Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 3
আনুমানিক সময়: 65 মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

Establishment of Colonial Authority

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস (অতীত ও ঐতিহ্য) পাঠ্যক্রমের তৃতীয় অধ্যায় 'ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা' (Establishment of Colonial Authority)-র সম্পূর্ণ ও প্রামাণ্য স্টাডি গাইড। এই অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি নিছক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। এতে কর্ণাটকের তিনটি যুদ্ধ, সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজদের সংঘাত, অন্ধকূপ হত্যার ঐতিহাসিক অপপ্রচার ও আলিনগরের সন্ধি পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচিত হয়েছে। বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে পলাশীর ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ (১৭৫৭), মির জাফরের পুতুল শাসন এবং বাংলার কোষাগার নিঃশেষকারী 'পলাশী লুণ্ঠন'। এরপর মির কাসিমের রাজধানী স্থানান্তর ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্য ঘোষণা, বক্সারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ (১৭৬৪), সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের থেকে দেওয়ানি সনদ লাভ (১৭৬৫) এবং রবার্ট ক্লাইভের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ভয়াবহ কুফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরিশেষে ঔপনিবেশিক শাসনের চার মূল স্তম্ভ—সিভিল সার্ভিস, সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও বিচার বিভাগ—এবং সাম্রাজ্য বিস্তারে লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি, লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি ও ১৮৫৬ সালের অযোধ্যা অধিগ্রহণের ঐতিহাসিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

কীভাবে লন্ডনের একদল বণিকের বাণিজ্যিক যৌথ মূলধনী কোম্পানি, যারা একসময় মুঘল সম্রাটের কাছে বিনম্রভাবে সামান্য বাণিজ্যের ফরমান প্রার্থনা করত, তারা মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে বাংলার নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করে, উত্তর ভারতের যৌথ বাহিনীকে পরাস্ত করে এবং সমগ্র উপমহাদেশের ত্রিশ কোটি মানুষের ওপর একটি কঠোর আমলাতান্ত্রিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি অনুধাবন করতে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কীভাবে একটি বহিরাগত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষের সবচেয়ে সমৃদ্ধ প্রদেশ বাংলাকে পদানত করেছিল এবং পরে সেই বাংলাকে ভিত্তি করে সারা ভারতে সাম্রাজ্যবাদী জাল বিস্তার করেছিল, তা এই অধ্যায় থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। কর্নওয়ালিস, হেস্টিংস, ওয়েলেসলি এবং ডালহৌসির প্রশাসনিক ও সাম্রাজ্যবাদী নীতিগুলি ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে এই পাঠ শিক্ষার্থীদের সাম্রাজ্যবাদী শোষণের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি উন্মোচন করতে শেখায়।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার অবক্ষয় এবং মুর্শিদকুলি খান ও আলিবর্দি খানের নেতৃত্বে বাংলার স্বশাসিত আঞ্চলিক শক্তির বিকাশ
  • ভারতে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ইংরেজ ও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠির প্রতিষ্ঠা ও ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
  • ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ারের ফরমান এবং ইংরেজ কোম্পানির বাৎসরিক ৩,০০০ টাকার বিনিময়ে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের ছাড়পত্র (দস্তক) প্রাপ্তি

