১.১ সংবিধান রচনার পটভূমি ও ক্যাবিনেট মিশন (১৯৪৬)
১৯৪৭ সালের পূর্বে ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী আইনের অধীনে (যেমন ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন) শাসিত হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান এবং ভারতের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের তীব্র চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে ভারতে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঠায়, যা ক্যাবিনেট মিশন বা মন্ত্রিমিশন (Cabinet Mission) নামে পরিচিত।
ক্যাবিনেট মিশনের সুপারিশ অনুসারেই স্বাধীন ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয় গণপরিষদ (Constituent Assembly)। বিভিন্ন প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষ নির্বাচনে এবং দেশীয় রাজ্যগুলির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল।
১.২ গণপরিষদ গঠন ও ড. বি.আর. আম্বেদকরের খসড়া কমিটি
গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসেছিল ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর নতুন দিল্লির বর্তমান সংসদ ভবনের কেন্দ্রীয় কক্ষে (Constitution Hall):
- অস্থায়ী সভাপতি: বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য ড. সচ্চিদানন্দ সিনহা প্রথম দিনের সভায় অস্থায়ী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
- স্থায়ী সভাপতি: ১৯৪৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সর্বসম্মতিক্রমে গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন।
- খসড়া কমিটি (Drafting Committee): ১৯৪৭ সালের ২৯ আগস্ট সংবিধানের সামগ্রিক খসড়া প্রস্তুতের জন্য সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ খসড়া কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন খ্যাতনামা আইনজ্ঞ ও সমাজসংস্কারক ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্য ও অবদানের জন্য তাঁকে "ভারতীয় সংবিধানের জনক" (Father of the Indian Constitution) বলা হয়।
- রচনার সময়সীমা: সংবিধান রচনায় সময় লেগেছিল দীর্ঘ ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন। এই পর্বে মোট ১১টি অধিবেশন বসে এবং ১৬৫ দিন ধরে গভীর বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।
১.৩ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তারিখ: সংবিধান গ্রহণ বনাম কার্যকর
| মাইলফলক | সুনির্দিষ্ট তারিখ | ঐতিহাসিক ঘটনা ও তাৎপর্য | জাতীয় উদযাপন |
|---|---|---|---|
| সংবিধান গ্রহণ (Adoption) | ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ | গণপরিষদ সংবিধানের চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদন করে এবং ২৮৪ জন সদস্যের স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা গৃহীত হয়। | সংবিধান দিবস (Constitution Day / Samvidhan Divas) |
| সংবিধান কার্যকর (Enforcement) | ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ | সমগ্র ভারতবর্ষে সংবিধান আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয় এবং ভারত একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র রূপে আত্মপ্রকাশ করে। | প্রজাতন্ত্র দিবস (Republic Day) |
২৬ জানুয়ারির বিশেষ তাৎপর্য: ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান তৈরি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও পূর্ণ কার্যকর করার জন্য দুই মাস অপেক্ষা করা হয়েছিল। কারণ ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে ঐতিহাসিক পূর্ণ স্বরাজ (Purna Swaraj / সম্পূর্ণ স্বাধীনতা) দিবস পালিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক দিনটির গৌরবময় স্মৃতিকে অমর রাখতেই ২৬ জানুয়ারিকে সংবিধান কার্যকর করার দিন অর্থাৎ 'প্রজাতন্ত্র দিবস' হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
১.৪ সংবিধানের প্রস্তাবনা (Preamble): সংবিধানের আত্মা ও আদর্শের দর্পণ
ভারতীয় সংবিধানের শুরুতেই রয়েছে একটি ভূমিকা বা প্রস্তাবনা (Preamble)। বিখ্যাত আইনজ্ঞ নানি পালকিওয়ালার মতে প্রস্তাবনা হলো "সংবিধানের পরিচয়পত্র" (Identity Card of the Constitution) এবং পণ্ডিত ঠাকুরদাস ভার্গব একে "সংবিধানের আত্মা ও অমূল্য রত্ন" হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রস্তাবনার প্রারম্ভিক শব্দমালা: "আমরা, ভারতের জনগণ..." (WE, THE PEOPLE OF INDIA...) — এই বাক্যটি প্রমাণ করে যে ভারতে কোনো ঔপনিবেশিক শাসক বা কোনো ব্যক্তিবিশেষ সার্বভৌম নয়; দেশের সমস্ত রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার মূল উৎস হলেন ভারতীয় জনগণ।
১.৫ প্রস্তাবনার মূল শব্দাবলির অর্থ ও গুরুত্ব
| প্রস্তাবনার আদর্শ শব্দ | ইংরেজি পরিভাষা | সাংবিধানিক অর্থ ও গণতান্ত্রিক তাৎপর্য |
|---|---|---|
| সার্বভৌম | SOVEREIGN | ভারত অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী এবং কোনো বিদেশি বা বাহ্যিক শক্তির নিয়ন্ত্রণমুক্ত। |
| সমাজতান্ত্রিক* | SOCIALIST | ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনে যুক্ত হয়। এর লক্ষ্য হলো গণতান্ত্রিক উপায়ে সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও বৈষম্য হ্রাস করা। |
| ধর্মনিরপেক্ষ* | SECULAR | ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনে যুক্ত হয়। ভারতে কোনো রাষ্ট্রীয় ধর্ম নেই; রাষ্ট্র সমস্ত ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করবে (সর্বধর্মসমভাব)। |
| গণতান্ত্রিক | DEMOCRATIC | সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হয় এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। |
| প্রজাতন্ত্র | REPUBLIC | ভারতের রাষ্ট্রপ্রধান (রাষ্ট্রপতি) কোনো বংশানুক্রমিক রাজা বা রানি নন; তিনি জনগণের দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ের (৫ বছর) জন্য পরোক্ষভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধি। |
| ন্যায়বিচার | JUSTICE | সকল নাগরিকের জন্য সামাজিক ন্যায় (জাতি-ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ বিলোপ), অর্থনৈতিক ন্যায় ও রাজনৈতিক ন্যায় নিশ্চিত করা। |
| স্বাধীনতা | LIBERTY | চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্মপালন ও উপাসনার পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা। |
| সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ | EQUALITY & FRATERNITY | মর্যাদা ও সুযোগের সমতা প্রতিষ্ঠা এবং ভৌগোলিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্য ছাপিয়ে সকল ভারতীয়র মধ্যে জাতীয় ঐক্যের বন্ধন সুদৃঢ় করা। |