Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 10
আনুমানিক সময়: 50 Mins
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

পৃথিবীর অন্দরমহল

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যপুস্তক "আমাদের পৃথিবী"-র প্রথম অধ্যায় "পৃথিবীর অন্দরমহল" (Interior of the Earth / অধ্যায় ১: পৃথিবীর অন্দরমহল)-এর সম্পূর্ণ, সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ পাঠ্য সহায়িকায় স্বাগতম। আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে মহাজাগতিক ঘূর্ণায়মান গ্যাস ও নীহারিকাকণার মহাকর্ষীয় ঘনীভবন থেকে আদিম পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল। উৎপত্তিকালে পৃথিবী ছিল এক উত্তপ্ত, জ্বলন্ত ও গ্যাসীয় পিণ্ড। কালক্রমে তাপ বিকিরণ করে শীতল ও তরল হওয়ার সময় ভারী ও হালকা পদার্থের মধ্যে এক অভূতপূর্ব মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস (Gravitational Differentiation) ঘটে: ভারী নিকেল ও লোহার মতো ধাতব পদার্থ কেন্দ্রের দিকে জমা হয়ে সৃষ্টি করে কেন্দ্রমণ্ডল (Core), মধ্যম ঘনত্বের সিলিকেট জমা হয়ে গঠন করে গুরুমণ্ডল (Mantle), এবং সবচেয়ে হালকা অ্যালুমিনো-সিলিকেট ভেসে উঠে শীতল হয়ে তৈরি করে বহিরাবরণী ভূত্বক (Crust)। পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭১ কিমি (নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ ৬,৩৭৮ কিমি ও মেরু ব্যাসার্ধ ৬,৩৫৭ কিমি)। অথচ মানুষ আজ পর্যন্ত ভূগর্ভের মাত্র সামান্য অংশই প্রত্যক্ষভাবে জানতে পেরেছে: বিশ্বের গভীরতম সোনার খনি (দক্ষিণ আফ্রিকার মপনেং খনি) মাত্র ৩.৯ থেকে ৪ কিমি গভীর, যেখানে পাথরের তাপমাত্রা পৌঁছায় ৬৬° সেলসিয়াসে; আর বিজ্ঞানীদের খনন করা সর্বকালের গভীরতম গর্ত (রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপের সুপারডিপ বোরহোল) মাত্র ১২,২৬২ মিটার (প্রায় ১২.৩ কিমি) গভীর হতে পেরেছিল, যেখানে তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০°C-এ পৌঁছানোয় ড্রিল পাইপ গলে বেঁকে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীর মোট ৬,৩৭১ কিমি ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯% প্রত্যক্ষভাবে খনন করা সম্ভব হয়েছে! তাই ভূগর্ভ সম্পর্কে আমাদের সিংহভাগ জ্ঞান নির্ভর করে পরোক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর—যেমন ভূ-তাপীয় নতি (প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় ১°C তাপমাত্রা বৃদ্ধি), গভীর কূপ ও বক্রেশ্বরের মতো উষ্ণ প্রস্রবণ, পৃথিবীর গড় ঘনত্ব (৫.৫১৭ গ্রাম/ঘনসেমি) বনাম ভূত্বকের ঘনত্ব (২.৭-৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি), আগ্নেয়গিরির লাভা ও জেনোলিথ, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র (Geodynamo), এবং সর্বোপরি ভূমিকম্পীয় তরঙ্গের (P ও S তরঙ্গ) প্রতিফলন ও প্রতিসরণ। ভূগর্ভ মূলত তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত: (১) ভূত্বক (০–৩৫ কিমি), যা সিয়াল ও সিমা নিয়ে গঠিত এবং কনরাড বিযুক্তি দ্বারা বিভক্ত; (২) গুরুমণ্ডল (৩৫–২৯০০ কিমি), যা মোহোরোভিসিচ (মোহো) বিযুক্তি দ্বারা ভূত্বক থেকে বিচ্ছিন্ন, যেখানে রয়েছে নমনীয় গলিত অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (১০০–২৫০ কিমি), ক্রোফেসিমা (৩৫–৭০০ কিমি), রেপেত্তি বিযুক্তি এবং নিফেসিমা (৭০০–২৯০০ কিমি); এবং (৩) কেন্দ্রমণ্ডল বা ব্যারিফিয়ার (২৯০০–৬৩৭১ কিমি), যা গুটেনবার্গ বিযুক্তি দ্বারা গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক। এখানে রয়েছে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (২৯০০–৫১৫০ কিমি), যার আবর্তিত তরল লোহা তৈরি করে পৃথিবীর জীবনরক্ষাকারী চৌম্বক ঢাল, এবং লেহম্যান বিযুক্তি দ্বারা পৃথকীকৃত কঠিন স্ফটিকাকার অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (৫১৫০–৬৩৭১ কিমি), যেখানে ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে ৫০০০°–৬০০০°C তাপেও লোহা না গলে কঠিন অবস্থায় বিরাজ করে। এই অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক উপবিভাগ সমন্বিত ৫টি পূর্ণাঙ্গ মডিউল, ৯২০x৫২০ মাত্রার প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি গাণিতিক-ভৌগোলিক সূত্রাবলী, ৮টি নিখুঁত সমাধানকৃত গাণিতিক উদাহরণ ও কেস স্টাডি, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ বিশ্লেষণ, ৮টি সারাংশ সূত্র, ৮টি আবশ্যিক তথ্য, ৫টি ধাপে ধাপে সমাধানকৃত আত্ম-যাচাই প্রশ্ন এবং ৫টি আধুনিক CBT ডায়াগনস্টিক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)।

🔥 পাতালপুরীর অনন্ত বিস্ময়: ভূগর্ভের অতল গভীরে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?

তুমি কি জানো, পৃথিবীকে যদি একটি আস্ত আপেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে আমরা যে পাহাড়, সমুদ্র আর মহাদেশের ওপর বাস করছি—সেই সমগ্র ভূত্বকটি হবে আপেলের পাতলা খোসাটার চেয়েও পাতলা?

আমাদের পায়ের কয়েক হাজার কিলোমিটার নিচে জ্বলছে সূর্যের উপরিভাগের সমান উত্তপ্ত (৬,০০০°C) এক ধাতব অগ্নিকুণ্ড! দক্ষিণ আফ্রিকায় মাত্র ৪ কিলোমিটার গভীরে সোনার সন্ধানে নামা শ্রমিকদের গায়ে বরফের জল ছিটিয়ে ঠান্ডা রাখতে হয় কারণ সেখানকার পাথরের দেওয়াল ৬৬°C তাপে ফুটতে থাকে। রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপে বিজ্ঞানীরা যখন ১২ কিলোমিটার গর্ত খুঁড়লেন, তখন ভূগর্ভের প্রচণ্ড তাপে তাঁদের শক্ত ড্রিল পাইপ মোমের মতো নরম হয়ে বেঁকে গিয়েছিল!

