কোষ বিভাজন হলো সমস্ত সজীব জীবের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ১৮৫৫ সালে বিজ্ঞানী রুডলফ ভার্চো তাঁর বিখ্যাত মতবাদে বলেন—Omnis cellula-e cellula (পূর্ববর্তী কোষ থেকেই নতুন কোষের সৃষ্টি হয়)। যে ধারাবাহিক ও সুশৃঙ্খল আণবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি কোষ তার জিনোমের প্রতিলিপিকরণ ঘটায়, প্রয়োজনীয় সাইটোপ্লাজমীয় উপাদান তৈরি করে এবং দুটি অপত্য কোষে বিভক্ত হয়, তাকে কোষ চক্র (Cell Cycle) বলে।
- জেনারেশন কাল ($T_g$): একটি সম্পূর্ণ কোষ চক্র সম্পন্ন হতে যে সময় লাগে তাকে জেনারেশন কাল বলে। মানবদেহের কোষ কালচারে একটি কোষ চক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা সময় লাগে। অন্যদিকে এককোষী ইস্ট (Saccharomyces cerevisiae) মাত্র ৯০ মিনিটে কোষ চক্র শেষ করে।
- দুটি মৌলিক পর্যায়:
- ইন্টারফেজ (Interphase / প্রস্তুতি পর্ব): দুটি ধারাবাহিক M দশার মধ্যবর্তী সময়কাল। এই দশায় কোষ শারীরবৃত্তীয়ভাবে অত্যন্ত সক্রিয় থেকে বিভাজনের প্রস্তুতি নেয় এবং এটি কোষ চক্রের ৯৫% এরও বেশি সময় (মানুষে প্রায় ২৩ ঘণ্টা) অধিকার করে।
- M দশা (মাইটোসিস / বিভাজন পর্ব): এটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও নাটকীয় পর্যায় (প্রায় ১ ঘণ্টা), যেখানে নিউক্লিয়াসের বিভাজন (ক্যারিওকাইনেসিস) এবং সাইটোপ্লাজমের বিভাজন (সাইটোকাইনেসিস) ঘটে।
- $G_1$ দশা (প্রথম বৃদ্ধি দশা / Post-mitotic gap):
- মাইটোসিস বিভাজন সমাপ্তি এবং DNA প্রতিলিপিকরণ শুরুর মধ্যবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায়।
- কোষটি অত্যন্ত সক্রিয় থাকে, অবিরাম বিভিন্ন প্রকার RNA (mRNA, tRNA, rRNA), উৎসেচক প্রোটিন এবং বিভিন্ন অঙ্গাণু (মাইটোকনড্রিয়া, রাইবোজোম) তৈরি করে।
- কোষের সামগ্রিক আয়তন বৃদ্ধি পায়। ক্রোমোসোম সংখ্যা ও DNA এর পরিমাণ অপরিবর্তিত ($2n$ ও $2C$) থাকে।
- $S$ দশা (সংশ্লেষ দশা / Synthesis Phase):
- এই দশায় নিউক্লিয়াসে DNA রেপ্লিকেশন বা প্রতিলিপিকরণ ঘটে। DNA এর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে $2C o 4C$ হয়।
- মৌলিক নিয়ম: প্রতিলিপিকৃত নতুন সিস্টার ক্রোমাটিড দুটি একটিমাত্র সাধারণ সেন্ট্রোমিয়ারে যুক্ত থাকায় ক্রোমোজোম সংখ্যা কঠোরভাবে একই ($2n$) থাকে। যেমন মানুষের কোষে S দশার আগেও ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে এবং S দশার পরেও ৪৬টি ক্রোমোজোমই থাকে।
- প্রাণী কোষে একই সাথে সাইটোপ্লাজমে সেন্ট্রিওলের দ্বিত্বায়ন ঘটে এবং নতুন DNA তন্তুকে আবৃত করার জন্য হিস্টোন প্রোটিন সংশ্লেষিত হয়।
- $G_2$ দশা (দ্বিতীয় বৃদ্ধি দশা / Pre-mitotic gap):
- DNA প্রতিলিপিকরণ সমাপ্তি এবং মাইটোসিস শুরুর মধ্যবর্তী প্রস্তুতিমূলক পর্যায়।
- স্পিন্ডল তন্তু গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় টিউবুলিন প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত ATP সংশ্লেষিত হয়। কোষে $2n$ ক্রোমোজোম ও $4C$ DNA থাকে।
- $G_0$ শান্ত দশা (Quiescent / Resting Stage):
- প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীদের বহু কোষ আর বিভাজিত হয় না (যেমন হৃদপেশি কোষ, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের নিউরোন)।
- এই কোষগুলি $G_1$ দশা থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে একটি বিপাকীয়ভাবে সক্রিয় কিন্তু অবিভাজন দশায় অবস্থান করে, যাকে $G_0$ দশা বলে।
- কোষগুলি শারীরবৃত্তীয়ভাবে জীবন্ত ও বিশেষায়িত থাকে, কিন্তু নির্দিষ্ট বৃদ্ধির উদ্দীপনা বা আঘাত মেরামতের প্রয়োজন ছাড়া DNA প্রতিলিপিকরণ বা বিভাজনে অংশ নেয় না।
কোষ চক্রের পর্যায়ক্রমিক রূপান্তর সাইক্লিন নামক নিয়ন্ত্রক প্রোটিন এবং সাইক্লিন-নির্ভর কাইনেজ (Cyclin-Dependent Kinases, CDKs) এর ফসফোরাইলেশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জেনেটিক ত্রুটি রোধে তিনটি প্রধান চেকপয়েন্ট (Checkpoints) কাজ করে:
- $G_1/S$ চেকপয়েন্ট (রেস্ট্রিকশন পয়েন্ট / START): সাইক্লিন D-CDK4/6 এবং সাইক্লিন E-CDK2 দ্বারা পরিচালিত। এটি কোষের আকার, পুষ্টি এবং DNA ক্ষতির পরীক্ষা করে। DNA তে কোনো ক্ষয়ক্ষতি থাকলে টিউমার দমনকারী প্রোটিন p53 কোষ চক্র স্তব্ধ করে মেরামতের সুযোগ দেয়; ব্যর্থ হলে কোষের অ্যাপোপটোসিস (নিয়ন্ত্রিত মৃত্যু) ঘটায়।
- $G_2/M$ চেকপয়েন্ট: সাইক্লিন B-CDK1 (ম্যাচুরেশন প্রমোটিং ফ্যাক্টর, MPF) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটি নিশ্চিত করে যে DNA প্রতিলিপিকরণ ১০০% নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা।
- স্পিন্ডল অ্যাসেম্বলি চেকপয়েন্ট (SAC): মেটাফেজে কাজ করে। প্রতিটি ক্রোমোজোমের কাইনেটোকোরের সাথে স্পিন্ডল তন্তুর সঠিক উভমুখী সংযুক্তি নিশ্চিত করে, যাতে অ্যানাফেজে কোনো ক্রোমোজোমীয় নন-ডিসজাংশন বা অ্যানিউপ্লয়েডি না ঘটে।