প্রাণীজগতের দশ লক্ষাধিক প্রজাতির মধ্যে আকৃতি ও দৈহিক গঠনে প্রচুর বৈচিত্র্য থাকলেও কিছু মৌলিক কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য এদের পারস্পরিক সম্পর্কের দিশা দেখায়। প্রাণীদের বিজ্ঞানসম্মত শ্রেণিবিন্যাসে এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলিই মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- কোশীয় স্তর (Cellular Level): কোশগুলি শিথিলভাবে বিন্যস্ত থাকে, কোনো কলা গঠিত হয় না। কোশগুলির মধ্যে শ্রমবণ্টন বর্তমান। উদাহরণ: পরিফেরা পর্ব (স্পঞ্জ)।
- কলা স্তর (Tissue Level): একই কাজ সম্পন্নকারী কোশগুলি একত্রিত হয়ে সুনির্দিষ্ট কলা গঠন করে। উদাহরণ: নিডারিয়া (সিলেন্টেরটা) ও টেনোফোরা।
- অঙ্গ স্তর (Organ Level): বিভিন্ন কলা সুসংগঠিত হয়ে নির্দিষ্ট শারীরবৃত্তীয় অঙ্গ গঠন করে। প্রথম দেখা যায় প্লাটিহেলমিনথিস পর্বে।
- অঙ্গতন্ত্র স্তর (Organ-System Level): একাধিক অঙ্গ মিলিত হয়ে সুনির্দিষ্ট তন্ত্র (পৌষ্টিকতন্ত্র, সংবহনতন্ত্র, রেচনতন্ত্র ইত্যাদি) গঠন করে। অ্যাসকেলমিনথিস থেকে শুরু করে কর্ডাটা পর্যন্ত সমস্ত উন্নত পর্বে এটি দেখা যায়।
- অপ্রতিসম (Asymmetrical): দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর কোনো তল দিয়েই দেহটিকে দুটি সমান অর্ধাংশে বিভক্ত করা যায় না। অধিকাংশ স্পঞ্জ (Porifera) এবং প্রাপ্তবয়স্ক শামুক অপ্রতিসম।
- অরীয় প্রতিসাম্য (Radial Symmetry): দেহের কেন্দ্রীয় লম্ব অক্ষ বরাবর যেকোনো উল্লম্ব তলে ছেদ করলে দেহটি দুটি সদৃশ অর্ধাংশে বিভক্ত হয়। উদাহরণ: নিডারিয়া, টেনোফোরা এবং পূর্ণাঙ্গ একাইনোডার্মাটা (পঞ্চ-অরীয়)।
- দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসাম্য (Bilateral Symmetry): দেহের মধ্য-অনুদৈর্ঘ্য তল (Sagittal plane) বরাবর কেবল একটিমাত্র তলেই দেহটিকে সদৃশ বাম ও ডান অর্ধাংশে ভাগ করা যায়। এর সাথে মস্তকীভবন (Cephalization) যুক্ত। প্লাটিহেলমিনথিস থেকে কর্ডাটা (এবং একাইনোডার্মাটার লার্ভা) দ্বিপার্শ্বীয় প্রতিসম।
- দ্বিস্তরী প্রাণী (Diploblastic): ভ্রূণের পরিস্ফুটনকালে কোশগুলি দুটি প্রাথমিক স্তরে বিন্যস্ত থাকে—বহিঃস্থ এক্টোডার্ম এবং অন্তঃস্থ এন্ডোডার্ম। এদের মাঝে কোশবিহীন জেলির মতো স্তর থাকে যাকে মেসোগ্লিয়া বলে। উদাহরণ: পরিফেরা, নিডারিয়া ও টেনোফোরা।
- ত্রিস্তরী প্রাণী (Triploblastic): এক্টোডার্ম ও এন্ডোডার্মের মাঝখানে তৃতীয় ভ্রূণস্তর মেসোডার্ম গঠিত হয়। মেসোডার্ম থেকে পেশি, সংবহনকলা ও কঙ্কাল সৃষ্টি হয়। প্লাটিহেলমিনথিস থেকে কর্ডাটা পর্যন্ত সকল প্রাণী ত্রিস্তরী।
দেহতৃক এবং পৌষ্টিকনালীর মধ্যবর্তী মেসোডার্ম-আবৃত দেহগহ্বরকে সিলোম বলে। সিলোমের উপস্থিতির ভিত্তিতে প্রাণীদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
- অ্যাসিলোমেট (Acoelomate): কোনো সিলোম বা দেহগহ্বর থাকে না। দেহতৃক ও পৌষ্টিকনালীর মধ্যবর্তী স্থান কঠিন মেসোডার্মাল প্যারেনকাইমা কলা দ্বারা পূর্ণ থাকে। উদাহরণ: প্লাটিহেলমিনথিস (চ্যাপ্টাকৃমি)।
- সিউডোসিলোমেট বা ছদ্ম-সিলোমেট (Pseudocoelomate): দেহগহ্বরটি মেসোডার্মীয় পেরিটোনিয়াম পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে না; বরং ভ্রূণীয় ব্লাস্টোসিল গহ্বরে মেসোডার্ম কোশগুলি বিক্ষিপ্ত থলি হিসেবে অবস্থান করে। উদাহরণ: অ্যাসকেলমিনথিস (গোলকৃমি)।
- ইউসিলোমেট (Eucoelomate / True Coelomate): মেসোডার্মীয় পেরিটোনিয়াম (প্যারাইটাল ও ভিসেরাল স্তর) দ্বারা সম্পূর্ণ বেষ্টিত প্রকৃত দেহগহ্বর থাকে। অ্যানেলিডা, আর্থ্রোপোডা, মোলাস্কা, একাইনোডার্মাটা, হেমিকর্ডাটা ও কর্ডাটা ইউসিলোমেট।
- মেটামেরিক খণ্ডীভবন: দেহটি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে রৈখিক ক্রমে সজ্জিত একাধিক খণ্ডে (Metameres) বিভক্ত থাকে এবং অন্তত কিছু অঙ্গের পৌনঃপুনিক পুনরাবৃত্তি ঘটে। উদাহরণ: অ্যানেলিডা, আর্থ্রোপোডা ও কর্ডাটা।
- নটোকর্ড: ভ্রূণাবস্থায় মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন পৃষ্ঠীয়, নমনীয়, দণ্ডাকার গঠন। নটোকর্ডযুক্ত প্রাণীরা কর্ডাটা এবং নটোকর্ডবিহীন প্রাণীরা নন-কর্ডাটা।