১.১ পৃথিবীর তাপীয় উৎপত্তি ও মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস
আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে (4.6 Billion Years Ago) আদিম সৌরজগতের মহাশূন্যে ঘূর্ণায়মান গ্যাসীয় নীহারিকা ও ধূলিকণার মহাকর্ষীয় আকর্ষণে সংকুচিত হয়ে আমাদের পৃথিবীর জন্ম হয়। প্রাথমিক অবস্থায় প্রবল উল্কাপাত, মহাকর্ষীয় চাপ এবং ক্ষণস্থায়ী তেজস্ক্রিয় পদার্থের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে পৃথিবী ছিল একটি ফুটন্ত উত্তপ্ত ও উজ্জ্বল গলিত পিণ্ড (Magma Ocean)।
এই তরল গলিত অবস্থায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী এক বিরাট মহাকর্ষীয় স্তরবিন্যাস (Gravitational Differentiation) ঘটেছিল:
- সবচেয়ে ভারী ও ঘন ধাতব মৌল—প্রধানত লোহা ($\text{Fe}$) এবং নিকেল ($\text{Ni}$)—মহাকর্ষের টানে পৃথিবীর একেবারে কেন্দ্রে তলিয়ে গিয়ে গঠন করে কেন্দ্রমণ্ডল (Core / NIFE)।
- মাঝারি ঘনত্বের লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ সিলিকেট খনিজ কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে মধ্যবর্তী অংশে থিতিয়ে পড়ে এবং সৃষ্টি করে সুবিশাল গুরুমণ্ডল (Mantle)।
- সবচেয়ে হালকা অ্যালুমিনো-সিলিকেট খনিজগুলি (সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম) তরল গলিত পিণ্ডের ওপর ফেনার মতো ভেসে ওঠে এবং ধীরে ধীরে মহাশূন্যে তাপ বিকিরণ করে কঠিন ও শক্ত হয়ে সৃষ্টি করে বহিরাবরণী ভূত্বক (Crust)।
১.২ মানব অন্বেষণের সীমা বনাম পৃথিবীর সামগ্রিক ব্যাসার্ধ
পৃথিবী একটি অভিগত গোলক, যার কেন্দ্র পর্যন্ত গড় দূরত্ব বা ব্যাসার্ধ প্রায় $R_{\oplus} \approx ৬,৩৭১\text{ কিমি}$ (নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ ৬,৩৭৮ কিমি এবং মেরু ব্যাসার্ধ ৬,৩৫৭ কিমি)। এই বিপুল গভীরতার তুলনায় ভূগর্ভে মানুষের প্রত্যক্ষ প্রবেশ অত্যন্ত নগণ্য:
| অন্বেষণের মাইলফলক | সর্বাধিক গভীরতা | ভূগর্ভস্থ পরিবেশ ও তাপমাত্রা | পৃথিবীর সামগ্রিক ব্যাসার্ধের অনুপাত |
|---|---|---|---|
| গভীরতম সোনার খনি (মপনেং খনি, দক্ষিণ আফ্রিকা) | ৩.৯ থেকে ৪.০ কিমি | পাথরের দেওয়ালের তাপমাত্রা ৬৬° সেলসিয়াস; শ্রমিকদের বাঁচিয়ে রাখতে ওপর থেকে অবিরাম বরফের জল পাম্প করে বাতাস ঠান্ডা রাখতে হয়। | পৃথিবীর গভীরতার মাত্র ০.০৬%। |
| গভীরতম কৃত্রিম গর্ত (কোলা সুপারডিপ বোরহোল, রাশিয়া) | ১২,২৬২ মিটার (প্রায় ১২.৩ কিমি) | ১৯৭০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ২৪ বছর ধরে খোঁড়া হয়। ১২ কিমি নিচে তাপমাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে ১৮০°C-এ পৌঁছায় এবং পাথর নমনীয় হয়ে ড্রিল পাইপ বেঁকে যাওয়ায় খনন কাজ চিরতরে বন্ধ হয়। | পৃথিবীর মোট ৬,৩৭১ কিমি ব্যাসার্ধের মাত্র ০.১৯%! |
১.৩ ভূ-অভ্যন্তর জানার প্রত্যক্ষ বনাম পরোক্ষ উৎস
যেহেতু মানুষ ১২.৩ কিলোমিটারের বেশি নিচে যেতে পারেনি, তাই ভূগর্ভের গঠন জানতে বিজ্ঞানীরা দুটি ভিন্ন ধারার বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করেন:
- প্রত্যক্ষ উৎস (Direct Sources):
- ভূপৃষ্ঠের শিলা ও গভীর খনন: খনির ভেতর থেকে এবং সামুদ্রিক ড্রিলিং থেকে সংগৃহীত প্রত্যক্ষ শিলাখণ্ড।
- অগ্ন্যুৎপাত ও জেনোলিথ (Xenoliths): আগ্নেয়গিরির মাধ্যমে ভূগর্ভের ১০০–২০০ কিমি গভীর থেকে উঠে আসা লাভা এবং আস্ত ম্যান্টল শিলার টুকরো (যেমন হীরকযুক্ত কিম্বারলাইট পাইপ)।
- পরোক্ষ উৎস (Indirect Sources):
- ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient): ভূগর্ভে তাপমাত্রা, চাপ ও ঘনত্বের নিয়মিত বৃদ্ধি।