বিজ্ঞানী জুল ভার্নের উপন্যাসের মতো কোনো মানুষ কি কখনও পৌঁছাতে পারবে পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে? কীভাবে আমরা জানলাম যে মাটির নিচে ফুটন্ত তরল লোহার এক ঘূর্ণায়মান সাগর আমাদের পৃথিবীকে মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে রক্ষা করছে? এসো উন্মোচন করি পৃথিবীর অন্দরমহল-এর রোমাঞ্চকর রহস্য!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যপুস্তক "আমাদের পৃথিবী"-র প্রথম অধ্যায় "পৃথিবীর অন্দরমহল" (Interior of the Earth / অধ্যায় ১: পৃথিবীর অন্দরমহল)-এর সম্পূর্ণ, সুসংগঠিত ও সমৃদ্ধ পাঠ্য সহায়িকায় স্বাগতম। আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে মহাজাগতিক ঘূর্ণায়মান গ্যাস ও নীহারিকাকণার মহাকর্ষীয় ঘনীভবন থেকে আদিম পৃথিবীর জন্ম হয়েছিল। উৎপত্তিকালে পৃথিবী ছিল এক উত্তপ্ত, জ্বলন্ত ও গ্যাসীয় পিণ্ড। কালক্রমে তাপ বিকিরণ করে শীতল ও তরল হওয়ার সময় ভারী ও হালকা পদার্থের মধ্যে এক অভূতপূর্ব মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস (Gravitational Differentiation) ঘটে: ভারী নিকেল ও লোহার মতো ধাতব পদার্থ কেন্দ্রের দিকে জমা হয়ে সৃষ্টি করে কেন্দ্রমণ্ডল (Core), মধ্যম ঘনত্বের সিলিকেট জমা হয়ে গঠন করে গুরুমণ্ডল (Mantle), এবং সবচেয়ে হালকা অ্যালুমিনো-সিলিকেট ভেসে উঠে শীতল হয়ে তৈরি করে বহিরাবরণী ভূত্বক (Crust)। পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ প্রায় ৬,৩৭১ কিমি (নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ ৬,৩৭৮ কিমি ও মেরু ব্যাসার্ধ ৬,৩৫৭ কিমি)। অথচ মানুষ আজ পর্যন্ত ভূগর্ভের মাত্র সামান্য অংশই প্রত্যক্ষভাবে জানতে পেরেছে: বিশ্বের গভীরতম সোনার খনি (দক্ষিণ আফ্রিকার মপনেং খনি) মাত্র ৩.৯ থেকে ৪ কিমি গভীর, যেখানে পাথরের তাপমাত্রা পৌঁছায় ৬৬° সেলসিয়াসে; আর বিজ্ঞানীদের খনন করা সর্বকালের গভীরতম গর্ত (রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপের সুপারডিপ বোরহোল) মাত্র ১২,২৬২ মিটার (প্রায় ১২.৩ কিমি) গভীর হতে পেরেছিল, যেখানে তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০°C-এ পৌঁছানোয় ড্রিল পাইপ গলে বেঁকে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীর মোট ৬,৩৭১ কিমি ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯% প্রত্যক্ষভাবে খনন করা সম্ভব হয়েছে! তাই ভূগর্ভ সম্পর্কে আমাদের সিংহভাগ জ্ঞান নির্ভর করে পরোক্ষ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর—যেমন ভূ-তাপীয় নতি (প্রতি ৩৩ মিটার গভীরতায় ১°C তাপমাত্রা বৃদ্ধি), গভীর কূপ ও বক্রেশ্বরের মতো উষ্ণ প্রস্রবণ, পৃথিবীর গড় ঘনত্ব (৫.৫১৭ গ্রাম/ঘনসেমি) বনাম ভূত্বকের ঘনত্ব (২.৭-৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি), আগ্নেয়গিরির লাভা ও জেনোলিথ, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র (Geodynamo), এবং সর্বোপরি ভূমিকম্পীয় তরঙ্গের (P ও S তরঙ্গ) প্রতিফলন ও প্রতিসরণ। ভূগর্ভ মূলত তিনটি প্রধান স্তরে বিন্যস্ত: (১) ভূত্বক (০–৩৫ কিমি), যা সিয়াল ও সিমা নিয়ে গঠিত এবং কনরাড বিযুক্তি দ্বারা বিভক্ত; (২) গুরুমণ্ডল (৩৫–২৯০০ কিমি), যা মোহোরোভিসিচ (মোহো) বিযুক্তি দ্বারা ভূত্বক থেকে বিচ্ছিন্ন, যেখানে রয়েছে নমনীয় গলিত অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (১০০–২৫০ কিমি), ক্রোফেসিমা (৩৫–৭০০ কিমি), রেপেত্তি বিযুক্তি এবং নিফেসিমা (৭০০–২৯০০ কিমি); এবং (৩) কেন্দ্রমণ্ডল বা ব্যারিফিয়ার (২৯০০–৬৩৭১ কিমি), যা গুটেনবার্গ বিযুক্তি দ্বারা গুরুমণ্ডল থেকে পৃথক। এখানে রয়েছে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (২৯০০–৫১৫০ কিমি), যার আবর্তিত তরল লোহা তৈরি করে পৃথিবীর জীবনরক্ষাকারী চৌম্বক ঢাল, এবং লেহম্যান বিযুক্তি দ্বারা পৃথকীকৃত কঠিন স্ফটিকাকার অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (৫১৫০–৬৩৭১ কিমি), যেখানে ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে ৫০০০°–৬০০০°C তাপেও লোহা না গলে কঠিন অবস্থায় বিরাজ করে। এই অধ্যায়টিতে রয়েছে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক উপবিভাগ সমন্বিত ৫টি পূর্ণাঙ্গ মডিউল, ৯২০x৫২০ মাত্রার প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর SVG কনসেপ্ট ম্যাপ, ৮টি গাণিতিক-ভৌগোলিক সূত্রাবলী, ৮টি নিখুঁত সমাধানকৃত গাণিতিক উদাহরণ ও কেস স্টাডি, ৭টি পরীক্ষক ফাঁদ বিশ্লেষণ, ৮টি সারাংশ সূত্র, ৮টি আবশ্যিক তথ্য, ৫টি ধাপে ধাপে সমাধানকৃত আত্ম-যাচাই প্রশ্ন এবং ৫টি আধুনিক CBT ডায়াগনস্টিক বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ)।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পদার্থের ঘনত্বের মৌলিক ধারণা (ঘনত্ব = ভর / আয়তন) এবং ভারী পদার্থ নিচে ডুবে যাওয়া ও হালকা পদার্থ ওপরে ভেসে ওঠার নীতি।
  • তাপ সঞ্চালনের বিভিন্ন রূপ: কঠিন মাধ্যমে পরিবহন (Conduction) এবং তরল/গ্যাসে পরিচলন (Convection) স্রোত।
  • ভূকম্পীয় তরঙ্গের প্রাথমিক ধারণা: প্রাথমিক অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ (P-তরঙ্গ) বনাম গৌণ অনুপ্রস্থ কৃন্তন তরঙ্গ (S-তরঙ্গ)।
  • পৃথিবীর ভৌগোলিক মাপজোখ: গড় ব্যাসার্ধ (প্রায় ৬,৩৭১ কিমি) এবং পরিধি (প্রায় ৪০,০০০ কিমি)।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • ৪৬০ কোটি বছর আগে আদিম পৃথিবীর তাপীয় উৎপত্তি ও মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • ভূগর্ভ সম্পর্কে জানার প্রত্যক্ষ উৎস (খনন, অগ্ন্যুৎপাত) এবং পরোক্ষ উৎসের (ভূ-তাপীয় নতি, ঘনত্ব, উল্কা, ভূকম্পীয় তরঙ্গ) পার্থক্য নিরূপণ করা।
  • ভূ-তাপীয় নতি (প্রতি ৩৩ মিটারে ১°C বৃদ্ধি) গণনা করতে পারা এবং ভূগর্ভের তাপের উৎস চিহ্নিত করা।
  • ভূত্বকের গঠন বিশ্লেষণ করা এবং মহাদেশীয় সিয়াল (গ্রানাইট, ২.৭ গ্রাম/সেমি³) ও মহাসাগরীয় সিমা (ব্যাসাল্ট, ৩.০ গ্রাম/সেমি³)-র তুলনামূলক পার্থক্য স্পষ্ট করা।
  • গুরুমণ্ডলের গঠন, ক্রোফেসিমা ও নিফেসিমা স্তর এবং অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের (১০০-২৫০ কিমি) পরিচলন স্রোতের ভূমিকা নিরূপণ করা।
  • তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের ভূ-ডায়নামো (Geodynamo) ক্রিয়া এবং কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের ক্ল্যাপেরন গলনাঙ্ক বৃদ্ধি নীতি ব্যাখ্যা করা।
  • পাঁচটি প্রধান ভূকম্পীয় বিযুক্তি রেখা (C-M-R-G-L সূত্র: কনরাড, মোহো, রেপেত্তি, গুটেনবার্গ, লেহম্যান) ক্রমানুসারে আয়ত্ত করা।
  • ভূকম্পীয় তরঙ্গের বেগ রূপরেখা বিশ্লেষণ করা এবং S-তরঙ্গ ছায়াবলয় (১০৫°-১৮০°) কীভাবে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের প্রমাণ দেয় তা উপলব্ধি করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. পৃথিবীর তাপীয় উৎপত্তি, মানব অন্...
2 ২. ভূত্বক (Crust) ও অশ্মমণ্ডল
3 ৩. গুরুমণ্ডল (Mantle) ও অ্যাস্থেনোস...
4 ৪. কেন্দ্রমণ্ডল (Core / Barysphere)...
5 ৫. ভূকম্পীয় তরঙ্গের প্রতিফলন ও বিয...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. পৃথিবীর তাপীয় উৎপত্তি, মানব অন্বেষণের সীমা ও ভূ-অভ্যন্তরের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উৎস

১.১ পৃথিবীর তাপীয় উৎপত্তি ও মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস

আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে (4.6 Billion Years Ago) আদিম সৌরজগতের মহাশূন্যে ঘূর্ণায়মান গ্যাসীয় নীহারিকা ও ধূলিকণার মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সংকুচিত হয়ে আমাদের পৃথিবীর জন্ম হয়। প্রাথমিক অবস্থায় প্রবল উল্কাপাত, মহাকর্ষীয় চাপ এবং ক্ষণস্থায়ী তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে পৃথিবী ছিল একটি ফুটন্ত উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল গলিত পিণ্ড (Magma Ocean)।

এই তরল গলিত অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এক বিরাট মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস (Gravitational Differentiation) ঘটেছিল:

  • সবচেয়ে ভারী ও ঘন ধাতব মৌল—প্রধানত লোহা ($\text{Fe}$) এবং নিকেল ($\text{Ni}$)—মহাকর্ষের টানে পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে তলিয়ে গিয়ে গঠন করে কেন্দ্রমণ্ডল (Core / NIFE)।
  • মাঝারি ঘনত্বের লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ সিলিকেট খনিজ কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে মধ্যবর্তী অংশে থিতিয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি করে সুবিশাল গুরুমণ্ডল (Mantle)।
  • সবচেয়ে হালকা অ্যালুমিনো-সিলিকেট খনিজগুলি (সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম) তরল গলিত পিণ্ডের ওপর ফেনার মতো ভেসে ওঠে এবং ধীরে ধীরে মহাশূন্যে তাপ বিকিরণ করে কঠিন ও শক্ত হয়ে সৃষ্টি করে বহিরাবরণী ভূত্বক (Crust)।

১.২ মানব অন্বেষণের সীমা বনাম পৃথিবীর সামগ্রিক ব্যাসার্ধ

পৃথিবী একটি অভিগত গোলক, যার কেন্দ্র পর্যন্ত গড় দূরত্ব বা ব্যাসার্ধ প্রায় $R_{\oplus} \approx ৬,৩৭১\text{ কিমি}$ (নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ ৬,৩৭৮ কিমি এবং মেরু ব্যাসার্ধ ৬,৩৫৭ কিমি)। এই বিপুল গভীরতার তুলনায় ভূগর্ভে মানুষের প্রত্যক্ষ প্রবেশ অত্যন্ত নগণ্য:

অন্বেষণের মাইলফলক সর্বাধিক গভীরতা ভূগর্ভস্থ পরিবেশ ও তাপমাত্রা পৃথিবীর সামগ্রিক ব্যাসার্ধের অনুপাত
গভীরতম সোনার খনি (মপনেং খনি, দক্ষিণ আফ্রিকা) ৩.৯ থেকে ৪.০ কিমি পাথরের দেওয়ালের তাপমাত্রা ৬৬° সেলসিয়াস; শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে ওপর থেকে অবিরাম বরফের জল পাম্প করে বাতাস ঠান্ডা রাখতে হয়। পৃথিবীর গভীরতার মাত্র ০.০৬%।
গভীরতম কৃত্রিম গর্ত (কোলা সুপারডিপ বোরহোল, রাশিয়া) ১২,২৬২ মিটার (প্রায় ১২.৩ কিমি) ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর ধরে খোঁড়া হয়। ১২ কিমি নিচে তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০°C-এ পৌঁছায় এবং পাথর নমনীয় হয়ে ড্রিল পাইপ বেঁকে যাওয়ায় খনন কাজ চিরতরে বন্ধ হয়। পৃথিবীর মোট ৬,৩৭১ কিমি ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯%!

১.৩ ভূ-অভ্যন্তর জানার প্রত্যক্ষ বনাম পরোক্ষ উৎস

যেহেতু মানুষ ১২.৩ কিলোমিটারের বেশি নিচে যেতে পারেনি, তাই ভূগর্ভের গঠন জানতে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ধারার বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করেন:

  • প্রত্যক্ষ উৎস (Direct Sources):
    • ভূপৃষ্ঠের শিলা ও গভীর খনন: খনির ভেতর থেকে এবং সামুদ্রিক ড্রিলিং থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষ শিলাখণ্ড।
    • অগ্ন্যুৎপাত ও জেনোলিথ (Xenoliths): আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে ভূগর্ভের ১০০–২০০ কিমি গভীর থেকে উঠে আসা লাভা এবং আস্ত ম্যান্টল শিলার টুকরো (যেমন হীরকযুক্ত কিম্বারলাইট পাইপ)।
  • পরোক্ষ উৎস (Indirect Sources):
    • ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient): ভূগর্ভে তাপমাত্রা, চাপ ও ঘনত্বের নিয়মিত বৃদ্ধি।
    • পৃথিবীর গড় ঘনত্ব গণনা: আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রানুসারে পৃথিবীর সামগ্রিক গড় ঘনত্ব হলো ৫.৫১৭ গ্রাম/ঘনসেমি। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সিয়াল শিলার ঘনত্ব মাত্র ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি হওয়ায় এটি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে যে ভূগর্ভের কেন্দ্রভাগ অবশ্যই অত্যন্ত ভারী পদার্থে (১০–১৩ গ্রাম/ঘনসেমি) তৈরি।
    • উল্কাখণ্ড (Meteorites): সৌরজগতে ভাসমান উল্কাগুলি পৃথিবীর সমসময়ে তৈরি হয়েছিল; লোহা-নিকেল নির্মিত ধাতব উল্কাগুলি পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডলের প্রত্যক্ষ প্রতিরূপ।
    • ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র (Geomagnetism): পৃথিবীর চৌম্বক ঢাল প্রমাণ করে যে ভূগর্ভের কেন্দ্রস্থলে পরিবাহী গলিত ধাতব তরলের ঘূর্ণন ঘটছে।
    • ভূকম্পীয় তরঙ্গ (Seismic Waves): সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম; ভূমিকম্পের P ও S তরঙ্গের গতিবিধি ভূগর্ভের ভেতরের স্তর ও তরল অবস্থা এক্স-রে এর মতো নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।

