১.১ ভৌগোলিক অবস্থান ও মহাদেশের বিস্তৃতি
স্থলভাগের ক্ষেত্রফলের বিচারে দক্ষিণ আমেরিকা (South America) পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম মহাদেশ। এর মোট আয়তন প্রায় ১ কোটি ৭৮ লক্ষ বর্গকিলোমিটার (১.৭৮ কোটি বর্গকিমি), যা পৃথিবীর মোট ভূভাগের প্রায় ১২%। মহাদেশটি মূলত পশ্চিম গোলার্ধে অবস্থিত। এর উত্তরের সামান্য অংশ উত্তর গোলার্ধে এবং সিংহভাগ অংশ দক্ষিণ গোলার্ধে বিস্তৃত। মহাদেশটির আকৃতি অনেকটা একটি উল্টানো ত্রিভুজের মতো—উত্তরভাগ চওড়া এবং দক্ষিণভাগ ক্রমশ সরু হয়ে মহাসাগরে শেষ হয়েছে।
দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাল্পনিক ভৌগোলিক অক্ষরেখা এই মহাদেশের ওপর দিয়ে প্রসারিত হয়েছে:
- বিষুবরেখা (০°): মহাদেশটির উত্তরভাগে ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ব্রাজিলের ওপর দিয়ে আমাজন নদীর মোহনার নিকট দিয়ে অতিক্রম করেছে।
- মকরক্রান্তি রেখা (২৩½° দক্ষিণ): মহাদেশের মধ্যভাগে উত্তর চিলি, উত্তর আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে এবং দক্ষিণ ব্রাজিলের সাও পাওলোর পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছে।
| চরম প্রান্তবিন্দু | অক্ষাংশ / দ্রাঘিমাংশ | ভৌগোলিক স্থান ও বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| উত্তরতম বিন্দু | ১২°২৮′ উত্তর অক্ষাংশ | পুন্তা গ্যালিনাস (Punta Gallinas), কলম্বিয়ার গুয়াজিরা উপদ্বীপ। |
| দক্ষিণতম বিন্দু | ৫৫°৫৯′ দক্ষিণ অক্ষাংশ | কেপ হর্ন (Cape Horn) / ডিয়েগো রামিরেজ দ্বীপপুঞ্জ, চিলি। |
| পূর্বতম বিন্দু | ৩৪°৪৭′ পশ্চিম দ্রাঘিমা | পুন্তা দো সেইক্সাস (Ponta do Seixas), ব্রাজিল। |
| পশ্চিমতম বিন্দু | ৮১°২০′ পশ্চিম দ্রাঘিমা | পুন্তা পারিনাস (Punta Pariñas), পেরু। |
১.২ পানামা যোজক ও পানামা খালের গুরুত্ব
পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশটি একটি সংকীর্ণ জলাভূমিময় ভূখণ্ড দ্বারা উত্তর আমেরিকা মহাদেশের সাথে যুক্ত ছিল, যাকে পানামা যোজক (Isthmus of Panama) বলে। দক্ষিণ আমেরিকার বিপজ্জনক ও ঝড়ঝঞ্ঝাপূর্ণ দক্ষিণ প্রান্ত কেপ হর্ন ঘুরে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে যেতে জাহাজগুলিকে প্রায় ১৩,০০০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হতো:
- ১৯১৪ সালে পানামা খাল খনন: এই ৮০ কিমি প্রশস্ত পানামা যোজক কেটে কৃত্রিম লক-গেটের (গাতুন হ্রদ) সাহায্যে পানামা খাল (Panama Canal) তৈরি করা হয়, যা সরাসরি আটলান্টিক মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
- বাণিজ্যিক তাৎপর্য: এর ফলে নিউইয়র্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকো বা এশিয়ার সমুদ্রযাত্রার সময় কয়েক সপ্তাহ কমে যায় এবং বিশ্ববাণিজ্যে এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটে।
১.৩ দক্ষিণ আমেরিকার চারপাশের প্রাকৃতিক সীমানা
- উত্তরে: উষ্ণ ক্রান্তীয় ক্যারিবিয়ান সাগর এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর।
- পূর্বে: সুবিশাল আটলান্টিক মহাসাগর।
- পশ্চিমে: গভীর সামুদ্রিক খাতযুক্ত প্রশান্ত মহাসাগর।
- দক্ষিণে: উত্তাল ও হিমশীতল ড্রেক প্রণালী (Drake Passage), যা দক্ষিণ আমেরিকাকে এন্টার্কটিকা মহাদেশ থেকে পৃথক করেছে।
১.৪ ভৌগোলিক আবিষ্কারের ইতিহাস
ইউরোপীয়দের আগমনের বহু শতাব্দী আগে পেরুর আন্দিজের উচ্চভূমিতে সুবিশাল ও উন্নত ইনকা সাম্রাজ্য (Inca Empire) প্রতিষ্ঠিত ছিল, যাদের রাজধানী ছিল কুসকো এবং মাচু পিচু নগরী তাদের অপরূপ স্থাপত্যের সাক্ষ্য দেয়:
- ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৯৮): তাঁর তৃতীয় সমুদ্রাভিযানে কলম্বাস ভেনেজুয়েলার ওরিনোকো নদীর মোহনায় পৌঁছান এবং উপলব্ধি করেন এটি কোনো ক্ষুদ্র দ্বীপ নয়, এক সুবিশাল অজানা মহাদেশ।
- আমেরিগো ভেসপুচি (১৪৯৯–১৫০২): ইতালীয় নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি এই মহাদেশের পূর্ব উপকূল জরিপ করে প্রথম দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে এটি এশিয়া নয়, এটি এক সম্পূর্ণ নতুন ভূখণ্ড—"মুন্ডাস নোভুস" (Mundus Novus বা নতুন পৃথিবী)। তাঁর নামানুসারেই ১৫০৭ সালে মানচিত্রকার মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার এই ভূখণ্ডের নাম দেন "আমেরিকা"।
- ফার্ডিন্যান্ড ম্যাগেলান (১৫২০): স্প্যানিশ অভিযানের অধিনায়ক ম্যাগেলান মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণে সংকীর্ণ ও দুর্গম জলপথ আবিষ্কার করেন, যা আজ ম্যাগেলান প্রণালী নামে পরিচিত।
- আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট (১৭৯৯–১৮০৪): জার্মান বিজ্ঞানী ও ভূগোলের জনক হামবোল্ট আন্দিজ ও আমাজন অববাহিকায় বৈজ্ঞানিক অভিযান চালিয়ে মহাদেশটির আধুনিক ভূগোলের ভিত্তি স্থাপন করেন।