Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 7
আনুমানিক সময়: ৫০ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবই 'অতীত ও ঐতিহ্য'-এর সপ্তম অধ্যায় 'ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন' (Ideals and Evolution of India's National Movement)-এর সম্পূর্ণ মাস্টার স্টাডি মডিউলে স্বাগত। এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে কীভাবে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে আবেদন-নিবেদনের গণ্ডি পেরিয়ে এবং চরমপন্থার তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য, সর্বব্যাপী গণসংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল।১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সংগ্রাম শেষ করে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ভারতে প্রত্যাবর্তন জাতীয় রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের পরামর্শে দেশ ভ্রমণের পর গান্ধীজি 'সত্যাগ্রহ'—সত্য ও অহিংসার আত্মিক শক্তিভিত্তিক অভিনব সংগ্রামপদ্ধতি—প্রয়োগ করেন। বিহারের চম্পারণের নীল সত্যাগ্রহ (১৯১৭), গুজরাটের আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট (১৯১৮) এবং খেড়া কৃষক আন্দোলন (১৯১৮) সাধারণ দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের প্রথমবার জাতীয় আন্দোলনের সম্মুখভাগে এনে দাঁড় করায়।প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুখ্যাত রাওলাট আইন (১৯১৯)—'ন দলিল, ন অকিল, ন আপিল'—এবং ১৩ এপ্রিলের পৈশাচিক জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতীয়দের চৈতন্যে চরম আঘাত হানে। এর প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রাজকীয় 'নাইটহুড' (Knighthood) উপাধি বর্জন করেন। এরপরই মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন—অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন (১৯২০–১৯২২)। বিলিতি পণ্য ও আদালত বর্জন, জাতীয় শিক্ষা এবং খাদি ও চরকার প্রচারে সমগ্র দেশ জেগে ওঠে। কিন্তু ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২-এ উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় উত্তেজিত জনতার থানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গান্ধীজি আকস্মিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করলে জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু প্রতিষ্ঠা করেন স্বরাজ্য দল (১৯২৩) এবং বাংলায় স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩)।একই সাথে সূচনা ঘটে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের। উত্তর ভারতে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ এবং সুখদেবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)। কাকোরি ট্রেন ডাকাতি (১৯২৫), সন্ডার্স হত্যা (১৯২৮) এবং কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ (১৯২৯)-এর মাধ্যমে তাঁরা প্রচার করেন সাম্যবাদী বিপ্লবের আদর্শ। ৬৩ দিন অনশনের পর শহীদ হন যতীন দাস। বাংলায় মাস্টারদা সূর্য সেন-এর নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সংঘটিত হয় কিংবদন্তি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও জালালাবাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যেখানে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তর মতো নারীরা অস্ত্র হাতে সম্মুখসমরে বীরত্ব প্রদর্শন করেন।১৯২৯-এর ঐতিহাসিক লাহোর কংগ্রেসে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে গৃহীত হয় 'পূর্ণ স্বরাজ' (Purna Swaraj)-এর প্রস্তাব এবং ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধীজির ঐতিহাসিক ২৪০ মাইলের ডান্ডি পদযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০–১৯৩৪)। সীমান্তের বাদশা খান (সীমান্ত গান্ধী)-র খোদাই খিদমতগার থেকে শুরু করে মেদিনীপুরের উপকূলীয় লবণ আন্দোলন—দেশজুড়ে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটকালে ১৯৪২-এর আগস্টে গান্ধীজির অবিস্মরণীয় মন্ত্র 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' (Do or Die)-র আহ্বানে শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। মেদিনীপুরের তমলুকে গঠিত হয় স্বাধীন সমান্তরাল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার এবং তেরঙ্গা হাতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ৭৩ বছরের বীরাঙ্গনা বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা ('গান্ধীবুড়ি')। পরিশেষে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)-এর 'দিল্লি চলো' সামরিক অভিযান, লালকেল্লার ঐতিহাসিক বিচার এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ (RIN Mutiny) ব্রিটিশ শাসনের সামরিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট এনে দেয় ভারতবর্ষের চিরকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

কীভাবে কোটি কোটি নিরস্ত্র ভারতীয় কৃষক, তাঁতি, ছাত্র ও সাধারণ নারী একজোট হয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন? ডান্ডির সমুদ্রতীরে গান্ধীজির একমুঠো লবণ আইন ভাঙা থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল, মেদিনীপুরে তিনটে গুলি বুকে নিয়ে তেরঙ্গা উঁচিয়ে ধরা মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মবলিদান থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের 'দিল্লি চলো' রণহুঙ্কার—জানুন সেই রক্তস্নাত আদর্শ ও বিবর্তনের অবিনশ্বর ইতিহাস।

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যবই 'অতীত ও ঐতিহ্য'-এর সপ্তম অধ্যায় 'ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন' (Ideals and Evolution of India's National Movement)-এর সম্পূর্ণ মাস্টার স্টাডি মডিউলে স্বাগত। এই অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে কীভাবে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে আবেদন-নিবেদনের গণ্ডি পেরিয়ে এবং চরমপন্থার তাত্ত্বিক স্তর অতিক্রম করে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন এক অপ্রতিরোধ্য, সর্বব্যাপী গণসংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল।

১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সংগ্রাম শেষ করে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ভারতে প্রত্যাবর্তন জাতীয় রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের পরামর্শে দেশ ভ্রমণের পর গান্ধীজি 'সত্যাগ্রহ'—সত্য ও অহিংসার আত্মিক শক্তিভিত্তিক অভিনব সংগ্রামপদ্ধতি—প্রয়োগ করেন। বিহারের চম্পারণের নীল সত্যাগ্রহ (১৯১৭), গুজরাটের আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট (১৯১৮) এবং খেড়া কৃষক আন্দোলন (১৯১৮) সাধারণ দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিকদের প্রথমবার জাতীয় আন্দোলনের সম্মুখভাগে এনে দাঁড় করায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কুখ্যাত রাওলাট আইন (১৯১৯)—'ন দলিল, ন অকিল, ন আপিল'—এবং ১৩ এপ্রিলের পৈশাচিক জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ভারতীয়দের চৈতন্যে চরম আঘাত হানে। এর প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রাজকীয় 'নাইটহুড' (Knighthood) উপাধি বর্জন করেন। এরপরই মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন—অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন (১৯২০–১৯২২)। বিলিতি পণ্য ও আদালত বর্জন, জাতীয় শিক্ষা এবং খাদি ও চরকার প্রচারে সমগ্র দেশ জেগে ওঠে। কিন্তু ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২-এ উত্তরপ্রদেশের চৌরিচৌরায় উত্তেজিত জনতার থানা পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় গান্ধীজি আকস্মিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করলে জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু প্রতিষ্ঠা করেন স্বরাজ্য দল (১৯২৩) এবং বাংলায় স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩)।

একই সাথে সূচনা ঘটে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গের। উত্তর ভারতে ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ এবং সুখদেবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)। কাকোরি ট্রেন ডাকাতি (১৯২৫), সন্ডার্স হত্যা (১৯২৮) এবং কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ (১৯২৯)-এর মাধ্যমে তাঁরা প্রচার করেন সাম্যবাদী বিপ্লবের আদর্শ। ৬৩ দিন অনশনের পর শহীদ হন যতীন দাস। বাংলায় মাস্টারদা সূর্য সেন-এর নেতৃত্বে ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সংঘটিত হয় কিংবদন্তি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও জালালাবাদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যেখানে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তর মতো নারীরা অস্ত্র হাতে সম্মুখসমরে বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

১৯২৯-এর ঐতিহাসিক লাহোর কংগ্রেসে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে গৃহীত হয় 'পূর্ণ স্বরাজ' (Purna Swaraj)-এর প্রস্তাব এবং ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধীজির ঐতিহাসিক ২৪০ মাইলের ডান্ডি পদযাত্রার মাধ্যমে শুরু হয় আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০–১৯৩৪)। সীমান্তের বাদশা খান (সীমান্ত গান্ধী)-র খোদাই খিদমতগার থেকে শুরু করে মেদিনীপুরের উপকূলীয় লবণ আন্দোলন—দেশজুড়ে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সংকটকালে ১৯৪২-এর আগস্টে গান্ধীজির অবিস্মরণীয় মন্ত্র 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' (Do or Die)-র আহ্বানে শুরু হয় ভারত ছাড়ো আন্দোলন। মেদিনীপুরের তমলুকে গঠিত হয় স্বাধীন সমান্তরাল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার এবং তেরঙ্গা হাতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ৭৩ বছরের বীরাঙ্গনা বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা ('গান্ধীবুড়ি')। পরিশেষে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)-এর 'দিল্লি চলো' সামরিক অভিযান, লালকেল্লার ঐতিহাসিক বিচার এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ (RIN Mutiny) ব্রিটিশ শাসনের সামরিক ভিত্তি সম্পূর্ণ ধসিয়ে দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট এনে দেয় ভারতবর্ষের চিরকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • অষ্টম শ্রেণি ইতিহাসের ষষ্ঠ অধ্যায়: 'জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ' (১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, নরমপন্থী বনাম চরমপন্থী মতাদর্শ, লাল-বাল-পাল এবং ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন)।
  • ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক চরিত্র: রেলপথ, নিষ্কাশন তত্ত্ব (Drain of Wealth) এবং নীল ও রায়তওয়ারি বন্দোবস্তের সাধারণ ধারণা।
  • মূল ঐতিহাসিক শব্দাবলির পরিচয়: সত্যাগ্রহ, অহিংসা, স্বরাজ, বয়কট, খিলাফৎ, এবং বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহের মূল আদর্শ বিশ্লেষণ করতে পারা এবং চম্পারণ, আহমেদাবাদ ও খেড়ার প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড ত্যাগের ঐতিহাসিক ও নৈতিক গুরুত্ব অনুধাবন করা।
  • অসহযোগ, আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনের কারণ, বিস্তার, গঠনমূলক কর্মসূচি ও ফলাফল তুলনামূলকভাবে নিরূপণ করা।
  • বিপ্লবী ধারায় ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, মাস্টারদা সূর্য সেন এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের ন্যায় নারী বিপ্লবীদের অতুলনীয় অবদান মূল্যায়ন করা।
  • স্বরাজ্য দল ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩) এবং মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ও মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মদানের গুরুত্ব বর্ণনা করা।
  • নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)-এর সামরিক অভিযান, লালকেল্লার বিচার এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ কীভাবে ব্রিটিশ শাসন অবসানে অনুঘটকের কাজ করেছিল তা ব্যাখ্যা করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: গান্ধীবাদী আদর্শ, সত্যাগ্র...
2 মডিউল ২: অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন থে...
3 মডিউল ৩: বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ ও বামপ...
4 মডিউল ৪: আইন অমান্য আন্দোলন, ডান্ডি...
5 মডিউল ৫: চূড়ান্ত আঘাত: ভারত ছাড়ো...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: গান্ধীবাদী আদর্শ, সত্যাগ্রহ ও প্রারম্ভিক আঞ্চলিক আন্দোলন (১৯১৫–১৯১৯)