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • কর্ণাটকের তিনটি যুদ্ধ (১৭৪৬-১৭৬৩), ডুপ্লে ও ক্লাইভের দ্বৈরথ এবং বন্দিবাসের যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতে ফরাসি আধিপত্য অবসানের কারণ ও ফলাফল বিশ্লেষণ করতে পারা।
  • নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির সংঘাতের কারণসমূহ (দস্তকের অপব্যবহার, ফোর্ট উইলিয়ামের দুর্গনির্মাণ, কৃষ্ণদাসকে আশ্রয়), অন্ধকূপ হত্যা বিতর্ক এবং আলিনগরের সন্ধির গুরুত্ব পর্যালোচনা করতে পারা।
  • পলাশীর যুদ্ধের (২৩ জুন ১৭৫৭) ষড়যন্ত্র, যুদ্ধক্ষেত্রের নাটকীয় ঘটনাবলি ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং পুতুল নবাব মির জাফরের আমলে সংঘটিত 'পলাশী লুণ্ঠন'-এর স্বরূপ উদ্ঘাটন করতে পারা।
  • মির কাসিমের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, বক্সারের যুদ্ধের (১৭৬৪) সর্বভারতীয় রাজনৈতিক গুরুত্ব, দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫) এবং রবার্ট ক্লাইভের ক্ষতিকর দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করতে পারা।
  • ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চার প্রশাসনিক স্তম্ভ—সিভিল সার্ভিস, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা—এবং ১৭৭৩-এর রেগুলেটিং অ্যাক্ট ও ১৭৯৩-এর কর্নওয়ালিস কোডের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • আগ্রাসী সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি: লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (১৭৯৮) এবং লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি (১৮৪৮) ও ১৮৫৬ সালে কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা অধিগ্রহণের পটভূমি ও ফলাফল বিচার করতে পারা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: কর্ণাটকের যুদ্ধ ও বাংলার স...
2 মডিউল ২: পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ও 'পলা...
3 মডিউল ৩: মির কাসিম, বক্সারের যুদ্ধ...
4 মডিউল ৪: ঔপনিবেশিক শাসনের চার প্রশা...
5 মডিউল ৫: আগ্রাসী সাম্রাজ্য বিস্তার...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: কর্ণাটকের যুদ্ধ ও বাংলার সার্বভৌমত্বের অবসান (১৭৪৬–১৭৫৭)

১.১ ইংরেজ-ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কর্ণাটকের যুদ্ধসমূহ (১৭৪৬–১৭৬৩)

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপে ব্রিটিশ ও ফরাসিদের বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভারতীয় ভূখণ্ডেও ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ ভারতের করমণ্ডল উপকূলবর্তী কর্ণাটক অঞ্চলে এই দুই ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে তিনটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা কর্ণাটকের যুদ্ধ (Carnatic Wars) নামে পরিচিত:

  • প্রথম কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৬–১৭৪৮): ইউরোপে অস্ট্রিয়ার উত্তরাধিকার যুদ্ধের প্রভাবে এই সংঘাত শুরু হয়। ফরাসি গভর্নর জোসেফ ফ্রাঁসোয়া ডুপ্লে (Dupleix) মাদ্রাজের সেন্ট জর্জ দুর্গ দখল করেন। এই যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল সেন্ট থোমের যুদ্ধ (বা আদিয়ারের যুদ্ধ, ১৭৪৬), যেখানে আধুনিক কামান ও শৃঙ্খলায় সজ্জিত মাত্র কয়েকশো ফরাসি সৈন্য কর্ণাটকের নবাব আনোয়ার-উদ্দিনের ১০,০০০ অশ্বারোহী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে সুশৃঙ্খল ইউরোপীয় বন্দুকধারী বাহিনীর কাছে মধ্যযুগীয় ভারতীয় সেনাদল কতটা অসহায়। ১৭৪৮ সালে আই-লা-শাপেলের সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
  • দ্বিতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৯–১৭৫৪): হায়দরাবাদের নিজাম ও কর্ণাটকের নবাব পদে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে ডুপ্লে 'রাজা তৈরির খেলায়' (Kingmaker) নামেন। তিনি হায়দরাবাদে মুজাফফর জঙ্গ এবং কর্ণাটকে চাঁদা সাহেবকে সমর্থন করেন। কিন্তু ইংরেজ সেনাপতি তরুণ রবার্ট ক্লাইভ অসামান্য রণকুশলতা দেখিয়ে মাত্র ৫০০ সৈন্য নিয়ে আরকট (১৭৫১) দখল ও রক্ষা করেন। ফরাসি সরকার ১৭৫৪ সালে ডুপ্লেকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে নিলে ফরাসিদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
  • তৃতীয় কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৫৬–১৭৬৩): ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের কারণে এই যুদ্ধ বাধে। ফরাসি সেনাপতি কাউন্ট দ্য লালি ভারতে আসেন। ১৭৬০ সালে সংঘটিত বিখ্যাত বন্দিবাসের যুদ্ধে (Battle of Wandiwash) ব্রিটিশ সেনাপতি স্যার আয়ার কূট ফরাসি বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে বিধ্বস্ত করেন। ১৭৬৩ সালের প্যারিসের সন্ধির মাধ্যমে ফরাসিদের সমস্ত দুর্গ ভেঙে কেবল বাণিজ্য করার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে ভারতে ব্রিটিশদের একমাত্র ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসি শক্তির রাজনৈতিক স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
১.২ সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসন লাভ (১৭৫৬) ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্র

