Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 2
আনুমানিক সময়: 65 মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

Rise of Regional Powers

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান (ইতিহাস - অতীত ও ঐতিহ্য) পাঠ্যক্রমের দ্বিতীয় অধ্যায়: 'আঞ্চলিক শক্তির উত্থান' (Rise of Regional Powers)-এর প্রামাণ্য মাস্টার স্টাডি গাইডে আপনাকে স্বাগতম। এই অধ্যায়ে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরবর্তী অষ্টাদশ শতকের ভারতীয় উপমহাদেশের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক রূপান্তর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জানবে কীভাবে কেন্দ্রীয় মুঘল ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ সংকট, জায়গিরদারি ও মনসবদারি ব্যবস্থার অচলাবস্থা, কৃষক বিদ্রোহ এবং নাদির শাহ ও আহমদ শাহ আবদালির বিধ্বংসী আক্রমণের ফলে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে। এরপর বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে তিনটি প্রধান উত্তরাধিকার রাজ্য—মুর্শিদকুলি খান ও আলিবর্দি খানের অধীন বাংলা, নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহের অধীন হায়দরাবাদ এবং সাদাত খান ও সফদরজং-এর অধীন অযোধ্যা। একই সাথে পেশোয়াদের অধীনে মারাঠা সাম্রাজ্যের উত্তর ভারতে বিস্তার, সাঙ্গোলা চুক্তি ও মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের ঐতিহাসিক পরিণতি বিশদভাবে উন্মোচিত হয়েছে। পরিশেষে মহীশূরে হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের বিজ্ঞানসম্মত সামরিক সংস্কার ও প্রতিরোধ এবং পাঞ্জাবে মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহের অধীনে আধুনিক শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ও অমৃতসরের সন্ধি (১৮০৯) বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কীভাবে পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে এবং বাংলা, অযোধ্যা ও হায়দরাবাদে স্বশাসিত উত্তরাধিকার রাজ্য, মারাঠা কনফেডারেসি এবং মহীশূর ও শিখ রাজ্যের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটেছিল?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

অষ্টাদশ শতকের আঞ্চলিক শক্তির উত্থান অনুধাবন করা আধুনিক ভারতের ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য। এই অধ্যায়টি অষ্টাদশ শতককে কেবলমাত্র 'অন্ধকার যুগ' হিসেবে দেখার ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকে খণ্ডন করে প্রমাণ করে যে এটি ছিল প্রাণবন্ত আঞ্চলিক রাষ্ট্র গঠন, সামরিক আধুনিকায়ন ও প্রশাসনিক উদ্ভাবনের যুগ। মারাঠা, মহীশূর, বাংলা কিংবা শিখদের মতো অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন তারা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় ফ্রন্ট গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং কীভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা একটি বিদেশি বাণিজ্যিক কোম্পানিকে সমগ্র ভারত জয় করার সুযোগ করে দিয়েছিল, তা বিশ্লেষণ করা শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক অন্তর্দৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করে।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • আকবর, শাহজাহান ও ঔরঙ্গজেবের আমলে মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা ও ভৌগোলিক বিস্তার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
  • মুঘল প্রশাসনিক কাঠামো, বিশেষত মনসবদারি ও জায়গিরদারি ব্যবস্থার মূল নীতিসমূহ
  • সপ্তদশ শতকে ভারতীয় উপকূলে ইউরোপীয় বণিক কোম্পানিগুলির (পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ব্রিটিশ) আগমন ও বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের আর্থ-সামাজিক কারণ (জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট, কৃষক বিদ্রোহ) এবং নাদির শাহ (১৭৩৯) ও আহমদ শাহ আবদালির (১৭৬১) বৈদেশিক আক্রমণের ধ্বংসাত্মক প্রভাব বিশ্লেষণ করা।
  • মুর্শিদকুলি খানের নেতৃত্বে বাংলার স্বশাসিত সুবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা (রাজধানী স্থানান্তর, মাল-জামিনি ব্যবস্থা) এবং আলিবর্দি খানের শাসনকালে মারাঠা বর্গি আক্রমণ প্রতিরোধ ও ইউরোপীয় কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ পর্যালোচনা করা।
  • হায়দরাবাদে নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহের নেতৃত্বে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা (১৭২৪ সাকরখেদার যুদ্ধ) এবং অযোধ্যায় সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক ও পরবর্তী নওয়াব ওয়াজিরদের শাসনকাল মূল্যায়ন করা।
  • পেশোয়াদের নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির বিস্তার (বালাজি বিশ্বনাথ, বাজিরাও ১-এর হিন্দু পদ পাদশাহী, বালাজি বাজিরাও), মারাঠা যুক্তরাষ্ট্রের স্বরূপ এবং ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের কারণ ও সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করা।
  • মহীশূরে হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের আধুনিক সামরিক সংস্কার (রকেট প্রযুক্তি, ফরাসি মৈত্রী) ও চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ এবং পাঞ্জাবে মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহের অধীনে ১২টি মিসলের ঐক্যবদ্ধকরণ ও ফউজ-ই-খাস গঠন বিশ্লেষণ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 অধ্যায় ১: মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: অভ...
2 অধ্যায় ২: স্বশাসিত বাংলা: মুর্শিদক...
3 অধ্যায় ৩: হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার উত...
4 অধ্যায় ৪: মারাঠা কনফেডারেসি ও তৃতী...
5 অধ্যায় ৫: স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি: ম...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

অধ্যায় ১: মুঘল সাম্রাজ্যের পতন: অভ্যন্তরীণ সংকট ও বৈদেশিক আক্রমণ

১.১ ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭) ও পরবর্তী মুঘল রাজনীতি

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ আহমেদনগরে ষষ্ঠ মহামতি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব আলমগীর-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অখণ্ড মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত ভাঙন শুরু হয়। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে মুঘলরা যে রাজনৈতিক ঐক্য, কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সামরিক শৃঙ্খলা গড়ে তুলেছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। দাক্ষিণাত্যে ঔরঙ্গজেবের সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের যুদ্ধ (১৬৮১–১৭০৭)—যাকে ঐতিহাসিকরা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' (Deccan Ulcer) বলে অভিহিত করেছেন—মুঘল রাজকোষ শূন্য করে দেয়, সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে ফেলে এবং উত্তর ভারতের প্রশাসনকে অচল করে তোলে।

ঔরঙ্গজেবের পর দিল্লির মসনদে বসেন দুর্বল ও অযোগ্য একদল শাসক, যাদের ইতিহাসে 'পরবর্তী মুঘল' (Later Mughals) বলা হয় (প্রথম বাহাদুর শাহ, জাহান্দার শাহ, ফাররুখশিয়ার, মহম্মদ শাহ)। এঁদের রাজত্বকালে মুঘল দরবার প্রধান তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাত গোষ্ঠীর চক্রান্তের আখড়ায় পরিণত হয়:

  • তুরানি গোষ্ঠী: মধ্য এশিয়া থেকে আগত অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের নেতা ছিলেন চিন কুলিজ খান (নিজাম-উল-মুলক)।
  • ইরানি গোষ্ঠী: পারস্য থেকে আগত শিয়া অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের অন্যতম ছিলেন অযোধ্যার সাদাত খান।
  • হিন্দুস্তানি গোষ্ঠী: ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমান অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাত সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় (হাসান আলি ও আবদুল্লা খান)। ১৭১৩ থেকে ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁরা একের পর এক সম্রাটকে সিংহাসনে বসিয়েছেন ও হত্যা করেছেন, ফলে তাঁদের 'নৃপতিকর্তা' বা 'কিংমেকার' (Kingmakers) বলা হয়।
১.২ অভ্যন্তরীণ সংকট: জায়গিরদারি, মনসবদারি সংকট ও কৃষক বিদ্রোহ

আধুনিক ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র ও ইরফান হাবিব দেখিয়েছেন যে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কোনো ব্যক্তির দুর্বলতার কারণে ঘটেনি, বরং এর মূলে ছিল গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট:

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কাঠামোগত দিকসমূহ:
  • জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: মুঘল শাসন ও সামরিক ব্যবস্থা নির্ভরশীল ছিল মনসবদারি প্রথার ওপর। মনসবদারদের বেতনের বদলে রাজস্ব আদায়ের জন্য জমি দেওয়া হতো, যাকে জায়গির বলা হতো। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মনসবদারের সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু বিলি করার মতো জমি (পাইবাকি জমি / Paibaqi)-র তীব্র অভাব দেখা দেয়। এই জমি সংকট বা 'বে-জায়গিরি' (Be-jagiri) অভিজাতদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দেয়।
  • চরম রাজস্ব শোষণ: অনিশ্চিত ও স্বল্পমেয়াদী বদলি ব্যবস্থার কারণে জায়গিরদাররা কৃষকদের ওপর বেপরোয়া রাজস্ব চাপিয়ে দেন। উৎপন্ন ফসলের শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত কর হিসেবে কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে কৃষকেরা ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
  • কৃষক বিদ্রোহ: শোষিত কৃষকেরা জাতিগত ও ধর্মীয় নেতৃত্বে মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আগ্রা-মথুরার জাঠ (গোকুলা, রাজারাম, চূড়ামন), নারনৌলের সৎনামী, বুন্দেলখণ্ডের বুন্দেলা (ছত্রশাল) এবং পাঞ্জাবের শিখরা লাগাতার সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
১.৩ নাদির শাহের ভারত আক্রমণ ও দিল্লি লুণ্ঠন (১৭৩৯)

মুঘল সাম্রাজ্য যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, তখন পশ্চিম দিক থেকে নেমে আসে এক বিধ্বংসী আঘাত। পারস্যের পরাক্রান্ত শাসক নাদির শাহ আফশার ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে খাইবার গিরিপথ পার হয়ে ভারত আক্রমণ করেন।

  • কারনালের যুদ্ধ (২৪ ফেব্রুয়ারি ১৭৩৯): হরিয়ানার কারনাল প্রান্তরে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ 'রঙ্গিলা'-র বিশৃঙ্খল সেনাদল নাদির শাহের সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বন্ধুকধারী সেনার মুখোমুখি হয়। মাত্র তিন ঘণ্টার যুদ্ধে মুঘল বাহিনী সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়। প্রধান অমাত্য খান-ই-দৌরান নিহত হন এবং নিজাম-উল-মুলক মধ্যস্থতা করে সাময়িক সন্ধি করেন।
  • দিল্লির গণহত্যা (কতল-ই-আম): নাদির শাহ মহম্মদ শাহকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে প্রবেশ করেন। দিল্লিতে নাদির শাহের মৃত্যুর মিথ্যা গুজব রটলে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা কিছু পারসিক সেনাকে হত্যা করে। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে নাদির শাহ চাঁদনি চকের সুনেহরি মসজিদ থেকে উন্মুক্ত তরবারি তুলে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গণহত্যার (কতল-ই-আম / Qatl-e-Aam) আদেশ দেন। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ মার্চ মাত্র এক দিনে ৩০,০০০ নিরীহ মানুষ নিহত হন।
  • অমূল্য সম্পদ লুণ্ঠন: নাদির শাহ দিল্লির শতাব্দীর সঞ্চিত রাজকোষ উজাড় করে দেন। তিনি আনুমানিক ৭০ কোটি টাকার সোনা, হিরে ও জহরত লুণ্ঠন করেন। এর মধ্যে ছিল জগদ্বিখ্যাত কোহিনূর হীরা (Koh-i-Noor) এবং সম্রাট শাহজাহানের তৈরি রত্নখচিত ময়ূর সিংহাসন (তখত-ই-তাউস / Takht-i-Taus)। লুণ্ঠিত সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে নাদির শাহ ইরানে ফিরে গিয়ে পরবর্তী তিন বছরের জন্য সমস্ত প্রজাদের কর মকুব করে দিয়েছিলেন।
১.৪ আহমদ শাহ আবদালির আক্রমণ (১৭৪৮–১৭৬৭)