১.১ সত্যাগ্রহের দর্শন: সত্য, অহিংসা ও আত্মিক শক্তির সংগ্রাম

১৯১৫ সালের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকায় দুই দশকের বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সফল সংগ্রাম শেষ করে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন (এই দিনটি স্মরণে প্রতি বছর প্রবাসী ভারতীয় দিবস পালিত হয়)।

ভারতে এসে তিনি যে নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবর্তন করেন, তার নাম 'সत्याগ্রহ' (সত্য + আগ্রহ)। গান্ধীজির মতে সত্যাগ্রহ কোনো নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ বা দুর্বল মানুষের অস্ত্র নয়; এটি হলো পরম 'আত্মিক বল' (Soul-Force)। সত্যাগ্রহের প্রধান তিনটি স্তম্ভ ছিল:

  • পরম অহিংসা (Ahimsa): অহিংসা কাপুরুষতা নয়; কোনো পরিস্থিতিতেই শত্রুর প্রতি হিংসা বা বিদ্বেষভাব পোষণ না করে অন্যায়কে প্রতিরোধ করার অসীম সৎসাহস।
  • আত্মপীড়নের মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠা (Truth through Self-Suffering): শত্রুকে আঘাত না করে নিজেই দুঃখ-কষ্ট বরণ করে প্রতিপক্ষের হৃদয় ও বিবেককে জাগ্রত করা।
  • অন্যায়ের সঙ্গে অসহযোগ: অন্যায্য আইন মানতে অস্বীকার করা, কারণ জনগণের সম্মতির ওপরই যেকোনো স্বৈরাচারী শাসন টিকে থাকে।

রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের উপদেশে তিনি প্রথম এক বছর তৃতীয় শ্রেণির রেলগাড়িতে চেপে সমগ্র ভারত ঘুরে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন।

১.২ চম্পারণ নীল সত্যাগ্রহ (১৯১৭): ভারতীয় মাটিতে গান্ধীজির প্রথম বিজয়

১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারণ জেলার স্থানীয় কৃষক রাজকুমার শুক্ল-র আমন্ত্রণে গান্ধীজি সেখানে পৌঁছান।

সেখানে ইউরোপীয় নীলকর সাহেবরা কৃষকদের ওপর কুখ্যাত তিনকাঠিয়া প্রথা (Tinkathia System) চাপিয়ে রেখেছিল। এই নিয়ম অনুসারে প্রতি বিঘার (২০ কাঠার) মধ্যে সবচেয়ে উর্বর ৩ কাঠা জমিতে বাধ্যতামূলকভাবে নীল চাষ করতে হতো। উনিশ শতকের শেষে জার্মান কৃত্রিম নীল আবিষ্কারের ফলে বিশ্ববাজারে নীলের দাম পড়ে গেলে নীলকররা কৃষকদের চুক্তি থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য চড়া হারে বেআইনি কর (তাওয়ান ও শারাবেশি) দাবি করতে থাকে।

গান্ধীজি চম্পারণে পা রাখলে ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে অবিলম্বে জেলা ছেড়ে যাওয়ার নোটিশ দেন। গান্ধীজি শান্তভাবে সেই আদেশ অমান্য করে বলেন যে তিনি বিবেকের উচ্চতর নির্দেশ পালন করছেন। এটিই ছিল ভারতীয় ভূখণ্ডে গান্ধীজির প্রথম প্রকাশ্য আইন অমান্য।

সরকার বাধ্য হয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার অন্যতম সদস্য ছিলেন গান্ধীজি। কমিশনের সুপারিশে তিনকাঠিয়া প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত হয় এবং নীলকররা আদায় করা বেআইনি অর্থের ২৫ শতাংশ ফেরত দিতে বাধ্য হয়। চম্পারণের সাফল্য গান্ধীজিকে কৃষকসমাজের প্রধান নেতায় পরিণত করে।

১.৩ আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট ও খেড়া কৃষক সত্যাগ্রহ (১৯১৮)

১৯১৮ সালের শুরুতে গুজরাটে আরও দুটি সফল স্থানীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন মহাত্মা গান্ধী:

আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট (মার্চ ১৯১৮)

কারণ: প্লেগ মহামারী কেটে যাওয়ার পর সুতি বস্ত্রকল মালিকরা 'প্লেগ বোনাস' বন্ধ করতে চাইলে শ্রমিকরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ৫০% মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানায়। মালিকরা কেবল ২০% দিতে রাজি হয়।

গান্ধীজির ভূমিকা: গান্ধীজি শ্রমিকদের ৩৫% মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শান্তিপূর্ণ ধর্মঘট করতে বলেন। শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখতে তিনি ভারতে তাঁর প্রথম অনশন শুরু করেন। তিন দিনের মাথায় মালিকপক্ষ দাবি মেনে ৩৫% মজুরি বৃদ্ধি মঞ্জুর করে।

খেড়া সত্যাগ্রহ (মার্চ–জুন ১৯১৮)

কারণ: ভয়াবহ খরার কারণে খেড়া জেলায় ফসলের উৎপাদন স্বাভাবিকের এক-চতুর্থাংশের নিচে নেমে যায়। রাজস্ব আইনানুযায়ী খাজনা সম্পূর্ণ মকুব হওয়ার কথা থাকলেও ঔপনিবেশিক সরকার জোরপূর্বক খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের গবাদিপশু ও জমি ক্রোক করতে থাকে।

ফলাফল: তরুণ আইনজীবী বল্লভভাই প্যাটেল-কে সঙ্গে নিয়ে গান্ধীজি কৃষকদের অহিংসভাবে খাজনা বন্ধ করতে বলেন। সরকার নতিস্বীকার করে নির্দেশ দেয় যে কেবল সমর্থ কৃষকদের থেকেই খাজনা নেওয়া হবে।

এই তিন আন্দোলনের মাধ্যমে রাজেন্দ্র প্রসাদ, জে.বি. কৃপালিনী, মহাদেব দেশাই এবং সর্দার প্যাটেলের মতো বিশ্বস্ত সহকর্মীরা গান্ধীজির নেতৃত্বে জাতীয় মঞ্চে উঠে আসেন।

১.৪ রাওলাট আইন (১৯১৯): ঔপনিবেশিক কালাকানুন ও দেশব্যাপী সত্যাগ্রহ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়রা রক্ত ও অর্থ দিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করেছিল এই আশায় যে যুদ্ধের পর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে। কিন্তু পরিবর্তে ব্রিটিশ সরকার স্যার সিডনি রাওলাটের কমিটির সুপারিশে প্রণয়ন করে কুখ্যাত রাওলাট আইন (মার্চ ১৯১৯)।

এই আইনের মূল স্বৈরাচারী ধারাগুলি ছিল:

  • সন্দেহের বশে যেকোনো ভারতীয়কে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে।
  • কোনো বিচার বা প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক বন্দিকে ২ বছর পর্যন্ত জেলে আটকে রাখা যাবে।
  • বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গোপনে বিচার হবে এবং রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার কোনো অধিকার থাকবে না। অর্থাৎ: 'ন দলিল, ন অকিল, ন আপিল'।

গান্ধীজি রাওলাট আইনকে 'কালাকানুন' আখ্যা দেন এবং ৬ এপ্রিল ১৯১৯ দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল পালনের ডাক দেন। এটিই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সর্বভারতীয় সমন্বিত গণপ্রতিবাদ।

১.৫ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড (১৩ এপ্রিল ১৯১৯) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড বর্জন

পাঞ্জাবের অমৃতসরে রাওলাটবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে ১০ এপ্রিল জনপ্রিয় দুই নেতা—ডাঃ সইফুদ্দিন কিচলু ও ডাঃ সত্যপাল-কে ব্রিটিশ পুলিশ গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠায়।

১৩ এপ্রিল ১৯১৯ বৈশাখী উৎসবের দিন প্রায় ১০,০০০ নিরীহ মানুষ অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ ময়দানে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সমবেত হন। মাঠটি ছিল চারদিকে উঁচু প্রাচীর ঘেরা এবং ভেতরে ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য কেবল একটি অতি সরু গলি ছিল।

সামরিক শাসক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজিনাল্ড ডায়ার ৯০ জন ব্রিটিশ ও গোর্খা সৈন্য নিয়ে একমাত্র নির্গমন পথটি অবরুদ্ধ করেন। জনতাকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার কোনো সতর্কবার্তা না দিয়েই নিরস্ত্র ও বন্দি জনতার ওপর নির্বিচারে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। টানা ১০ মিনিট ধরে ১,৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়।

নির্মম নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খতিয়ান

সরকারি হান্টার কমিশন নিহতের সংখ্যা মাত্র ৩৭৯ বললেও কংগ্রেসের পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যর তদন্তে প্রমাণিত হয় যে ১,০০০-এর বেশি নিরীহ মানুষ নিহত এবং ১,৫০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন। আত্মরক্ষার্থে বহু মানুষ মাঠের পাতকুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

এই পৈশাচিক বর্বরতার প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালের ৩১ মে বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে এক ঐতিহাসিক চিঠি পাঠিয়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া 'নাইটহুড' (Knighthood) উপাধি ত্যাগ করেন। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:

"The time has come when badges of honour make our shame glaring in their incongruous context of humiliation, and I for my part wish to stand, shorn of all special distinctions, by the side of those of my countrymen who, for their so-called insignificance, are liable to suffer degradation not fit for human beings."