১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে বাংলার বিচক্ষণ নবাব আলিবর্দি খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় তিনি তাঁর প্রিয় দৌহিত্র তেইশ বছর বয়সী সিরাজউদ্দৌলাকে মুর্শিদাবাদের মসনদে মনোনীত করেন। কিন্তু তরুণ নবাবের সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গেই রাজপরিবারে তীব্র বিরোধ ও ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত হয়:

  1. ঘসেটি বেগম (মেহেরুন্নিসা): সিরাজের জ্যেষ্ঠা খালা, যিনি মতিঝিল প্রাসাদ থেকে দেওয়ান রাজবল্লভের সাহায্যে সিরাজবিরোধী চক্রান্ত চালাতে থাকেন।
  2. শওকত জঙ্গ: সিরাজের খালাতো ভাই এবং পূর্ণিয়ার নবাব, যিনি নিজেকে বাংলার মসনদের আসল দাবিদার মনে করতেন।
  3. মির জাফর আলি খান: আলিবর্দি খাঁর ভগ্নিপতি এবং বাংলার প্রধান সেনাপতি (বখশি), যিনি গোপনে নবাব হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করছিলেন।

সিরাজ দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি মতিঝিল দখল করে ঘসেটি বেগমকে নজরবন্দি করেন এবং ১৭৫৬ সালের অক্টোবর মাসে মণিহারির যুদ্ধে শওকত জঙ্গকে পরাজিত ও নিহত করেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শত্রু ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যারা সিরাজের শত্রুদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রাখছিল।

১.৩ সিরাজের সঙ্গে ইংরেজ কোম্পানির সংঘাতের কারণসমূহ

নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধের মূল কারণ ছিল তিনটি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী বিষয়:

সংঘাতের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র:
  • দস্তকের চরম অপব্যবহার (Misuse of Dastak): ১৭১৭ সালে সম্রাট ফারুকশিয়ার কোম্পানিকে বিনা শুল্কে বৈদেশিক বাণিজ্যের ছাড়পত্র বা দস্তক দিয়েছিলেন। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা বেআইনিভাবে এই দস্তক নিজেদের ব্যক্তিগত অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যে ব্যবহার করতে থাকে এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করতে থাকে। ফলে নবাবের রাজকোষ বিশাল শুল্ক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ে।
  • ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের অবৈধ প্রাচীর নির্মাণ: ইউরোপে সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সম্ভাবনায় ইংরেজরা কলকাতায় এবং ফরাসিরা চন্দননগরে নিজ নিজ দুর্গের চারদিকে পরিখা খনন ও তোপখানা স্থাপন শুরু করে। সিরাজ উভয় পক্ষকেই অবিলম্বে দুর্গ সংস্কার বন্ধের নির্দেশ দেন। ফরাসিরা নবাবের নির্দেশ মানলেও ইংরেজ গভর্নর রজার ড্রেক ঔদ্ধত্য দেখিয়ে দুর্গ প্রাচীর নির্মাণ অব্যাহত রাখেন।
  • রাজদ্রোহী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: ঢাকার প্রাক্তন দেওয়ান রাজবল্লভের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠলে তাঁর পুত্র কৃষ্ণদাস রাজকোষের প্রচুর ধনরত্ন সহ পালিয়ে কলকাতায় চলে যান। ইংরেজরা কৃষ্ণদাসকে ফোর্ট উইলিয়ামে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং নবাবের দূত নারায়ণ দাসকে চর সন্দেহে তাড়িয়ে দিয়ে নবাবকে অপমানিত করে।
১.৪ কলকাতা আক্রমণ ও অন্ধকূপ হত্যা বিতর্ক (Black Hole Tragedy)