১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতি আহমদ শাহ আবদালি (দুররানি) আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। ১৭৪৮ থেকে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আবদালি মোট আটবার ভারত আক্রমণ করেন:

  • তিনি বারবার পাঞ্জাব, দিল্লি, মথুরা ও আগ্রা লুণ্ঠন করেন এবং পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও মুলতানকে আফগান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
  • মুঘল সম্রাটরা আবদালির হাতের পুতুলে পরিণত হন এবং তাঁর অনুগত রোহিলা সর্দার নজিব-উদ-দৌলাকে দিল্লির 'মীর বখশী' (প্রধান সেনাপতি) পদে বসাতে বাধ্য হন।
  • আবদালির এই আক্রমণ উত্তর ভারতে মুঘল কেন্দ্রীয় শক্তির অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে দেয় এবং ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে তৃতীয় পানিপথের রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

অধ্যায় ২: স্বশাসিত বাংলা: মুর্শিদকুলি খান ও আলিবর্দি খান

২.১ 'উত্তরাধিকার রাজ্য' (Successor State)-এর ধারণা

অষ্টাদশ শতকে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসন ভেঙে পড়ার পর ভারতীয় উপমহাদেশে তিন ধরনের আঞ্চলিক রাজ্যের আবির্ভাব ঘটেছিল:

  1. উত্তরাধিকার রাজ্য (Successor States): মুঘল সাম্রাজ্যের যে সকল ধনী প্রদেশের সুবাদাররা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করলেও দিল্লির মুঘল সম্রাটের প্রতি নামমাত্র আনুষ্ঠানিক আনুগত্য বজায় রেখেছিলেন (বাংলা, অযোধ্যা, হায়দরাবাদ)।
  2. স্বাধীন রাজ্য (Independent Kingdoms): যে রাজ্যগুলি কখনোই প্রত্যক্ষ মুঘল শাসনের অধীনে ছিল না বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা বজায় রেখেছিল (মহীশূর, কেরল/ত্রিবাঙ্কুর, রাজপুত রাজ্যসমূহ)।
  3. বিদ্রোহী রাজ্য (Rebel/Insurgent States): যারা মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল (মারাঠা, শিখ, জাঠ)।
২.২ মুর্শিদকুলি খান ও বাংলার প্রশাসনিক পুনর্গঠন (১৭০০–১৭২৭)

মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সম্পদশালী সুবা ছিল সুবা বাংলা (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, বিহার ও ওড়িশা)। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব এক সুদক্ষ প্রশাসক মুর্শিদকুলি খান-কে বাংলার প্রধান দেওয়ান (অর্থ সচিব) নিযুক্ত করেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফাররুখশিয়ার তাঁকে একই সাথে বাংলার সুবাদার (নাজিম) ও দেওয়ান পদে নিযুক্ত করলে বাংলায় স্বশাসিত নওয়াবি শাসনের সূচনা হয়।

  • রাজধানী স্থানান্তর (১৭০৪): ঢাকায় যুবরাজ আজিম-উস-শানের সাথে মতবিরোধের কারণে মুর্শিদকুলি খান বাংলার রাজধানী ঢাকা (জাহাঙ্গীরনগর) থেকে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত মুকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন এবং নিজের নামানুসারে তার নাম দেন মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)।
  • মাল-জামিনি রাজস্ব ব্যবস্থা (Mal-zamini System): মুর্শিদকুলি খান বাংলার কৃষিভূমির সঠিক পরিমাপ করান এবং মধ্যস্বত্বভোগী দুর্নীতিগ্রস্ত পুরনো জমিদারদের অপসারণ করে চুক্তিভিত্তিক ইজারাদার নিয়োগ করেন। ইজারাদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ের লিখিত জামিন বা মুচলেকা নেওয়া হতো, যাকে মাল-জামিনি ব্যবস্থা বলা হয়। রাজস্ব দিতে ব্যর্থ জমিদারদের চরম নির্যাতন করা হতো (যেমন মলমূত্রপূর্ণ ডোবায় ফেলে রাখার শাস্তি, যাকে বলা হতো 'বৈকুণ্ঠবাস')।
  • নতুন জমিদার শ্রেণির উত্থান: মুর্শিদকুলি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় একদল অনুগত ও বিত্তবান হিন্দু জমিদারের উদ্ভব ঘটে, যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: নাটোর (রাজা রামজীবন), বর্ধমান, নদিয়া ও দিনাজপুরের জমিদাররা।
  • জগৎ শেঠ পরিবারের ভূমিকা: মুর্শিদকুলি খানের অন্যতম প্রধান সহযোগী ছিলেন মাড়োয়ারি ব্যাংকার ফতেহ চাঁদ। ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট মহম্মদ শাহ তাঁকে 'জগৎ শেঠ' (জগতের শেঠ বা মহাজন) উপাধিতে ভূষিত করেন। জগৎ শেঠের কুঠি বাংলার সরকারি টাকশাল নিয়ন্ত্রণ করত, জমিদারদের রাজস্বের ঋণ দিত এবং হুন্ডির (Hundi) মাধ্যমে দিল্লির বাদশাহের বার্ষিক রাজস্ব নিরাপদে পাঠাত।
২.৩ আলিবর্দি খান (১৭৪০–১৭৫৬) ও মারাঠা বর্গি হাঙ্গামা

১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খানের মৃত্যুর পর তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন এবং পরে দৌহিত্র সরফরাজ খান বাংলার মসনদে বসেন। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে বিহারের নায়েব নাজিম আলিবর্দি খান বিদ্রোহ করেন এবং গিরিয়ার যুদ্ধে (১৭৪০) সরফরাজ খানকে পরাজিত ও নিহত করে বাংলার মসনদ দখল করেন।

বর্গি হাঙ্গামার সংকট (১৭৪২–১৭৫১):

আলিবর্দি খানের শাসনকালের সবচেয়ে বড় সংকট ছিল নাগপুরের মারাঠা সেনাপতি রঘুজী ভোঁসলের পাঠানো মারাঠা অশ্বারোহী সেনাদল—যাদের বাংলায় 'বর্গি' (Bargi) বলা হতো—তাদের উপর্যুপরি আক্রমণ। এই আক্রমণ পরিচালনা করতেন সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিত।

  • ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টানা দশ বছর পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চল (মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি, মুর্শিদাবাদ) বর্গিদের অবাধ লুণ্ঠন ও নারকীয় অত্যাচারে ছারখার হয়ে যায়। কবি গঙ্গারামের রচিত 'মহারাষ্ট্র পুরাণ' কাব্যে বর্গিদের বর্বরতার মর্মস্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যায়।
  • বর্গিদের হাত থেকে কলকাতাকে রক্ষা করার জন্য ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কোম্পানি ও স্থানীয় অধিবাসীরা ৩ মাইল দীর্ঘ এক পরিখা খনন করে, যা ইতিহাসে 'মারাঠী খাত' (Maratha Ditch) নামে পরিচিত (বর্তমানের সার্কুলার রোড)।
  • ১৭৪৪ খ্রিস্টাব্দে আলিবর্দি খান মনকরা নামক স্থানে ভাস্কর পণ্ডিত ও তাঁর ২২ জন সেনাপতিকে আলোচনার জন্য ডেকে এনে তাঁবুর মধ্যে গোপনে হত্যা করেন। তবুও বর্গি আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
  • ১৭৫১ সালের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি: ক্রমাগত যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে আলিবর্দি মারাঠাদের সাথে সন্ধি করেন:
    1. তিনি রঘুজী ভোঁসলেকে ওড়িশার কটক অঞ্চলের প্রত্যক্ষ শাসন ও রাজস্ব ছেড়ে দেন।
    2. বাংলা ও বিহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর ১২ লক্ষ টাকা 'চৌথ' (Chauth) হিসেবে মারাঠাদের দিতে সম্মত হন।
২.৪ ইউরোপীয় বণিকদের প্রতি আলিবর্দির নীতি: মৌমাছির উপমা

আলিবর্দি খান বাংলায় অবস্থানরত ইউরোপীয় বণিকদের—কলকাতা ও কাশিমবাজারে ব্রিটিশ, চন্দননগরে ফরাসি এবং চুঁচুড়ায় ওলন্দাজ—কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। তিনি তাদের বাণিজ্য করার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাদের বাণিজ্যিক কুঠিতে নতুন দুর্গ নির্মাণ বা সামরিক প্রস্তুতি নিতে দেননি।

ইউরোপীয়দের চরিত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলিবর্দি খান তাঁদের মৌচাকের মৌমাছির সাথে তুলনা করে বলেছিলেন: "ইউরোপীয় বণিকরা হলো মৌমাছির মতো; এদের ঘাঁটাঘাঁটি না করলে এরা সুস্বাদু মধু দেয়, কিন্তু এদের চটানো হলে এরা দল বেঁধে বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে মেরে ফেলতে পারে।" ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল আলিবর্দি খানের মৃত্যুর পর তাঁর তরুণ দৌহিত্র সিরাজ-উদ-দৌলা বাংলার মসনদে বসেন, যার ফলে ব্রিটিশদের সাথে সরাসরি সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

অধ্যায় ৩: হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার উত্থান

৩.১ হায়দরাবাদ: নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহ (১৭২৪)

দাক্ষিণাত্যে স্বাধীন হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট তুরানি সেনাপতি মীর কমর-উদ-দীন খান সিদ্দিকী, যিনি ইতিহাসে চিন কুলিজ খান, নিজাম-উল-মুলক এবং প্রথম আসফ জাহ নামে সুপরিচিত। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহের উজিরে আজম (প্রধানমন্ত্রী) নিযুক্ত হন। কিন্তু দিল্লির দরবারের বিলাসিতা ও নোংরা ষড়যন্ত্রে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে তিনি পদত্যাগ করে দাক্ষিণাত্যের দিকে যাত্রা করেন।

  • সাকরখেদার যুদ্ধ (১১ অক্টোবর ১৭২৪): ক্ষুব্ধ মুঘল সম্রাট দাক্ষিণাত্যের সুবাদার মুবারিজ খান-কে সসৈন্যে পাঠান নিজামকে ধ্বংস করার জন্য। বেরার অঞ্চলের সাকরখেদায় উভয় বাহিনী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। নিজাম-উল-মুলকের রণকৌশলে মুবারিজ খান রণক্ষেত্রে নিহত হন।
  • আসফ জাহি রাজবংশের পত্তন: বাধ্য হয়ে সম্রাট মহম্মদ শাহ নিজামকে ক্ষমা করেন এবং তাঁকে 'আসফ জাহ' (Asaf Jah) উপাধি দিয়ে দাক্ষিণাত্যের ৬টি সুবার ভাইসরয় হিসেবে স্বীকৃতি দেন। এর মধ্য দিয়ে হায়দরাবাদে আসফ জাহি রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল।
  • শাসনের প্রকৃতি: নিজাম কার্যত সম্পূর্ণ স্বাধীন রাজার মতো দেশ শাসন করতেন: তিনি স্বাধীনভাবে মনসব বিলি করতেন, সেনাবাহিনী পরিচালনা করতেন এবং মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ বা সন্ধি করতেন। তবে তিনি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি—দিল্লির সম্রাটের নামেই খুতবা পাঠ ও মুদ্রা তৈরি হতো।
  • বহিঃসংকট: হায়দরাবাদকে ক্রমাগত মারাঠা পেশোয়া প্রথম বাজিরাওয়ের আক্রমণের মুখে পড়তে হতো (১৭২৮ সালের পালখেদের যুদ্ধে নিজাম বাজিরাওয়ের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হন)। ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে নিজামের মৃত্যুর পর হায়দরাবাদের উত্তরাধিকার নিয়ে ফরাসি ও ইংরেজদের মধ্যে দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ শুরু হয়।
৩.২ অযোধ্যা: সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক (১৭২২–১৭৩৯)