জালিয়ানওয়ালাবাগের রক্তপাত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নৈতিক ভিত্তিকে চিরতরে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং দেশবাসীকে অসহযোগের মহাসংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।

মডিউল ২: অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন থেকে স্বরাজ্য দল (১৯২০–১৯২৬)

২.১ খিলাফৎ আন্দোলন ও হিন্দু-মুসলিম ঐতিহাসিক মৈত্রী

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের ওসমানীয় সাম্রাজ্য পরাজিত হলে ব্রিটিশরা তুরস্ককে বিভক্ত করে এবং মুসলিম জগতের ধর্মীয় প্রধান বা খলিফা-র মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।

এর প্রতিবাদে ভারতীয় মুসলিমরা আলি ভ্রাতৃদ্বয় (মৌলানা মহম্মদ আলি ও শওকত আলি), মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এবং ডাঃ এম. এ. আনসারির নেতৃত্বে খিলাফৎ আন্দোলন শুরু করেন। গান্ধীজি উপলব্ধি করেন যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু ও মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করার এমন সুবর্ণ সুযোগ এক শতাব্দীতেও আর আসবে না।

১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে এবং ডিসেম্বরে নাগপুর অধিবেশনে খিলাফৎ দাবি এবং পাঞ্জাবের অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে এক বছরের মধ্যে 'স্বরাজ' অর্জনের লক্ষ্যে অসহযোগ আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।

২.২ অসহযোগের কর্মসূচি: বয়কট ও গঠনমূলক স্বদেশী প্রয়াস

অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০–১৯২২) অহিংস পদ্ধতিতে নেতিবাচক বয়কট এবং ইতিবাচক জাতীয় গঠনের দুই ধারায় রূপায়িত হয়েছিল:

বয়কট কর্মসূচি (বর্জন)

  • সরকারি খেতাব, পদক ও সম্মান ত্যাগ (গান্ধীজি 'কায়জার-ই-হিন্দ' পদক ত্যাগ করেন)।
  • দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মতিলাল নেহরুর মতো আইনজীবীদের ওকালতি ও ব্রিটিশ আদালত বর্জন।
  • সরকারি স্কুল-কলেজ বর্জন করে ছাত্রদের আন্দোলনে যোগদান।
  • বিদেশি বস্ত্র ও সামগ্রী বর্জন এবং জনসমক্ষে বিলিতি কাপড়ের অগ্নিকুণ্ড তৈরি।
  • আইনসভার নির্বাচন বর্জন।

গঠনমূলক স্বদেশী কর্মসূচি

  • জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা: কাশী বিদ্যাপীঠ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, গুজরাট বিদ্যাপীঠ, বিহার বিদ্যাপীঠ।
  • বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সালিশি পঞ্চায়েত আদালত গঠন।
  • স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য ঘরে ঘরে চরকায় সুতো কাটা ও খাদি কাপড়ের উৎপাদন ও প্রসার।
  • তিলক স্বরাজ্য তহবিলের জন্য ১ কোটি টাকা সংগ্রহ।
  • অস্পৃশ্যতা বর্জন এবং জাতীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা।

এর ফলে ১৯২০-২১ সালে যেখানে ১০২ কোটি টাকার ব্রিটিশ বস্ত্র ভারতে আমদানি হতো, ১৯২১-২২ সালে তা কমে ৫৭ কোটি টাকায় নেমে আসে।

২.৩ কৃষক ও শ্রমিকদের জাগরণ: আন্দোলনের সর্বভারতীয় বিস্তৃতি

অসহযোগ আন্দোলন কেবল শহরের মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা দ্রুত গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে কৃষক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির আন্দোলনে পরিণত হয়:

  • যুক্তপ্রদেশ (UP): বাবা রামচন্দ্র-র নেতৃত্বে অযোধ্যায় কিষাণ সভা সংগঠিত হয় এবং কৃষকরা জমিদারি শোষণ, অবৈধ উচ্ছেদ ও বেগার শ্রমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। মাদারি পাসীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে একা আন্দোলন।
  • বাংলা: মেদিনীপুরে বীরেন্দ্রনাথ শাসমল-এর নেতৃত্বে কৃষকরা ব্রিটিশ ইউনিয়ন বোর্ডের কর দিতে অস্বীকার করে আন্দোলন গড়ে তোলেন এবং সরকারকে ইউনিয়ন বোর্ড বাতিল করতে বাধ্য করেন। আসামের চা বাগান শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে চাঁদপুরে জাহাজ ধর্মঘট ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে ধর্মঘট শুরু হয়।
  • অন্ধ্র ও অন্যান্য অঞ্চল: অন্ধ্রের গুন্টুরে কৃষকরা সরকারি বন আইন অগ্রাহ্য করে চারণভূমিতে পশু চরিয়ে বন সত্যাগ্রহ শুরু করেন। রাজস্থানে মোতিলাল তেলাওয়াতের নেতৃত্বে আদিবাসী ভিল আন্দোলন গড়ে ওঠে।

১৯২১ সালের শেষ নাগাদ ৩০,০০০-এর বেশি সত্যাগ্রহী কারারুদ্ধ হন এবং যুবরাজ (Prince of Wales)-এর ভারত সফর সম্পূর্ণভাবে বয়কট করে কালো পতাকা দেখানো হয়।

২.৪ চৌরিচৌরার ঘটনা (৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২) ও আন্দোলন প্রত্যাহার

যখন আন্দোলন সাফল্যের চরম সীমায় এবং গান্ধীজি গুজরাটের বারদোলি থেকে ব্যাপক কর-বন্ধ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা।

৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ যুক্তপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার চৌরিচৌরা গ্রামে স্থানীয় বাজারে মদের দোকান ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কৃষকদের একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। ক্ষিপ্ত জনতা পুলিশকে তাড়া করলে পুলিশ কর্মীরা স্থানীয় থানায় আশ্রয় নেয়। উন্মত্ত জনতা থানায় তালা ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়, যার ফলে ২২ জন পুলিশকর্মী জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান।

এই হিংসাত্মক ঘটনায় ব্যথিত হয়ে গান্ধীজি সিদ্ধান্ত নেন যে ভারতবাসী এখনও অহিংস সত্যাগ্রহের প্রকৃত পাঠ নেয়নি। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি বারদোলিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি বৈঠক ডেকে অসহযোগ আন্দোলন সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।

গান্ধীজির এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সারা দেশে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সুভাষচন্দ্র বসু একে 'জাতীয় বিপর্যয়' (National Calamity) বলে উল্লেখ করেন। জওহরলাল নেহরু ও চিত্তরঞ্জন দাশ চরম হতাশ হন। ১০ মার্চ ১৯২২ ব্রিটিশ সরকার গান্ধীজিকে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করে ৬ বছরের কারাদণ্ড দেয়।

২.৫ স্বরাজ্য দল (১৯২৩), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও বেঙ্গল প্যাক্ট

আন্দোলন স্থগিত হওয়ার পর কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে দুটি পরস্পরবিরোধী মতাদর্শের সৃষ্টি হয়:

  • পরিবর্তনবিরোধী (No-Changers): চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং রাজেন্দ্র প্রসাদ আইনসভা বর্জন অব্যাহত রেখে গ্রামে গ্রামে চরকা ও সমাজসেবামূলক গঠনমূলক কাজে মনোনিবেশ করতে চান।
  • পরিবর্তনকামী (Pro-Changers): দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং মতিলাল নেহরু দাবি করেন যে বয়কট পরিহার করে ঔপনিবেশিক আইনসভায় প্রবেশ করতে হবে এবং ভেতর থেকে সরকারের কাজকর্ম অচল করে সংস্কারের মুখোশ খুলে দিতে হবে।

১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে গঠিত হয় কংগ্রেস-খিলাফৎ স্বরাজ্য দল। ১৯২৩-এর সাধারণ নির্বাচনে স্বরাজ্য দল কেন্দ্রীয় আইনসভা এবং বাংলা প্রদেশে বিপুল জয়লাভ করে এবং সরকারের সব প্রস্তাব ও বাজেট ক্রমাগত নাকচ করে আইনসভায় অচলাবস্থা তৈরি করে।

বাংলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩) স্বাক্ষরের মাধ্যমে। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে এই চুক্তিতে মুসলিমদের জন্য জনসংখ্যানুপাতে সরকারি চাকরি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে আসন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধুর অকাল প্রয়াণ পর্যন্ত বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট ছিল।

মডিউল ৩: বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থী গণচেতনার বিস্তার (১৯২০–১৯৩০-এর দশক)

৩.১ বিপ্লবী আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়: এইচআরএ থেকে এইচএসআরএ

অসহযোগ আন্দোলনের আকস্মিক ব্যর্থতায় তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ অহিংস পদ্ধতির ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেয়।

১৯২৪ সালের অক্টোবরে কানপুরে রামপ্রসাদ বিসমিল, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল এবং যোগেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HRA)। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে 'যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতীয় প্রজাতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা করা।

বিপ্লবী কাজের জন্য অর্থের সংস্থানে ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট লখনউয়ের কাছে কাকোরি ট্রেন ডাকাতি সংঘটিত হয়। ব্রিটিশ সরকারের কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান, রোশন সিং এবং রাজেন লাহিড়ীর ফাঁসি হয়।

১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা ময়দানে ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদ-এর নেতৃত্বে সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA), যা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও মেহনতি মানুষের অধিকারকে বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করে।

৩.২ ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ ও কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা

১৯২৮ সালের ৩০ অক্টোবর লাহোরে সাইমন কমিশন বিরোধী মিছিলে পুলিশের লাঠির আঘাতে পাঞ্জাবকেশরী লালা লাজপত রায়-এর মৃত্যু হলে বিপ্লবীরা এর প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন।

১৯২৮-এর ১৭ ডিসেম্বর ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেব লাহোর পুলিশের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট জে. পি. সন্ডার্স-কে গুলি করে হত্যা করেন এবং নিরাপদে পালিয়ে যান।

৮ এপ্রিল ১৯২৯ শ্রমিক আন্দোলন দমনের জন্য আনা 'ট্রেড ডিসপিউটস বিল' ও 'পাবলিক সেফটি বিল'-এর প্রতিবাদে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লির কেন্দ্রীয় আইনসভার ফাঁকা মেঝের দিকে দুটি শব্দবোমা নিক্ষেপ করেন। কাউকে আঘাত না করে তাঁরা লাল প্রচারপত্র ছড়িয়ে স্লোগান দেন:

"বধিরকে শোনানোর জন্য তীব্র চিৎকারের প্রয়োজন হয়।" — ইনকিলাব জিন্দাবাদ! সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক!

পালিয়ে না গিয়ে তাঁরা স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হন যাতে ঔপনিবেশিক আদালতকে বিপ্লবের প্রচারমঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। লাহোর জেলে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে অনশন করতে গিয়ে তরুণ বাঙালি বিপ্লবী যতীন দাস ১৯২৯-এর ১৩ সেপ্টেম্বর ৬৩ দিন অনশনের পর শহীদ হন।

১৯৩১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে পুলিশের সঙ্গে অসম লড়াইয়ে শেষ গুলি দিয়ে নিজের জীবন শেষ করেন বীর চন্দ্রশেখর আজাদ। আর ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ভগৎ সিং, রাজগুরু ও সুখদেব ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গান।

৩.৩ মাস্টারদা সূর্য সেন ও ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (১৯৩০)

বাংলায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাইস্কুলের অঙ্কের শিক্ষক সূর্য সেন, যাঁকে বিপ্লবীরা শ্রদ্ধায় 'মাস্টারদা' বলে ডাকতেন।

তিনি গড়ে তোলেন ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি (চট্টগ্রাম শাখা)। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল গুড ফ্রাইডের রাতে ৬৫ জন তরুণ বিপ্লবী একযোগে চারটি সুপরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করেন:

  • দামপাড়া পুলিশ লাইন অস্ত্রাগার ও অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার দখল করেন।
  • টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার কেটে এবং রেললাইন উপড়ে ফেলে চট্টগ্রামকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।
  • পুলিশ অস্ত্রাগারে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে স্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন।

এরপর জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নিলে ২২ এপ্রিল ১৯৩০ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্মুখসমর ঘটে। মেশিনগানের গুলির মুখে যুদ্ধ করে ১২ জন তরুণ বিপ্লবী শহীদ হন, কিন্তু পিছু হটে ব্রিটিশ বাহিনী। চট্টগ্রামের এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে ভারতীয় তরুণরা ব্রিটিশের আধুনিক সামরিক বাহিনীকে মুখোমুখি পরাস্ত করতে সক্ষম।