ইংরেজদের ক্রমাগত স্পর্ধায় ক্রুদ্ধ হয়ে সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালের জুন মাসে সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে কাশিমবাজার কুঠি দখল করেন এবং ২০ জুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ অধিকার করেন। গভর্নর ড্রেক সহ ইংরেজ পদস্থ কর্তারা জাহাজ নিয়ে ফলতায় পালিয়ে যান। নবাব কলকাতার দায়িত্ব দেন তাঁর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে এবং দাদুর নামানুসারে কলকাতার নতুন নাম রাখেন আলিনগর (Alinagar)।

ফোর্ট উইলিয়াম পতনের পর ইংরেজ কর্মচারী জন যেফানিয়া হলওয়েল (J.Z. Holwell) একটি চাঞ্চল্যকর প্রচার চালান, যা ইতিহাসে অন্ধকূপ হত্যা (Black Hole Tragedy) নামে পরিচিত। তিনি দাবি করেন যে ২০ জুন রাতে নবাবের নির্দেশে ১৪৬ জন ইংরেজ বন্দিকে মাত্র ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি অন্ধকার কামরায় আটকে রাখা হয় এবং প্রচণ্ড গরমে দম আটকে পরদিন সকালে ১২৩ জন মারা যান।

আধুনিক ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে অন্ধকূপ হত্যার অসারতা:

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ভোলানাথ চন্দ্র, জে. এইচ. লিটল এবং আচার্য যদুনাথ সরকার গাণিতিক পরিমাপের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন যে ২৬৭ বর্গফুটের একটি ক্ষুদ্র কামরায় ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে শারীরিকভাবে প্রবেশ করানোই অসম্ভব। সমকালীন ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন গ্রন্থেও এই ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। প্রকৃতপক্ষে সিরাজউদ্দৌলাকে ইউরোপের চোখে এক বর্বর ও নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিত্রিত করে ভারতে ইংরেজদের সামরিক আগ্রাসনকে নৈতিকভাবে বৈধ করার লক্ষ্যেই হলওয়েল এই কাল্পনিক ও অতিরঞ্জিত কাহিনি রচনা করেছিলেন।

১.৫ কলকাতা পুনর্দখল ও আলিনগরের সন্ধি (৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭)

কলকাতার পতনের খবর মাদ্রাজে পৌঁছলে রবার্ট ক্লাইভ এবং নৌ-সেনাপতি চার্লস ওয়াটসনের নেতৃত্বে এক শক্তিশালী বাহিনী বাংলায় আসে। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারিতে ক্লাইভ নবাবের অনুগত সেনাপতি মানিকচাঁদকে ঘুষ দিয়ে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই কলকাতা পুনর্দখল করেন এবং হুগলি শহর লুণ্ঠন করেন।

এদিকে উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আফগান নেতা আহমেদ শাহ আবদালির ভারত আক্রমণের ভয়ে ভীত হয়ে সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আলিনগরের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এই সন্ধির শর্তানুযায়ী:

  • ১৭১৭ সালের ফারুকশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী কোম্পানির সমস্ত বাণিজ্যিক সুযোগ-সুবিধা পুনরায় বহাল হয়।
  • ইংরেজরা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার ও সুরক্ষিত করার পূর্ণ অনুমতি পায়।
  • কোম্পানিকে নিজস্ব নামাঙ্কিত মুদ্রা (সিক্কা) তৈরির সার্বভৌম অধিকার দেওয়া হয়।
  • কলকাতায় ইংরেজদের যে ক্ষতি হয়েছিল তার জন্য নবাব ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হন।

আলিনগরের সন্ধি ছিল নবাবের এক বিরাট নৈতিক ও কৌশলগত পরাজয়। সন্ধির মাত্র এক মাসের মধ্যে ক্লাইভ ফরাসি বাণিজ্য ঘাঁটি চন্দননগর দখল করে নেন, ফলে সিরাজ ফরাসিদের সামরিক সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হন।

