১.১ সত্যাগ্রহের দর্শন: সত্য, অহিংসা ও আত্মিক শক্তির সংগ্রাম
১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই দশকের বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সফল সংগ্রাম শেষ করে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন (এই দিনটি স্মরণে প্রতি বছর প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালিত হয়)।
ভারতে এসে তিনি যে নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, তার নাম 'সत्याগ্রহ' (সত্য + আগ্রহ)। গান্ধীজির মতে সত্যাগ্রহ কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ বা দুর্বল মানুষের অস্ত্র নয়; এটি হলো পরম 'আত্মিক বল' (Soul-Force)। সত্যাগ্রহের প্রধান তিনটি স্তম্ভ ছিল:
- পরম অহিংসা (Ahimsa): অহিংসা কাপুরুষতা নয়; কোনো পরিস্থিতিতেই শত্রুর প্রতি হিংসা বা বিদ্বেষভাব পোষণ না করে অন্যায়কে প্রতিরোধ করার অসীম সৎসাহস।
- আত্মপীড়নের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা (Truth through Self-Suffering): শত্রুকে আঘাত না করে নিজেই দুঃখ-কষ্ট বরণ করে প্রতিপক্ষের হৃদয় ও বিবেককে জাগ্রত করা।
- অন্যায়ের সঙ্গে অসহযোগ: অন্যায্য আইন মানতে অস্বীকার করা, কারণ জনগণের সম্মতির ওপরই যেকোনো স্বৈরাচারী শাসন টিকে থাকে।
রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের উপদেশে তিনি প্রথম এক বছর তৃতীয় শ্রেণির রেলগাড়িতে চেপে সমগ্র ভারত ঘুরে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন।
১.২ চম্পারণ নীল সত্যাগ্রহ (১৯১৭): ভারতীয় মাটিতে গান্ধীজির প্রথম বিজয়
১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণ জেলার স্থানীয় কৃষক রাজকুমার শুক্ল-র আমন্ত্রণে গান্ধীজি সেখানে পৌঁছান।
সেখানে ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা কৃষকদের ওপর কুখ্যাত তিনকাঠিয়া প্রথা (Tinkathia System) চাপিয়ে রেখেছিল। এই নিয়ম অনুসারে প্রতি বিঘার (২০ কাঠার) মধ্যে সবচেয়ে উর্বর ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে নীল চাষ করতে হতো। উনিশ শতকের শেষে জার্মান কৃত্রিম নীল আবিষ্কারের ফলে বিশ্ববাজারে নীলের দাম পড়ে গেলে নীলকররা কৃষকদের চুক্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য চড়া হারে বেআইনি কর (তাওয়ান ও শারাবেশি) দাবি করতে থাকে।
গান্ধীজি চম্পারণে পা রাখলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে অবিলম্বে জেলা ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ দেন। গান্ধীজি শান্তভাবে সেই আদেশ অমান্য করে বলেন যে তিনি বিবেকের উচ্চতর নির্দেশ পালন করছেন। এটিই ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডে গান্ধীজির প্রথম প্রকাশ্য আইন অমান্য।
সরকার বাধ্য হয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার অন্যতম সদস্য ছিলেন গান্ধীজি। কমিশনের সুপারিশে তিনকাঠিয়া প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং নীলকররা আদায় করা বেআইনি অর্থের ২৫ শতাংশ ফেরত দিতে বাধ্য হয়। চম্পারণের সাফল্য গান্ধীজিকে কৃষকসমাজের প্রধান নেতায় পরিণত করে।
১.৩ আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট ও খেড়া কৃষক সত্যাগ্রহ (১৯১৮)
১৯১৮ সালের শুরুতে গুজরাটে আরও দুটি সফল স্থানীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মহাত্মা গান্ধী:
আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট (মার্চ ১৯১৮)
কারণ: প্লেগ মহামারী কেটে যাওয়ার পর সুতি বস্ত্রকল মালিকরা 'প্লেগ বোনাস' বন্ধ করতে চাইলে শ্রমিকরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ৫০% মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানায়। মালিকরা কেবল ২০% দিতে রাজি হয়।
গান্ধীজির ভূমিকা: গান্ধীজি শ্রমিকদের ৩৫% মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট করতে বলেন। শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে তিনি ভারতে তাঁর প্রথম অনশন শুরু করেন। তিন দিনের মাথায় মালিকপক্ষ দাবি মেনে ৩৫% মজুরি বৃদ্ধি মঞ্জুর করে।
খেড়া সত্যাগ্রহ (মার্চ–জুন ১৯১৮)
কারণ: ভয়াবহ খরার কারণে খেড়া জেলায় ফসলের উৎপাদন স্বাভাবিকের এক-চতুর্থাংশের নিচে নেমে যায়। রাজস্ব আইনানুযায়ী খাজনা সম্পূর্ণ মকুব হওয়ার কথা থাকলেও ঔপনিবেশিক সরকার জোরপূর্বক খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের গবাদিপশু ও জমি ক্রোক করতে থাকে।