৩.৪ বিপ্লবী সংগ্রামে নারীশক্তি: প্রীতিলতা, কল্পনা ও বীণা দাস

১৯৩০-এর দশকে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল নারী সমাজের প্রত্যক্ষ সশস্ত্র অংশগ্রহণ:

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার

বেথুন কলেজের মেধাবী ছাত্রী প্রীতিলতা মাস্টারদার নির্দেশে ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইউরোপীয়দের জাতিবিদ্বেষী ক্লাব 'পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব' (যেখানে লেখা থাকত: 'কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ')-এ সফল সশস্ত্র আক্রমণ চালান। গুলিতে আহত হয়ে পুলিশের হাতে জীবন্ত ধরা না দেওয়ার জন্য তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন এবং ভারতের প্রথম মহিলা বিপ্লবী শহীদ হন।

কল্পনা দত্ত

অস্ত্র পরিবহন ও বোমা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। পুরুষের ছদ্মবেশে মাস্টারদার সঙ্গে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন এবং গৈরালা সংঘর্ষে গ্রেফতার হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।

বীণা দাস, শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী

১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে সরাসরি পাঁচ রাউন্ড গুলি চালান তরুণী বীণা দাস। তার আগে ১৯৩১-এর ডিসেম্বরে কুমিল্লার দুই কিশোরী স্কুলছাত্রী শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী অত্যাচারী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে গুলি করে হত্যা করেন।

বিশ্বাসঘাতকের চক্রান্তে মাস্টারদা সূর্য সেন ধরা পড়েন এবং নারকীয় শারীরিক নির্যাতনের পর ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গে তাঁর ফাঁসি হয়।

৩.৫ বামপন্থী মতাদর্শের বিকাশ ও কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন

১৯১৭ সালের রুশ বলশেভিক বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় ১৯২০-এর দশক থেকে ভারতে সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের দ্রুত বিস্তার ঘটে:

  • ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি: ১৯২০ সালের অক্টোবরে তাসখন্দে মানবেন্দ্রনাথ রায় (M.N. Roy) ও অন্যান্যদের উদ্যোগে এবং ১৯২৫-এর ডিসেম্বরে কানপুর সম্মেলনে ভারতীয় ভূখণ্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • শ্রমিক সংগঠন: ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC), যার প্রথম সভাপতি ছিলেন লালা লাজপত রায়। বোম্বাই ও কলকাতার কলকারখানায় ব্যাপক ধর্মঘট হয়।
  • মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯): কমিউনিস্টদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে ভীত হয়ে সরকার মুজফফর আহমদ, এস. এ. ডাঙ্গে সহ ৩১ জন শ্রমিক নেতাকে গ্রেফতার করে ৪ বছর ধরে বিচার চালায়।
  • সারা ভারত কিষাণ সভা (AIKS): ১৯৩৬ সালে লখনউতে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতীর সভাপতিত্বে গঠিত হয়, যা জমিদার প্রথা উচ্ছেদ ও কৃষকদের ঋণমুক্তির দাবি তোলে।

কংগ্রেসের অভ্যন্তরেও জওহরলাল নেহরু ও সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার প্রসার ঘটে, যা জাতীয় আন্দোলনকে কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার নয়, শোষিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে পরিণত করে।

মডিউল ৪: আইন অমান্য আন্দোলন, ডান্ডি অভিযান ও সাংবিধানিক বিতর্ক (১৯২৭–১৯৩৯)

৪.১ সাইমন কমিশন বর্জন (১৯২৭) ও নেহরু রিপোর্ট (১৯২৮)

১৯১৯ সালের মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার আইন পর্যালোচনার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৯২৭ সালের নভেম্বরে স্যার জন সাইমনের নেতৃত্বে সাইমন কমিশন নিয়োগ করে।

কমিশনের সাতজন সদস্যের প্রত্যেকেই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ ইংরেজ এবং কোনো ভারতীয়কে এতে রাখা হয়নি। আত্মনিয়ন্ত্রণের এই চরম অপমানের প্রতিবাদে কংগ্রেস, মুসলিম লিগ সহ সব দল কমিশন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯২৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি কমিশন বোম্বাইয়ে নামলে দেশজুড়ে কালো পতাকা ও 'সাইমন গো ব্যাক' (Simon Go Back) ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়।

ভারত সচিব লর্ড বার্কেনহেড ভারতীয়দের সর্বসম্মত সংবিধান রচনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলে পণ্ডিত মতিলাল নেহরুর সভাপতিত্বে ১৯২৮ সালে রচিত হয় ঐতিহাসিক নেহরু রিপোর্ট—ভারতীয়দের তৈরি প্রথম সাংবিধানিক রূপরেখা।

নেহরু রিপোর্টে ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস (ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন), মৌলিক অধিকার এবং যৌথ নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু সুভাষচন্দ্র বসু ও জওহরলাল নেহরুর মতো তরুণ নেতৃত্ব পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে অটল থেকে গঠন করেন 'ইন্ডিপেন্ডেন্স ফর ইন্ডিয়া লিগ'।

৪.২ ১৯২৯-এর লাহোর অধিবেশন ও 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা

১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পাঞ্জাবের লাহোরে ইরাবতী (রবি) নদীর তীরে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় কংগ্রেসের ঐতিহাসিক বাৎসরিক অধিবেশন।

ব্রিটিশ সরকার ডমিনিয়ন স্ট্যাটাসের সময়সীমা পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় লাহোর অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয় 'পূর্ণ স্বরাজ' (Complete Independence)।

৩১ ডিসেম্বর ১৯২৯ মধ্যরাতে জওহরলাল নেহরু রবি নদীর তীরে স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং দেশবাসীকে স্বাধীনতার শপথ পাঠ করান।

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে প্রথম 'স্বাধীনতা দিবস' (পূর্ণ স্বরাজ দিবস) হিসেবে উদযাপনের নির্দেশ দেয়। (এই ঐতিহাসিক দিনটিকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্যই বিশ বছর পর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হয়)।

৪.৩ ডান্ডি অভিযান ও লবণ সত্যাগ্রহ (১২ মার্চ – ৬ এপ্রিল ১৯৩০)

পূর্ণ স্বরাজের লক্ষ্য অর্জনে মহাত্মা গান্ধী বেছে নেন এক অদ্ভুত সাধারণ অথচ যুগান্তকারী প্রতীক: লবণ।

লবণ ছিল সমাজের ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম, জাত-পাত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার লবণের ওপর চড়া কর ধার্য করত এবং উপকূলীয় দরিদ্র মানুষদের সমুদ্রজল ফুটিয়ে লবণ তৈরি নিষিদ্ধ করেছিল। লবণের ওপর এই কর ছিল ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন প্রকাশ।

১২ মার্চ ১৯৩০ গান্ধীজি তাঁর সবরমতী আশ্রম থেকে ৭৮ জন বাছাই করা অনুগামীকে নিয়ে গুজরাটের সমুদ্র উপকূলবর্তী ডান্ডি গ্রামের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেন। ২৪ দিনে ২৪০ মাইল পথ হেঁটে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন।

৬ এপ্রিল ১৯৩০ সকালে সাগরে স্নান সেরে গান্ধীজি সমুদ্রতীর থেকে একমুঠো লবণাক্ত মাটি তুলে নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ লবণ আইন ভঙ্গ করেন এবং ঘোষণা করেন:

"এই একমুঠো লবণ দিয়ে আমি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দিচ্ছি।"

এর সঙ্গে সঙ্গেই সারা দেশে শুরু হয়ে যায় আইন অমান্য আন্দোলন। লক্ষ লক্ষ মানুষ সাগরজলে লবণ তৈরি করতে শুরু করেন, কর প্রদান বন্ধ করেন এবং বিদেশি দোকান পিকেটিং করেন।

৪.৪ আন্দোলনের দেশজোড়া ব্যাপ্তি: পেশোয়ার, ধারাশনা ও মেদিনীপুর

আইন অমান্য আন্দোলন অভূতপূর্ব গণউন্মাদনায় সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে:

  • উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ: খান আব্দুল গফফর খান (সীমান্ত গান্ধী) তাঁর অহিংস সংগঠন 'খোদাই খিদমতগার' (বা লাল কুর্তা বাহিনী)-কে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। পেশোয়ারে নিরস্ত্র পাঠানদের ওপর ব্রিটিশ অফিসার গুলি চালানোর নির্দেশ দিলে চন্দ্র সিং গাড়োয়ালের নেতৃত্বে গাড়োয়াল রাইফেলসের হিন্দু সৈন্যরা মুসলিম ভাইদের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকার করেন।
  • ধারাশনা লবণ ডিপো (গুজরাট): ২১ মে ১৯৩০ সরোজিনী নাইডু ও ইমাম সাহেবের নেতৃত্বে ২,৫০০ অহিংস সত্যাগ্রহী ধারাশনা লবণ কারখানা অভিমুখে পদযাত্রা করেন। ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদের মাথায় বেধড়ক লাঠিচার্জ করলেও কেউ হাত পর্যন্ত তোলেননি। মার্কিন সাংবাদিক ওয়েব মিলারের প্রতিবেদনে ব্রিটিশ নিষ্ঠুরতার নগ্ন রূপ বিশ্বদরবারে ফাঁস হয়ে যায়।
  • বাংলা: মেদিনীপুরের কাঁথি, তমলুক ও মহিষাদলে ব্যাপক লবণ সত্যাগ্রহ ও চৌকিদারি ট্যাক্স বন্ধের আন্দোলন চলে। নারীরা ঘরের কাজকর্ম ছেড়ে দলে দলে মিছিলে শামিল হন।
  • নাগাল্যান্ড: মাত্র ১৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন বীরাঙ্গনা আদিবাসী কন্যা রানি গাইদিনলিউ।

গান্ধীজি ও নেহরু সহ ৯০,০০০-এর বেশি মানুষকে কারারুদ্ধ করে সরকার আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে।

৪.৫ গোলটেবিল বৈঠক, পুনা চুক্তি (১৯৩২) ও ১৯৩৫-এর আইন

আন্দোলন সাময়িক থামাতে বড়লাট লর্ড আরউইন গান্ধীজির সঙ্গে গান্ধী-আরউইন চুক্তি (৫ মার্চ ১৯৩১) স্বাক্ষর করেন। লবণ তৈরির অনুমতি ও বন্দিমুক্তির আশ্বাসে কংগ্রেস দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দিতে রাজি হয়।

১৯৩১-এর লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে গান্ধীজি হতাশ হন, কারণ ব্রিটিশরা ভারতীয়দের ঐক্যের বদলে সাম্প্রদায়িক মতবিরোধ উসকে দেয়। দেশে ফিরে তিনি আন্দোলন পুনরায় শুরু করেন।

১৯৩২ সালের আগস্টে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ড 'সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা' (Communal Award) ঘোষণা করে দলিতদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করে হিন্দু সমাজকে বিভক্ত করার চক্রান্ত করেন। এর প্রতিবাদে পুনের যেরাওয়াড়া জেলে বন্দি গান্ধীজি আমরণ অনশন শুরু করেন।