১.৪ ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient) ও ভূগর্ভস্থ তাপের উৎস

ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূগর্ভের ভেতরের দিকে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি একক দূরত্বে তাপমাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পায়, তাকে ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient) বলে। সাধারণ মহাদেশীয় ভূত্বকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার হলো:

$$\text{ভূ-তাপীয় নতি} \approx \text{প্রতি ৩২ – ৩৩ মিটার গভীরতায় } ১^\circ\text{ সেলসিয়াস} \quad (\approx \text{প্রতি কিলোমিটারে } ৩০^\circ\text{C})$$

ভূগর্ভের তাপের প্রধান উৎসসমূহ:

  1. আদিম সঞ্চিত তাপ (Primordial Heat): পৃথিবী সৃষ্টির সময়কার প্রচণ্ড সংঘর্ষ ও সংকোচনের ফলে উৎপন্ন তাপ, যা ওপরের কঠিন শিলার আবরণের কারণে পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে যেতে পারেনি।
  2. তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনজনিত তাপ (Radioactive Decay): ভূগর্ভের শিলায় অবস্থিত ইউরেনিয়াম ($^{238}\text{U}$), থোরিয়াম ($^{232}\text{Th}$) ও পটাশিয়াম ($^{40}\text{K}$) প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলির স্বতঃস্ফূর্ত পরমাণু বিভাজন থেকে ক্রমাগত বিপুল তাপ নির্গত হচ্ছে।
  3. অভ্যন্তরীণ স্ফটিকীভবনের সুপ্ততাপ: তরল লোহা জমে কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলে পরিণত হওয়ার সময় মুক্ত হওয়া তাপ।

স্মরণীয় সত্য: যদি প্রতি কিলোমিটারে ৩০°C বৃদ্ধির হার কেন্দ্র পর্যন্ত সমভাবে বজায় থাকত, তবে পৃথিবীর কেন্দ্রে তাপমাত্রা হতো প্রায় ২ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস! কিন্তু বাস্তবে ভূত্বকের নিচে এই বৃদ্ধির হার দ্রুত কমে যায় এবং পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা প্রায় ৫,০০০° থেকে ৬,০০০° সেলসিয়াসে স্থির থাকে।

১.৫ উষ্ণ প্রস্রবণ ও গিজার: ভূগর্ভস্থ তাপের জীবন্ত নিদর্শন

বৃষ্টির জল মাটির ফাটল দিয়ে নিচে নেমে যখন উত্তপ্ত শিলাস্তরের সংস্পর্শে আসে, তখন তা ফুটতে শুরু করে এবং বাষ্পীভূত হয়:

  • উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Springs): ফুটন্ত গরম জল যখন স্বাভাবিকভাবে ভূত্বকের দুর্বল ফাটল দিয়ে অবিরাম বাইরে বেরিয়ে আসে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বিখ্যাত বক্রেশ্বর (Bakreshwar) উষ্ণ প্রস্রবণ এর অন্যতম উদাহরণ (যেখানে অগ্নি কুণ্ডের তাপমাত্রা প্রায় ৮০°C এবং এর জলে গন্ধক ও তেজস্ক্রিয় রেডন গ্যাস দ্রবীভূত থাকে)। এছাড়া হিমাচল প্রদেশের মণিকরণ ও বিহারের রাজগিরেও উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে।
  • গিজার (Geyser): ভূগর্ভের অতল গহ্বরে অতি-উত্তপ্ত জল ও বাষ্প প্রচণ্ড বাষ্পচাপের সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফোয়ারার মতো গর্জন করে আকাশে উৎক্ষিপ্ত হলে তাকে গিজার বলে (যেমন আমেরিকার ইয়োলোস্টোন পার্কের ওল্ড ফেইথফুল)।

২. ভূত্বক (Crust) ও অশ্মমণ্ডল

২.১ ভূত্বকের সামগ্রিক রূপরেখা ও বিস্তার

পৃথিবীর একেবারে বাইরের কঠিন, পাতলা ও ভঙ্গুর পাথুরে ত্বককে ভূত্বক (Crust) বলে। সমগ্র পৃথিবীর আয়তনের তুলনায় এটি অত্যন্ত পাতলা—মাত্র ১ শতাংশেরও কম (<১%) আয়তন এবং প্রায় ০.৫ শতাংশ ভর ভূত্বক দ্বারা গঠিত। ভূত্বকের পুরুত্ব স্থানভেদে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়:

  • মহাসাগরের তলদেশে অত্যন্ত পাতলা: গড়ে মাত্র ৫ থেকে ১০ কিমি।
  • মহাদেশীয় সমভূমি অঞ্চলে মাঝারি পুরু: গড়ে ৩০ থেকে ৫০ কিমি।
  • সুউচ্চ নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালায় (যেমন হিমালয় বা আন্দিজের নিচে): সবচেয়ে পুরু, প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত।

২.২ মহাদেশীয় ভূত্বক: সিয়াল (SIAL)

মহাদেশীয় ভূখণ্ড গঠনকারী ভূত্বকের ওপরের হালকা অংশকে বলা হয় সিয়াল (SIAL)। এর প্রধান দুটি উপাদান হলো সিলিকন (Si) এবং অ্যালুমিনিয়াম (Al)।

  • প্রধান শিলা: হালকা রঙের, আম্লিক ও বৃহৎ দানাদার গ্রানাইট (Granite) শিলা দ্বারা গঠিত।
  • গড় ঘনত্ব: তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি।
  • পুরুত্ব: মহাদেশীয় অঞ্চলে গড়ে ৩০–৫০ কিমি এবং পর্বতের নিচে ৭০ কিমি; তবে গভীর সমুদ্রের নিচে সিয়াল স্তর সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
  • বয়স: অত্যন্ত প্রাচীন; কানাডা বা ভারতের সিংভূমের সিয়াল শিলা প্রায় ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি বছর পুরোনো।

২.৩ মহাসাগরীয় ভূত্বক: সিমা (SIMA)

সিয়াল স্তরের নিচে অবস্থিত এবং সমগ্র সমুদ্রের তলদেশ গঠনকারী অপেক্ষাকৃত ভারী স্তরটিকে বলা হয় সিমা (SIMA)। এর প্রধান দুটি উপাদান হলো সিলিকন (Si) এবং ম্যাগনেসিয়াম (Mg)।

  • প্রধান শিলা: গাঢ় রঙের, ক্ষারকীয় ও সূক্ষ্ম দানাদার ব্যাসাল্ট (Basalt) এবং গ্যাব্রো শিলা দ্বারা গঠিত।
  • গড় ঘনত্ব: অপেক্ষাকৃত বেশি ও ভারী, প্রায় ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি।
  • পুরুত্ব: সমুদ্রের তলদেশে পাতলা, প্রায় ৫ থেকে ১০ কিমি।
  • ধারাবাহিকতা: সিমা স্তরটি সমুদ্রবক্ষ গঠন করে সিয়াল স্তরের নিচেও অবিচ্ছিন্নভাবে বিস্তৃত থাকে। অর্থাৎ হালকা সিয়াল স্তর ভারী সিমা স্তরের ওপর ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
  • বয়স: ভূতাত্ত্বিকভাবে নবীন (২০ কোটি বছরের কম পুরোনো), কারণ সমুদ্রবক্ষের বিস্তার ও সাবডাকশনে এই ভূত্বক প্রতিনিয়ত ধ্বংস ও পুনর্নির্মিত হয়।

২.৪ কনরাড বিযুক্তি (Conrad Discontinuity)

১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ান ভূকম্পবিদ ভিক্টর কনরাড (Victor Conrad) আবিষ্কার করেন যে মহাদেশীয় ভূত্বকের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতি হঠাৎ বৃদ্ধি পায়। মহাদেশীয় ভূত্বকের ওপরের হালকা গ্রানাইটধর্মী সিয়াল (SIAL) স্তর এবং নিচের ভারী ব্যাসাল্টধর্মী সিমা (SIMA) স্তরের মধ্যবর্তী বিচ্ছিন্নতাকারী সীমারেখাকে কনরাড বিযুক্তি রেখা বলা হয়।

  • গভীরতা: মহাদেশের নিচে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিমি গভীরতায় অবস্থিত।
  • তরঙ্গের গতি পরিবর্তন: সিয়াল স্তরে P-তরঙ্গের বেগ থাকে প্রায় ৬.০ কিমি/সেকেন্ড, যা কনরাড পার হয়ে সিমা স্তরে পৌঁছে একলাফে ৬.৬–৬.৮ কিমি/সেকেন্ডে উন্নীত হয়।
  • অবস্থান: এটি কেবল মহাদেশীয় ভূখণ্ডেই দেখা যায়; মহাসাগরের নিচে কনরাড বিযুক্তি থাকে না।

২.৫ অশ্মমণ্ডল (Lithosphere)

গ্রিক শব্দ 'Lithos' (পাথর) থেকে এসেছে অশ্মমণ্ডল (Lithosphere)। ভূতাত্ত্বিক সংজ্ঞানুসারে, সমগ্র ভূত্বক (সিয়াল ও সিমা) এবং তার ঠিক নিচে অবস্থিত গুরুমণ্ডলের একেবারে উপরিভাগের কঠিন ও ভঙ্গুর পাথুরে অংশকে একত্রে অশ্মমণ্ডল বলা হয়:

$$\text{অশ্মমণ্ডল (Lithosphere)} = \text{সমগ্র ভূত্বক (Crust)} + \text{গুরুমণ্ডলের উপরিভাগের কঠিন পাথুরে স্তর}$$

অশ্মমণ্ডলের গড় গভীরতা প্রায় ১০০ কিমি (সমুদ্রের নিচে ৫০–১০০ কিমি এবং মহাদেশের প্রাচীন শীল্ডে ১৫০–২০০ কিমি)। এটি কোনো অখণ্ড খোলস নয়, বরং কতগুলি বিশালাকার খণ্ডে বা টেকটনিক পাতে (Tectonic Plates) বিভক্ত, যা নিচের পিচ্ছিল অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের ওপর ভাসমান অবস্থায় চলাচল করে।

৩. গুরুমণ্ডল (Mantle) ও অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের গতিশীল রূপরেখা

