অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারতীয় ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের করমণ্ডল উপকূলবর্তী কর্ণাটক অঞ্চলে এই দুই ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা কর্ণাটকের যুদ্ধ (Carnatic Wars) নামে পরিচিত:
- প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৬–১৭৪৮): ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের প্রভাবে এই সংঘাত শুরু হয়। ফরাসি গভর্নর জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লে (Dupleix) মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গ দখল করেন। এই যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল সেন্ট থোমের যুদ্ধ (বা আদিয়ারের যুদ্ধ, ১৭৪৬), যেখানে আধুনিক কামান ও শৃঙ্খলায় সজ্জিত মাত্র কয়েকশো ফরাসি সৈন্য কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার-উদ্দিনের ১০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল ইউরোপীয় বন্দুকধারী বাহিনীর কাছে মধ্যযুগীয় ভারতীয় সেনাদল কতটা অসহায়। ১৭৪৮ সালে আই-লা-শাপেলের সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
- দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৯–১৭৫৪): হায়দরাবাদের নিজাম ও কর্ণাটকের নবাব পদে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ডুপ্লে 'রাজা তৈরির খেলায়' (Kingmaker) নামেন। তিনি হায়দরাবাদে মুজাফফর জঙ্গ এবং কর্ণাটকে চাঁদা সাহেবকে সমর্থন করেন। কিন্তু ইংরেজ সেনাপতি তরুণ রবার্ট ক্লাইভ অসামান্য রণকুশলতা দেখিয়ে মাত্র ৫০০ সৈন্য নিয়ে আরকট (১৭৫১) দখল ও রক্ষা করেন। ফরাসি সরকার ১৭৫৪ সালে ডুপ্লেকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে নিলে ফরাসিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
- তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৫৬–১৭৬৩): ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের কারণে এই যুদ্ধ বাধে। ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট দ্য লালি ভারতে আসেন। ১৭৬০ সালে সংঘটিত বিখ্যাত বন্দিবাসের যুদ্ধে (Battle of Wandiwash) ব্রিটিশ সেনাপতি স্যার আয়ার কূট ফরাসি বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে বিধ্বস্ত করেন। ১৭৬৩ সালের প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে ফরাসিদের সমস্ত দুর্গ ভেঙে কেবল বাণিজ্য করার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে ভারতে ব্রিটিশদের একমাত্র ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসি শক্তির রাজনৈতিক স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে বাংলার বিচক্ষণ নবাব আলিবর্দি খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি তাঁর প্রিয় দৌহিত্র তেইশ বছর বয়সী সিরাজউদ্দৌলাকে মুর্শিদাবাদের মসনদে মনোনীত করেন। কিন্তু তরুণ নবাবের সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গেই রাজপরিবারে তীব্র বিরোধ ও ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত হয়:
- ঘসেটি বেগম (মেহেরুন্নিসা): সিরাজের জ্যেষ্ঠা খালা, যিনি মতিঝিল প্রাসাদ থেকে দেওয়ান রাজবল্লভের সাহায্যে সিরাজবিরোধী চক্রান্ত চালাতে থাকেন।
- শওকত জঙ্গ: সিরাজের খালাতো ভাই এবং পূর্ণিয়ার নবাব, যিনি নিজেকে বাংলার মসনদের আসল দাবিদার মনে করতেন।
- মির জাফর আলি খান: আলিবর্দি খাঁর ভগ্নিপতি এবং বাংলার প্রধান সেনাপতি (বখশি), যিনি গোপনে নবাব হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করছিলেন।
সিরাজ দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি মতিঝিল দখল করে ঘসেটি বেগমকে নজরবন্দি করেন এবং ১৭৫৬ সালের অক্টোবর মাসে মণিহারির যুদ্ধে শওকত জঙ্গকে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যারা সিরাজের শত্রুদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখছিল।
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধের মূল কারণ ছিল তিনটি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী বিষয়:
- দস্তকের চরম অপব্যবহার (Misuse of Dastak): ১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুকশিয়ার কোম্পানিকে বিনা শুল্কে বৈদেশিক বাণিজ্যের ছাড়পত্র বা দস্তক দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা বেআইনিভাবে এই দস্তক নিজেদের ব্যক্তিগত অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যবহার করতে থাকে এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করতে থাকে। ফলে নবাবের রাজকোষ বিশাল শুল্ক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ে।
- ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের অবৈধ প্রাচীর নির্মাণ: ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সম্ভাবনায় ইংরেজরা কলকাতায় এবং ফরাসিরা চন্দননগরে নিজ নিজ দুর্গের চারদিকে পরিখা খনন ও তোপখানা স্থাপন শুরু করে। সিরাজ উভয় পক্ষকেই অবিলম্বে দুর্গ সংস্কার বন্ধের নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের নির্দেশ মানলেও ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দুর্গ প্রাচীর নির্মাণ অব্যাহত রাখেন।
- রাজদ্রোহী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: ঢাকার প্রাক্তন দেওয়ান রাজবল্লভের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠলে তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাস রাজকোষের প্রচুর ধনরত্ন সহ পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। ইংরেজরা কৃষ্ণদাসকে ফোর্ট উইলিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং নবাবের দূত নারায়ণ দাসকে চর সন্দেহে তাড়িয়ে দিয়ে নবাবকে অপমানিত করে।
ইংরেজদের ক্রমাগত স্পর্ধায় ক্রুদ্ধ হয়ে সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের জুন মাসে সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে কাশিমবাজার কুঠি দখল করেন এবং ২০ জুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করেন। গভর্নর ড্রেক সহ ইংরেজ পদস্থ কর্তারা জাহাজ নিয়ে ফলতায় পালিয়ে যান। নবাব কলকাতার দায়িত্ব দেন তাঁর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে এবং দাদুর নামানুসারে কলকাতার নতুন নাম রাখেন আলিনগর (Alinagar)।
ফোর্ট উইলিয়াম পতনের পর ইংরেজ কর্মচারী জন যেফানিয়া হলওয়েল (J.Z. Holwell) একটি চাঞ্চল্যকর প্রচার চালান, যা ইতিহাসে অন্ধকূপ হত্যা (Black Hole Tragedy) নামে পরিচিত। তিনি দাবি করেন যে ২০ জুন রাতে নবাবের নির্দেশে ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে মাত্র ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি অন্ধকার কামরায় আটকে রাখা হয় এবং প্রচণ্ড গরমে দম আটকে পরদিন সকালে ১২৩ জন মারা যান।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ভোলানাথ চন্দ্র, জে. এইচ. লিটল এবং আচার্য যদুনাথ সরকার গাণিতিক পরিমাপের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে ২৬৭ বর্গফুটের একটি ক্ষুদ্র কামরায় ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে শারীরিকভাবে প্রবেশ করানোই অসম্ভব। সমকালীন ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন গ্রন্থেও এই ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। প্রকৃতপক্ষে সিরাজউদ্দৌলাকে ইউরোপের চোখে এক বর্বর ও নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিত্রিত করে ভারতে ইংরেজদের সামরিক আগ্রাসনকে নৈতিকভাবে বৈধ করার লক্ষ্যেই হলওয়েল এই কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত কাহিনি রচনা করেছিলেন।
কলকাতার পতনের খবর মাদ্রাজে পৌঁছলে রবার্ট ক্লাইভ এবং নৌ-সেনাপতি চার্লস ওয়াটসনের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী বাহিনী বাংলায় আসে। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারিতে ক্লাইভ নবাবের অনুগত সেনাপতি মানিকচাঁদকে ঘুষ দিয়ে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই কলকাতা পুনর্দখল করেন এবং হুগলি শহর লুণ্ঠন করেন।
এদিকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আফগান নেতা আহমেদ শাহ আবদালির ভারত আক্রমণের ভয়ে ভীত হয়ে সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আলিনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্তানুযায়ী:
- ১৭১৭ সালের ফারুকশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী কোম্পানির সমস্ত বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা পুনরায় বহাল হয়।
- ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও সুরক্ষিত করার পূর্ণ অনুমতি পায়।
- কোম্পানিকে নিজস্ব নামাঙ্কিত মুদ্রা (সিক্কা) তৈরির সার্বভৌম অধিকার দেওয়া হয়।
- কলকাতায় ইংরেজদের যে ক্ষতি হয়েছিল তার জন্য নবাব ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন।
আলিনগরের সন্ধি ছিল নবাবের এক বিরাট নৈতিক ও কৌশলগত পরাজয়। সন্ধির মাত্র এক মাসের মধ্যে ক্লাইভ ফরাসি বাণিজ্য ঘাঁটি চন্দননগর দখল করে নেন, ফলে সিরাজ ফরাসিদের সামরিক সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হন।