অবশেষে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ মহাত্মা গান্ধী এবং ড. বি. আর. আম্বেদকর-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পুনা চুক্তি (Poona Pact)। এর ফলে পৃথক নির্বাচন বাতিল হয় এবং যৌথ নির্বাচনের কাঠামোয় প্রাদেশিক আইনসভায় দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৭১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৮ করা হয়। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের পটভূমিতে প্রণীত হয় ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন এবং ১৯৩৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেস ৭টি প্রদেশে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করে।

মডিউল ৫: চূড়ান্ত আঘাত: ভারত ছাড়ো আন্দোলন, তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার, নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ (১৯৪২–১৯৪৬)

৫.১ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও মতাদর্শগত মেরুকরণ: সুভাষচন্দ্র ও ফরোয়ার্ড ব্লক

১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই বড়লাট লর্ড লিনলিথগো একতরফাভাবে ভারতকে যুদ্ধে লিপ্ত ঘোষণা করেন। প্রতিবাদে অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৩৯-এ কংগ্রেসের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলি পদত্যাগ করে।

এর আগেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে গভীর মতাদর্শগত সংঘাত দেখা দিয়েছিল। সুভাষচন্দ্র বসু হরিপুরা (১৯৩৮) এবং ত্রিপুরী কংগ্রেসে (১৯৩৯) গান্ধীজির মনোনীত প্রার্থী পট্টভি সীতারামাইয়াকে পরাজিত করে সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি বিশ্বযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশদের পূর্ণ স্বাধীনতার চরমপত্র দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন।

গান্ধীজির দক্ষিণপন্থী অনুগামীদের বিরোধিতায় তিনি সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ১৯৩৯ সালের ৩ মে কংগ্রেসের অভ্যন্তরেই সমস্ত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বামপন্থী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করতে গঠন করেন ফরোয়ার্ড ব্লক (Forward Bloc)।

১৯৪২-এর মার্চে জাপানি আগ্রাসনের মুখে ভারতীয়দের যুদ্ধকালীন সহযোগিতা পেতে ব্রিটিশ সরকার পাঠায় ক্রিপস মিশন। কিন্তু কোনো তাৎক্ষণিক বাস্তব ক্ষমতা না দিয়ে যুদ্ধোত্তর ডমিনিয়ন স্ট্যাটাসের প্রস্তাব দেওয়ায় গান্ধীজি একে 'দেউলিয়া ব্যাংকের ওপর কাটা ভবিষ্যৎ তারিখের চেক' বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

৫.২ ভারত ছাড়ো আন্দোলন (আগস্ট ১৯৪২): 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে'

ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতার পর ১৯৪২ সালের ৮ আগস্ট বোম্বাইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে গৃহীত হয় ঐতিহাসিক 'ভারত ছাড়ো' (Quit India) প্রস্তাব।

জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে মহাত্মা গান্ধী তাঁর জীবনের সবচেয়ে উদ্দীপনাময় ও চূড়ান্ত মন্ত্রটি উচ্চারণ করেন:

"আমি আপনাদের একটি সংক্ষিপ্ত মন্ত্র দিচ্ছি, যা আপনাদের হৃদয়ে অঙ্কিত করে রাখুন। মন্ত্রটি হলো: 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' (Do or Die)। আমরা হয় ভারতকে স্বাধীন করব, না হয় এই প্রচেষ্টায় জীবন বিসর্জন দেব। কিন্তু আমাদের দাসত্ব চিরস্থায়ী হতে দেব না।"

৯ আগস্ট ১৯৪২ ভোররাতে ব্রিটিশ পুলিশ 'অপারেশন জিরো আওয়ার' চালিয়ে গান্ধীজি, নেহরু, প্যাটেল সহ সমস্ত শীর্ষ কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে এবং কংগ্রেসকে বেআইনি ঘোষণা করে।

শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতার আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং তা এক নজিরবিহীন নেতৃত্বহীন গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়। অরুনা আসফ আলি, জয়প্রকাশ নারায়ণ, রামমনোহর লোহিয়া ও ঊষা মেহতার নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে গুপ্ত বেতার ও প্রতিরোধ নেটওয়ার্ক। রেললাইন উপড়ে ফেলা, টেলিফোন পোস্ট ভাঙা ও থানা আক্রমণের মাধ্যমে কৃষক ও ছাত্ররা বিদ্রোহে ফেটে পড়ে।

৫.৩ মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ও বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা

ভারত ছাড়ো আন্দোলনে বাংলার সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়েছিল মেদিনীপুর জেলার তমলুকে, যেখানে ১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় সমান্তরাল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার।

সর্বাধিনায়ক সতীশচন্দ্র সামন্ত-র পরিচালনায় এই জাতীয় সরকার গড়ে তোলে নিজস্ব প্রতিরক্ষাবাহিনী 'বিদ্যুৎবাহিনী' এবং নারীদের 'ভগিনী সেনা'। গঠিত হয় সালিশি আদালত এবং ১৯৪৩-এর ভয়াবহ মন্বন্তরে ধনী জোতদারদের ধান বাজেয়াপ্ত করে অনাহারক্লিষ্ট মানুষদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় দু'বছর এই স্বাধীন প্রশাসন সফলভাবে কার্যকর ছিল।

এই আন্দোলনের মহানতম প্রতীক হলেন ৭৩ বছরের বীরাঙ্গনা বিধবা বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা, যাঁকে মানুষ ভালোবেসে ডাকতেন 'গান্ধীবুড়ি'। ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তমলুক থানা অভিযানের সময় একটি ৬,০০০ মানুষের নিরস্ত্র মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী সামনে এগিয়ে যান।

পুলিশের গুলি একে একে তাঁর বাঁ হাত ও ডান হাতে আঘাত করে, কিন্তু তিনি তেরঙ্গা জাতীয় পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেননি। কপালে তৃতীয় বুলেটটি বিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন। মেদিনীপুর ছাড়াও মহারাষ্ট্রের সাতারাতে নানা পাটিলের 'প্রতি সরকার' এবং উত্তরপ্রদেশের বালিয়ায় চিত্তু পাণ্ডের সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়।

৫.৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA): 'দিল্লি চলো'

কলকাতায় এলগিন রোডের বাড়িতে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৪১ সালের ১৬-১৭ জানুয়ারি মধ্যরাতে ব্রিটিশ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে ছদ্মবেশে ঐতিহাসিক 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' ঘটান নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। পেশোয়ার, কাবুল ও মস্কো হয়ে বার্লিনে পৌঁছে তিনি গঠন করেন ফ্রি ইন্ডিয়া সেন্টার।

পরবর্তীতে ৯০ দিনের বিপজ্জনক ডুবোজাহাজ যাত্রায় তিনি ১৯৪৩ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে পৌঁছান এবং বিপ্লবী রাসবিহারী বসু-র হাত থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army)-এর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

২১ অক্টোবর ১৯৪৩ সিঙ্গাপুরে নেতাজি প্রতিষ্ঠা করেন 'আজাদ হিন্দ সরকার' (Arzi Hukumat-e-Azad Hind)। তিনি দেশবাসীকে দেন অমর অভিবাদন 'জয় হিন্দ' এবং রণধ্বনি 'দিল্লি চলো'। ব্রহ্মদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন:

"তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব!"

আজাদ হিন্দ ফৌজের গৌরবোজ্জ্বল কীর্তি

  • এশিয়া মহাদেশের প্রথম নারী সামরিক বাহিনী গঠন: ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন (সায়গল)-এর নেতৃত্বে 'ঝাঁসির রানি রেজিমেন্ট'।
  • জাপানের থেকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের নাম দেন 'শহীদ' ও 'স্বরাজ' দ্বীপ।
  • ১৯৪৪ সালে মণিপুরের মইরাং-এ স্বাধীন ভারতের মাটিতে প্রথম তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন আজাদ হিন্দ সেনারা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাপানি বিমান সহায়তা বিচ্ছিন্নতা ও রশদের অভাবে ইম্ফল-কোহিমা অভিযানে আজাদ হিন্দ ফৌজ সামরিকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হলেও এই বাহিনী ভারতীয়দের অন্তরে স্বাধীনতার তীব্র আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

৫.৫ লালকেল্লার বিচার, নৌবিদ্রোহ (১৯৪৬) ও চূড়ান্ত স্বাধীনতা লাভ

যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৫ সালের শেষের দিকে দিল্লির লালকেল্লায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বন্দি সেনাপতিদের বিচার শুরু করে। কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তিন ভিন্ন ধর্মের সেনাপতিকে: কর্নেল প্রেমকুমার সায়গল (হিন্দু), কর্নেল গুরবখশ সিং ধিলন (শিখ) এবং মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খান (মুসলিম)।

এই বিচারের প্রতিবাদে গোটা দেশে বিক্ষোভের অগ্ন্যুৎপাত ঘটে। ভুলাভাই দেশাই, তেজবাহাদুর সপ্রু এবং স্বয়ং জওহরলাল নেহরু ব্যারিস্টারির গাউন গায়ে চাপিয়ে বন্দিদের পক্ষে আদালতে দাঁড়ান। কলকাতায় ১৯৪৬-এর ১২ ফেব্রুয়ারি 'রশিদ আলি দিবস' পালনে হিন্দু-মুসলিম-ছাত্র সমাজ এক হয়ে রাজপথে রক্ত দেয়।

সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয় ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বাইয়ের নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ জাহাজ 'এইচএমআইএস তলোয়ার' (HMIS Talwar)-এ ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার মাধ্যমে। বর্ণবৈষম্য ও খারাপ খাবারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহে ২০,০০০ নৌসেনা ৭৮টি রণতরী দখল করে কংগ্রেসের তেরঙ্গা, মুসলিম লিগের সবুজ ও কমিউনিস্টদের লাল পতাকা একসঙ্গে উত্তোলন করেন।

যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এতদিন ভারতীয় সৈন্যদের বন্দুকের জোরে টিকে ছিল, নৌসেনাদের বিদ্রোহের পর তারা বুঝতে পারে ভারতীয় সামরিক বাহিনীকে আর দেশবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা অসম্ভব। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি বাধ্য হয়ে ক্যাবিনেট মিশন প্রেরণ করেন এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত অর্জন করে তার চিরকাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও স্বাধীনতা।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক কালপঞ্জি ও মাইলফলক (১৯১৫–১৯৪৭)
$$১৯১৫ গান্ধীর প্রত্যাবর্তন ⇒ ১৯২৯ পূর্ণ স্বরাজ ⇒ ১৯৪২ করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে ⇒ ১৯৪৭ স্বাধীনতা$$
সালঐতিহাসিক ঘটনাশাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য
১৯১৫গান্ধীজির ভারতে প্রত্যাবর্তনসত্যাগ্রহের আদর্শের আগমন; গোখলের উপদেশে দেশভ্রমণ ও ভারতীয় বাস্তবতার পাঠ।
১৯১৭চম্পারণ নীল সত্যাগ্রহভারতে প্রথম অহিংস আইন অমান্যের বিজয়; তিনকাঠিয়া প্রথা চিরতরে বিলোপ।
১৯১৮আহমেদাবাদ ও খেড়া আন্দোলনপ্রথম অনশন (৩৫% মজুরি বৃদ্ধি) এবং খেড়ায় কৃষকদের খাজনা বন্ধে সাফল্য।
১৯১৯রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ১,০০০+ নিরস্ত্র মানুষ হত্যা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক নাইটহুড উপাধি বর্জন।
১৯২০–২২অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলনপ্রথম সর্বভারতীয় গণসংগ্রাম; বিলিতি বস্ত্র, আদালত ও স্কুল বর্জন।
১৯২২চৌরিচৌরার ঘটনা ও প্রত্যাহারথানায় অগ্নিসংযোগে ২২ পুলিশ নিহত; অহিংসার নীতিতে আন্দোলন স্থগিত।
১৯২৩স্বরাজ্য দল ও বেঙ্গল প্যাক্টসি.আর. দাশ ও মতিলাল নেহরুর আইনসভায় অচলাবস্থা সৃষ্টি; হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি চুক্তি।
১৯২৫কাকোরি ট্রেন ডাকাতিএইচআরএ-র অস্ত্র তহবিল সংগ্রহ; রামপ্রসাদ বিসমিল ও আশফাকউল্লার ফাঁসি।
১৯২৮সাইমন কমিশন ও নেহরু রিপোর্টলালা লাজপত রায়ের আত্মদান; মতিলাল নেহরুর ঐতিহাসিক সর্বসম্মত সংবিধান খসড়া।
১৯২৯বিধানসভায় বোমা ও লাহোর কংগ্রেসভগৎ সিং ও বটুকেশ্বরের বোমা নিক্ষেপ; লাহোরে পূর্ণ স্বরাজের ঐতিহাসিক ঘোষণা।
১৯৩০ডান্ডি অভিযান ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগারলবণ আইন ভঙ্গ; মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে স্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠা।
১৯৩১গান্ধী-আরউইন চুক্তি ও ভগৎ সিংয়ের ফাঁসি২৩ মার্চ ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেবের ফাঁসি; ২য় গোলটেবিল বৈঠক।
১৯৩২পুনা চুক্তিগান্ধী ও আম্বেদকরের মধ্যে দলিতদের জন্য যৌথ নির্বাচনে আসন সংরক্ষণ চুক্তি।
১৯৩৯ফরোয়ার্ড ব্লক গঠনকংগ্রেস সভাপতি পদ ত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র বসু কর্তৃক বামপন্থী জোট গঠন।
১৯৪২ভারত ছাড়ো ও তাম্রলিপ্ত সরকার'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' মন্ত্র; তমলুকে মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মদান ও সমান্তরাল সরকার।
১৯৪৩–৪৫আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)নেতাজির 'দিল্লি চলো' সামরিক অভিযান; ঝাঁসির রানি নারী রেজিমেন্ট ও স্বাধীনতা যুদ্ধ।
১৯৪৫–৪৬লালকেল্লার বিচার ও নৌবিদ্রোহআইএনএ বিচারের প্রতিবাদ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তলোয়ার জাহাজে ২০,০০০ নৌসেনার বিদ্রোহ।
১৯৪৭ভারতের স্বাধীনতা লাভ১৫ আগস্ট ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।
গান্ধীবাদী সত্যাগ্রহের ত্রিমুখী মৌলিক সূত্র
$$আত্মবল (Moral Soul-Force) ঔপনিবেশিক সামরিক বাহুবল (Brute Imperial Force)$$
সত্যাগ্রহী কখনো প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করে না; নিজের কষ্ট বরণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের বিবেকের শুভ চেতনাকে জাগ্রত করে।
তিনটি প্রধান গান্ধীবাদী গণআন্দোলনের তুলনামূলক মেট্রিক্স
$$ব্যবস্থা বর্জন ⇒ আইন ভঙ্গ ⇒ চূড়ান্ত উচ্ছেদ ('করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে')$$
বিষয়অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০–২২)আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০–৩৪)ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২–৪৪)
মূল লক্ষ্য১ বছরে স্বরাজ অর্জন ও পাঞ্জাব-খিলাফতের প্রতিকারপূর্ণ স্বরাজ (সম্পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ)ব্রিটিশ শাসনের অবিলম্বে নিঃশর্ত প্রস্থান ('ভারত ছাড়ো')
প্রধান কৌশলব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আদালত ও বস্ত্র বর্জনসুনির্দিষ্ট অন্যায্য ঔপনিবেশিক আইন (লবণ, বন, ট্যাক্স) অমান্যব্যাপক গণঅভ্যুত্থান, সমান্তরাল সরকার, স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট
নেতৃত্বের ধরনসম্পূর্ণ গান্ধীজি নিয়ন্ত্রিত ও কেন্দ্রীভূতগান্ধীজি নিয়ন্ত্রিত হলেও আঞ্চলিক নেতৃত্ব সক্রিয়নেতৃত্বহীন; তরুণ ছাত্র ও স্থানীয় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম
নারীদের অংশগ্রহণচরকায় সুতো কাটা, খাদি ও পিকেটিংব্যাপক মিছিল, লবণ তৈরি, ধারাশনা অভিযানসশস্ত্র সংগ্রাম, আত্মবলিদান (মাতঙ্গিনী হাজরা), গুপ্ত বেতার
ব্রিটিশ প্রতিক্রিয়াগণগ্রেফতার (~৩০,০০০ কারারুদ্ধ)বর্বর লাঠিচার্জ, বিশেষ অধ্যাদেশ (~৯০,০০০ কারাদণ্ড)মেশিনগান ও বিমান থেকে গুলিবর্ষণ, পাইকারি জরিমানা
বিপ্লবী ধারার দুই কেন্দ্রবিন্দুর তুলনামূলক বিন্যাস
$$ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদ ⇔ মাস্টারদা সূর্য সেন ও প্রীতিলতা$$
উভয় ধারাই ব্রিটিশের সঙ্গে আপস প্রত্যাখ্যান করেছিল; উত্তর ভারতে আদর্শিক সাম্যবাদ এবং বাংলায় দুর্ধর্ষ গেরিলা যুদ্ধের বিকাশ ঘটেছিল।
স্বরাজ্য দলের আইনসভা প্রতিরোধ সমীকরণ (১৯২৩–১৯২৬)
$$দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ + মতিলাল নেহরু ⇒ দ্বৈত শাসন অচল করে তোলা$$
বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩)-এর মাধ্যমে দেশবন্ধু দেখিয়েছিলেন যে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যই ভারতের জাতীয় মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি।
তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো (১৯৪২–১৯৪৪)
$$তমলুক মহকুমা, মেদিনীপুর ⇒ ২১ মাস ধরে স্বাধীন জাতীয় শাসন$$
এই সরকারের আত্মত্যাগের মহানতম শিখর ছিলেন ৭৩ বছর বয়সী বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা।
আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA) সমর ও রাজনৈতিক রণকৌশল (১৯৪৩–১৯৪৫)
$$'দিল্লি চলো' + 'তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি স্বাধীনতা দেব' ⇒ 'জয় হিন্দ'$$
যুদ্ধোত্তর লালকেল্লার বিচার ভারতীয় সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর আনুগত্যে চিড় ধরিয়ে ব্রিটিশ বিদায় নিশ্চিত করে।
সাংবিধানিক দাবির বিবর্তন ভেক্টর (১৮৮৫–১৯৪৭)
$$প্রার্থনা ও সভা ⇒ বয়কট ও খাদি ⇒ আইন অমান্য ⇒ সার্বভৌম স্বাধীন প্রজাতন্ত্র (১৯৪৭)$$
লাহোর অধিবেশনে (১৯২৯) গৃহীত 'পূর্ণ স্বরাজ' সংকল্পই স্বাধীনোত্তর ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধানের আত্মিক উৎস।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
১৯১৭ সালের চম্পারণ সত্যাগ্রহকে কেন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে গান্ধীজির প্রথম সফল পরীক্ষা হিসেবে গণ্য করা হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ঐতিহাসিক পটভূমি: বিহারের চম্পারণে কৃষকরা তিনকাঠিয়া প্রথার অধীনে জমির ৩/২০ অংশে নীল চাষ করতে বাধ্য ছিল এবং কৃত্রিম নীলের আবিষ্কারের পর নীলকররা চুক্তি মুক্তির নামে বেআইনি কর আদায় করছিল।

নির্ভীক আইন অমান্য: ম্যাজিস্ট্রেটের এলাকা ত্যাগের সরকারি নির্দেশ অমান্য করে গান্ধীজি বিবেকের উচ্চতর আদালতের নির্দেশ পালনের কথা বলেন, যা ছিল ভারতে প্রথম প্রকাশ্য আইন অমান্য।

কৃষকদের ভয়মুক্তি: হাজার হাজার দরিদ্র রায়ত গান্ধীজির সমর্থনে সমবেত হয়ে নীলকরদের বিরুদ্ধে নির্ভয়ে সাক্ষ্য দেয় এবং তাদের বহু দশকের ভীতি কেটে যায়।

চূড়ান্ত ফলাফল: সরকারি তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে তিনকাঠিয়া প্রথা চিরতরে রদ হয় এবং আদায় করা বেআইনি অর্থের ২৫% কৃষকদের ফেরত দেওয়া হয়।

উদাহরণ 2
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর বড়লাটকে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড ত্যাগের চিঠিটির নৈতিক ও জাতীয় গুরুত্ব কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

বর্বরতার প্রেক্ষাপট: ১৩ এপ্রিল ১৯১৯ অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে জেনারেল ডায়ার অবরুদ্ধ নিরপরাধ জনতার ওপর গুলি চালিয়ে ১,০০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করে।

প্রতিবাদের ভাষা: ৩১ মে ১৯১৯ রবীন্দ্রনাথ বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে চিঠি লিখে জানান যে অবমাননার এই বৈসাদৃশ্যে সম্মানের তকমাগুলি আমাদের লজ্জাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।

সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো: তিনি সমস্ত বিশেষ রাজকীয় মর্যাদা বর্জন করে দেশের কোটি কোটি সাধারণ শোষিত ও অপমানিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান।

আন্তর্জাতিক প্রভাব: এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী কবির এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ সমগ্র বিশ্বমঞ্চে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের তথাকথিত 'সভ্য শাসনের' মুখোশ খুলে দেয়।

উদাহরণ 3
১৯২২ সালে চৌরিচৌরার ঘটনার পর দেশজুড়ে চরম বিরোধিতা সত্ত্বেও মহাত্মা গান্ধী কেন অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

হিংসাত্মক ঘটনা: ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২ চৌরিচৌরায় উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন লাগিয়ে ২২ জন পুলিশকর্মীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারে।