৩.১ গুরুমণ্ডলের বিস্তার ও বৈশ্বিক গুরুত্ব

ভূত্বকের নিচে মোহো বিযুক্তি থেকে শুরু করে ভূগর্ভের ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল স্তরটিকে গুরুমণ্ডল (Mantle) বলা হয়। এর মোট পুরুত্ব প্রায় ২,৮৬৫ কিমি।

  • আয়তন ও ভরের অংশীদারি: সমগ্র পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৮৪ শতাংশ এবং মোট ভরের প্রায় ৬৭ শতাংশ (দুই-তৃতীয়াংশ) এই গুরুমণ্ডল ধারণ করে।
  • শিলা ও খনিজ গঠন: প্রধানত লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ অতি-ক্ষারকীয় (Ultramafic) পেরিডোটাইট (Peridotite) শিলা এবং অলিভিন ও পাইরক্সিন খনিজ দ্বারা গঠিত।
  • ঘনত্ব বৃদ্ধি: ওপরের অংশে ৩.৪ গ্রাম/ঘনসেমি থেকে শুরু করে নিচের অংশে বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৬ গ্রাম/ঘনসেমি হয়।

৩.২ মোহোরোভিসিচ বিযুক্তি বা মোহো (Mohorovičić Discontinuity / Moho)

১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে ক্রোয়েশিয়ার বিখ্যাত আবহবিদ ও ভূকম্পবিদ আন্দ্রিজা মোহোরোভিসিচ (Andrija Mohorovičić) বলকান অঞ্চলের এক ভূমিকম্পের সিসমোগ্রাম বিশ্লেষণ করে ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলের মধ্যকার এই প্রধান সীমারেখাটি আবিষ্কার করেন। তাঁর নামানুসারে একে মোহো (Moho) বলা হয়।

তুলনামূলক বৈশিষ্ট্য মোহোর ওপরে (ভূত্বক) মোহোর নিচে (গুরুমণ্ডল)
প্রধান শিলা গ্রানাইট ও ব্যাসাল্ট শিলা (সিলিকা-অ্যালুমিনা-ম্যাগনেসিয়াম) পেরিডোটাইট শিলা (লোহা-ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ আল্ট্রামাফিক শিলা)
গড় ঘনত্ব ২.৭ থেকে ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি ৩.৩ থেকে ৩.৪ গ্রাম/ঘনসেমি (হঠাৎ বৃদ্ধি)
P-তরঙ্গের বেগ ($v_p$) প্রায় ৬.০ কিমি/সেকেন্ড একলাফে ৮.১ কিমি/সেকেন্ড (৩৫% গতি বৃদ্ধি)
গড় গভীরতা সমুদ্রের নিচে ৫–১০ কিমি; মহাদেশীয় সমভূমিতে ৩০–৩৫ কিমি; পর্বতমালার নিচে ৭০ কিমি

৩.৩ বহিঃগুরুমণ্ডল বা ক্রোফেসিমা (CROFESIMA)

মোহো বিযুক্তি থেকে শুরু করে ভূগর্ভের ৭০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে বহিঃগুরুমণ্ডল বলে। এখানকার শিলায় প্রধানত চারটি রাসায়নিক মৌলের আধিক্য দেখা যায়: ক্রোমিয়াম ($\text{Cr}$), লোহা ($\text{Fe}$ / Ferrum), সিলিকন ($\text{Si}$) এবং ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}$)। এই মৌলগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে একে ক্রোফেসিমা (CROFESIMA) বলা হয়।

  • ঘনত্ব: ৩.৪ গ্রাম/ঘনসেমি থেকে ৪.৫ গ্রাম/ঘনসেমি।
  • তাপমাত্রা: ১০০০° সেলসিয়াস থেকে প্রায় ২০০০° সেলসিয়াস।

৩.৪ অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere): পাত সঞ্চালনের ইঞ্জিন

বহিঃগুরুমণ্ডলের ওপরের অংশে ভূপৃষ্ঠের নিচে ১০০ কিমি থেকে ২৫০ কিমি গভীরতায় অবস্থিত বিশেষ নমনীয় স্তরটিকে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere) বলে (গ্রিক শব্দ 'Asthenes' অর্থ দুর্বল বা নমনীয়):

  • ভৌত অবস্থা: এখানে তাপমাত্রা (১০০০°–১৪০০°C) শিলার গলনাঙ্কের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। প্রচণ্ড চাপ ও তাপে এখানকার পেরিডোটাইট শিলা আংশিক গলে গিয়ে (১% থেকে ৫% গলন) থকথকে, সান্দ্র, নমনীয় ও পিচ্ছিল প্লাস্টিকের মতো রূপ ধারণ করে (যেমন নরম মোমবাতি বা পিচ)।
  • নিম্ন বেগ মণ্ডল (Low-Velocity Zone / LVZ): শিলার আংশিক গলনের কারণে এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় ভূকম্পীয় P ও S তরঙ্গের গতি কিছুটা হ্রাস পায়।
  • ম্যাগমার আধার: ভূত্বকে ফাটল সৃষ্টি হলে চাপ কমে যায় এবং এই অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারের নমনীয় শিলা গলে গিয়ে ম্যাগমা তৈরি করে আগ্নেয়গিরি দিয়ে নির্গত হয়।
  • পরিচলন স্রোত ও পাত সঞ্চালন: তেজস্ক্রিয় তাপের প্রভাবে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে চক্রাকার পরিচলন স্রোত (Convection Currents) তৈরি হয়। এই স্রোতের ওপর ভর করে কঠিন অশ্মমণ্ডলের টেকটনিক পাতগুলি কনভেয়ার বেল্টের মতো বছরে ২ থেকে ১০ সেমি গতিতে ভেসে চলে।

৩.৫ রেপেত্তি বিযুক্তি ও অন্তঃগুরুমণ্ডল বা নিফেসিমা (NIFESIMA)

ভূগর্ভের প্রায় ৭০০ কিমি গভীরতায় বহিঃগুরুমণ্ডল এবং অন্তঃগুরুমণ্ডলের মধ্যবর্তী পরিবর্তনকারী সীমারেখাকে রেপেত্তি বিযুক্তি (Repetti Discontinuity) বলা হয়।

রেপেত্তি থেকে শুরু করে ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে অন্তঃগুরুমণ্ডল বলে:

  • রাসায়নিক নাম (NIFESIMA / নিফেসিমা): প্রধান চারটি মৌল—নিকেল ($\text{Ni}$), লোহা ($\text{Fe}$ / Ferrum), সিলিকন ($\text{Si}$) এবং ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}$) নিয়ে গঠিত।
  • ভৌত অবস্থা: সম্পূর্ণ কঠিন। তাপমাত্রা ২,৫০০°–৩,০০০°C হলেও ওপরের প্রায় ১৩.৫ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় প্রচণ্ড চাপের কারণে শিলা গলতে পারে না, কঠিন অবস্থায় থাকে। এখানে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচুর্যময় খনিজ ব্রিজম্যানাইট (Bridgmanite) প্রাধান্য বিস্তার করে।
  • ঘনত্ব: ৪.৫ গ্রাম/ঘনসেমি থেকে বেড়ে তলদেশে ৫.৬ গ্রাম/ঘনসেমিতে পৌঁছায়।

৪. কেন্দ্রমণ্ডল (Core / Barysphere), নিফে ও ভূ-চুম্বকত্ব

৪.১ কেন্দ্রমণ্ডলের পরিমাপ ও উপাদানের অনুপাত

পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা অভ্যন্তরীণ সমকেন্দ্রী গোলকাকার স্তরটিকে কেন্দ্রমণ্ডল (Core) বা ব্যারিফিয়ার (Barysphere / গুরুগোলক) বলা হয়। এটি ভূগর্ভের ২,৯০০ কিমি গভীরতা থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র অর্থাৎ ৬,৩৭১ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত (কেন্দ্রমণ্ডলের মোট ব্যাসার্ধ প্রায় ৩,৪৭১ কিমি)।

  • আয়তন বনাম ভরের অসমতা: কেন্দ্রমণ্ডল পৃথিবীর মোট আয়তনের মাত্র ১৬ শতাংশ দখল করে থাকে, অথচ পৃথিবীর মোট ভরের প্রায় ৩২ শতাংশ (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) এই স্তরে পুঞ্জীভূত! কারণ এখানকার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি।
  • রাসায়নিক উপাদান (NIFE / নিফে): মূলত ভারী ধাতব মৌল নিকেল ($\text{Ni}$) এবং লোহা ($\text{Fe}$ / Ferrum) দ্বারা গঠিত। এর সাথে সামান্য পরিমাণ গন্ধক, সিলিকন ও কার্বন মিশ্রিত রয়েছে।

৪.২ গুটেনবার্গ বিযুক্তি (Gutenberg Discontinuity)

১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মান-আমেরিকান বিজ্ঞানী বেনো গুটেনবার্গ (Beno Gutenberg) ভূগর্ভের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রধান সীমানাটি আবিষ্কার করেন। কঠিন সিলিকেট গুরুমণ্ডল এবং গলিত ধাতব বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী ২,৯০০ কিমি গভীরতায় অবস্থিত সীমারেখাকে গুটেনবার্গ বিযুক্তি বলা হয়।

  • পৃথিবীর সর্বাধিক বৈপরীত্যময় সীমানা: একদিকে কঠিন পাথুরে শিলা ($\rho \approx ৫.৬\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$), অন্যদিকে অত্যন্ত ভারী গলিত তরল লোহা ($\rho \approx ৯.৯\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$)।
  • ভূকম্পীয় তরঙ্গের আচরণ:
    • গৌণ তরঙ্গ (S-তরঙ্গ) সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়: তরল মাধ্যমে কৃন্তন শক্তি শূন্য হওয়ায় ($\mu=০$) S-তরঙ্গ গুটেনবার্গ বিযুক্তি পার হয়ে কেন্দ্রমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে পৃথিবীতে বিশালাকার S-তরঙ্গ ছায়াবলয় তৈরি হয়।
    • প্রাথমিক তরঙ্গ (P-তরঙ্গ) একলাফে কমে যায়: তরল মাধ্যমে প্রবেশ করার সাথে সাথে কৃন্তন প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে P-তরঙ্গের বেগ ১৩.৭ কিমি/সেকেন্ড থেকে সোজা কমে ৮.১ কিমি/সেকেন্ড হয়ে যায় এবং তরঙ্গ খাড়াভাবে ভেতরের দিকে প্রতিসারিত হয়।

৪.৩ বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (Outer Core) ও ভূ-ডায়নামো (Geodynamo)

গুটেনবার্গ বিযুক্তি (২,৯০০ কিমি) থেকে শুরু করে ৫,১৫০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত অংশটি হলো বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল, যা ফুটন্ত তরল লোহা ও নিকেল ধাতুর মহাসাগর:

