বহুকোষী উন্নত জীবদেহে সুনির্দিষ্ট সমতা বা হোমিয়োস্ট্যাসিস (Homeostasis) বজায় রাখার জন্য দুটি প্রধান সমন্বয়কারী ব্যবস্থা কাজ করে: স্নায়ুতন্ত্র (দ্রুত, নির্দিষ্ট ও ক্ষণস্থায়ী বৈদ্যুতিক সংকেত) এবং অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র (ধীর, বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক সংকেত)।
অতীতে হরমোনকে অনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত রক্তবাহিত রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হতো (স্টার্লিং, ১৯০৫)। আধুনিক অন্তঃক্ষরা বিজ্ঞানের সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা অনুসারে: "হরমোন হলো অপৌষ্টিক জৈব রাসায়নিক বার্তাবহ, যা দেহে অতি স্বল্প মাত্রায় (Trace amounts) উৎপন্ন হয়, কোষসমূহের মধ্যে আন্তঃকোষীয় সংকেত প্রেরক হিসেবে কাজ করে এবং রক্ত বা দেহতরলের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্য কোষের নির্দিষ্ট গ্রাহকে আবদ্ধ হয়ে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটায়।"
রাসায়নিক গঠন ও দ্রবণীয়তার ভিত্তিতে মানবদেহের হরমোনসমূহকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়:
- পেপটাইড, পলিপেপটাইড ও প্রোটিন হরমোন: জলে দ্রবণীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের শৃঙ্খল দ্বারা গঠিত। যেমন: হাইপোথ্যালামিক হরমোনসমূহ (GnRH, TRH, সোমাটোস্ট্যাটিন), অগ্র পিটুইটারি হরমোনসমূহ (GH, TSH, ACTH, PRL, LH, FSH), অগ্ন্যাশয়ের হরমোন (ইনসুলিন, গ্লুকাগন) এবং প্যারাথাইরয়েড হরমোন (PTH)।
- স্টেরয়েড হরমোন: মসৃণ এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলামে কোলেস্টেরল থেকে সংশ্লেষিত লিপিড-দ্রাব্য হরমোন। যেমন: অ্যাড্রিনাল কর্টেক্সের হরমোনসমূহ (কর্টিসোল, অ্যালডোস্টেরন, DHEA) এবং জননগ্রন্থির হরমোনসমূহ (টেস্টোস্টেরন, ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন)।
- আয়োডোথাইরোনিন: থাইরয়েড ফলিকলে টাইরোসিন অ্যামিনো অ্যাসিডের সাথে সমযোজী বন্ধনে আবদ্ধ আয়োডিনযুক্ত যৌগ। যেমন: ট্রাইআয়োডোথাইরোনিন (\(T_3\)) এবং টেট্রাআয়োডোথাইরোনিন বা থাইরক্সিন (\(T_4\))।
- অ্যামিনো অ্যাসিড ডেরিভেটিভ: একক অ্যামিনো অ্যাসিড (প্রধানত টাইরোসিন ও ট্রিপটোফ্যান) থেকে সংশোধিত ক্ষুদ্রাকার অণু। যেমন: ক্যাটেকোলামাইন (টাইরোসিন থেকে তৈরি অ্যাড্রিনালিন ও নর-অ্যাড্রিনালিন) এবং মেলাটোনিন (পিনিয়াল গ্রন্থিতে ট্রিপটোফ্যান থেকে সংশ্লেষিত)।
স্নায়বিক সমন্বয়: নিউরনের অ্যাক্সন ও সিন্যাপসের মাধ্যমে তড়িৎ-রাসায়নিক সংকেত পরিবহন; অত্যন্ত দ্রুত গতি (প্রতি সেকেন্ডে \(১০০\text{ মিটার}\) পর্যন্ত); সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কোষে সীমাবদ্ধ; প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক এবং ক্ষণস্থায়ী (উদ্দীপনা বন্ধ হলেই থেমে যায়)।
হরমোনজনিত সমন্বয়: রক্তের মাধ্যমে রাসায়নিক অণুর ব্যাপন ও সংবহন; তুলনামূলক ধীর গতি (কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট); সারা শরীরে বিস্তৃত লক্ষ্য কোষে কার্যকারিতা; দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব (ঘণ্টা, দিন বা মাসব্যাপী বিপাকীয় পরিবর্তন অব্যাহত থাকে)।