সত্যাগ্রহের মূলনীতি: গান্ধীজির কাছে অহিংসা কোনো সুবিধাবাদী কৌশল ছিল না, তা ছিল এক আপসহীন আধ্যাত্মিক ব্রত। হিংসার মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা জনগণের মুক্তির পথ হতে পারে না।

সাম্রাজ্যবাদী দমনের আশঙ্কা: গান্ধীজি বিচক্ষণতার সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন যে আন্দোলন হিংসাত্মক হলে ব্রিটিশ সরকার সেনা নামিয়ে হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে আন্দোলন ধূলিসাৎ করে দেবে।

বারদোলি সিদ্ধান্ত: নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও ১২ ফেব্রুয়ারি বারদোলিতে আন্দোলন প্রত্যাহার করে তিনি আন্দোলনের নৈতিক পবিত্রতা ও দীর্ঘমেয়াদী সংগঠন রক্ষা করেন।

উদাহরণ 4
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট কীভাবে ঔপনিবেশিক বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মডেল তৈরি করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

অসহযোগ পরবর্তী সংকট: অসহযোগ প্রত্যাহার ও খিলাফৎ অবসানের পর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হচ্ছিল।

দেশবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা: চিত্তরঞ্জন দাশ স্পষ্ট বুঝেছিলেন যে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে অংশীদারিত্ব না দিলে স্বাধীনতা সংগ্রাম কখনোই সফল হতে পারে না।

চুক্তির মূল ধারা: চুক্তিতে প্রস্তাব করা হয় যে স্বরাজ অর্জিত হলে বাংলায় মুসলিমরা জনসংখ্যানুপাতে ৫৫% সরকারি চাকরি এবং ৬০% স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের আসন পাবে।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য: সর্বভারতীয় কংগ্রেস নেতাদের বিরোধিতায় চুক্তিটি শেষপর্যন্ত খারিজ হলেও এটি প্রমাণ করেছিল যে পারস্পরিক আস্থা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক ঐক্য সম্ভব।

উদাহরণ 5
মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কেন ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের সবচেয়ে সংগঠিত ও দুঃসাহসী অভিযান?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সুপরিকল্পিত আক্রমণ: ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে ৬৫ জন বিপ্লবী অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে পুলিশ লাইন ও অক্সিলিয়ারি ফোর্সের দুটি প্রধান অস্ত্রাগার দখল করেন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: বিপ্লবীরা টেলিফোন ও টেলিগ্রাফের তার কেটে এবং রেললাইন উপড়ে ফেলে চট্টগ্রামকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।

বিপ্লবী সরকার ঘোষণা: অস্ত্রাগার চত্বরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মাস্টারদা অন্তর্বর্তীকালীন স্বাধীন বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন।

জালালাবাদের সম্মুখযুদ্ধ: ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে মেশিনগান সজ্জিত ব্রিটিশ সেনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ১২ জন বিপ্লবী বীরত্বের সাথে আত্মাহুতি দিয়ে যুদ্ধ করেন।

উদাহরণ 6
১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হিসেবে মহাত্মা গান্ধী লবণ করকে কেন বেছে নিয়েছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সর্বজনীন প্রয়োজনীয়তা: লবণ সমাজের ধনী, দরিদ্র, হিন্দু, মুসলিম, উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন আহার্যের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

ঔপনিবেশিক শোষণের প্রতীক: প্রকৃতির দেওয়া সমুদ্রজল থেকে লবণ তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা এবং তাতে চড়া কর ধার্য করা ছিল ব্রিটিশরাজের সবচেয়ে অমানবিক লোভের বহিঃপ্রকাশ।

প্রতীকের শক্তি: সবরমতী থেকে ডান্ডি পর্যন্ত ২৪০ মাইলের পদযাত্রা বিশ্বসংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন প্রচারিত হয়ে আন্দোলনকে এক মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছিল।

সহজ গণঅংশগ্রহণ: লবণ তৈরি করতে কোনো অস্ত্র বা বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ছিল না; সাধারণ নারী ও দরিদ্রতম কৃষকও সমুদ্রের জল ফুটিয়ে সত্যাগ্রহী হতে পেরেছিলেন।

উদাহরণ 7
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মদান কীভাবে গণসংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

প্রেক্ষাপট: ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের মানুষ নিজস্ব তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ও বিদ্যুৎবাহিনী গঠন করে স্বশাসনের লড়াই শুরু করেন।

মিছিলের নেতৃত্ব: ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তমলুক থানা অভিযানের সময় ৬,০০০ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের বিশাল মিছিলের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দেন ৭৩ বছরের বিধবা বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।

অবিচল দেশপ্রেম: পুলিশের প্রথম গুলিতে বাঁ হাত এবং দ্বিতীয় গুলিতে ডান হাত রক্তাক্ত হলেও তিনি তেরঙ্গা জাতীয় পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেননি।

অমর পরিণতি: কপালে তৃতীয় বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিয়ে তেরঙ্গা উঁচিয়ে রেখেছিলেন, যা তাঁকে 'গান্ধীবুড়ি' নামে ইতিহাসে অমর করেছে।

উদাহরণ 8
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ কীভাবে ব্রিটিশদের ভারতত্যাগে বাধ্য করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিভঙ্গ: ব্রিটিশরা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ভারতীয় সৈন্যদের বন্দুক ও আনুগত্যের জোরেই ভারতবর্ষ শাসন করে আসছিল।

আজাদ হিন্দ ফৌজের আঘাত: নেতাজির আইএনএ প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় সৈন্যরা দেশের মুক্তির জন্য ব্রিটিশ সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে পারে।

লালকেল্লার বিচার ও গণজোয়ার: সায়গল, ধিলন ও শাহনওয়াজের বিচার গোটা ভারতীয় সেনাবাহিনীকে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগে উদ্বেলিত করে তোলে।

নৌবিদ্রোহের চূড়ান্ত আঘাত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ বোম্বাইয়ের তলোয়ার জাহাজে ২০,০০০ নৌসেনার বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে সামরিক আনুগত্য চিরতরে ভেঙে গেছে, ফলে দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া ব্রিটেনের আর কোনো উপায় ছিল না।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০) এবং আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০)-এর উদ্দেশ্যের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অসহযোগ আন্দোলন ছিল সরকারি প্রতিষ্ঠান (স্কুল, আদালত, নির্বাচন, বস্ত্র) বর্জনের আন্দোলন। আর আইন অমান্য ছিল সক্রিয়ভাবে ব্রিটিশের অন্যায্য আইন (যেমন লবণ আইন, বন আইন, ট্যাক্স) অমান্য করার আন্দোলন।

সাধারণ ভুল ধারণা

চৌরিচৌরা (১৯২২) এবং চম্পারণ (১৯১৭)-এর স্থান ও প্রেক্ষাপট এক মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

চম্পারণ হলো বিহারে, যেখানে ১৯১৭ সালে নীলকরদের তিনকাঠিয়া প্রথার বিরুদ্ধে গান্ধীজি অহিংস সত্যাগ্রহ করেছিলেন। আর চৌরিচৌরা হলো উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুরে, যেখানে ১৯২২ সালে উত্তেজিত জনতা থানায় আগুন দিয়েছিল।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৯২০ সালের 'স্বরাজ' এবং ১৯২৯ সালের 'পূর্ণ স্বরাজ'-এর মধ্যে পার্থক্য না বোঝা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৯২০ সালে স্বরাজ বলতে বোঝানো হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে স্বায়ত্তশাসন (ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস)। আর ১৯২৯ সালের লাহোর কংগ্রেসে প্রথমবার ঔপনিবেশিক সম্পর্ক ছিন্ন করে 'পূর্ণ স্বরাজ' বা সম্পূর্ণ স্বাধীনতাকে কংগ্রেসের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

স্বরাজ্য দল (১৯২৩) এবং ফরোয়ার্ড ব্লক (১৯৩৯)-কে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

স্বরাজ্য দল গঠন করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহরু ১৯২৩ সালে আইনসভায় প্রবেশের উদ্দেশ্যে। আর ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে বামপন্থী ঐক্য গড়ার জন্য।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে পুনা চুক্তির (১৯৩২) মাধ্যমে দলিতদের পৃথক নির্বাচন দেওয়া হয়েছিল।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারায় দলিতদের পৃথক নির্বাচন দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধেই গান্ধীজি অনশন করেন। গান্ধী ও আম্বেদকরের পুনা চুক্তির ফলে পৃথক নির্বাচন বাতিল হয় এবং যৌথ নির্বাচনের মধ্যে দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসন দ্বিগুণ করা হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

বিপ্লবী দেশপ্রেমিকদের ব্রিটিশদের মতো 'সন্ত্রাসবাদী' আখ্যা দেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ঔপনিবেশিক 'সন্ত্রাসবাদী' শব্দটি পুরোপুরি বর্জন করেছে। তাঁদের যথাযথ সম্মান দিয়ে 'বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী' বা 'বিপ্লবী দেশপ্রেমিক' লিখতে হবে।

সাধারণ ভুল ধারণা

মনে করা যে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু প্রথম আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আজাদ হিন্দ ফৌজ মূলত ১৯৪২ সালে ক্যাপ্টেন মোহন সিং ও রাসবিহারী বসুর উদ্যোগে গঠিত হয়। নেতাজি ১৯৪৩ সালের জুলাইয়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে এর সর্বাধিনায়ক হন এবং এটিকে এক অপরাজেয় সামরিক বাহিনীতে রূপ দেন।

ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন (১৯১৫–১৯৪৭) – সময়পঞ্জি ও বিবর্তনধারা