  • ভৌত পরিমাপ: পুরুত্ব প্রায় ২,২৫০ কিমি; ঘনত্ব ৯.৯ থেকে ১২.২ গ্রাম/ঘনসেমি; তাপমাত্রা ৩৭০০° থেকে ৪৫০০° সেলসিয়াস।
  • ভূ-ডায়নামো ক্রিয়া (Geodynamo Effect): গলিত লোহা হলো বিদ্যুতের সুপরিবাহী। পৃথিবীর দ্রুত অক্ষীয় আবর্তন (Coriolis বল) এবং গভীর অভ্যন্তরীণ তাপের পরিচলন স্রোত তরল ধাতব লোহাকে螺旋াকার বা প্যাঁচানো ঘূর্ণি প্রবাহে আবর্তিত করে। তড়িচ্চুম্বকীয় আবেশের নিয়ম অনুযায়ী, এই চলমান তরল লোহা একটি প্রকাণ্ড ডায়নামোর মতো কাজ করে এবং সৃষ্টি করে পৃথিবীর শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র (Global Magnetic Field)।
  • জীবজগতের জন্য গুরুত্ব: এই চৌম্বক ঢাল (Magnetosphere) সূর্য থেকে ধেয়ে আসা প্রাণঘাতী সৌরঝড় এবং মহাজাগতিক ক্ষতিকর বিকিরণকে মহাশূন্যে বিচ্যুত করে দিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও জলরাশিকে বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করছে।

৪.৪ লেহম্যান বিযুক্তি (Lehmann Discontinuity)

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সমগ্র কেন্দ্রমণ্ডলই হয়তো তরল। কিন্তু ১৯৩৬ সালে ড্যানিশ মহিলা বিজ্ঞানী ইংগে লেহম্যান (Inge Lehmann) নিউজিল্যান্ডের ভূমিকম্পের সিসমোগ্রাম বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে কেন্দ্রমণ্ডলের একেবারে অভ্যন্তরে একটি কঠিন ধাতব গোলক বিদ্যমান। তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল এবং কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের মধ্যবর্তী ৫,১৫০ কিমি গভীরতার সীমারেখাকে লেহম্যান বিযুক্তি বলা হয়।

৪.৫ অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (Inner Core): পৃথিবীর কঠিন ধাতব হৃদয়

লেহম্যান বিযুক্তি (৫,১৫০ কিমি) থেকে পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রবিন্দু (৬,৩৭১ কিমি) পর্যন্ত বিস্তৃত স্তরটি হলো অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল, যার ব্যাসার্ধ প্রায় ১,২২১ কিমি (চাঁদের আকারের প্রায় ৭০%):

  • ভৌত পরিমাপ: ঘনত্ব ১৩.০ থেকে ১৩.৬ গ্রাম/ঘনসেমি; তাপমাত্রা ৫,০০০° থেকে ৬,০০০° সেলসিয়াস (সূর্যের উপরিভাগের সমান তপ্ত!); চাপ >৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (৩৬০ GPa)।
  • অতিতপ্ত অবস্থায়ও লোহা কেন কঠিন? এটি ভূগোলের অন্যতম বিখ্যাত ধাঁধাঁ! সাধারণ চাপে লোহা ১,৫৩৮°C তাপমাত্রাতেই সম্পূর্ণ গলে জল হয়ে যায়। কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্রে সমগ্র গ্রহের পর্বত, সমুদ্র ও পাথরের অসীম ওজনের কারণে সৃষ্ট ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ফলে লোহার পরমাণুগুলি অত্যন্ত আঁটসাঁট স্ফটিকাকার জালকে আবদ্ধ হয়ে যায়। ক্ল্যাপেরন সূত্রানুসারে, এই বিপুল চাপে লোহার গলনাঙ্ক বেড়ে ৬,২০০°C-এরও বেশি হয়ে যায়। যেহেতু কেন্দ্রের প্রকৃত তাপমাত্রা (৫,৫০০°C) সেই বর্ধিত গলনাঙ্কের চেয়ে কম, তাই প্রচণ্ড তাপেও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল সম্পূর্ণ কঠিন স্ফটিকাকার অবস্থায় বিরাজ করে!

৫. ভূকম্পীয় তরঙ্গের প্রতিফলন ও বিযুক্তি রেখাসমূহের তুলনামূলক মূল্যায়ন

৫.১ পাঁচটি প্রধান বিযুক্তি রেখা (C-M-R-G-L সূত্র)

ভূপৃষ্ঠ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ক্রমানুসারে পাঁচটি প্রধান ভূকম্পীয় বিযুক্তি রেখাকে সহজে মনে রাখার জন্য "C-M-R-G-L" সূত্রটি অত্যন্ত জনপ্রিয়:

সূত্রের বর্ণ বিযুক্তি রেখার নাম আবিষ্কারক ও সাল গড় গভীরতা বিভাজনকারী স্তরসমূহ
C কনরাড বিযুক্তি (Conrad) ভিক্টর কনরাড (১৯২৫) ১৫ – ২০ কিমি সিয়াল (SIAL) ও সিমা (SIMA)
M মোহোরোভিসিচ বা মোহো (Moho) আন্দ্রিজা মোহোরোভিসিচ (১৯০৯) ৩০ – ৩৫ কিমি ভূত্বক ও গুরুমণ্ডল ($V_p$ লাফায় ৬.০ $\to$ ৮.১ কিমি/সে)
R রেপেত্তি বিযুক্তি (Repetti) উইলিয়াম রেপেত্তি (১৯৩০) প্রায় ৭০০ কিমি ক্রোফেসিমা ও নিফেসিমা (বহিঃ ও অন্তঃগুরুমণ্ডল)
G গুটেনবার্গ বিযুক্তি (Gutenberg) বেনো গুটেনবার্গ (১৯১৪) ২,৯০০ কিমি গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল (S-তরঙ্গ অবলুপ্ত, $V_p$ হ্রাস পায়)
L লেহম্যান বিযুক্তি (Lehmann) ইংগে লেহম্যান (১৯৩৬) ৫,১৫০ কিমি তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ও কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল

৫.২ পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরসমূহের সম্পূর্ণ তুলনামূলক সারণী

স্তরের নাম গভীরতার বিস্তার ভৌত অবস্থা প্রধান খনিজ ও উপাদান ঘনত্ব (গ্রাম/ঘনসেমি) তাপমাত্রা
সিয়াল (মহাদেশীয় ভূত্বক) ০ – ৩৫ কিমি কঠিন ভঙ্গুর গ্রানাইট ($\text{Si, Al}$) ২.৭ ১৫° – ৫০০°C
সিমা (মহাসাগরীয় ভূত্বক) ৫ – ১০ কিমি কঠিন ভারী ব্যাসাল্ট ($\text{Si, Mg}$) ৩.০ ২০০° – ৭০০°C
অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ১০০ – ২৫০ কিমি নমনীয় অর্ধ-গলিত আংশিক গলিত পেরিডোটাইট ৩.৪ – ৩.৫ ১০০০° – ১৪০০°C
ক্রোফেসিমা (বহিঃগুরুমণ্ডল) ৩৫ – ৭০০ কিমি কঠিন / প্লাস্টিক $\text{Cr, Fe, Si, Mg}$ ৩.৪ – ৪.৫ ১০০০° – ২০০০°C
নিফেসিমা (অন্তঃগুরুমণ্ডল) ৭০০ – ২৯০০ কিমি ঘন কঠিন ব্রিজম্যানাইট ($\text{Ni, Fe, Si, Mg}$) ৪.৫ – ৫.৬ ২০০০° – ৩০০০°C
বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ২৯০০ – ৫১৫০ কিমি ফুটন্ত তরল তরল লোহা ও নিকেল ($\text{NIFE}$) ৯.৯ – ১২.২ ৩৭০০° – ৪৫০০°C
অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল ৫১৫০ – ৬৩৭১ কিমি স্ফটিকাকার কঠিন কঠিন লোহা ও নিকেল ($\text{NIFE}$) ১৩.০ – ১৩.৬ ৫০০০° – ৬০০০°C

৫.৩ ভূকম্পীয় তরঙ্গের ছায়াবলয় ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার প্রমাণ

  • S-তরঙ্গ ছায়াবলয় (১০৫° থেকে ১৮০°): গৌণ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ কেবল কঠিনের মধ্য দিয়ে চলতে পারে, তরলে কৃন্তন শক্তি না থাকায় ($\mu = ০$) তরল মাধ্যমে S-তরঙ্গ চলতে পারে না। ভূমিকম্প কেন্দ্র থেকে ২৯০০ কিমি গভীরে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে আঘাত করার সাথে সাথে সমস্ত S-তরঙ্গ থেমে যায়। ফলে পৃথিবীর উপরিভাগে ১০৫° থেকে ১৮০° পর্যন্ত কোনো প্রত্যক্ষ S-তরঙ্গ পৌঁছায় না। এটি সরাসরি প্রমাণ করে যে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল তরল।
  • P-তরঙ্গ ছায়াবলয় (১০৫° থেকে ১৪২°): প্রাথমিক অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ কঠিন, তরল ও গ্যাস তিনটি মাধ্যমেই চলে। কিন্তু ২৯০০ কিমি গভীরে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে প্রবেশের সময় কৃন্তন গুণাঙ্ক হারানোর কারণে তরঙ্গের বেগ হঠাৎ ১৩.৭ কিমি/সেকেন্ড থেকে কমে ৮.১ কিমি/সেকেন্ড হয়ে যায়। এই প্রচণ্ড বেগ হ্রাসের ফলে তরঙ্গগুলি খাড়াভাবে ভেতরের দিকে প্রতিসারিত বা বেঁকে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের ১০৫° থেকে ১৪২° কৌণিক দূরত্বের বলয়ে কোনো প্রত্যক্ষ P-তরঙ্গ এসে পৌঁছাতে পারে না।

৫.৪ মানবসভ্যতায় ভূ-অভ্যন্তরের অপরিসীম গুরুত্ব

  1. চৌম্বকীয় বর্ম: বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের ডায়নামো ক্রিয়া পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও জলবায়ুকে মহাজাগতিক বিকিরণের হাত থেকে সুরক্ষিত রেখেছে।
  2. খনিজ ও শক্তি সম্পদ: কয়লা, খনিজ তেল, লোহা, সোনা, তামা প্রভৃতি অপরিহার্য সম্পদ ভূত্বকের শিলাস্তর থেকেই আহরিত হয়।
  3. ভূ-তাপীয় শক্তির সম্ভাবনা: ভূগর্ভের তাপ কাজে লাগিয়ে দূষণমুক্ত বিদ্যুৎ ও উত্তাপ উৎপাদন সম্ভব।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

