১.১ বাষ্পীভবন ও সুপ্ততাপের ধারণা
বাষ্পীভবন (Evaporation) হলো এমন একটি ভৌত প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে তরল জল তাপশক্তি গ্রহণ করে অদৃশ্য গ্যাসীয় জলীয় বাষ্পে রূপান্তরিত হয়। এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় তাপকে বাষ্পীভবনের সুপ্ততাপ (Latent Heat of Vaporisation) বলে। প্রতি ১ গ্রাম তরল জলকে বাষ্পে পরিণত করতে প্রায় ৫৪০ ক্যালোরি (বা প্রায় $২.৫ \times ১০^৬\text{ জুল/কেজি}$) তাপের প্রয়োজন হয়। যেহেতু এই তাপ আশপাশের বাতাস ও জল থেকে শোষিত হয়, তাই বাষ্পীভবন একটি শৈত্য উৎপাদনকারী প্রক্রিয়া (যেমন—ঘাম শুকিয়ে গেলে বা মাটির কলসির জল ঠান্ডা হলে আমরা শীতলতা অনুভব করি)।
বাষ্পীভবনের হার প্রধানত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
- বায়ুর তাপমাত্রা: উষ্ণ বায়ুর অণুগুলির গতিশক্তি বেশি থাকে, তাই তাপমাত্রা বাড়লে বাষ্পীভবন দ্রুত হয়।
- বায়ুর শুষ্কতা বা আর্দ্রতার ঘাটতি: বাতাস যত শুষ্ক হবে, বাষ্প ধারণের ক্ষমতা তত বেশি থাকবে এবং বাষ্পীভবন দ্রুত হবে।
- বায়ুপ্রবাহ: বাতাস প্রবাহিত হলে বাষ্পীভবনস্থলের ওপর জমে থাকা বাষ্প দ্রুত দূরে সরে যায় এবং সেখানে নতুন শুষ্ক বাতাস এসে বাষ্পীভবন ত্বরান্বিত করে।
- উন্মুক্ত জলের ক্ষেত্রফল: জলাশয়ের উপরিভাগের ক্ষেত্রফল যত বড় হবে, তত বেশি জলকণা বাতাসে মুক্ত হতে পারবে।
১.২ পরম আর্দ্রতা বনাম আপেক্ষিক আর্দ্রতা
বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের পরিমাণকে ভূগোলে প্রধানত দুই ভাবে প্রকাশ করা হয়:
| প্যারামিটার | পরম আর্দ্রতা (Absolute Humidity) | আপেক্ষিক আর্দ্রতা (Relative Humidity - RH) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে প্রকৃতপক্ষে যে পরিমাণ জলীয় বাষ্প উপস্থিত থাকে। | কোনো নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট আয়তনের বায়ুতে উপস্থিত প্রকৃত বাষ্প এবং ওই উষ্ণতায় ওই বায়ুকে সম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ বাষ্পের অনুপাত (শতকরা হার)। |
| একক | গ্রাম প্রতি ঘনমিটার ($\text{g/m}^3$)। | শতকরা হার ($\%$); ০% (সম্পূর্ণ শুষ্ক) থেকে ১০০% (সম্পৃক্ত)। |
| তাপমাত্রার প্রভাব | বায়ুর আয়তন ও বাষ্পের পরিমাণ স্থির থাকলে তাপমাত্রার পরিবর্তনে এটি পরিবর্তিত হয় না। | তাপমাত্রার সাথে অত্যন্ত সংবেদনশীল: তাপমাত্রা বাড়লে বায়ুর বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বাড়ে, ফলে RH কমে; তাপমাত্রা কমলে RH বাড়ে। |
| আবহাওয়াগত তাৎপর্য | বায়ুর সামগ্রিক জলের ভর নির্দেশ করে। | বৃষ্টিপাত, মেঘ সৃষ্টি এবং মানুষের শারীরিক স্বস্তি-অস্বস্তি নির্ধারণ করে। |
১.৩ সম্পৃক্ত বায়ু, শিশিরাঙ্ক ও জলকর্ষী ধূলিকণা
বাতাসের তাপমাত্রা বাড়লে তার জলীয় বাষ্প ধারণের ক্ষমতা চক্রবৃদ্ধি হারে বৃদ্ধি পায়, আর তাপমাত্রা কমলে ধারণ ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়।