- পৃথিবীর গড় ঘনত্ব গণনা: আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রানুসারে পৃথিবীর সামগ্রিক গড় ঘনত্ব হলো ৫.৫১৭ গ্রাম/ঘনসেমি। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সিয়াল শিলার ঘনত্ব মাত্র ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি হওয়ায় এটি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করে যে ভূগর্ভের কেন্দ্রভাগ অবশ্যই অত্যন্ত ভারী পদার্থে (১০–১৩ গ্রাম/ঘনসেমি) তৈরি।
- উল্কাখণ্ড (Meteorites): সৌরজগতে ভাসমান উল্কাগুলি পৃথিবীর সমসময়ে তৈরি হয়েছিল; লোহা-নিকেল নির্মিত ধাতব উল্কাগুলি পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডলের প্রত্যক্ষ প্রতিরূপ।
- ভূ-চৌম্বক ক্ষেত্র (Geomagnetism): পৃথিবীর চৌম্বক ঢাল প্রমাণ করে যে ভূগর্ভের কেন্দ্রস্থলে পরিবাহী গলিত ধাতব তরলের ঘূর্ণন ঘটছে।
- ভূকম্পীয় তরঙ্গ (Seismic Waves): সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম; ভূমিকম্পের P ও S তরঙ্গের গতিবিধি ভূগর্ভের ভেতরের স্তর ও তরল অবস্থা এক্স-রে এর মতো নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে।
১.৪ ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient) ও ভূগর্ভস্থ তাপের উৎস
ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূগর্ভের ভেতরের দিকে গভীরতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রতি একক দূরত্বে তাপমাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পায়, তাকে ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient) বলে। সাধারণ মহাদেশীয় ভূত্বকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার হলো:
$$\text{ভূ-তাপীয় নতি} \approx \text{প্রতি ৩২ – ৩৩ মিটার গভীরতায় } ১^\circ\text{ সেলসিয়াস} \quad (\approx \text{প্রতি কিলোমিটারে } ৩০^\circ\text{C})$$ভূগর্ভের তাপের প্রধান উৎসসমূহ:
- আদিম সঞ্চিত তাপ (Primordial Heat): পৃথিবী সৃষ্টির সময়কার প্রচণ্ড সংঘর্ষ ও সংকোচনের ফলে উৎপন্ন তাপ, যা ওপরের কঠিন শিলার আবরণের কারণে পুরোপুরি বাইরে বেরিয়ে যেতে পারেনি।
- তেজস্ক্রিয় পদার্থের ভাঙনজনিত তাপ (Radioactive Decay): ভূগর্ভের শিলায় অবস্থিত ইউরেনিয়াম ($^{238}\text{U}$), থোরিয়াম ($^{232}\text{Th}$) ও পটাশিয়াম ($^{40}\text{K}$) প্রভৃতি তেজস্ক্রিয় মৌলগুলির স্বতঃস্ফূর্ত পরমাণু বিভাজন থেকে ক্রমাগত বিপুল তাপ নির্গত হচ্ছে।
- অভ্যন্তরীণ স্ফটিকীভবনের সুপ্ততাপ: তরল লোহা জমে কঠিন অন্তঃকেন্দ্রমণ্ডলে পরিণত হওয়ার সময় মুক্ত হওয়া তাপ।
স্মরণীয় সত্য: যদি প্রতি কিলোমিটারে ৩০°C বৃদ্ধির হার কেন্দ্র পর্যন্ত সমভাবে বজায় থাকত, তবে পৃথিবীর কেন্দ্রে তাপমাত্রা হতো প্রায় ২ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াস! কিন্তু বাস্তবে ভূত্বকের নিচে এই বৃদ্ধির হার দ্রুত কমে যায় এবং পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলের তাপমাত্রা প্রায় ৫,০০০° থেকে ৬,০০০° সেলসিয়াসে স্থির থাকে।
১.৫ উষ্ণ প্রস্রবণ ও গিজার: ভূগর্ভস্থ তাপের জীবন্ত নিদর্শন
বৃষ্টির জল মাটির ফাটল দিয়ে নিচে নেমে যখন উত্তপ্ত শিলাস্তরের সংস্পর্শে আসে, তখন তা ফুটতে শুরু করে এবং বাষ্পীভূত হয়:
- উষ্ণ প্রস্রবণ (Hot Springs): ফুটন্ত গরম জল যখন স্বাভাবিকভাবে ভূত্বকের দুর্বল ফাটল দিয়ে অবিরাম বাইরে বেরিয়ে আসে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বিখ্যাত বক্রেশ্বর (Bakreshwar) উষ্ণ প্রস্রবণ এর অন্যতম উদাহরণ (যেখানে অগ্নি কুণ্ডের তাপমাত্রা প্রায় ৮০°C এবং এর জলে গন্ধক ও তেজস্ক্রিয় রেডন গ্যাস দ্রবীভূত থাকে)। এছাড়া হিমাচল প্রদেশের মণিকরণ ও বিহারের রাজগিরেও উষ্ণ প্রস্রবণ রয়েছে।
- গিজার (Geyser): ভূগর্ভের অতল গহ্বরে অতি-উত্তপ্ত জল ও বাষ্প প্রচণ্ড বাষ্পচাপের সৃষ্টি করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর ফোয়ারার মতো গর্জন করে আকাশে উৎক্ষিপ্ত হলে তাকে গিজার বলে (যেমন আমেরিকার ইয়োলোস্টোন পার্কের ওল্ড ফেইথফুল)।