ভূ-তাপীয় নতি সমীকরণ (Geothermal Gradient Formula)
$$G ≈ ০.০৩^/মিটার (উর্ধ্ব ভূত্বকে)$$
এই নিয়মটি কেবল ভূত্বকের ওপরের ১৫ কিমি পর্যন্ত কার্যকর থাকে; আরও গভীরে পরিচলনের কারণে তাপ বৃদ্ধির হার অনেক কমে যায়।
পৃথিবীর গড় ঘনত্ব নির্ণয়ের সমীকরণ (Newton-Cavendish Density)
$$ ≈ ৫.৫১৭ গ্রাম/ঘনসেমি = ৫,৫১৭ কেজি/মিটার^৩$$
১৭৯৮ সালে হেনরি ক্যাভেন্ডিশ প্রথম এই ঘনত্ব সঠিকভাবে পরিমাপ করেন।
প্রাথমিক P-তরঙ্গের বেগ ও স্থিতিস্থাপক গুণাঙ্ক সূত্র
$$v_p ≈ ৬.০ কিমি/সে (ভূত্বক) → ৮.১ (মোহো) → ১৩.৭ (গুরুমণ্ডল)$$
তরলে কৃন্তন শক্তি লোপ পাওয়ায় গুটেনবার্গ বিযুক্তিতে P-তরঙ্গের তীব্র প্রতিসরণ ঘটে।
গৌণ S-তরঙ্গের বেগ ও তরল মাধ্যমের কৃন্তন প্রমাণ
$$v_s = ০ (বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে); v_s ≈ ৩.৫ - ৭.৩ কিমি/সে (কঠিন গুরুমণ্ডলে)$$
এই সমীকরণটি প্রমাণ করে যে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল গলিত তরল অবস্থায় রয়েছে।
স্থৈতিক ভূগর্ভস্থ চাপ নির্ণয় সূত্র (Lithostatic Pressure)
$$P ≈ ১৩.৫ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (২৯০০ কিমিতে); P ≈ ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (কেন্দ্রে)$$
পৃথিবীর কেন্দ্রে এই চাপ ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বেশি হওয়ায় ৬,০০০°C তাপমাত্রাতেও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল কঠিন থাকে।
অ্যাডামস-উইলিয়ামসন ঘনত্ব সমীকরণ
$$(r) = {K} (ভূকম্পীয় পরামিতি)$$
আধুনিক ভূ-পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে এটি স্বীকৃত।
কেন্দ্রমণ্ডল ও গুরুমণ্ডলের আয়তন-ভর অনুপাত
$$ভূত্বক: <১\% আয়তন, ≈ ০.৫\% ভর$$
ধাতব উপাদানের চরম ঘনত্বের কারণেই কেন্দ্রমণ্ডলে এই বিপুল ভর পুঞ্জীভূত।
ক্ল্যাপেরন গলনাঙ্ক বৃদ্ধি সমীকরণ (Clapeyron Equation)
$$T_m(Fe at ৩৬০ GPa) ≈ ৬,২০০^ > T_{actual} (৫,৫০০^)$$
এটি ব্যাখ্যা করে কেন অতিরিক্ত তাপেও পৃথিবীর অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল তরল না হয়ে কঠিন থাকে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
রাশিয়ার কোলা সুপারডিপ বোরহোলটি (SG-3) ১২,২৬২ মিটার (প্রায় ১২.৩ কিমি) গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। যদি ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ১০°C হয় এবং ভূত্বকের তাপীয় বৃদ্ধির হার প্রতি ৩৩ মিটারে ১°C হয়, তবে: (ক) তাত্ত্বিক হিসেবে তলদেশের তাপমাত্রা কত হওয়ার কথা ছিল? এবং (খ) বাস্তবে প্রাপ্ত তাপমাত্রা (১৮০°C) কেন বিজ্ঞানীদের চমকে দিয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. প্রদত্ত মানসমূহ:

  • ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা $T_0 = ১০^\circ\text{C}$
  • খননের গভীরতা $z = ১২,২৬২\text{ মিটার} \approx ১২.২৬২\text{ কিমি}$
  • তাপীয় নতি $= \frac{১^\circ\text{C}}{৩৩\text{ মিটার}}$

২. তাত্ত্বিক তাপমাত্রা গণনা: সাধারণ ভূত্বকীয় নতি অনুসারে:

$$\text{তাপমাত্রা বৃদ্ধি } \Delta T = \frac{১২,২৬২}{৩৩} \approx ৩৭১.৫^\circ\text{C}$$

কিন্তু কোলা উপদ্বীপ একটি অতি প্রাচীন ও শীতল প্রিক্যামব্রিয়ান শীল্ড অঞ্চল হওয়ায় বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন সেখানকার নতি হবে অনেক কম (প্রতি কিমিতে মাত্র ৭-৮°C) এবং তলদেশের তাপমাত্রা ১০০°C-এর বেশি হবে না।

৩. বাস্তব পরিস্থিতি ও বিস্ময়ের কারণ: বাস্তবে ১২ কিমি নিচে তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০° সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। এই চরম তাপে ভূগর্ভের জল ও খনিজের মিথস্ক্রিয়ায় পাথর স্পঞ্জের মতো নমনীয় হয়ে ওঠে এবং ড্রিলিং বিটগুলো প্লাস্টিকের মতো গলে ও বেঁকে যেতে থাকে। ফলে ১৯৯২ সালে খননকাজ চিরতরে বন্ধ করতে বাধ্য হন বিজ্ঞানীরা।

উত্তর: (ক) প্রাচীন শীল্ডের জন্য পূর্বাভাস ছিল প্রায় ১০০°C। (খ) কিন্তু বাস্তবে ১৮০°C তাপমাত্রা ধরা পড়ায় প্রমাণিত হয় যে ভূগর্ভে তেজস্ক্রিয় তাপ নির্গমন পূর্ব ধারণার চেয়ে অনেক বেশি!

উদাহরণ 2
মানুষের দ্বারা খনন করা সর্বকালের গভীরতম গর্ত কোলা বোরহোল (১২.২৬২ কিমি) পৃথিবীর সমগ্র ব্যাসার্ধের (৬,৩৭১ কিমি) শতকরা কত ভাগ? এই অনুপাত থেকে ভূগর্ভ সম্পর্কে আমাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান সম্পর্কে কী উপলব্ধি করা যায়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. প্রদত্ত মান:

  • কোলা বোরহোলের গভীরতা $d_{\text{Kola}} = ১২.২৬২\text{ কিমি}$
  • পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ $R_{\oplus} = ৬,৩৭১\text{ কিমি}$

২. শতকরা হার গণনা:

$$\text{শতকরা হার} = \left(\frac{১২.২৬২}{৬,৩৭১}\right) \times ১০০\% \approx \mathbf{০.১৯২\%}$$

৩. ভূতাত্ত্বিক উপলব্ধি:

  • মানুষ পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত দূরত্বের এক শতাংশের পাঁচ ভাগের এক ভাগ (০.১৯%) মাত্র প্রত্যক্ষভাবে স্পর্শ করতে পেরেছে!
  • গভীরতম এই গর্তটি মহাদেশীয় ভূত্বকের (৩৫ কিমি) অর্ধেকেরও কম এবং মোহো বিযুক্তি বা গুরুমণ্ডলে পৌঁছানোর ধারেকাছেও যেতে পারেনি।

উত্তর: মানুষ পৃথিবীর মাত্র ০.১৯% গভীরতা খনন করতে পেরেছে; অর্থাৎ ভূগর্ভের ৯৯.৮% জ্ঞানই পরোক্ষ ভূকম্পীয় তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।

উদাহরণ 3
পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডল গ্রহের মোট আয়তনের মাত্র ১৬% অধিকার করে থাকলেও, কেন এটি পৃথিবীর মোট ভরের প্রায় ৩২% (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) ধারণ করে? মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস ও ঘনত্বের সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. আয়তন ও ভরের অনুপাত:

  • আয়তনের ভাগ: $\approx ১৬.২\%$
  • ভরের ভাগ: $\approx ৩১.৫\%$

২. মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস ও ঘনত্বের বৈসাদৃশ্য:

  • ৪৬০ কোটি বছর আগে তরল অবস্থায় মহাকর্ষের টানে সবচেয়ে ভারী ধাতু লোহা ও নিকেল কেন্দ্রে ডুবে যায়।
  • ভূত্বকের শিলার গড় ঘনত্ব মাত্র ২.৮ গ্রাম/ঘনসেমি এবং গুরুমণ্ডলের গড় ঘনত্ব ৪.৫ গ্রাম/ঘনসেমি।
  • কিন্তু কেন্দ্রমণ্ডলের ঘনত্ব চরম চাপে সংকুচিত হয়ে ৯.৯ থেকে ১৩.৬ গ্রাম/ঘনসেমি পর্যন্ত পৌঁছায়—যা ভূত্বকের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি ভারী!

৩. গাণিতিক যুক্তি:

$$\text{ভর} = \text{ঘনত্ব} \times \text{আয়তন}$$

যেহেতু কেন্দ্রমণ্ডলের ঘনত্ব পৃথিবীর সামগ্রিক গড় ঘনত্বের (৫.৫ গ্রাম/ঘনসেমি) প্রায় দ্বিগুণ, তাই মাত্র ১৬% আয়তন হলেও তা প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ৩২% ভর ধারণ করে।

উত্তর: চরম ঘনত্ব এবং লোহা-নিকেলের অতি-সংকুচিত উপস্থিতির কারণেই কেন্দ্রমণ্ডল স্বল্প আয়তনে গ্রহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভর ধরে রেখেছে।

উদাহরণ 4
মহাদেশীয় ভূত্বকের নিচে প্রায় ৩৫ কিমি গভীরতায় মোহোরোভিসিচ বিযুক্তি রেখায় প্রাথমিক তরঙ্গের বেগ (Vp) হঠাৎ ৬.০ কিমি/সেকেন্ড থেকে বেড়ে ৮.১ কিমি/সেকেন্ড হয়ে যায়। গণনা করো: (ক) বেগের শতকরা বৃদ্ধির হার কত? এবং (খ) শিলাস্তরের কোন রূপান্তরের কারণে এই আকস্মিক বৃদ্ধি ঘটে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. প্রদত্ত মানসমূহ:

  • ভূত্বকে বেগ $v_1 = ৬.০\text{ কিমি/সেকেন্ড}$
  • গুরুমণ্ডলে বেগ $v_2 = ৮.১\text{ কিমি/সেকেন্ড}$

২. শতকরা বৃদ্ধির হার গণনা:

$$\text{বেগ বৃদ্ধি } \Delta v = ৮.১ - ৬.০ = ২.১\text{ কিমি/সেকেন্ড}$$

$$\text{শতকরা বৃদ্ধি} = \left(\frac{২.১}{৬.০}\right) \times ১০০\% = \mathbf{৩৫.০\%}$$

৩. ভূতাত্ত্বিক কারণ:

  • তরঙ্গের গতিবেগ সূত্র: $v_p = \sqrt{(K + \frac{4}{3}\mu)/\rho}$।
  • মোহো বিযুক্তির ওপরে ভূত্বক গঠিত ব্যাসাল্ট ও গ্রানাইট শিলা দ্বারা (ঘনত্ব ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি)।
  • মোহো অতিক্রম করলেই শুরু হয় অতি-ক্ষারকীয় পেরিডোটাইট শিলা (ঘনত্ব ৩.৪ গ্রাম/ঘনসেমি)।
  • পেরিডোটাইটের অলিভিন ও পাইরক্সিন স্ফটিকের চরম স্থিতিস্থাপক দৃঢ়তা ($K$ ও $\mu$) শিলার সামান্য ঘনত্ব বৃদ্ধির চেয়ে বহুগুণ বেশি হওয়ায় তরঙ্গের বেগ একলাফে ৩৫% বৃদ্ধি পায়।

