১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ আহমেদনগরে ষষ্ঠ মহামতি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব আলমগীর-এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অখণ্ড মুঘল সাম্রাজ্যের দ্রুত ভাঙন শুরু হয়। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে মুঘলরা যে রাজনৈতিক ঐক্য, কেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সামরিক শৃঙ্খলা গড়ে তুলেছিল, তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। দাক্ষিণাত্যে ঔরঙ্গজেবের সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের যুদ্ধ (১৬৮১–১৭০৭)—যাকে ঐতিহাসিকরা 'দাক্ষিণাত্য ক্ষত' (Deccan Ulcer) বলে অভিহিত করেছেন—মুঘল রাজকোষ শূন্য করে দেয়, সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে ফেলে এবং উত্তর ভারতের প্রশাসনকে অচল করে তোলে।
ঔরঙ্গজেবের পর দিল্লির মসনদে বসেন দুর্বল ও অযোগ্য একদল শাসক, যাদের ইতিহাসে 'পরবর্তী মুঘল' (Later Mughals) বলা হয় (প্রথম বাহাদুর শাহ, জাহান্দার শাহ, ফাররুখশিয়ার, মহম্মদ শাহ)। এঁদের রাজত্বকালে মুঘল দরবার প্রধান তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী অভিজাত গোষ্ঠীর চক্রান্তের আখড়ায় পরিণত হয়:
- তুরানি গোষ্ঠী: মধ্য এশিয়া থেকে আগত অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের নেতা ছিলেন চিন কুলিজ খান (নিজাম-উল-মুলক)।
- ইরানি গোষ্ঠী: পারস্য থেকে আগত শিয়া অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের অন্যতম ছিলেন অযোধ্যার সাদাত খান।
- হিন্দুস্তানি গোষ্ঠী: ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমান অভিজাতবৃন্দ, যাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন কুখ্যাত সৈয়দ ভ্রাতৃদ্বয় (হাসান আলি ও আবদুল্লা খান)। ১৭১৩ থেকে ১৭২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তাঁরা একের পর এক সম্রাটকে সিংহাসনে বসিয়েছেন ও হত্যা করেছেন, ফলে তাঁদের 'নৃপতিকর্তা' বা 'কিংমেকার' (Kingmakers) বলা হয়।
আধুনিক ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র ও ইরফান হাবিব দেখিয়েছেন যে, মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কোনো ব্যক্তির দুর্বলতার কারণে ঘটেনি, বরং এর মূলে ছিল গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট:
- জায়গিরদারি ও মনসবদারি সংকট: মুঘল শাসন ও সামরিক ব্যবস্থা নির্ভরশীল ছিল মনসবদারি প্রথার ওপর। মনসবদারদের বেতনের বদলে রাজস্ব আদায়ের জন্য জমি দেওয়া হতো, যাকে জায়গির বলা হতো। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে মনসবদারের সংখ্যা বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু বিলি করার মতো জমি (পাইবাকি জমি / Paibaqi)-র তীব্র অভাব দেখা দেয়। এই জমি সংকট বা 'বে-জায়গিরি' (Be-jagiri) অভিজাতদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দেয়।
- চরম রাজস্ব শোষণ: অনিশ্চিত ও স্বল্পমেয়াদী বদলি ব্যবস্থার কারণে জায়গিরদাররা কৃষকদের ওপর বেপরোয়া রাজস্ব চাপিয়ে দেন। উৎপন্ন ফসলের শতকরা ৫০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত কর হিসেবে কেড়ে নেওয়া হতো। ফলে কৃষকেরা ভিটেমাটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
- কৃষক বিদ্রোহ: শোষিত কৃষকেরা জাতিগত ও ধর্মীয় নেতৃত্বে মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আগ্রা-মথুরার জাঠ (গোকুলা, রাজারাম, চূড়ামন), নারনৌলের সৎনামী, বুন্দেলখণ্ডের বুন্দেলা (ছত্রশাল) এবং পাঞ্জাবের শিখরা লাগাতার সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
মুঘল সাম্রাজ্য যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, তখন পশ্চিম দিক থেকে নেমে আসে এক বিধ্বংসী আঘাত। পারস্যের পরাক্রান্ত শাসক নাদির শাহ আফশার ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে খাইবার গিরিপথ পার হয়ে ভারত আক্রমণ করেন।
- কারনালের যুদ্ধ (২৪ ফেব্রুয়ারি ১৭৩৯): হরিয়ানার কারনাল প্রান্তরে মুঘল সম্রাট মহম্মদ শাহ 'রঙ্গিলা'-র বিশৃঙ্খল সেনাদল নাদির শাহের সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বন্ধুকধারী সেনার মুখোমুখি হয়। মাত্র তিন ঘণ্টার যুদ্ধে মুঘল বাহিনী সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়। প্রধান অমাত্য খান-ই-দৌরান নিহত হন এবং নিজাম-উল-মুলক মধ্যস্থতা করে সাময়িক সন্ধি করেন।
- দিল্লির গণহত্যা (কতল-ই-আম): নাদির শাহ মহম্মদ শাহকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে প্রবেশ করেন। দিল্লিতে নাদির শাহের মৃত্যুর মিথ্যা গুজব রটলে স্থানীয় ক্ষুব্ধ জনতা কিছু পারসিক সেনাকে হত্যা করে। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে নাদির শাহ চাঁদনি চকের সুনেহরি মসজিদ থেকে উন্মুক্ত তরবারি তুলে সাধারণ মানুষের ওপর নির্বিচার গণহত্যার (কতল-ই-আম / Qatl-e-Aam) আদেশ দেন। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ মার্চ মাত্র এক দিনে ৩০,০০০ নিরীহ মানুষ নিহত হন।
- অমূল্য সম্পদ লুণ্ঠন: নাদির শাহ দিল্লির শতাব্দীর সঞ্চিত রাজকোষ উজাড় করে দেন। তিনি আনুমানিক ৭০ কোটি টাকার সোনা, হিরে ও জহরত লুণ্ঠন করেন। এর মধ্যে ছিল জগদ্বিখ্যাত কোহিনূর হীরা (Koh-i-Noor) এবং সম্রাট শাহজাহানের তৈরি রত্নখচিত ময়ূর সিংহাসন (তখত-ই-তাউস / Takht-i-Taus)। লুণ্ঠিত সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে নাদির শাহ ইরানে ফিরে গিয়ে পরবর্তী তিন বছরের জন্য সমস্ত প্রজাদের কর মকুব করে দিয়েছিলেন।
১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহের মৃত্যুর পর তাঁর সেনাপতি আহমদ শাহ আবদালি (দুররানি) আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। ১৭৪৮ থেকে ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আবদালি মোট আটবার ভারত আক্রমণ করেন:
- তিনি বারবার পাঞ্জাব, দিল্লি, মথুরা ও আগ্রা লুণ্ঠন করেন এবং পাঞ্জাব, কাশ্মীর ও মুলতানকে আফগান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।
- মুঘল সম্রাটরা আবদালির হাতের পুতুলে পরিণত হন এবং তাঁর অনুগত রোহিলা সর্দার নজিব-উদ-দৌলাকে দিল্লির 'মীর বখশী' (প্রধান সেনাপতি) পদে বসাতে বাধ্য হন।
- আবদালির এই আক্রমণ উত্তর ভারতে মুঘল কেন্দ্রীয় শক্তির অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে দেয় এবং ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে তৃতীয় পানিপথের রক্তক্ষয়ী মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।