ফলাফল: তরুণ আইনজীবী বল্লভভাই প্যাটেল-কে সঙ্গে নিয়ে গান্ধীজি কৃষকদের অহিংসভাবে খাজনা বন্ধ করতে বলেন। সরকার নতিস্বীকার করে নির্দেশ দেয় যে কেবল সমর্থ কৃষকদের থেকেই খাজনা নেওয়া হবে।
এই তিন আন্দোলনের মাধ্যমে রাজেন্দ্র প্রসাদ, জে.বি. কৃপালিনী, মহাদেব দেশাই এবং সর্দার প্যাটেলের মতো বিশ্বস্ত সহকর্মীরা গান্ধীজির নেতৃত্বে জাতীয় মঞ্চে উঠে আসেন।
১.৪ রাওলাট আইন (১৯১৯): ঔপনিবেশিক কালাকানুন ও দেশব্যাপী সত্যাগ্রহ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়রা রক্ত ও অর্থ দিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করেছিল এই আশায় যে যুদ্ধের পর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। কিন্তু পরিবর্তে ব্রিটিশ সরকার স্যার সিডনি রাওলাটের কমিটির সুপারিশে প্রণয়ন করে কুখ্যাত রাওলাট আইন (মার্চ ১৯১৯)।
এই আইনের মূল স্বৈরাচারী ধারাগুলি ছিল:
- সন্দেহের বশে যেকোনো ভারতীয়কে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে।
- কোনো বিচার বা প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক বন্দিকে ২ বছর পর্যন্ত জেলে আটকে রাখা যাবে।
- বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গোপনে বিচার হবে এবং রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কোনো অধিকার থাকবে না। অর্থাৎ: 'ন দলিল, ন অকিল, ন আপিল'।
গান্ধীজি রাওলাট আইনকে 'কালাকানুন' আখ্যা দেন এবং ৬ এপ্রিল ১৯১৯ দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালনের ডাক দেন। এটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সর্বভারতীয় সমন্বিত গণপ্রতিবাদ।
১.৫ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৩ এপ্রিল ১৯১৯) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড বর্জন
পাঞ্জাবের অমৃতসরে রাওলাটবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ১০ এপ্রিল জনপ্রিয় দুই নেতা—ডাঃ সইফুদ্দিন কিচলু ও ডাঃ সত্যপাল-কে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠায়।
১৩ এপ্রিল ১৯১৯ বৈশাখী উৎসবের দিন প্রায় ১০,০০০ নিরীহ মানুষ অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ ময়দানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সমবেত হন। মাঠটি ছিল চারদিকে উঁচু প্রাচীর ঘেরা এবং ভেতরে ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য কেবল একটি অতি সরু গলি ছিল।
সামরিক শাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার ৯০ জন ব্রিটিশ ও গোর্খা সৈন্য নিয়ে একমাত্র নির্গমন পথটি অবরুদ্ধ করেন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই নিরস্ত্র ও বন্দি জনতার ওপর নির্বিচারে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। টানা ১০ মিনিট ধরে ১,৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়।
নির্মম নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খতিয়ান
সরকারি হান্টার কমিশন নিহতের সংখ্যা মাত্র ৩৭৯ বললেও কংগ্রেসের পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যর তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ১,০০০-এর বেশি নিরীহ মানুষ নিহত এবং ১,৫০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। আত্মরক্ষার্থে বহু মানুষ মাঠের পাতকুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
এই পৈশাচিক বর্বরতার প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালের ৩১ মে বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে এক ঐতিহাসিক চিঠি পাঠিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া 'নাইটহুড' (Knighthood) উপাধি ত্যাগ করেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:
"The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of those of my countrymen who, for their so-called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings."
জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তপাত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত্তিকে চিরতরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং দেশবাসীকে অসহযোগের মহাসংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।