উত্তর: (ক) বেগ বৃদ্ধি পায় ঠিক ৩৫.০%। (খ) ভূত্বকের ব্যাসাল্ট শিলা থেকে গুরুমণ্ডলের ঘন পেরিডোটাইট শিলায় উত্তরণের ফলেই এই উল্লম্ফন ঘটে।

উদাহরণ 5
গুরুমণ্ডলের তলদেশে ২,৯০০ কিমি গভীরতায় গুটেনবার্গ বিযুক্তি রেখায় ওপরের শিলাস্তরের মোট স্থৈতিক চাপ (Lithostatic Pressure) নির্ণয় করো, যেখানে গুরুমণ্ডলের গড় ঘনত্ব ৪,৫০০ কেজি/মিটার³ এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ g = ১০ মিটার/সেকেন্ড²। বায়ুমণ্ডলীয় চাপের (১ atm ≈ ১০⁵ Pa) সঙ্গে এর তুলনা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. প্রদত্ত মানসমূহ:

  • গভীরতা $z = ২,৯০০\text{ কিমি} = ২.৯ \times ১০^৬\text{ মিটার}$
  • গড় ঘনত্ব $\bar{\rho} = ৪,৫০০\text{ কেজি/মিটার}^৩$
  • অভিকর্ষজ ত্বরণ $g = ১০\text{ মিটার/সেকেন্ড}^২$

২. স্থৈতিক চাপ গণনা:

$$P = \bar{\rho} \cdot g \cdot z$$

$$P = ৪,৫০০ \times ১০ \times (২.৯ \times ১০^৬) = ১.৩০৫ \times ১০^{১১}\text{ প্যাসকেল (Pa)}$$

৩. বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও মেগাবারে রূপান্তর:

$$১\text{ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (atm)} \approx ১০^৫\text{ Pa}$$

$$\text{অনুপাত} = \frac{১.৩০৫ \times ১০^{১১}}{১০^৫} = ১.৩০৫ \times ১০^৬\text{ গুণ}$$

(অর্থাৎ প্রায় ১৩ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বা প্রায় ১৩০ গিগাপ্যাসকেল / ১.৩ মেগাবার)।

উত্তর: গুটেনবার্গ বিযুক্তিতে চাপ ভূপৃষ্ঠের বায়ুমণ্ডলীয় চাপের প্রায় ১৩ লক্ষ গুণ! এই বিপুল চাপের কারণেই ৩,০০০°C তাপমাত্রাতেও গুরুমণ্ডলের নিচের অংশ কঠিন অবস্থায় থাকে।

উদাহরণ 6
বহিঃগুরুমণ্ডল (ক্রোফেসিমা) এবং অন্তঃগুরুমণ্ডলের (নিফেসিমা) মধ্যে গভীরতার বিস্তার, প্রধান রাসায়নিক উপাদান, শিলার ঘনত্ব, প্রধান শিলা এবং ভৌত অবস্থার ভিত্তিতে একটি কাঠামোগত তুলনামূলক সারণী প্রস্তুত করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

একটি প্রামাণ্য পাঠ্যপুস্তকীয় তুলনামূলক সারণী:

১. গভীরতার বিস্তার:

  • ক্রোফেসিমা (বহিঃগুরুমণ্ডল): মোহো বিযুক্তি (৩০–৩৫ কিমি) থেকে ৭০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত।
  • নিফেসিমা (অন্তঃগুরুমণ্ডল): রেপেত্তি বিযুক্তি (৭০০ কিমি) থেকে ২,৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত।

২. প্রধান রাসায়নিক উপাদান:

  • ক্রোফেসিমা: ক্রোমিয়াম ($\text{Cr}$), লোহা ($\text{Fe}$), সিলিকন ($\text{Si}$), ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}$)।
  • নিফেসিমা: নিকেল ($\text{Ni}$), লোহা ($\text{Fe}$), সিলিকন ($\text{Si}$), ম্যাগনেসিয়াম ($\text{Mg}$)।

৩. শিলার ঘনত্ব:

  • ক্রোফেসিমা: ৩.৪ থেকে ৪.৫ গ্রাম/ঘনসেমি।
  • নিফেসিমা: ৪.৫ থেকে ৫.৬ গ্রাম/ঘনসেমি।

৪. প্রধান শিলা ও খনিজ:

  • ক্রোফেসিমা: পেরিডোটাইট শিলা (অলিভিন ও পাইরক্সিন)।
  • নিফেসিমা: ঘন ব্রিজম্যানাইট ও সিলিকেট পেরোভস্কাইট।

৫. ভৌত অবস্থা ও গতিশীলতা:

  • ক্রোফেসিমা: এর মধ্যে ১০০–২৫০ কিমিতে আংশিক গলিত নমনীয় অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার বিদ্যমান যা পাতের সঞ্চালন ঘটায়।
  • নিফেসিমা: সমগ্র অংশটি প্রচণ্ড চাপে নিরেট কঠিন অবস্থায় বিদ্যমান।
উদাহরণ 7
কেন পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল তুলনামূলক কম তাপমাত্রায় (৩৭০০°–৪৫০০°C) গলিত তরল অবস্থায় থাকে, কিন্তু অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল সূর্যের সমান উত্তপ্ত (৫০০০°–৬০০০°C) হওয়া সত্ত্বেও সম্পূর্ণ কঠিন? ক্ল্যাপেরন সূত্রের সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. কেন্দ্রমণ্ডলের আপাত বৈপরীত্য:

  • বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল (৩৭০০°–৪৫০০°C): গলিত তরল।
  • অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল (৫০০০°–৬০০০°C): স্ফটিকাকার কঠিন।
  • বেশি উত্তপ্ত স্তরটি কেন কঠিন থাকে, অথচ কম উত্তপ্ত স্তরটি গলে তরল হয়?

২. ক্ল্যাপেরন সূত্র ও চাপের প্রভাব:

  • পদার্থের গলনাঙ্ক কেবল তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে না, পরিবেষ্টিত চাপের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল: $\frac{dT_m}{dP} = \frac{T_m \Delta V}{L_f}$।
  • লোহা কঠিন অবস্থা থেকে গলে তরল হলে তার আয়তন বৃদ্ধি পায় ($\Delta V > ০$)। ফলে শিলার ওপর বাইরে থেকে চাপ প্রয়োগ করলে তা গলতে বাধা পায় এবং গলনাঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়।

৩. চাপের বৈষম্য ও চূড়ান্ত অবস্থা:

  • বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে চাপ ১৩.৫ থেকে ৩২ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ। এই চাপে লোহার গলনাঙ্ক থাকে প্রায় ৩,৫০০°C। যেহেতু সেখানকার তাপমাত্রা (৪,০০০°C) এই গলনাঙ্কের চেয়ে বেশি, তাই লোহা গলে তরল অবস্থায় ফুটতে থাকে।
  • কিন্তু অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলে সমগ্র গ্রহের ওজনে চাপ পৌঁছে যায় ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বেশি। এই চরম চাপে লোহার গলনাঙ্ক একলাফে বেড়ে ৬,২০০°C-এর বেশি হয়ে যায়!
  • ফলে অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের চরম উত্তাপ (৫,৫০০°C) সত্ত্বেও তা এই বর্ধিত গলনাঙ্ক ছুঁতে পারে না। লোহার পরমাণুগুলি শক্ত খাঁচায় স্ফটিকাকার জালকে আবদ্ধ হয়ে সম্পূর্ণ কঠিন অবস্থায় থাকে।

উত্তর: অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের চরম ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ লোহার গলনাঙ্ককে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও ওপরে তুলে দেয়, যার ফলে চরম উত্তাপেও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল কঠিন থাকে।

উদাহরণ 8
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র থেকে ১০৫° থেকে ১৮০° কৌণিক দূরত্বের মধ্যে S-তরঙ্গ ছায়াবলয় (Shadow Zone) কীভাবে অকাট্যভাবে প্রমাণ করেছিল যে পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল একটি তরল স্তর? রিচার্ড ডিক্সন ওল্ডহ্যামের ১৯০৬ সালের আবিষ্কারের সাপেক্ষে ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. সিসমিক পর্যবেক্ষণ:

  • ভূকম্পীয় তরঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা যায়, উপকেন্দ্র থেকে ১০৫° কৌণিক দূরত্ব পর্যন্ত P ও S উভয় তরঙ্গই বিভিন্ন স্টেশনে রেকর্ড হয়।
  • কিন্তু ১০৫° থেকে ১৮০° কৌণিক দূরত্বের মধ্যে পৃথিবীর কোথাও কোনো প্রত্যক্ষ S-তরঙ্গ ধরা পড়ে না। এই ৪২% অঞ্চলকে S-তরঙ্গ ছায়াবলয় বলে।

২. পদার্থবিজ্ঞানের তরঙ্গ নীতি:

  • গৌণ (S) তরঙ্গ হলো অনুপ্রস্থ কৃন্তন তরঙ্গ (Shear wave)। এর গতিবেগ $v_s = \sqrt{\mu/\rho}$, যেখানে $\mu$ হলো কৃন্তন দৃঢ়তা।
  • তরল ও গ্যাসে কোনো কৃন্তন প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে না ($\mu = ০$)। ফলে তরল মাধ্যমে S-তরঙ্গের বেগ শূন্য হয়ে যায়; অর্থাৎ S-তরঙ্গ তরল মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে না।

৩. ওল্ডহ্যামের আবিষ্কার (১৯০৬):

  • ব্রিটিশ ভূকম্পবিদ আর. ডি. ওল্ডহ্যাম লক্ষ্য করেন যে S-তরঙ্গ কঠিন গুরুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে চলাচল করলেও ২,৯০০ কিমি গভীরে আঘাত করার সাথে সাথে পুরোপুরি থেমে যায়।
  • যেহেতু তরল ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যম S-তরঙ্গকে এভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারে না, তাই ওল্ডহ্যাম দ্বিধাহীনভাবে ঘোষণা করেন যে—২,৯০০ কিমি নিচে অবস্থিত পৃথিবীর বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল একটি গলিত তরল স্তর!