গঙ্গা অববাহিকার উর্বর ভূখণ্ডে অবস্থিত অযোধ্যা (Awadh / Oudh) ছিল দিল্লি ও বাংলার মধ্যবর্তী প্রধান বাণিজ্যিক ও সামরিক সংযোগস্থল। ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে পারসিক বংশোদ্ভূত শিয়া অভিজাত সাদাত খান-কে সম্রাট মহম্মদ শাহ অযোধ্যার সুবাদার নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে বুরহান-উল-মুলক উপাধি দেন।

  • বিদ্রোহী জমিদার দমন: অযোধ্যায় শক্তিশালী রাজপুত ও পাঠান জমিদাররা মাটির কেল্লা বানিয়ে কর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। সাদাত খান কঠোর সামরিক অভিযান চালিয়ে এই জমিদারদের দুর্গ গুঁড়িয়ে দেন এবং রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
  • রাজস্ব ও প্রশাসনিক সংস্কার: ১৭২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জমি জরিপ করে নতুন কর নির্ধারণ করেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার বন্ধ করে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং বিশ্বস্ত রাজস্ব আদায়কারী নিয়োগ করেন।
  • মর্মান্তিক অবসান: ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহের ভারত আক্রমণের সময় কারনালের যুদ্ধে সাদাত খান বন্দি হন। নাদির শাহকে দিল্লিতে নিয়ে আসার পর যখন নাদির শাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২০ কোটি টাকা দাবি করেন, তখন সেই বিপুল অর্থ জোগাড়ে ব্যর্থ হয়ে চরম অপমানে সাদাত খান বিষপানে আত্মহত্যা করেন (১৭৩৯)।
৩.৩ সফদরজং ও সুজা-উদ-দৌলা: অযোধ্যার 'নওয়াব ওয়াজির'

সাদাত খানের পর অযোধ্যার মসনদে বসেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা মহম্মদ মুকিম, যিনি ইতিহাসে সফদরজং (Safdarjung, ১৭৩৯–১৭৫৪) নামে খ্যাত।

  • ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আহমদ শাহ সফদরজংকে মুঘল সাম্রাজ্যের 'ওয়াজির' (প্রধানমন্ত্রী) পদে নিযুক্ত করেন। এরপর থেকে অযোধ্যার নবাবরা বংশানুক্রমিকভাবে 'নওয়াব ওয়াজির' (Nawab Wazir) নামে অভিহিত হতেন।
  • সফদরজং অযোধ্যায় হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে অসাধারণ সম্প্রীতি বজায় রেখেছিলেন এবং মহারাজা নবাব রায়-এর মতো যোগ্য হিন্দুদের উচ্চ প্রশাসনিক পদে বসিয়েছিলেন।
৩.৪ সুজা-উদ-দৌলা ও ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা

সফদরজং-এর পুত্র সুজা-উদ-দৌলা (Shuja-ud-Daula, ১৭৫৪–১৭৭৫)-র আমলে অযোধ্যা সামরিক শক্তিতে শীর্ষস্থান দখল করে। কিন্তু তিনি সমসাময়িক তিনটি যুগান্তকারী ঐতিহাসিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন:

  1. তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ (১৭৬১): তিনি মারাঠাদের দমন করার আশায় আহমদ শাহ আবদালির পক্ষে যোগ দেন এবং মারাঠাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রসদ ও সৈন্য জোগান দেন।
  2. বক্সারের যুদ্ধ (২২ অক্টোবর ১৭৬৪): দিল্লির পলাতক সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এবং বাংলার ক্ষমতাচ্যুত নবাব মীর কাশিম-এর সাথে একজোট হয়ে সুজা-উদ-দৌলা ব্রিটিশদের বাংলা থেকে উৎখাত করতে অগ্রসর হন। কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে মেজর হেক্টর মুনরোর ইংরেজ বাহিনীর কাছে এই সম্মিলিত সেনাদল চরমভাবে পরাজিত হয়।
  3. এলাহাবাদের সন্ধি (১৬ আগস্ট ১৭৬৫): লর্ড রবার্ট ক্লাইভ সুজা-উদ-দৌলাকে নতজানু করে ঐতিহাসিক এলাহাবাদের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন:
    • অযোধ্যা থেকে কোড়া ও এলাহাবাদ জেলা দুটি কেড়ে নিয়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমকে দেওয়া হয়।
    • যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে কোম্পানিকে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা দিতে হয়।
    • অযোধ্যাকে ব্রিটিশ বাংলার প্রতিরক্ষার জন্য একটি 'বাফার স্টেট' বা মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত করা হয় এবং লখনউতে ব্রিটিশ সৈন্য ও রেসিডেন্ট মোতায়েন করা হয়।
উত্তরাধিকার রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠার বছর রাজধানী প্রধান প্রশাসনিক অবদান ঔপনিবেশিক অধীনতার মোড়
বাংলা মুর্শিদকুলি খান (১৭১৭) ঢাকা → মুর্শিদাবাদ (১৭০৪) মাল-জামিনি ব্যবস্থা; নতুন জমিদার ও জগৎ শেঠদের উত্থান পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ও দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫)
হায়দরাবাদ নিজাম আসফ জাহ ১ (১৭২৪) হায়দরাবাদ সাকরখেদায় মুবারিজ খানকে পরাস্ত; আসফ জাহি রাজবংশ প্রতিষ্ঠা ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রথম গ্রহণ (১৭৯৮)
অযোধ্যা সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক (১৭২২) ফয়জাবাদ → লখনউ বিদ্রোহী রাজপুত জমিদার দমন; 'নওয়াব ওয়াজির' উপাধি লাভ বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) ও এলাহাবাদের সন্ধি (১৭৬৫)

অধ্যায় ৪: মারাঠা কনফেডারেসি ও তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ (১৭৬১)

৪.১ পেশোয়াদের উত্থান: প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বোচ্চ ক্ষমতা

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘলরা শিবাজীর পৌত্র শাহু-কে কারামুক্ত করে। শাহু মহারাষ্ট্রে ফিরে এলে তাঁর কাকিমা তারাবাঈ (যিনি দ্বিতীয় শিবাজীর নামে কোলাপুরে শাসন করছিলেন)-এর সঙ্গে উত্তরাধিকার নিয়ে গৃহযুদ্ধ বাধে। এই গৃহযুদ্ধে শাহুর বিজয়ের প্রধান রূপকার ছিলেন এক অসাধারণ কূটনৈতিক প্রতিভাধর চিৎপাবন ব্রাহ্মণ রাজস্ব কর্মকর্তা—বালাজি বিশ্বনাথ (Balaji Vishwanath)।

  • ১৭১৩ খ্রিস্টাব্দে শাহু সন্তুষ্ট হয়ে বালাজি বিশ্বনাথকে মারাঠা সাম্রাজ্যের পেশোয়া (Peshwa / প্রধানমন্ত্রী) পদে নিযুক্ত করেন এবং এই পদকে বংশানুক্রমিক করে দেন।
  • ১৭১৯ সালের দিল্লির সন্ধি: ১৭১৯ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের সাথে চুক্তি করে বালাজি বিশ্বনাথ মারাঠা সেনাদল নিয়ে দিল্লিতে প্রবেশ করেন। মুঘল সম্রাট শিবাজীর 'স্বরাজ্য' স্বীকার করেন এবং দাক্ষিণাত্যের ছয়টি মুঘল সুবা থেকে মারাঠাদের বৈধভাবে চৌথ (Chauth - রাজস্বের ১/৪ অংশ) এবং সরদেশমুখী (Sardeshmukhi - অতিরিক্ত ১/১০ অংশ) আদায়ের রাজকীয় ফরমান প্রদান করেন।
৪.২ প্রথম বাজিরাও (১৭২০–১৭৪০): 'হিন্দু পদ পাদশাহী' ও বিদ্যুৎগতির বিস্তার

বালাজি বিশ্বনাথের মৃত্যুর পর তাঁর মাত্র কুড়ি বছর বয়সী সুযোগ্য পুত্র প্রথম বাজিরাও (Baji Rao I) পেশোয়া পদে আসীন হন। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতকের ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক রণকৌশলী ও অশ্বারোহী সেনাপতি।

  • হিন্দু পদ পাদশাহী (Hindu Pad Padshahi): বাজিরাও শিবাজীর হিন্দু সাম্রাজ্যের আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করে ছত্রপতি শাহুকে বলেছিলেন: "আসুন, আমরা ক্ষয়িষ্ণু মুঘল রূপী শুকনো গাছের কাণ্ডে আঘাত হানি, তবে ডালপালাগুলি নিজে থেকেই খসে পড়বে! আমাদের মারাঠা বিজয়পতাকা কৃষ্ণা নদী থেকে সিন্ধুনদের তীর (আটক) পর্যন্ত সগৌরবে উড়বে!"
  • সামরিক সাফল্যসমূহ:
    1. পালখেদের যুদ্ধ (১৭২৮): বিদ্যুৎগতির অশ্বারোহী কৌশলে নিজাম-উল-মুলককে অবরুদ্ধ ও জল সরবরাহ বন্ধ করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন।
    2. মালব ও গুজরাট জয়: মুঘল বাহিনীকে বিতাড়িত করে মধ্য ভারত ও পশ্চিম ভারতের বাণিজ্যপথ দখল করেন।
    3. বুন্দেলখণ্ডের ছত্রশালকে সাহায্য (১৭২৯): আফগান সেনাপতি মহম্মদ খান বঙ্গাশের হাত থেকে বৃদ্ধ রাজা ছত্রশালকে উদ্ধার করেন; কৃতজ্ঞ ছত্রশাল বাজিরাওকে নিজের রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ (ঝাঁসি, সাগর) এবং কন্যা মাস্তানিকে উপহার দেন।
    4. দিল্লি আক্রমণ (১৭৩৭): মাত্র দশ দিনে ৫০০ মাইল পথ অতিক্রম করে অতর্কিতে দিল্লির দরজায় সেনা নিয়ে হাজির হন, যা মুঘল সম্রাটকে স্তম্ভিত করে দেয়।
    5. ভোপালের যুদ্ধ (১৭৩৮): মুঘল ও নিজামের সম্মিলিত বাহিনীকে ভোপালে অবরুদ্ধ করে নর্মদা ও চম্বল নদীর মধ্যবর্তী সমস্ত অঞ্চল মারাঠাদের অধীনে আনার চুক্তি (দোরাহার চুক্তি) আদায় করেন।
৪.৩ বালাজি বাজিরাও (নানা সাহেব) ও মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র (কনফেডারেসি)

বালাজি বাজিরাও (নানা সাহেব, ১৭৪০–১৭৬১)-এর আমলে মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বাধিক ভৌগোলিক বিস্তার ঘটে, তবে এর চরিত্র পরিবর্তিত হয়:

  • সাঙ্গোলা চুক্তি (১৭৫০): ১৭৪৯ সালে ছত্রপতি শাহুর নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুর পর সাঙ্গোলা চুক্তির মাধ্যমে নামসর্বস্ব ছত্রপতিকে সাতারার রাজপ্রাসাদে বন্দি করে পেশোয়াই মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বময় প্রশাসনিক ক্ষমতার অধিকারী হন এবং রাজধানী পুনেতে (Pune) স্থানান্তরিত হয়।
  • মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র বা কনফেডারেসি (Maratha Confederacy): সুবিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য ক্ষমতা বিভিন্ন শক্তিশালী আঞ্চলিক সামরিক সর্দারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়:
    • সিন্ধিয়া (Scindia): গোয়ালিয়র ও উজ্জয়িনীর শাসক (রানোজি সিন্ধিয়া, পরে মহাদজি সিন্ধিয়া)।
    • হোলকার (Holkar): ইন্দোর ও মালবের শাসক (মলহর রাও হোলকার)।
    • গায়কোয়াড় (Gaekwad): বরোদা ও গুজরাটের শাসক (দমহজি গায়কোয়াড়)।
    • ভোঁসলে (Bhonsle): নাগপুর, বেরার ও ওড়িশার শাসক (রঘুজী ভোঁসলে)।
    • পেশোয়া (Peshwa): পুনে থেকে সমগ্র কনফেডারেসির প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দিতেন।
  • পাঞ্জাব জয় ও আটক দুর্গ অধিকার (১৭৫৮): পেশোয়ার ভাই রঘুনাথ রাও ১৭৫৮ সালে পাঞ্জাবে অভিযান চালিয়ে আবদালির পুত্র তৈমুর শাহকে বিতাড়িত করেন এবং সিন্ধুনদের তীরের বিখ্যাত আটক দুর্গে (Fort Attock) মারাঠাদের গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করেন। এই ঘটনাই আহমদ শাহ আবদালিকে চরম প্রতিশোধমূলক আক্রমণে প্ররোচিত করে।
৪.৪ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ (১৪ জানুয়ারি ১৭৬১)

হরিয়ানার ঐতিহাসিক পানিপথের প্রান্তরে মারাঠা সাম্রাজ্য এবং আহমদ শাহ আবদালির নেতৃত্বাধীন আফগান জোটের মধ্যে সংঘটিত এই যুদ্ধটি ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী ও ভাগ্যনির্ধারক যুদ্ধ।

তৃতীয় পানিপথ: কারণ, কৌশলগত ভুল ও বিপর্যয়:
  • মারাঠা সেনাদল: সেনাপতি ছিলেন পেশোয়ার ভাইপো সদাশিবরাও ভাউ (Sadashivrao Bhau) এবং নামেমাত্র প্রধান ছিলেন পেশোয়ার ১৭ বছর বয়সী পুত্র বিশ্বাসরাও। মারাঠাদের প্রধান ভরসা ছিল ফরাসি সামরিক কায়দায় শিক্ষিত ইব্রাহিম খান গার্দি-র পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনী।
  • আফগান জোট: আবদালি ধর্মীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে অযোধ্যার সুজা-উদ-দৌলা এবং রোহিলা সর্দার নজিব-উদ-দৌলাকে নিজের পক্ষে টেনে নেন।
  • মারাঠাদের পরাজয়ের কারণসমূহ:
    1. কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা: ক্রমাগত অতিরিক্ত চৌথ আদায়ের কারণে উত্তর ভারতের স্থানীয় রাজারা মারাঠাদের শত্রু ভাবতেন। রাজপুতরা সাহায্য করতে অস্বীকার করে; ভাউ-এর দুর্ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়ে ভরতপুরের জাঠ রাজা সুরজ মল যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে চলে যান; আর শিখরা নিরপেক্ষ থাকে।
    2. অপ্রয়োজনীয় যাত্রীদল: মারাঠা সেনাবাহিনীর সাথে প্রায় ১ লক্ষ তীর্থযাত্রী, মহিলা ও সেবক ছিল, যা সেনাদলের রসদ ও চলাচলে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল।
    3. রসদ সংকট ও অনাহার: আবদালি মারাঠাদের যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের পথ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পানিপথের শিবিরে টানা তিন মাস প্রায় অনাহারে হাজার হাজার মারাঠা সেনা ও ঘোড়া মারা যায়। ১৪ জানুয়ারি সকালে ক্ষুধার্ত সৈনিকরা মরিয়া হয়ে মরণপণ যুদ্ধ শুরু করে।
    4. যুদ্ধাস্ত্রের তারতম্য: ইব্রাহিম গার্দির ভারী কামানগুলি ছিল অচল ও অনড়; পক্ষান্তরে আবদালির উটের পিঠে বসানো হালকা ও ভ্রাম্যমাণ কামান (জাম্বুরাক / Zamburak) মারাঠা ব্যূহ তছনছ করে দেয়।
  • যুদ্ধ ও মর্মান্তিক বার্তা: প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বিশ্বাসরাও মাথায় গুলি লেগে মারা যান। ভ্রাতুষ্পুত্রের মৃত্যুতে শোকাহত ভাউ ঘোড়া থেকে নেমে তরবারি হাতে শত্রুর মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিহত হন। প্রায় ৭০,০০০ মারাঠা যোদ্ধা ও ৩০,০০০ তীর্থযাত্রী নির্মমভাবে নিহত হন।

    পুনেতে পেশোয়া নানা সাহেবের কাছে এক ব্যবসায়ীর পাঠানো ঐতিহাসিক সাংকেতিক চিঠি পৌঁছায়: "দুটি মুক্তো গলে গেল [ভাউ ও বিশ্বাসরাও], সাতাশটি মোহর হারিয়ে গেল [প্রধান সেনাপতিবৃন্দ], আর রুপো ও তামার মুদ্রার কোনো হিসাবই করা গেল না [সাধারণ সৈনিক]।" এই নিদারুণ শোক সহ্য করতে না পেরে ১৭৬১ সালের ২৩ জুন পেশোয়া বালাজি বাজিরাও মৃত্যুবরণ করেন।
৪.৫ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য

বিখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক সিডনি ওয়েন অত্যন্ত যথার্থই লিখেছেন: "তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ভারতে কে শাসন করবে তা ঠিক করেনি, কিন্তু কে শাসন করবে না তা নিশ্চিত করে দিয়েছিল।"

  • এই পরাজয়ের ফলে সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মারাঠাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন চিরতরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
  • বিজয়ী হয়েও আবদালি নিজের সেনাদের বিদ্রোহের কারণে কাবুলে ফিরে যেতে বাধ্য হন, ফলে উত্তর ভারতে কোনো স্থায়ী আফগান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
  • এর ফলে উত্তর ও পূর্ব ভারতে এক সুবিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হয়। ঠিক এই সময় বাংলার দেওয়ানি লাভ করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সম্পূর্ণ বিনা বাধায় ভারতে নিজেদের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য বিস্তার করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায়।

অধ্যায় ৫: স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি: মহীশূর ও পাঞ্জাব

৫.১ হায়দার আলির অধীনে মহীশূর রাজ্যের উত্থান (১৭৬১–১৭৮২)

দক্ষিণ ভারতে ব্রিটিশদের অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে সবচেয়ে অটল ও আপসহীন প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল মহীশূর রাজ্য (Kingdom of Mysore)। প্রাচীন ওয়াডিয়ার হিন্দু রাজাদের অধীনে মহীশূরের শাসনব্যবস্থা নানজারাজ ও দেবরাজ নামক দুই দুর্নীতিগ্রস্ত অমাত্যের হাতে বন্দি ছিল। সেই সংকটকালে নিজের সামরিক দক্ষতাবলে উত্থান ঘটে হায়দার আলি (Haidar Ali)-র।

  • ১৭২১ সালে জন্ম নেওয়া সাধারণ সৈনিক হায়দার আলি বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে ১৭৫৫ সালে দিন্দিগুলের ফৌজদার নিযুক্ত হন। সেখানে ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্যে তিনি এক অত্যাধুনিক অস্ত্রাগার (Ordnance Factory) গড়ে তোলেন এবং ইউরোপীয় কায়দায় পদাতিক বাহিনীকে বন্দুক চালনায় প্রশিক্ষিত করেন।
  • ১৭৬১ সালে তিনি নানজারাজকে ক্ষমতাচ্যুত করে মহীশূরের প্রকৃত শাসকে পরিণত হন।
  • প্রথম ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৬৭–১৭৬৯): হায়দার আলি কূটনীতি দিয়ে মারাঠা ও নিজামকে ইংরেজদের সঙ্গ ত্যাগ করতে বাধ্য করেন এবং বিদ্যুৎগতির অশ্বারোহী সেনা নিয়ে মাদ্রাজ শহরের পাঁচ মাইলের মধ্যে উপস্থিত হন। ভীতসন্ত্রস্ত ইংরেজরা ১৭৬৯ সালে হায়দারের শর্তে প্রতিরক্ষামূলক মাদ্রাজের সন্ধি (Treaty of Madras) স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়।
  • দ্বিতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৮০–১৭৮৪): মারাঠাদের আক্রমণের সময় ইংরেজরা শর্ত ভঙ্গ করে সাহায্য না করায় এবং মহীশূরের অধীন মাহে ফরাসি বন্দর দখল করায় হায়দার ক্ষুব্ধ হন। ১৭৮০ সালে পোল্লিলুরের যুদ্ধে হায়দার ও তাঁর পুত্র টিপু ইংরেজ সেনাপতি বেইলিকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। যুদ্ধের মাঝেই ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে হায়দার আলি মৃত্যুবরণ করেন।
৫.২ টিপু সুলতান: 'মহীশূরের বাঘ' (১৭৮২–১৭৯৯)

হায়দার আলির মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তাঁর সুযোগ্য ও পরম দেশপ্রেমিক পুত্র টিপু সুলতান (Tipu Sultan), যিনি ইতিহাসে 'মহীশূরের বাঘ' (Tiger of Mysore) নামে অমর হয়ে আছেন। টিপু উপলব্ধি করেছিলেন যে আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান ও শিল্প প্রযুক্তি আত্মস্থ না করলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ঠেকানো অসম্ভব।

টিপু সুলতানের আধুনিক ও যুগান্তকারী সংস্কারসমূহ:
  • সামরিক রকেটের উদ্ভাবন (Mysorean Rockets): টিপু প্রচলিত বাঁশের নলের বদলে খাঁটি লোহার চোঙায় বারুদ ভরে বিশ্বমানের সামরিক রকেট উদ্ভাবন করেন। এই রকেটগুলির পাল্লা ছিল প্রায় ২ কিলোমিটার এবং পোল্লিলুরের যুদ্ধে এগুলি ইংরেজ সেনার গোলাবারুদের স্তূপে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। টিপুর এই প্রযুক্তি দেখে পরবর্তীকালে ব্রিটিশরা 'কনগ্রিভ রকেট' তৈরি করে।
  • আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্যাকোবিন ক্লাব: ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে টিপু শ্রীরঙ্গপত্তমে ফরাসি সেনাদের তৈরি জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করেন এবং নিজেকে গর্বের সাথে 'নাগরিক টিপু' (Citizen Tipu) বলে ঘোষণা করেন। প্রাসাদের সামনে তিনি স্বাধীনতার বৃক্ষ (Tree of Liberty) রোপণ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্তর্জাতিক মৈত্রী গড়তে তিনি ফ্রান্স (নেপোলিয়ন ও ষোড়শ লুই), তুর্কি সাম্রাজ্যের সুলতান এবং আফগানিস্তানে দূত পাঠান।
  • রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও শিল্পায়ন: তিনি একটি সরকারি বাণিজ্য নিগম তৈরি করেন, পারস্য উপসাগরে (মাস্কাট, জেদ্দা) ৩০টি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করেন, বাংলায় লোক পাঠিয়ে মহীশূরে রেশম চাষ (Sericulture) প্রবর্তন করেন এবং রাষ্ট্রীয় চিনি ও কাগজ কল প্রতিষ্ঠা করেন।
  • প্রশাসনিক সংস্কার: নতুন সৌর ক্যালেন্ডার (মৌলুদি), আধুনিক ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি প্রবর্তন করেন এবং হিন্দু দেব-দেবী (শিব-পার্বতী) ও আরবি হরফ খোদাই করা বৈচিত্র্যময় মুদ্রা চালু করেন।
৫.৩ তৃতীয় ও চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ: শ্রীরঙ্গপত্তমের পতন

ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল ভারতে তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু টিপু সুলতান:

  • তৃতীয় ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯০–১৭৯২): গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস মারাঠা ও নিজামের সাথে জোট বেঁধে মহীশূর আক্রমণ করেন। রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তম (Seringapatam) অবরুদ্ধ হলে টিপু ১৭৯২ সালে অপমানজনক শ্রীরঙ্গপত্তমের সন্ধি করতে বাধ্য হন:
    1. মহীশূরের অর্ধেক ভূখণ্ড কেড়ে নিয়ে ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম ভাগ করে নেয়।
    2. ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৩ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা দাবি করা হয়।
    3. টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কর্নওয়ালিস টিপুর দুই নাবালক পুত্রকে (আব্দুল খালেক ও মুইজ-উদ-দীন) জামিন বন্দি হিসেবে কলকাতায় নিয়ে যান।
  • চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৯৯): সাম্রাজ্যবাদী গভর্নর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে এসে টিপুকে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) মেনে নিতে নির্দেশ দেন। বীর টিপু ঘৃণাভরে তা প্রত্যাখ্যান করে ঘোষণা করেন: "শেয়ালের মতো শত বছর বেঁচে থাকার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বাঁচাও অনেক সম্মানের।" ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৪ মে ব্রিটিশ বাহিনী শ্রীরঙ্গপত্তম আক্রমণ করে। বিশ্বাসঘাতক অমাত্য মীর সাদিকের চক্রান্ত সত্ত্বেও টিপু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তরবারি হাতে লড়াই করে দুর্গের প্রবেশদ্বারে বীরগতি বরণ করেন। ইংরেজরা ওয়াডিয়ার বংশের এক শিশুকে নামমাত্র রাজা করে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তি চাপিয়ে দেয়।
৫.৪ পাঞ্জাবে শিখ শক্তির উত্থান ও ১২টি মিসল

দশম শিখ গুরু গুরু গোবিন্দ সিংহ ১৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে আনন্দপুর সাহেবে খালসা (Khalsa) গঠনের মাধ্যমে শিখ সম্প্রদায়কে এক অজেয় সামরিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ১৭০৮ সালে গুরুর মৃত্যুর পর তাঁর শিষ্য বান্দা বাহাদুর (Banda Singh Bahadur) পাঞ্জাবের কৃষকদের সংগঠিত করে প্রথম সার্বভৌম শিখ রাষ্ট্র গড়ে তোলেন, মুদ্রা চালু করেন ও জমিদার প্রথা উচ্ছেদ করেন (১৭১৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে তিনি শহিদ হন)।

নাদির শাহ ও আবদালির আক্রমণের ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার মধ্যে শিখরা দল খালসা (Dal Khalsa)-র অধীনে সমবেত হয় এবং সমগ্র পাঞ্জাবে ১২টি স্বশাসিত গণতান্ত্রিক মিসল (Misl - কনফেডারেসি) গঠিত হয়:

  • ভঙ্গি, আহলুওয়ালিয়া, কানহাইয়া, রামগড়িয়া এবং শুকারচাকিয়া মিসল (Sukerchakia Misl) ছিল প্রধান।
  • অমৃতসরে বৈশাখী ও দীপাবলিতে অকাল তখতের সামনে সমবেত হয়ে মিসলদাররা যৌথ সিদ্ধান্ত বা 'গুরুমতা' (Gurmata) গ্রহণ করতেন।
৫.৫ মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ: পাঞ্জাবকেশরী (১৭৯২–১৮৩৯)

পাঞ্জাবের পরস্পরবিরোধী মিসলগুলিকে একত্রিত করে এক সুসংহত শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন শুকারচাকিয়া মিসলের মহানায়ক মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ (Maharaja Ranjit Singh), যিনি 'শের-ই-পাঞ্জাব' বা পাঞ্জাবকেশরী নামে সুবিখ্যাত।

  • সাম্রাজ্য বিস্তার:
    1. ১৭৯৯ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি ভঙ্গি মিসলের কাছ থেকে লাহোর জয় করে নিজের রাজনৈতিক রাজধানী করেন।
    2. ১৮০১ সালের বৈশাখীতে তিনি নিজেকে সমগ্র পাঞ্জাবের মহারাজা ঘোষণা করেন।
    3. ১৮০৫ সালে তিনি শিখদের পবিত্র তীর্থ অমৃতসর জয় করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের সমন্বয় ঘটান।
    4. এরপর তিনি মুলতান (১৮১৮), কাশ্মীর (১৮১৯) এবং পেশোয়ার (১৮৩৪) জয় করে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আফগান আক্রমণের পথ চিরতরে বন্ধ করে দেন। আফগান আমির শাহ সুজার কাছ থেকে তিনি বিখ্যাত কোহিনূর হীরা লাভ করেন।
  • অমৃতসরের সন্ধি (১৮০৯): যমুনা নদী পেরিয়ে সতলজ-পার্বত্য শিখ রাজ্যগুলি জয়ের স্বপ্ন দেখলে ইংরেজ দূত চার্লস মেটক্যাফ তাঁর সাথে ১৮০৯ সালে ঐতিহাসিক অমৃতসরের সন্ধি স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধি অনুসারে শতদ্রু নদী (River Sutlej)-কে শিখ সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যবর্তী সীমানা হিসেবে চূড়ান্তভাবে মেনে নেওয়া হয়।
  • ফউজ-ই-খাস ও আধুনিক সামরিক বাহিনী: রঞ্জিৎ সিংহ এশিয়ার দ্বিতীয় শক্তিশালী আধুনিক সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ ফরাসি ও ইতালীয় সেনাপতিদের দিয়ে তিনি 'ফউজ-ই-খাস' (Fauj-i-Khas) গঠন করেন:
    • জাঁ-ফ্রাঁসোয়া অ্যালার (Allard): অশ্বারোহী বাহিনীকে আধুনিক কায়দায় গড়ে তোলেন।
    • জাঁ-ব্যাপটিস্ট ভেঞ্চুরা (Ventura): পদাতিক বাহিনীকে ইউরোপীয় রাইফেল ড্রিল শেখান।
    • ক্লদ অগাস্ট কোর্ট ও পাওলো আভিটাবিলে: লাহোরে অস্ত্রাগার তৈরি করে বিশ্বমানের পিতল ও ব্রোঞ্জের কামান ঢালাই করেন।
  • ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার শাসন: রঞ্জিৎ সিংহের দরবার ছিল অসাধারণ এক ধর্মনিরপেক্ষ মিলনমেলা। তাঁর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডোগরা রাজপুত ধ্যান সিংহ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বিশিষ্ট মুসলিম পণ্ডিত ফকির আজিজুদ্দীন, এবং প্রধান সেনাপতি ছিলেন হরি সিংহ নলওয়া ও দেওয়ান মোহকম চাঁদ। তিনি অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে স্বর্ণের চাদর দান করেছিলেন এবং সমানভাবে হিন্দু ও মুসলিমদের ধর্মস্থানকে দান করতেন।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ও পতনের মহাক্রমপঞ্জি (১৭০৭–১৮০৯)
১৭০৭–১৮০৯ আঞ্চলিক শক্তির বিবর্তন
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু থেকে অমৃতসরের সন্ধি পর্যন্ত ১০২ বছরের ঐতিহাসিক কালখণ্ড।
অষ্টাদশ শতকের আঞ্চলিক রাজ্যসমূহের শ্রেণিবিভাগ ম্যাট্রিক্স
রাষ্ট্রের ধরন ও সার্বভৌমত্বের মাত্রা
উত্তরাধিকার রাজ্যগুলি দিল্লির নামমাত্র আনুগত্য রাখলেও কার্যত সম্পূর্ণ স্বশাসিত ছিল।
তিনটি প্রধান উত্তরাধিকার রাজ্যের তুলনামূলক ম্যাট্রিক্স
শাসন সংস্কার ও ব্রিটিশ পরাধীনতা
বাংলা সবার আগে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারায়; হায়দরাবাদ সবার আগে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি গ্রহণ করে।
মারাঠা পেশোয়াদের ক্ষমতার বিবর্তন ও ভৌগোলিক বিস্তার
পেশোয়া আধিপত্যের শীর্ষবিন্দু
১৭৫০ সালের সাঙ্গোলা চুক্তির দ্বারা পেশোয়াই মারাঠা সাম্রাজ্যের সর্বময় কর্তৃত্ব লাভ করেন।
মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র বা কনফেডারেসির পাঁচটি শাখার ম্যাট্রিক্স
বিকেন্দ্রীভূত মারাঠা শক্তি
এই বিকেন্দ্রীকরণ দ্রুত বিস্তার ঘটালেও কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলার অভাব তৈরি করেছিল।
তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ (১৭৬১): যুদ্ধরত পক্ষ ও ক্ষয়ক্ষতি ম্যাট্রিক্স
১৪ জানুয়ারি ১৭৬১ রক্তক্ষয়ী সংঘাত
সাংকেতিক চিঠি: 'দুটি মুক্তো গলে গেল, সাতাশটি মোহর হারিয়ে গেল, রুপো-তামার কোনো হিসাব নেই।'
চারটি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধের পর্যায়ক্রমিক ম্যাট্রিক্স
মহীশূরের ব্রিটিশ প্রতিরোধ ও পতন
১৭৯৯ সালের ৪ মে শ্রীরঙ্গপত্তমে বীরের মতো লড়াই করে টিপু সুলতান প্রাণ দেন।
পাঞ্জাবে শিখ শক্তির উত্তরণ: বান্দা বাহাদুর থেকে রঞ্জিৎ সিংহ
শিখ সামরিক রূপান্তর
রঞ্জিৎ সিংহ পাশ্চাত্য সামরিক বিজ্ঞান এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী শাসনের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের প্রধান অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত কারণগুলি কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের মূলে ছিল চারটি গভীর অভ্যন্তরীণ ও কাঠামোগত সংকট: ১. জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: মুঘল সামরিক কাঠামোর ভিত্তি ছিল মনসবদারি প্রথা, যেখানে বেতনের বদলে রাজস্বের জমি (জায়গির) দেওয়া হতো। অষ্টাদশ শতকে মনসবদারের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেলেও বিলি করার মতো অতিরিক্ত জমি (পাইবাকি জমি)-র তীব্র অভাব দেখা দেয়। এই 'বে-জায়গিরি' সংকট অভিজাতদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও চক্রান্তের সৃষ্টি করে। ২. ঔরঙ্গজেবের দাক্ষিণাত্য নীতি (১৬৮১–১৭০৭): দাক্ষিণাত্যের বিজাপুর, গোলকোণ্ডা জয় ও মারাঠাদের দমনে ঔরঙ্গজেবের একটানা ২৫ বছরের যুদ্ধ মুঘল রাজকোষ শূন্য করে দেয় এবং অভিজ্ঞ সেনাবাহিনীর ধ্বংস ডেকে আনে। উত্তর ভারতের শাসন সম্পূর্ণ অবহেলিত ও অচল হয়ে পড়ে। ৩. চরম কৃষক শোষণ ও কৃষক বিদ্রোহ: স্বল্পমেয়াদী জায়গিরদাররা কৃষকদের ওপর ফসলের ৫০-৬০% পর্যন্ত রাজস্ব চাপিয়ে দিত। এই অসহনীয় শোষণের বিরুদ্ধে জাঠ, সৎনামী, বুন্দেলা ও শিখ কৃষকেরা অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়ায় এবং কেন্দ্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ৪. দুর্বল শাসক ও দরবারি চক্রান্ত: ঔরঙ্গজেবের পরবর্তী মুঘল সম্রাটরা ছিলেন অযোগ্য ও বিলাসপ্রিয়। ফলে দরবার তুরানি, ইরানি ও হিন্দুস্তানি (সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়) গোষ্ঠীর নোংরা ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে পরিণত হয়, যা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে দেয়।
উদাহরণ 2
মুর্শিদকুলি খান কীভাবে বাংলাকে একটি শক্তিশালী স্বশাসিত উত্তরাধিকার রাজ্যে রূপান্তরিত করেছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
মুর্শিদকুলি খান চারটি প্রধান যুগান্তকারী পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাকে সমৃদ্ধ ও স্বশাসিত সুবায় পরিণত করেন: ১. রাজধানী স্থানান্তর (১৭০৪): ঢাকায় মুঘল যুবরাজ আজিম-উস-শানের প্রভাব ও সংঘাত এড়াতে তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত মুকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন এবং নিজের নামানুসারে তার নাম রাখেন মুর্শিদাবাদ। ২. মাল-জামিনি রাজস্ব ব্যবস্থা (মাল-জামিনি): তিনি বাংলার জমি জরিপ করান এবং পুরনো অবাধ্য জমিদারদের সরিয়ে চুক্তিভিত্তিক ইজারাদার নিয়োগ করেন। ইজারাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত রাজস্ব জমা দেওয়ার লিখিত মুচলেকা বা জামিন নেওয়া হতো, যা মাল-জামিনি ব্যবস্থা নামে খ্যাত। এতে সরকারি কোষাগারে নিয়মিত রাজস্ব জমা নিশ্চিত হয়। ৩. নতুন অনুগত জমিদার শ্রেণির বিকাশ: তিনি নাটোরের রাজা রামজীবন, বর্ধমান, নদিয়া ও দিনাজপুরের মতো অনুগত ও সম্পদশালী হিন্দু জমিদারদের উত্থান ঘটান, যাঁরা নওয়াবি প্রশাসনের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করতেন। ৪. জগৎ শেঠদের সাথে ঘনিষ্ঠ মৈত্রী: ফতেহ চাদের মাড়োয়ারি ব্যাংকিং পরিবার (যাঁদের মহম্মদ শাহ 'জগৎ শেঠ' উপাধি দেন) নওয়াবের সবচেয়ে বড় আর্থিক মিত্র হয়ে ওঠে। তাঁরা সরকারি টাকশাল পরিচালনা করতেন, জমিদারদের ঋণ দিতেন এবং হুন্ডির মাধ্যমে দিল্লির বাদশাহের বার্ষিক নজরানা পাঠাতেন। বাংলা দিল্লির প্রতি আনুষ্ঠানিক আনুগত্য রেখেও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত।
উদাহরণ 3
মারাঠা বর্গি হাঙ্গামা কী এবং নওয়াব আলিবর্দি খান কীভাবে এই সংকটের সমাধান করেছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বর্গি হাঙ্গামা (১৭৪২–১৭৫১): নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজী ভোঁসলের সেনাপতি ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে মারাঠা অশ্বারোহী সেনাদল (যাদের বাংলায় 'বর্গি' বলা হতো) দীর্ঘ দশ বছর ধরে পশ্চিম বাংলায় নারকীয় লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়: ১. বাংলার জনজীবনে বিপর্যয়: রাঢ় অঞ্চলের মেদিনীপুর, বর্ধমান, বীরভূম, হুগলি ও মুর্শিদাবাদে বর্গিরা নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেয় এবং শস্য লুঠ করে। সমকালীন কবি গঙ্গারামের 'মহারাষ্ট্র পুরাণ' গ্রন্থে এই ভয়াবহতার নিখুঁত বর্ণনা আছে। ২. মারাঠী খাত খনন (১৭৪২): কলকাতাকে বর্গি আক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে ইংরেজরা ও স্থানীয় মানুষ মিলে নগরের চারপাশে ৩ মাইল দীর্ঘ পরিখা বা 'মারাঠী খাত' খনন করে। ৩. আলিবর্দির প্রতিরোধ: আলিবর্দি খান সাহসিকতার সাথে বহুবার বর্গিদের বিতাড়িত করেন এবং ১৭৪৪ সালে মনকরায় ভাস্কর পণ্ডিতকে কৌশলে হত্যা করেন। কিন্তু মারাঠাদের ক্রমাগত গেরিলা আক্রমণ থামানো অসম্ভব হয়ে ওঠে। ৪. ১৭৫১ সালের ঐতিহাসিক সন্ধি: বাংলাকে স্থায়ী ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ১৭৫১ সালে আলিবর্দি মারাঠাদের সাথে সন্ধি করেন:

  • ওড়িশার কটক অঞ্চলের রাজস্ব ও নিয়ন্ত্রণ রঘুজী ভোঁসলেকে ছেড়ে দেন।
  • বাংলা ও বিহারের আক্রমণ বন্ধের বিনিময়ে প্রতি বছর ১২ লক্ষ টাকা 'চৌথ' হিসেবে মারাঠাদের দিতে সম্মত হন।
উদাহরণ 4
হায়দরাবাদে নিজাম-উল-মুলক এবং অযোধ্যায় সাদাত খানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির তুলনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

হায়দরাবাদ ও অযোধ্যা ছিল অষ্টাদশ শতকের দুটি প্রধান মুঘল উত্তরাধিকার রাজ্য, যার প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন দিল্লির ক্ষুব্ধ মুঘল সেনাপতি: ১. প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেক্ষাপট:

  • হায়দরাবাদ: বিশিষ্ট তুরানি অভিজাত নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহ ১ (চিন কুলিজ খান) দিল্লির দরবারের দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রে বিরক্ত হয়ে উজিরে আজম পদ ত্যাগ করে ১৭২৩ সালে দাক্ষিণাত্যে চলে যান।
  • অযোধ্যা: পারসিক বংশোদ্ভূত শিয়া নেতা সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক ১৭২২ সালে সম্রাট মহম্মদ শাহের দ্বারা অযোধ্যার সুবাদার নিযুক্ত হয়ে সেখানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ২. স্বায়ত্তশাসন অর্জনের পথ:
  • হায়দরাবাদ: নিজাম সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭২৪ সালে সাকরখেদার যুদ্ধে তিনি সম্রাটের পাঠানো সুবাদার মুবারিজ খানকে পরাজিত ও হত্যা করেন। সম্রাট বাধ্য হয়ে তাঁকে 'আসফ জাহ' উপাধি দিয়ে স্বীকৃতি দেন।
  • অযোধ্যা: সাদাত খান দিল্লির সাথে যুদ্ধ না করে অযোধ্যার স্থানীয় বিদ্রোহী রাজপুত ও পাঠান জমিদারদের মাটির দুর্গ ধ্বংস করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন এবং নতুন রাজস্ব সংস্কার করেন। ৩. সার্বভৌমত্বের চরিত্র:
  • উভয় শাসকই কার্যত স্বাধীন রাজার মতো সেনা পরিচালনা, কর আদায় ও পররাষ্ট্রনীতি চালাতেন, কিন্তু দিল্লির বাদশাহের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি রাখতেন।
  • অযোধ্যার পরবর্তী শাসক সফদরজং মুঘল সাম্রাজ্যের ওয়াজির হওয়ায় তাঁরা 'নওয়াব ওয়াজির' নামে পরিচিত হন, অন্যদিকে হায়দরাবাদের আসফ জাহিরা দাক্ষিণাত্যে মারাঠাদের আক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত থাকেন।
উদাহরণ 5
প্রথম বাজিরাওয়ের 'হিন্দু পদ পাদশাহী' নীতি কী এবং তিনি কীভাবে মারাঠা সামরিক কৌশলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

পেশোয়া প্রথম বাজিরাও (১৭২০–১৭৪০) মারাঠা রাজ্যকে একটি সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্যে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন: ১. হিন্দু পদ পাদশাহী নীতি: বাজিরাও শিবাজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মারাঠা ছত্রপতি শাহুকে বলেছিলেন: 'আসুন, আমরা ক্ষয়িষ্ণু মুঘল রূপী শুকনো গাছের কাণ্ডে আঘাত হানি, তবে ডালপালাগুলি নিজে থেকেই খসে পড়বে! আমাদের মারাঠা বিজয়পতাকা কৃষ্ণা নদী থেকে সিন্ধুনদের তীর (আটক) পর্যন্ত সগৌরবে উড়বে!' তিনি উত্তর ভারতের হিন্দু রাজাদের (বুন্দেলা, রাজপুত) সাথে ঐক্য গড়ে মুঘল কর্তৃত্ব ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন। ২. অশ্বারোহী গেরিলা রণকৌশল (গনিমি কাওয়া): বাজিরাও ভারী কামান ও ধীরগতির পদাতিকের বদলে বিদ্যুৎগতির হালকা অশ্বারোহী সেনাকে যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার করেন। তাঁর সেনা দিনে ৪০-৫০ মাইল পথ অতিক্রম করে খাদ্য ও রসদ স্থানীয় অঞ্চল থেকেই সংগ্রহ করত এবং অতর্কিতে শত্রুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলত। ৩. যুগান্তকারী বিজয়সমূহ:

  • পালখেদের যুদ্ধ (১৭২৮): কোনো বড় কামান যুদ্ধ ছাড়াই কেবল কৌশলগত গতি ও জল সরবরাহের পথ আটকে নিজাম-উল-মুলককে পরাস্ত করেন।
  • মালব ও গুজরাট অধিকার: মধ্য ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ মারাঠাদের করায়ত্ত হয়।
  • বুন্দেলখণ্ড রক্ষা (১৭২৯): রাজা ছত্রশালকে আফগানদের হাত থেকে উদ্ধার করে ঝাঁসি ও সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল লাভ করেন।
  • দিল্লি হানা (১৭৩৭): অতর্কিতে দিল্লির প্রাচীরের সামনে সেনা এনে সম্রাট মহম্মদ শাহের অন্তরে ত্রাস সৃষ্টি করেন।
উদাহরণ 6
১৭৬১ খ্রিস্টাব্দের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের বিপর্যয়ের প্রধান কারণগুলি আলোচনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি আহমদ শাহ আবদালির বিরুদ্ধে মারাঠাদের শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে চারটি প্রধান কারণ ছিল: ১. কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা: মারাঠাদের অতিরিক্ত চৌথ ও সরদেশমুখী আদায়ের কারণে উত্তর ভারতের প্রায় সব আঞ্চলিক শক্তি তাদের প্রতি বিরূপ ছিল। ভাউ-এর ঔদ্ধত্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জাঠ রাজা সুরজ মল সেনা সরিয়ে নেন; রাজপুতরা নিষ্ক্রিয় থাকে এবং শিখরা কোনো সাহায্য করেনি। অন্যদিকে আবদালি চতুরতার সাথে অযোধ্যার সুজা-উদ-দৌলা এবং নজিব-উদ-দৌলাকে ধর্মীয় ঐক্যের নামে নিজের পক্ষে টানেন। ২. অপ্রয়োজনীয় যাত্রী ও পরিবারের বোঝা: মারাঠাদের ৪৫,০০০ যুদ্ধক্ষেত্রের সেনার সাথে প্রায় ১ লক্ষ তীর্থযাত্রী, সাধু-সন্ন্যাসী ও মহিলা ছিল, যাঁরা উত্তর ভারতের তীর্থদর্শনের আশায় এসেছিলেন। এদের খাদ্য জোগাতে ও রক্ষা করতে গিয়ে মারাঠা সেনার স্বাভাবিক গতি নষ্ট হয়ে যায়। ৩. চরম রসদ সংকট ও অনাহার: আবদালি মারাঠাদের দিল্লির সাথে সমস্ত যোগাযোগ ও রসদ সরবরাহের পথ কেটে দেন। পানিপথের অবরুদ্ধ শিবিরে টানা তিন মাস প্রায় অনাহারে হাজার হাজার সেনা ও ঘোড়া মারা যায়। ১৪ জানুয়ারি যে মারাঠারা যুদ্ধ করতে নামে, তারা জয়ের আশায় নয়, বরং অনাহারের চেয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মরণকেই শ্রেয় মনে করে লড়েছিল। ৪. রণকৌশল ও যুদ্ধাস্ত্রের বৈষম্য: ইব্রাহিম খান গার্দির ফরাসি ভারী কামানগুলি ছিল অচল ও অনড়। পক্ষান্তরে আবদালির উটের পিঠে বসানো ভ্রাম্যমাণ ও বিধ্বংসী কামান (জাম্বুরাক) মারাঠা ব্যূহ তছনছ করে দেয় এবং সংরক্ষিত তাজা আফগান অশ্বারোহী সেনা যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আঘাত হানে।
উদাহরণ 7
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেন মহীশূরের টিপু সুলতানকে ভারতে তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু মনে করত?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
ব্রিটিশরা অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের কূটনৈতিক কূটকৌশলে বশ করতে পারলেও টিপু সুলতানকে নিজেদের সাম্রাজ্যের প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, কারণ: ১. উন্নত সামরিক ও রকেট প্রযুক্তি: টিপু বাঁশের নলের বদলে লোহার আবরণে বিশ্বমানের মহীশূরীয় সামরিক রকেট উদ্ভাবন করেছিলেন, যার পাল্লা ছিল ২ কিলোমিটার। পোল্লিলুরের যুদ্ধে এই রকেট ব্রিটিশ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছিল। ইউরোপীয় কায়দায় প্রশিক্ষিত তাঁর সৈন্য ও তোপখানা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ২. আন্তর্জাতিক ব্রিটিশবিরোধী মৈত্রী: টিপু উপলব্ধি করেছিলেন বিশ্বমৈত্রী ছাড়া সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের ভারত থেকে তাড়ানো যাবে না। তিনি বিপ্লবী ফ্রান্সের জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্য হয়ে 'নাগরিক টিপু' নাম নেন এবং স্বাধীনতার বৃক্ষ রোপণ করেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, তুরস্কের উসমানীয় সুলতান এবং আফগানিস্তানের জামান শাহের দরবারে ব্রিটিশবিরোধী জোট গড়ার দূত পাঠান। ৩. অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বয়ম্ভরতা: তিনি একটি সরকারি বাণিজ্য নিগম তৈরি করেন, বিদেশে ৩০টি বাণিজ্য কুঠি খোলেন, ফ্রান্সে লোক পাঠিয়ে রেশম চাষ শেখান এবং রাষ্ট্রীয় জাহাজ কারখানা, কাগজ ও চিনিকল গড়ে তুলে মহীশূরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। ৪. ব্রিটিশের বশ্যতা স্বীকারে আপসহীন মনোভাব: লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন: 'শেয়ালের মতো শত বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো একদিন বাঁচাও শ্রেষ্ঠ।' ১৭৯৯ সালের ৪ মে শ্রীরঙ্গপত্তমে বীরের মতো লড়াই করে তিনি শহিদ হন।
উদাহরণ 8
মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ কীভাবে পাঞ্জাবের মিসলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং তাঁর ইউরোপীয় ধাঁচের 'ফউজ-ই-খাস'-এর বৈশিষ্ট্য কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ ('পাঞ্জাবকেশরী') পরস্পরবিবাদে লিপ্ত মিসলগুলিকে একত্রিত করে এক দুর্ধর্ষ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন: ১. রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক একীকরণ: শুকারচাকিয়া মিসলের নেতা হিসেবে ১৭৯৯ সালে তিনি ভঙ্গি মিসলের কাছ থেকে লাহোর এবং ১৮০৫ সালে অমৃতসর অধিকার করে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ঐক্যের সমন্বয় ঘটান। ১৮১৮ সালে মুলতান, ১৮১৯ সালে কাশ্মীর এবং ১৮৩৪ সালে পেশোয়ার জয় করে শতাব্দীপ্রাচীন আফগান আক্রমণের পথ চিরতরে রুদ্ধ করেন। ২. অমৃতসরের সন্ধি (১৮০৯): ব্রিটিশ দূত চার্লস মেটক্যাফের সাথে চুক্তি করে তিনি কৌশলগতভাবে শতদ্রু নদীকে সীমানা মেনে নেন। এতে ব্রিটিশদের সাথে তৎকালীন সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে উত্তর ও পশ্চিম দিকে সাম্রাজ্য বিস্তারের পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেন। ৩. আধুনিক সেনাবাহিনী: ফউজ-ই-খাস (Fauj-i-Khas): নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ ফরাসি ও ইতালীয় সেনাপতিদের এনে তিনি এক বিশেষ ইউরোপীয় আধুনিক ব্রিগেড গড়ে তোলেন:

  • জাঁ-ফ্রাঁসোয়া অ্যালার (ফরাসি): ল্যান্সার ও ড্রাগুন অশ্বারোহী সেনাকে ইউরোপীয় শৃঙ্খলায় গড়ে তোলেন।
  • জাঁ-ব্যাপটিস্ট ভেঞ্চুরা (ইতালীয়): পদাতিক বাহিনীকে আধুনিক বন্দুক চালনা ও ব্যূহ রচনায় দক্ষ করেন।
  • ক্লদ কোর্ট ও পাওলো আভিটাবিলে: লাহোরে সরকারি অস্ত্রাগার প্রতিষ্ঠা করে ব্রোঞ্জ ও পিতলের বিশ্বমানের কামান তৈরি করেন। ৪. উদার ধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন: তাঁর শাসন ছিল সকল সম্প্রদায়ের সমান অধিকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী ধ্যান সিংহ (ডোগরা হিন্দু), পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফকির আজিজুদ্দীন (মুসলিম) এবং প্রধান সেনাপতি হরি সিংহ নলওয়া ও দেওয়ান মোহকম চাঁদ ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত স্তম্ভ। তিনি স্বর্ণমন্দিরে স্বর্ণের চাদর দান করেছিলেন এবং মসজিদ-মন্দিরে সমানভাবে অনুদান দিতেন।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

১৭৩৯ সালের কারনালের যুদ্ধ এবং ১৭৬১ সালের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৭৩৯ সালের আক্রমণকারী ছিলেন পারস্যের নাদির শাহ, যিনি মহম্মদ শাহকে কারনালের যুদ্ধে হারিয়ে ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরা লুঠ করেন। ১৭৬১ সালের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে এসেছিলেন আফগানিস্তানের আহমদ শাহ আবদালি এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল মারাঠারা।

সাধারণ ভুল ধারণা

উত্তরাধিকার রাজ্যগুলি দিল্লির সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উত্তরাধিকার রাজ্যগুলি (বাংলা, অযোধ্যা, হায়দরাবাদ) কার্যত সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিল ঠিকই, কিন্তু তারা কখনোই দিল্লির বাদশাহের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি। তারা বাদশাহের নামে মুদ্রা চালাত এবং জুম্মার নামাজে বাদশাহের নামে খুতবা পাঠ করত।

সাধারণ ভুল ধারণা

চৌথ এবং সরদেশমুখীর পার্থক্য ভুল ব্যাখ্যা করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

চৌথ হলো বহিরাগত অঞ্চলের মোট রাজস্বের ১/৪ অংশ (২৫%), যা মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার বিনিময়ে আদায় করা হতো। সরদেশমুখী হলো অতিরিক্ত ১/১০ অংশ (১০%), যা মারাঠা রাজা মহারাষ্ট্রের বংশানুক্রমিক প্রধান সর্দার (সরদেশমুখ) হিসেবে দাবি করতেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

প্রথম বাজিরাও তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রথম বাজিরাও ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দেই মারা যান। ১৭৬১ সালের তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ঘটেছিল তাঁর পুত্র বালাজি বাজিরাও (নানা সাহেব)-এর আমলে এবং মারাঠা সেনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সদাশিবরাও ভাউ ও বিশ্বাসরাও।

সাধারণ ভুল ধারণা

হায়দার আলি ও টিপু সুলতানকে মহীশূরের পুরনো বংশের নবাব ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

হায়দার আলি ছিলেন এক সাধারণ অশ্বারোহী সৈনিক, যিনি নিজের অসাধারণ প্রতিভায় দিন্দিগুলের ফৌজদার হন এবং ১৭৬১ সালে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রধানমন্ত্রী নানজারাজকে সরিয়ে মহীশূরের প্রকৃত ক্ষমতা দখল করেন। প্রাচীন হিন্দু ওয়াডিয়ার রাজপরিবার তখন নামসর্বস্ব পুতুলে পরিণত হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৮০৯ সালের অমৃতসরের সন্ধির সাথে ১৮৪৬ সালের অমৃতসরের সন্ধি গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৮০৯ সালের অমৃতসরের সন্ধি হয়েছিল মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহ ও ব্রিটিশদের (চার্লস মেটক্যাফ) মধ্যে, যেখানে শতদ্রু নদীকে সীমানা মানা হয়। কাশ্মীর বিক্রির চুক্তিটি হয়েছিল ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধের পর।

সাধারণ ভুল ধারণা

কলকাতার 'মারাঠী খাত' মারাঠারা আক্রমণ করার জন্য কেটেছিল বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মারাঠী খাত কোনো আক্রমণকারী পরিখা ছিল না; ১৭৪২ সালে মারাঠা বর্গিদের আকস্মিক আক্রমণ থেকে ফোর্ট উইলিয়াম ও কলকাতাবাসীকে রক্ষা করতে ব্রিটিশ কোম্পানি ও স্থানীয় অধিবাসীরা এই ৩ মাইল লম্বা প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খনন করেছিল।

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: স্থাপত্যিক কনসেপ্ট ম্যাপ (পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস অধ্যায় ২)

পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ২ কনসেপ্ট ম্যাপ আঞ্চলিক শক্তির উত্থান (মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও আঞ্চলিক রাজ্যসমূহ) অতীত ও ঐতিহ্য অধ্যায় ২ স্তম্ভ ১ মুঘল সাম্রাজ্যের পতন সংকট ও আক্রমণ (১৭০৭-৬১) অভ্যন্তরীণ শাসন সংকট • ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু (১৭০৭) • জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট • কৃষক বিদ্রোহ (জাঠ, সৎনামী) নাদির শাহের লুণ্ঠন (১৭৩৯) • কারনালের যুদ্ধ (১৭৩৯) • দিল্লি লুণ্ঠন ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ • কোহিনূর ও ময়ূর সিংহাসন অপহূত আহমদ শাহ আবদালির হানা • মুহুর্মুহু আফগান অভিযান • কেন্দ্রীয় মুঘল শক্তির অবলুপ্তি • আঞ্চলিক শক্তির উত্থানের পথ উন্মুক্ত মূল ঐতিহাসিক প্রভাব মুঘল সাম্রাজ্যের চরম দুর্বলতায় সুবেদার ও প্রাদেশিক শাসকেরা স্বশাসিত উত্তরাধিকার রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। স্তম্ভ ২ উত্তরাধিকার রাজ্য বাংলা, অযোধ্যা ও হায়দরাবাদ বাংলা: মুর্শিদকুলি খান • ১৭১৭ সালে সুবাদারি ও দেওয়ানি • রাজধানী স্থানান্তর: মুর্শিদাবাদ • মাল-জামিনি রাজস্ব ব্যবস্থা আলিবর্দি ও বর্গি হাঙ্গামা • আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬) • মারাঠা বর্গি আক্রমণ (১৭৪২-৫১) • ১৭৫১ সন্ধি: চৌথ ও ওড়িশা দান হায়দরাবাদ ও অযোধ্যা • নিজাম আসফ জাহ (১৭২৪) • সাকরখেদার যুদ্ধ ও স্বাধীন শাসন • সাদাত খান (১৭২২, অযোধ্যা) রাজনৈতিক রূপরেখা বাদশাহের নামে মুদ্রা ও খুতবা চালু রেখেও রাজস্ব ও সৈন্য পরিচালনায় সম্পূর্ণ সার্বভৌম স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতেন নওয়াবরা। স্তম্ভ ৩ মারাঠা আধিপত্য পেশোয়া ও পানিপথ (১৭৬১) পেশোয়াদের ক্ষমতায়ন • বালাজি বিশ্বনাথ (১৭১৩) • বাজিরাও ১: হিন্দু পদ পাদশাহী • বালাজি বাজিরাও ও সাঙ্গোলা চুক্তি মারাঠা যুক্তরাষ্ট্র • সিন্ধিয়া, হোলকার, গায়কোয়াড় • ভোঁসলে (নাগপুর), পেশোয়া (পুনে) • ১৭৫৮ সালে আটক দুর্গ জয় তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ • ১৪ জানুয়ারি ১৭৬১: আবদালি-ভাউ • কূটনৈতিক একাকীত্ব ও রসদসংকট • "দুটি মুক্তো গলে গেল" মর্মান্তিক ক্ষতি ঐতিহাসিক মোড় সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার মারাঠা স্বপ্ন ভেঙে যায়, যা ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির সাম্রাজ্য বিস্তারের পথ উন্মুক্ত করে। স্তম্ভ ৪ মহীশূর ও পাঞ্জাব প্রতিরোধ ও আধুনিকায়ন মহীশূর: হায়দার ও টিপু • দিন্দিগুলে আধুনিক অস্ত্রাগার • টিপু সুলতানের লোহার রকেট • ৪টি ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধ (১৭৬৭-৯৯) পাঞ্জাব: রঞ্জিৎ সিংহ • ১২ শিখ মিসল (শুকারচাকিয়া) • ১৭৯৯ সালে লাহোর অধিকার • ইউরোপীয় কায়দায় ফউজ-ই-খাস কূটনীতি ও সমাপ্তি • ১৭৯৯: শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর শাহাদাত • ১৮০৯: অমৃতসরের সন্ধি (মেটক্যাফ) • শতদ্রু নদী সীমান্ত নির্ধারণ অনমনীয় প্রতিরোধ পাশ্চাত্য প্রযুক্তিতে সৈন্যদল গড়ে কোম্পানির গতি রোধ করলেও কূটনৈতিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিবাদে শেষরক্ষা হয়নি।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ও দরবারি সংঘাত: ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দাক্ষিণাত্যের দীর্ঘ যুদ্ধ, তীব্র জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট (পাইবাকি জমির অভাব), কৃষক বিদ্রোহ (জাঠ, সৎনামী, শিখ) এবং তুরানি, ইরানি ও সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয়ের মতো অমাত্যদের চক্রান্তে কেন্দ্রীয় মুঘল শাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
মূল বিষয় 2
২. বিধ্বংসী বৈদেশিক আক্রমণ: ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের নাদির শাহের ভারত আক্রমণ (কারনালের যুদ্ধ, দিল্লির কতল-ই-আম, ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরা লুণ্ঠন) এবং পরবর্তীকালে আহমদ শাহ আবদালির বারবার আক্রমণ মুঘলদের সামরিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদাকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়।
মূল বিষয় 3
৩. স্বশাসিত বাংলা সুবা: মুর্শিদকুলি খান বাংলাকে সমৃদ্ধ সুবায় পরিণত করেন, রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নেন (১৭০৪), কঠোর মাল-জামিনি রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং জগৎ শেঠদের সাথে ঘনিষ্ঠ মৈত্রী গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে নওয়াব আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬) রক্তক্ষয়ী বর্গি হাঙ্গামা প্রতিহত করে ১৭৫১ সালের চুক্তির মাধ্যমে ওড়িশা ও ১২ লক্ষ টাকার চৌথ দেন এবং ইউরোপীয় কোম্পানিগুলিকে মৌমাছির মতো নিয়ন্ত্রণে রাখেন।
মূল বিষয় 4
৪. হায়দরাবাদ ও অযোধ্যার উত্থান: ১৭২৪ সালে সাকরখেদার যুদ্ধে মুবারিজ খানকে হারিয়ে নিজাম-উল-মুলক আসফ জাহ ১ হায়দরাবাদে আসফ জাহি বংশের প্রতিষ্ঠা করেন; ১৭২২ সালে সাদাত খান বুরহান-উল-মুলক অযোধ্যায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীকালে নওয়াব ওয়াজির সফদরজং ও সুজা-উদ-দৌলার হাত ধরে বিকাশ লাভ করে এবং ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদের সন্ধির মাধ্যমে ব্রিটিশ বাফার স্টেটে পরিণত হয়।
মূল বিষয় 5
৫. মারাঠা পেশোয়াদের বিস্তার: বালাজি বিশ্বনাথ (১৭১৯ দিল্লির সন্ধি), প্রথম বাজিরাওয়ের 'হিন্দু পদ পাদশাহী' নীতি ও বিদ্যুৎগতির অশ্বারোহী রণকৌশল (পালখেদ, মালব, গুজরাট) এবং বালাজি বাজিরাওয়ের সময় ১৭৫০ সালের সাঙ্গোলা চুক্তির মধ্য দিয়ে পুনে মারাঠা সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এবং আটক দুর্গ পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করে।
মূল বিষয় 6
৬. তৃতীয় পানিপথের বিপর্যয় (১৭৬১): ১৪ জানুয়ারি ১৭৬১ সালে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা, অনাহার ও আবদালির ভ্রাম্যমাণ জাম্বুরাক কামানের আঘাতে মারাঠা সেনার চরম পরাজয় ঘটে এবং ভাউ ও বিশ্বাসরাও নিহত হন, যা সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্যের স্বপ্ন চূর্ণ করে ব্রিটিশদের পথ সুগম করে।
মূল বিষয় 7
৭. মহীশূরের আধুনিকায়ন ও প্রতিরোধ: হায়দার আলি ও টিপু সুলতান আধুনিক ইউরোপীয় সামরিক বিজ্ঞান, লোহার তৈরি সামরিক রকেট, জ্যাকোবিন ক্লাব ও ফরাসি মৈত্রী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ইংরেজদের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন, যা চারটি যুদ্ধের পর ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর শাহাদাতের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।
মূল বিষয় 8
৮. মহারাজা রঞ্জিৎ সিংহের পাঞ্জাব: রঞ্জিৎ সিংহ ১২টি শিখ মিসলকে ঐক্যবদ্ধ করে লাহোর ও অমৃতসর জয় করেন, ১৮০৯ সালে অমৃতসরের সন্ধির মাধ্যমে শতদ্রু নদীকে সীমানা মানেন এবং নেপোলিয়নীয় সেনাপতিদের দিয়ে আধুনিক 'ফউজ-ই-খাস' গঠন করে এক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিশালী সার্বভৌম সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১৭৩৯ সালে নাদির শাহের ভারত আক্রমণের কারণ ও ফলাফল সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মুঘল সাম্রাজ্যের চরম দুর্বলতা ও দিল্লির বিপুল ধনসম্পদের লোভে পারস্যের নাদির শাহ ভারত আক্রমণ করেন। কারনালের যুদ্ধে মুঘল সেনাকে পরাস্ত করে তিনি দিল্লিতে ৩০,০০০ নিরীহ মানুষকে হত্যা (কতল-ই-আম) করেন এবং ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরাসহ ৭০ কোটি টাকার সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যান, যা মুঘল শক্তিকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেয়।
কারনালের যুদ্ধ, চাঁদনি চকের কতল-ই-আম এবং অপহৃত দুটি প্রধান রাজকীয় স্মারকের কথা ভাবো।
2
মুর্শিদকুলি খানের 'মাল-জামিনি ব্যবস্থা' এবং জগৎ শেঠদের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মাল-জামিনি ব্যবস্থায় ইজারাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত নির্দিষ্ট রাজস্ব জমা দেওয়ার লিখিত চুক্তি বা জামিন নেওয়া হতো। জগৎ শেঠ পরিবার সরকারি টাকশাল পরিচালনা করত, জমিদারদের রাজস্বের অর্থ ঋণ দিত এবং হুন্ডির মাধ্যমে নিরাপদে দিল্লির সম্রাটের নজরানা পাঠিয়ে নওয়াবি অর্থনীতিকে সচল রাখত।
লিখিত আর্থিক জামিন, ইজারাদারদের কড়াকড়ি এবং মাড়োয়ারি ব্যাংকারদের হুন্ডি ব্যবস্থা স্মরণ করো।
3
১৭২৪ সালের সাকরখেদার যুদ্ধ কীভাবে হায়দরাবাদ রাজ্যের জন্ম দিয়েছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: দিল্লির নোংরা রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিজাম-উল-মুলক দাক্ষিণাত্যে চলে এলে সম্রাট মুবারিজ খানকে পাঠান তাঁকে ধ্বংস করতে। সাকরখেদার যুদ্ধে নিজাম মুবারিজ খানকে পরাজিত ও হত্যা করেন। বাধ্য হয়ে সম্রাট তাঁকে 'আসফ জাহ' উপাধি দেন এবং দাক্ষিণাত্যের স্বশাসিত শাসক হিসেবে মেনে নেন, যা হায়দরাবাদ রাজ্যের সূচনা করে।
নিজামের দিল্লি ত্যাগ, মুবারিজ খানের পরাজয় এবং আসফ জাহ উপাধি প্রাপ্তির বিষয়টি মনে করো।
4
কেন বলা হয় যে তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ ঠিক করেছিল 'কে ভারত শাসন করবে না'?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে সর্বভারতীয় হিন্দু সাম্রাজ্য গড়ার মারাঠাদের স্বপ্ন চিরতরে ধ্বংস হয়, আবার জয়ী আবদালিও আফগান সেনাদের বিদ্রোহে কাবুলে ফিরে যান। এর ফলে তৈরি হওয়া ক্ষমতার শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনায়াসে সমগ্র ভারত গ্রাস করার সুযোগ পায়।
মারাঠাদের আধিপত্যের অবসান, আবদালির প্রস্থান এবং ব্রিটিশদের সুবিধার দিকটি বিশ্লেষণ করো।
5
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে টিপু সুলতান কী কী সামরিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: টিপু সুলতান বিশ্বমানের লোহার চোঙার মহীশূরীয় সামরিক রকেট ও আধুনিক কামান তৈরি করেন; বিপ্লবী ফ্রান্সের সাথে মৈত্রী গড়ে জ্যাকোবিন ক্লাবের সদস্য হন; বিদেশে ৩০টি বাণিজ্য কুঠি ও রেশম শিল্প স্থাপন করেন এবং ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি অগ্রাহ্য করে বীরের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন।
মহীশূরীয় রকেট, জ্যাকোবিন ক্লাব, রেশম চাষ ও অধীনতামূলক মিত্রতা প্রত্যাখ্যান মনে করো।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

Rise of Regional Powers অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।