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ • অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ৭ ধারণা মানচিত্র ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন (১৯১৫–১৯৪৭) অতীত ও ঐতিহ্য প্রথম পর্ব (১৯১৫–১৯) গান্ধীবাদী উন্মেষ সত্যাগ্রহ ও প্রাথমিক জাগরণ সত্যাগ্রহের আদর্শ • সত্য ও অহিংসার আত্মিক বল • অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্ভীক প্রতিবাদ আঞ্চলিক সত্যাগ্রহ • ১৯১৭: চম্পারণের তিনকাঠিয়া প্রথা • ১৯১৮: আহমেদাবাদ মিল ধর্মঘট • ১৯১৮: খেড়া খাজনা মকুব সংগ্রাম ঔপনিবেশিক দমন • ১৯১৯: কুখ্যাত রাওলাট আইন • 'ন দলিল, ন অকিল, ন আপিল' • ৬ এপ্রিল সর্বভারতীয় সত্যাগ্রহ জালিয়ানওয়ালাবাগ (১৯১৯) ১৩ এপ্রিল অমৃতসরে ডায়ারের নারকীয় বর্বর হত্যাকাণ্ড; প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাইটহুড উপাধি ত্যাগ। দ্বিতীয় পর্ব (১৯২০–২৯) গণআন্দোলনের জোয়ার অসহযোগ থেকে পূর্ণ স্বরাজ অসহযোগ আন্দোলন • খিলাফৎ ও জাতীয় কংগ্রেস ঐক্য • বিলিতি পণ্য ও আদালত বর্জন চৌরিচৌরা ও প্রত্যাহার • ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২২: থানা ভস্মীভূত • অহিংসার নীতিতে গান্ধীজির বিরতি • কংগ্রেসের ভেতর তীব্র মতপার্থক্য স্বরাজ্য দল ও বাংলা • ১৯২৩: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ • আইনসভায় ঢুকে প্রতিরোধ নীতি • ঐতিহাসিক বেঙ্গল প্যাক্ট (১৯২৩) ১৯২৯: পূর্ণ স্বরাজের শপথ সাইমন কমিশন বর্জন আন্দোলন; লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি ও ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০ প্রথম স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন। তৃতীয় পর্ব (১৯৩০–৩৯) প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ লবণ সত্যাগ্রহ ও বিপ্লবী বহ্নি ডান্ডি লবণ সত্যাগ্রহ • ১২ মার্চ–৬ এপ্রিল ১৯৩০ ডান্ডি যাত্রা • অন্যায় ব্রিটিশ লবণ আইন ভঙ্গ বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ • মাস্টারদা সূর্য সেন (চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার) • প্রীতিলতা ও কল্পনা দত্তের আত্মত্যাগ • ভগৎ সিং ও এইচএসআরএ আত্মদান গোলটেবিল ও পুনা চুক্তি • ১৯৩১: গান্ধী-আরউইন সমঝোতা • ১৯৩২: সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা • গান্ধী-আম্বেদকর পুনা চুক্তি ১৯৩৫ আইন ও বামপন্থা ১৯৩৭ নির্বাচন ও কংগ্রেস সরকার; কিষাণ সভা ও শ্রমিক আন্দোলন; সুভাষচন্দ্র বসুর ত্রিপুরী জয় ও ১৯৩৯-এ ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন। চতুর্থ পর্ব (১৯৪২–৪৭) চূড়ান্ত আঘাত ভারত ছাড়ো ও সশস্ত্র মুক্তি ভারত ছাড়ো আন্দোলন • ৮ আগস্ট ১৯৪২: 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' • নেতৃত্বহীন তীব্র স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার • মেদিনীপুরের সমান্তরাল প্রশাসন • ৭৩ বছরের মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মদান • সতীশ সামন্ত ও বিদ্যুৎবাহিনী নেতাজি ও আজাদ হিন্দ • সিঙ্গাপুর ১৯৪৩: 'দিল্লি চলো' • ইম্ফল-কোহিমায় সামরিক অভিযান • লালকেল্লার বিচার ও জনবিক্ষোভ ১৯৪৬: নৌবিদ্রোহ ও স্বাধীনতা কলকাতায় রশিদ আলি দিবস; বোম্বাইয়ের তলোয়ার জাহাজে ঐতিহাসিক নৌবিদ্রোহ; ব্রিটিশের পলায়ন ও স্বাধীনতা লাভ (১৯৪৭)। ১৯১৫–১৯: সত্যাগ্রহ ১৯২০–২৯: গণআন্দোলনের বিস্তার ১৯৩০–৩৯: আইন অমান্য ও বিপ্লবী ধারা ১৯৪২–৪৭: ভারত ছাড়ো ও আজাদ হিন্দ

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে মহাত্মা গান্ধী সত্য ও অহিংসার আত্মিক বলের 'সত্যাগ্রহ' আদর্শের মাধ্যমে চম্পারণ (১৯১৭), আহমেদাবাদ ও খেড়ায় (১৯১৮) কৃষক-শ্রমিক আন্দোলন সফল করেন।
মূল বিষয় 2
২. দমনমূলক রাওলাট আইন (১৯১৯) এবং ১৩ এপ্রিলের নৃশংস জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর রাজকীয় নাইটহুড উপাধি বর্জন করেন।
মূল বিষয় 3
৩. প্রথম সর্বভারতীয় গণআন্দোলন হিসেবে অসহযোগ ও খিলাফৎ আন্দোলন (১৯২০–২২) শুরু হয়; চৌরিচৌরার হিংসার পর গান্ধীজি আন্দোলন প্রত্যাহার করলে স্বরাজ্য দল গঠিত হয় এবং বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরিত হয়।
মূল বিষয় 4
৪. দ্বিতীয় পর্বে ভগৎ সিং ও চন্দ্রশেখর আজাদের এইচএসআরএ এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও প্রীতিলতা-কল্পনা দত্তের আত্মত্যাগে বিপ্লবী জাতীয়তাবাদ নতুন শিখর স্পর্শ করে।
মূল বিষয় 5
৫. ১৯২৯-এর লাহোর কংগ্রেসে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে 'পূর্ণ স্বরাজ' ঘোষিত হয় এবং ১৯৩০-এর ডান্ডি লবণ পদযাত্রার মধ্য দিয়ে আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা ঘটে যা পুনা চুক্তিতে রূপ নেয়।
মূল বিষয় 6
৬. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ১৯৩৯-এ সুভাষচন্দ্র বসু ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন এবং ১৯৪২-এ গান্ধীজির 'করেঙ্গে অথবা মরেঙ্গে' মন্ত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হয়।
মূল বিষয় 7
৭. মেদিনীপুরের তমলুকে গড়ে ওঠে স্বাধীন সমান্তরাল তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার এবং তেরঙ্গা পতাকা হাতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ৭৩ বছরের বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা।
মূল বিষয় 8
৮. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA)-এর সামরিক অভিযান, লালকেল্লার বিচার এবং ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত চূর্ণ করে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা এনে দেয়।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
আইন অমান্য আন্দোলনের সূচনা হিসেবে মহাত্মা গান্ধী কেন লবণ করকেই প্রধান মাধ্যম করেছিলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

গান্ধীজির লবণ বেছে নেওয়ার কারণ ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী ও রাজনৈতিকভাবে জিনিয়াস:

  1. সর্বজনীন অপরিহার্যতা: লবণ ধনী-দরিদ্র, হিন্দু-মুসলিম, বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র অবিচ্ছেদ্য জৈবিক উপাদান।
  2. ঔপনিবেশিক শোষণের নগ্ন রূপ: প্রকৃতির দেওয়া মুক্ত সমুদ্রের জল থেকে লবণ তৈরির অধিকার কেড়ে নিয়ে তাতে কর বসানো ছিল ব্রিটিশরাজের নির্মম লোভের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত।
  3. সহজ গণঅংশগ্রহণ: লবণ তৈরি করতে কোনো অস্ত্র বা বিশেষ প্রশিক্ষণের দরকার ছিল না; সাধারণ কৃষক ও নারীরা ঘরের মাটির পাত্রে সমুদ্রজল ফুটিয়েই সরাসরি আইন ভঙ্গকারী সত্যাগ্রহী হয়ে উঠতে পারতেন।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের (অধ্যায় ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
2
১৯২৯ সালের ঐতিহাসিক লাহোর কংগ্রেস অধিবেশনের গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৯২৯-এর লাহোর অধিবেশন তিনটি কারণে আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়:

  • পূর্ণ স্বরাজ প্রস্তাব: পূর্ববর্তী আপসমূলক 'ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস'-এর দাবি বাতিল করে প্রথমবারের মতো 'পূর্ণ স্বরাজ' (সম্পূর্ণ স্বাধীনতা)-কে কংগ্রেসের একমাত্র লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়।
  • তেরঙ্গা উত্তোলন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯২৯ মধ্যরাতে ইরাবতী নদীর তীরে স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।
  • ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস: প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারিকে 'স্বাধীনতা দিবস' হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যার স্মরণে পরবর্তীতে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান কার্যকর করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের (অধ্যায় ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
3
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও বিপ্লবী আন্দোলনে বাংলার নারীদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে নারীদের ভূমিকা ছিল বৈপ্লবিক ও অভূতপূর্ব:

  • প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: মাস্টারদার নির্দেশে ১৯৩২ সালে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে সফল সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করেন। আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে বন্দি না হওয়ার জন্য সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন এবং ভারতের প্রথম মহিলা বিপ্লবী শহীদ হন।
  • কল্পনা দত্ত: অস্ত্র পরিবহন ও বোমা তৈরির কাজ করেন, পুরুষের বেশে মাস্টারদার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেন।
  • বীণা দাস: ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে প্রকাশ্য মঞ্চে গুলি চালান।
  • শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী: কুমিল্লার দুই কিশোরী স্কুলছাত্রী ১৯৩১ সালে অত্যাচারী ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট স্টিভেন্সকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করেন।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের (অধ্যায় ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
4
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের কৃতিত্ব ও মাতঙ্গিনী হাজরার আত্মদান সম্পর্কে লেখো।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১৯৪২ সালের ১৭ ডিসেম্বর মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশচন্দ্র সামন্তর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ছিল এক স্বাধীন সমান্তরাল প্রশাসন:

  1. স্বাধীন পরিচালনা: ব্রিটিশ প্রশাসনকে উচ্ছেদ করে দীর্ঘ ২১ মাস ধরে তমলুকে নিজস্ব আইন-শৃঙ্খলা ও জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা বজায় রাখে।
  2. বিদ্যুৎবাহিনী ও ভগিনী সেনা: যুবকদের নিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষাবাহিনী 'বিদ্যুৎবাহিনী' এবং নারীদের নিয়ে 'ভগিনী সেনা' গঠন করা হয়।
  3. মন্বন্তরে ত্রাণ: ১৯৪৩-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় ধনী জোতদারদের বাড়তি ধান বাজেয়াপ্ত করে ক্ষুধার্ত মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করে।
  4. মাতঙ্গিনী হাজরার বলিদান: ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৪২ তমলুক থানা অভিযানের সময় ৭৩ বছরের বৃদ্ধা বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা কপালে ও দুই হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েও তেরঙ্গা পতাকা উঁচিয়ে 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি দিতে দিতে শহীদ হন।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের (অধ্যায় ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
5
১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহ কীভাবে ব্রিটিশদের ভারতত্যাগের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:

১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বাইয়ের HMIS তলোয়ার জাহাজে শুরু হওয়া নৌবিদ্রোহ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়:

  • সামরিক আনুগত্যের বিনাশ: ব্রিটিশরা ভারতে রাজত্ব করত মূলত ভারতীয় সৈন্যদের বন্দুকের জোরে। ২০,০০০ নৌসেনা ৭৮টি যুদ্ধজাহাজ দখল করে বিদ্রোহ ঘোষণা করায় ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে ভারতীয় সেনাদের আর দেশবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না।
  • অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক ঐক্য: নৌসেনারা জাহাজে কংগ্রেসের তেরঙ্গা, মুসলিম লিগের চাঁদ-তারা এবং কমিউনিস্টদের লাল পতাকা একসঙ্গে উত্তোলন করে সাম্রাজ্যবাদী বিভেদনীতি ধ্বংস করে দেন।
  • তাৎক্ষণিক ব্রিটিশ পিছুহটা: নৌবিদ্রোহের পরদিনই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ভারতে ক্যাবিনেট মিশন পাঠানোর ঘোষণা দেন।

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের (অধ্যায় ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।