- সম্পৃক্ত বায়ু (Saturated Air): কোনো নির্দিষ্ট উষ্ণতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ বায়ু তার ধারণ ক্ষমতার সমান সর্বোচ্চ জলীয় বাষ্প ধারণ করলে তাকে সম্পৃক্ত বায়ু বলে। এই অবস্থায় বায়ুর আপেক্ষিক আর্দ্রতা হয় ১০০%।
- শিশিরাঙ্ক (Dew Point): বায়ুর জলীয় বাষ্পের পরিমাণ স্থির রেখে তাপমাত্রা কমাতে থাকলে যে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছে ওই বায়ু তার ভেতরের বাষ্প দ্বারা সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে এবং ঘনীভবন শুরু হয়, সেই তাপমাত্রাকে শিশিরাঙ্ক বলে।
- জলকর্ষী ধূলিকণা (Hygroscopic Condensation Nuclei): ধূলিকণাহীন সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ বাতাসে জলীয় বাষ্প সহজে ঘনীভূত হতে পারে না। বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা সমুদ্রের সূক্ষ্ম লবণকণা, কলকারখানার ছাই ও ঝুলকালি, ধূলিকণা ও পরাগরেণু জলকে আকর্ষণ করে। এদের ওপর ভর করেই জলীয় বাষ্প জমাট বেঁধে ভাসমান মেঘকণা বা শিশিরবিন্দু তৈরি করে।
১.৪ ভূপৃষ্ঠে ঘনীভবনের রূপ: শিশির, তুহিন ও কুয়াশা
- শিশির (Dew): মেঘহীন পরিষ্কার শান্ত রাতে ভূপৃষ্ঠ দীর্ঘ তরঙ্গ বিকিরণ করে দ্রুত ঠান্ডা হয়। ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বাতাস শিশিরাঙ্কের নিচে নেমে গেলে ঘাস, গাছের পাতা বা পাথরের ওপর জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু হিসেবে জমা হয়। একে শিশির বলে। শিশির আকাশ থেকে পড়ে না, ভূমির ওপরই ঘনীভূত হয়।
- তুহিন (White Frost): শীতকালে রাতের তাপমাত্রা যখন হিমাঙ্কের নিচে (০° সেন্টিগ্রেডের কম) নেমে যায়, তখন জলীয় বাষ্প তরল না হয়ে সরাসরি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদা বরফ কুঁচি বা বরফের গুঁড়োতে পরিণত হয়। একে তুহিন বলে। এটি শাকসবজি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে।
- কুয়াশা (Fog): ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুর তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নিচে নেমে গেলে ধূলিকণাকে আশ্রয় করে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দুর সৃষ্টি হয়, যা দৃষ্টিসীমা কমিয়ে দেয়। আবহাওয়া বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, যখন দৃষ্টিসীমা ১ কিলোমিটারের কম হয়ে যায়, তখন তাকে কুয়াশা বলে।
- কুয়াটিকা (Mist): কুয়াশার চেয়ে হালকা রূপ, যেখানে ভাসমান জলকণার পরিমাণ কম থাকে এবং দৃষ্টিসীমা ১ কিলোমিটার থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে।
- ধোঁয়াশা (Smog): ধোঁয়া (Smoke) এবং কুয়াশা (Fog)-র ক্ষতিকর মিশ্রণকে ধোঁয়াশা বলে। শিল্পাঞ্চলের কয়লা ও ডিজেলের ধোঁয়ায় থাকা সালফার ডাই-অক্সাইড কুয়াশার সঙ্গে মিশে অত্যন্ত বিষাক্ত সালফিউরিক অ্যাসিডের কুয়াশা তৈরি করে (যেমন—১৯৫২ সালের লন্ডনের গ্রেট স্মগ)। আধুনিক বড় শহরে যানবাহনের ধোঁয়া সূর্যালোকের উপস্থিতিতে আলোক-রাসায়নিক ধোঁয়াশা (Photochemical Smog) সৃষ্টি করে।