উত্তর: তরলে অনুপ্রস্থ কৃন্তন তরঙ্গ চলতে না পারার অমোঘ নিয়মের কারণেই S-তরঙ্গের বিলুপ্তি তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের অকাট্য প্রমাণ দেয়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সিয়াল (SIAL) এবং সিমা (SIMA)-র ঘনত্ব ও অবস্থান উল্টো লেখা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সিয়াল (গ্রানাইট, ২.৭ গ্রাম/সেমি³) হালকা এবং ওপরে অবস্থান করে। সিমা (ব্যাসাল্ট, ৩.০ গ্রাম/সেমি³) ভারী এবং সিয়ালের নিচে সমুদ্রের তলদেশ গঠন করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

সমগ্র গুরুমণ্ডলকে গলিত তরল ম্যাগমার সাগর মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সমগ্র গুরুমণ্ডল কঠিন সিলিকেট পেরিডোটাইট শিলা দিয়ে গঠিত। কেবল ১০০–২৫০ কিমি গভীরতার অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার স্তরটি সামান্য (১-৫%) আংশিক গলে নমনীয় অবস্থায় থাকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের বেশি তাপমাত্রার কারণে একে তরল মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল সম্পূর্ণ কঠিন স্ফটিকাকার লোহা-নিকেল গোলক। ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের ফলে এর গলনাঙ্ক ৬,২০০°C ছাড়িয়ে যাওয়ায় এটি কঠিন থাকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

গুটেনবার্গ বিযুক্তি এবং মোহো বিযুক্তির অবস্থান গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মোহো থাকে ভূপৃষ্ঠের কাছে ৩০–৩৫ কিমিতে (ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলের মাঝে)। গুটেনবার্গ থাকে অতল গভীরে ২,৯০০ কিমিতে (গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে)।

সাধারণ ভুল ধারণা

কোলা বোরহোল গুরুমণ্ডলে পৌঁছেছিল বলে দাবি করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

কোলা বোরহোলের গভীরতা মাত্র ১২.৩ কিমি, যা মহাদেশীয় ভূত্বকের (৩৫ কিমি) মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। কোনো মানুষ এখনও মোহো বিযুক্তি বা গুরুমণ্ডলে পৌঁছাতে পারেনি।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভূ-তাপীয় নতির সরলরৈখিক বৃদ্ধিকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত টেনে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রতি কিলোমিটারে ৩০°C বৃদ্ধির হার কেবল ভূত্বকের ওপরের ১৫ কিমিতে প্রযোজ্য। গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলে পরিচলনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি দ্রুত হ্রাস পেয়ে কেন্দ্রে ৫০০০°–৬০০০°C-এ দাঁড়ায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

S-তরঙ্গ বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলে যেতে পারে না কেন তার বৈজ্ঞানিক কারণ ভুল লেখা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

S-তরঙ্গ হলো অনুপ্রস্থ কৃন্তন তরঙ্গ (Shear wave)। তরলে কৃন্তন প্রতিরোধ শক্তি শূন্য হওয়ায় ($\mu = ০$) তরল মাধ্যমে অনুপ্রস্থ তরঙ্গ চলা পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে অসম্ভব।

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস ও ভূকম্পীয় বিযুক্তি রেখা

পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস ও ভূকম্পীয় বিযুক্তি রেখা (WBBSE অষ্টম শ্রেণি) পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগের সমকেন্দ্রী স্তরবিন্যাস ভূত্বক, গুরুমণ্ডল (অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার) ও কেন্দ্রমণ্ডলের প্রামাণ্য চিত্র ভূত্বক (CRUST: ০ – ৩৫ কিমি) সিয়াল (SIAL: ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি) ও সিমা (SIMA: ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি) <১% আয়তন | ~০.৫% ভর কনরাড বিযুক্তি (সিয়াল ও সিমা) ⚡ মোহোরোভিসিচ বিযুক্তি (MOHO: ~৩০ – ৩৫ কিমি) | Vp বেগ লাফায় ৬.০ → ৮.১ কিমি/সে বহিঃগুরুমণ্ডল / ক্রোফেসিমা (CROFESIMA: ৩৫ – ৭০০ কিমি) Cr, Fe, Si, Mg | ঘনত্ব: ৩.৪ – ৪.৫ গ্রাম/ঘনসেমি | তাপমাত্রা: ১০০০° – ২০০০°C অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (১০০ – ২৫০ কিমি): নমনীয় পিচ্ছিল স্তর (ম্যাগমার উৎস ও গলন) পরিচলন স্রোত কনভেয়ার বেল্টের মতো কাজ করে পাত সঞ্চালন ঘটায় রেপেত্তি বিযুক্তি (~৭০০ কিমি) | বহিঃ ও অন্তঃগুরুমণ্ডলের সীমারেখা অন্তঃগুরুমণ্ডল / নিফেসিমা (NIFESIMA: ৭০০ – ২৯০০ কিমি) Ni, Fe, Si, Mg | কঠিন পেরিডোটাইট ও ব্রিজম্যানাইট | ঘনত্ব: ৪.৫ – ৫.৬ গ্রাম/ঘনসেমি গুরুমণ্ডল: ~৮৪% আয়তন | ৬৭% ভর চাপ: তলদেশে প্রায় ১৩.৫ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ⚡ গুটেনবার্গ বিযুক্তি (২৯০০ কিমি) | S-তরঙ্গ অবলুপ্ত (μ=০) | গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল / তরল নিফে (NIFE: ২৯০০ – ৫১৫০ কিমি) গলিত তরল লোহা ও নিকেল | ঘনত্ব: ৯.৯ – ১২.২ গ্রাম/ঘনসেমি | তাপমাত্রা: ৩৭০০° – ৪৫০০°C ভূ-ডায়নামো (Geodynamo): তরল লোহার ঘূর্ণন প্রবাহ পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে! S-তরঙ্গ চলাচল করতে পারে না; P-তরঙ্গের বেগ কমে ১৩.৭ → ৮.১ কিমি/সে হয় কেন্দ্রমণ্ডল: ~১৬% আয়তন | ৩২% ভর লেহম্যান বিযুক্তি (৫১৫০ কিমি) | ১৯৩৬ সালে ইংগে লেহম্যান কর্তৃক আবিষ্কৃত অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল / কঠিন নিফে (SOLID NIFE: ৫১৫০ – ৬৩৭১ কিমি) কঠিন স্ফটিকাকার লোহা-নিকেল গোলক | ঘনত্ব: ১৩.০ – ১৩.৬ গ্রাম/ঘনসেমি তাপমাত্রা: ৫০০০° – ৬০০০°C (সূর্যের পৃষ্ঠের সমান!) | চাপ: >৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ প্রচণ্ড ভূগর্ভস্থ চাপের কারণে অতিতপ্ত হলেও লোহা গলতে পারে না, কঠিন থাকে কেন্দ্র: ৬,৩৭১ কিমি ভূকম্পীয় তরঙ্গের বেগ রূপরেখা (Vp ও Vs) তরঙ্গ বেগের পরিবর্তন কঠিন গুরুমণ্ডল ও তরল কেন্দ্রমণ্ডলের প্রমাণ দেয় ০ কিমি (পৃষ্ঠ) ২৯০০ কিমি (গুটেনবার্গ) ৫১৫০ কিমি ৬৩৭১ কিমি গুরুমণ্ডল/কেন্দ্রমণ্ডল P-তরঙ্গ (Vp) হ্রাস পায় ১৩.৭ → ৮.১ S-তরঙ্গ (Vs) তরল কেন্দ্রমণ্ডলে বেগ = ০! P-তরঙ্গ: অনুদৈর্ঘ্য | কঠিন, তরল ও গ্যাস—তিনটি মাধ্যমেই চলে S-তরঙ্গ: অনুপ্রস্থ | শুধুমাত্র কঠিনে চলে (তরল কেন্দ্রমণ্ডলে অবলুপ্ত) পাঁচটি প্রধান বিযুক্তি রেখা (C-M-R-G-L সূত্র) বিযুক্তি রেখা গভীরতা বিভাজনকারী স্তর ১. কনরাড ~১৫ – ২০ কিমি সিয়াল ও সিমা ২. মোহোরোভিসিচ (মোহো) ~৩০ – ৩৫ কিমি ভূত্বক ও গুরুমণ্ডল ৩. রেপেত্তি ~৭০০ কিমি ক্রোফেসিমা ও নিফেসিমা ৪. গুটেনবার্গ ২,৯০০ কিমি গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল ৫. লেহম্যান ৫,১৫০ কিমি বহিঃ ও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল মানব অন্বেষণ বনাম পৃথিবীর সামগ্রিক গভীরতা: • গভীরতম সোনার খনি: মপনেং, দক্ষিণ আফ্রিকা = ৩.৯ কিমি (তাপ: ৬৬°C) • গভীরতম খনন গর্ত: কোলা উপদ্বীপ, রাশিয়া = ১২.২৬ কিমি (তাপ: ১৮০°C) পৃথিবীর মোট ৬,৩৭১ কিমি ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯% প্রত্যক্ষ খনন সম্ভব হয়েছে!

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
পৃথিবীর জন্ম ৪৬০ কোটি বছর আগে; আদিম তরল অবস্থায় মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাসে ভারী লোহা-নিকেল কেন্দ্রে তলিয়ে কেন্দ্রমণ্ডল এবং হালকা সিলিকেট ভেসে উঠে ভূত্বক তৈরি করে।
মূল বিষয় 2
পৃথিবীর গড় ব্যাসার্ধ ৬,৩৭১ কিমি। মানুষের গভীরতম খনন কোলা বোরহোল (১২.৩ কিমি) ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯%, তাই ভূগর্ভের জ্ঞান পরোক্ষ ভূকম্পীয় ও ভূ-চৌম্বকীয় প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল।
মূল বিষয় 3
ভূত্বকে ভূ-তাপীয় নতি প্রতি ৩২-৩৩ মিটারে ১°C বৃদ্ধি পায়; তাপের উৎস আদিম সঞ্চিত তাপ এবং তেজস্ক্রিয় মৌলের বিভাজন। বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণ এর জীবন্ত প্রমাণ।
মূল বিষয় 4
ভূত্বক (০–৩৫ কিমি) সিয়াল (গ্রানাইট, ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি) ও সিমা (ব্যাসাল্ট, ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি) নিয়ে গঠিত, যা কনরাড বিযুক্তি দ্বারা বিভক্ত।
মূল বিষয় 5
মোহোরোভিসিচ (মোহো) বিযুক্তি (৩০–৩৫ কিমি) ভূত্বক ও গুরুমণ্ডলকে পৃথক করে, যেখানে P-তরঙ্গের বেগ ৬.০ থেকে একলাফে ৮.১ কিমি/সেকেন্ডে উন্নীত হয়।
মূল বিষয় 6
গুরুমণ্ডল (৩৫–২৯০০ কিমি, ৮৪% আয়তন) বহিঃগুরুমণ্ডল ক্রোফেসিমা (অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার ১০০–২৫০ কিমি নমনীয় ম্যাগমা স্তর ও পরিচলন স্রোত), রেপেত্তি (৭০০ কিমি) এবং অন্তঃগুরুমণ্ডল নিফেসিমা নিয়ে গঠিত।
মূল বিষয় 7
গুটেনবার্গ বিযুক্তি (২৯০০ কিমি) গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডলের মাঝে অবস্থিত; এখানে তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডলের কারণে S-তরঙ্গ সম্পূর্ণ বন্ধ হয় ও P-তরঙ্গ প্রতিসারিত হয়।
মূল বিষয় 8
লেহম্যান বিযুক্তি (৫১৫০ কিমি) তরল বহিঃকেন্দ্রমণ্ডল ও কঠিন স্ফটিকাকার অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলের সীমারেখা; ৩৬ লক্ষ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের কারণে ৫০০০°–৬০০০°C তাপেও অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডল কঠিন থাকে।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।