শ্বসন হলো একটি অপরিহার্য শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেন ($\text{O}_2$) কোষীয় বিপাকীয় কার্যাবলীর জন্য কোষে সরবরাহ করা হয় এবং পুষ্টি উপাদানের জারণের মাধ্যমে এটিপি ($\text{ATP}$) তৈরির পাশাপাশি উৎপন্ন ক্ষতিকারক কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$) শরীর থেকে নিষ্কাশিত হয়। মানব শ্বসনতন্ত্র কার্যগত ও গাঠনিকভাবে দুটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত: পরিবাহী অঞ্চল (Conducting Zone) এবং শ্বসন বা বিনিময় অঞ্চল (Respiratory/Exchange Zone)।
| কার্যগত বিভাজন | অ্যানাটমিক্যাল অংশসমূহ | কলাস্থান ও শারীরবৃত্তীয় ভূমিকা |
|---|---|---|
| ১. পরিবাহী অঞ্চল (Conducting Zone) | বহিঃনাসারন্ধ্র $\to$ নাসা গহ্বর $\to$ অন্তঃনাসারন্ধ্র $\to$ গলবিল (নাসাগলবিল, মুখগলবিল, স্বরগলবিল) $\to$ স্বরযন্ত্র বা ল্যারিংস $\to$ শ্বাসনালী (Trachea) $\to$ প্রাথমিক, গৌণ ও প্রগৌণ ব্রঙ্কাই $\to$ প্রান্তীয় ব্রঙ্কিওল। | সিউডোস্ট্র্যাটিফাইড সিলিয়াযুক্ত স্তম্ভাকার আবরণী কলা, মিউকাস ক্ষরণকারী গবলেট কোষ ও রক্তজালক সমৃদ্ধ। এটি বায়ুকে পরিবাহিত করে, ধূলিকণা ও জীবাণু ফিল্টার করে (মিউকোসিলিয়ারি এস্কেলেটর), বায়ুকে ১০০% আর্দ্র করে এবং দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ($37^\circ\text{C}$) উত্তপ্ত করে। এখানে কোনো গ্যাসীয় বিনিময় ঘটে না। |
| ২. শ্বসন/বিনিময় অঞ্চল (Respiratory Zone) | শ্বসন ব্রঙ্কিওল $\to$ বায়ুকোষ নালী (Alveolar duct) $\to$ বায়ুকোষ থলি (Alveolar sac) $\to$ অ্যালভিওলাই বা বায়ুকোষ (উভয় ফুসফুসে প্রায় ৩০ কোটি বায়ুকোষ)। | অত্যন্ত পাতলা সরল আঁইশাকার আবরণী কলা (Type I নিউমোসাইট) দ্বারা গঠিত। এটি প্রায় ৭০–১০০ বর্গমিটার (একটি টেনিস কোর্টের সমতুল্য) এক বিশাল রক্তজালকসমৃদ্ধ তল প্রদান করে, যেখানে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় $\text{O}_2$ ও $\text{CO}_2$-এর দ্রুত বিনিময় ঘটে। |
শ্বাসনালী (Trachea) ও T5 কশেরুকায় ব্রঙ্কিয়াল বিভাজন
শ্বাসনালী বা ট্রাকিয়া (Trachea): এটি প্রায় ১০–১২ সেমি দীর্ঘ ও ২–২.৫ সেমি ব্যাসযুক্ত একটি সোজা নালী। এর প্রাচীরে ১৬ থেকে ২০টি অপূর্ণ 'C'-আকৃতির হায়ালিন তরুণাস্থি নির্মিত বলয় থাকে, যা প্রশ্বাসের সময় অন্তঃস্থ ঋণাত্মক চাপে শ্বাসনালীকে চুপসে (collapse) যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
- বিভাজনের ল্যান্ডমার্ক: পঞ্চম বক্ষদেশীয় কশেরুকার ($T_5$) সমতলে ট্রাকিয়া দুটি প্রধান শাখায় অর্থাৎ ডান ও বাম প্রাথমিক ব্রঙ্কাসে বিভক্ত হয়। ডান ব্রঙ্কাসটি বামটির তুলনায় অধিকতর চওড়া, খাটো এবং উল্লম্ব হওয়ায় শ্বাসনালীতে কোনো বাহ্যিক বস্তু প্রবেশ করলে তা সাধারণত ডান ফুসফুসেই প্রবেশ করে।
- শাখাবিন্যাস: প্রাথমিক ব্রঙ্কাস $\to$ গৌণ বা লোবার ব্রঙ্কাই (ডান ফুসফুসে ৩টি, বামে ২টি) $\to$ প্রগৌণ বা সেগমেন্টাল ব্রঙ্কাই $\to$ ব্রঙ্কিওল $\to$ প্রান্তীয় ব্রঙ্কিওল। ব্রঙ্কিওল পর্যন্ত তরুণাস্থির ফলক বর্তমান থাকে।
- স্বরযন্ত্র ও এপিগ্লটিস: ল্যারিংস ৯টি তরুণাস্থি দিয়ে গঠিত (থাইরয়েড, ক্রিকয়েড, এপিগ্লটিস ইত্যাদি)। এপিগ্লটিস বা উপজিহ্বা হলো একটি পাতা আকৃতির স্থিতিস্থাপক তরুণাস্থির ঢাকনা, যা খাদ্য গিলে ফেলার সময় গ্লটিসকে ঢেকে রেখে শ্বাসনালীতে খাদ্যের প্রবেশ বন্ধ করে।
বক্ষ গহ্বর ও প্লুরাল পর্দার গঠন
ফুসফুস দুটি একটি বায়ুরোধী বক্ষ গহ্বরে (Thoracic Cavity) সুরক্ষিত থাকে। এই গহ্বরটি পৃষ্ঠদেশে বক্ষদেশীয় কশেরুকা, অঙ্কদেশে স্টার্নাম, পার্শ্বদেশে ১২ জোড়া পাঁজর ও ইন্টারকোস্টাল পেশী এবং নিম্নদেশে গম্বুজাকৃতির পেশিময় মধ্যচ্ছদা (Diaphragm) দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিটি ফুসফুস দ্বিস্তরবিশিষ্ট প্লুরা (Pleura) পর্দা দ্বারা আবৃত:
- প্যারাইটাল প্লুরা (Parietal Pleura): বহিরাবরণী, যা বক্ষপ্রাচীর ও ডায়াফ্রামের সংস্পর্শে দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে।
- ভিসেরাল প্লুরা (Visceral Pleura): অন্তরাবরণী, যা সরাসরি ফুসফুসের বহিঃপৃষ্ঠের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে।
- প্লুরাল গহ্বর ও রস: এই দুই স্তরের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম স্থানে প্লুরাল তরল (Pleural fluid) থাকে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় ঘর্ষণ হ্রাস করে এবং একটি সার্বক্ষণিক ঋণাত্মক অন্তঃপ্লুরাল চাপ ($-4\text{ to } -6\text{ mmHg}$) বজায় রেখে ফুসফুসকে চুপসে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।