মডিউল ২: পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) ও 'পলাশী লুণ্ঠন'

২.১ পলাশীর ষড়যন্ত্র (The Grand Conspiracy)

সিরাজউদ্দৌলাকে মসনদ থেকে সরিয়ে একজন অনুগত ক্রীড়নককে নবাব করার লক্ষ্যে রবার্ট ক্লাইভ এক গভীর ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করেন। এই চক্রান্তে মুর্শিদাবাদ দরবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত হন:

  1. মির জাফর আলি খান: নবাবের প্রধান সেনাপতি বা বখশি, যাঁকে মসনদে বসানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
  2. জগৎ শেঠ ভ্রাতৃদ্বয় (মহাতাব রাই ও স্বরূপ চাঁদ): ভারতের শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যাঙ্কার পরিবার, যাঁরা নবাবের অর্থদাবি ও আচরণে ক্ষুব্ধ ছিলেন।
  3. রায় দুর্লভ: নবাবের প্রধান কোষাধ্যক্ষ ও সেনাপতি।
  4. ইয়ার লতিফ খাঁ: সিরাজের অন্য এক দলপতি।
  5. উমিচাঁদ (Amir Chand): এক ধনী শিখ ব্যবসায়ী, যিনি ক্লাইভ ও দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। উমিচাঁদ ষড়যন্ত্রের কথা নবাবকে ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে নবাবের কোষাগারের ৫% এবং ৩০ লক্ষ টাকা দাবি করলে ক্লাইভ তাঁকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য লাল ও সাদা কাগজের চাতুরী করেন। লাল কাগজে (Lal Kagaj) ওয়াটসনের জাল সই দিয়ে উমিচাঁদের দাবি মেনে নেওয়া হয়, কিন্তু আসল সাদা চুক্তিতে তা রাখা হয়নি।
২.২ পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন ১৭৫৭ / Battle of Plassey)

মুর্শিদাবাদের প্রায় ৪০ কিমি দক্ষিণে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আমবাগানে (লক্ষবাগ) ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ঐতিহাসিক পলাশীর যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়:

  • উভয় পক্ষের শক্তিসাম্য: নবাবের পক্ষে ছিল প্রায় ৫০,০০০ সৈন্য (৩৫,০০০ পদাতিক ও ১৫,০০০ অশ্বারোহী) এবং ফরাসি গোলন্দাজ সিনফ্রের অধীনে ৫৩টি ভারী কামান। অপরদিকে রবার্ট ক্লাইভের সেনাদলে ছিল মাত্র ৩,০০০ সৈন্য (প্রায় ৯৫০ শ্বেতাঙ্গ, ১০০ গোলন্দাজ এবং ২,১০০ ভারতীয় সিপাহি)।
  • দেশপ্রেমিকদের প্রতিরোধ: যুদ্ধ শুরু হলে দেশপ্রেমিক সেনাপতি মির মদন (Mir Madan) এবং মোহন লাল (Mohan Lal) তীব্র গোলন্দাজ আক্রমণ চালিয়ে ক্লাইভের বাহিনীকে আমবাগানের পরিখার পেছনে পিছু হটতে বাধ্য করেন।
  • বৃষ্টি ও বিশ্বাসঘাতকতা: দুপুরবেলা প্রবল বৃষ্টিতে নবাবের বারুদ ও কামানের গোলা ভিজে অকেজো হয়ে যায়, কিন্তু ব্রিটিশরা ত্রিপল দিয়ে বারুদ ঢেকে সুরক্ষিত রেখেছিল। বারুদ ভেজার ভুল ধারণায় মির মদন অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে এগোলে ইংরেজদের কামানের গোলার আঘাতে শহীদ হন।
  • মির জাফরের কূটচাল: মির মদনের মৃত্যুতে আতঙ্কিত নবাব মির জাফরকে ডেকে তাঁর পাগড়ি পদতলে রেখে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার মিনতি করেন। মির জাফর কোরআন স্পর্শ করে রক্ষার শপথ নিলেও নবাবকে যুদ্ধ থামিয়ে মোহন লালকে ফেরত আনার কু-পরামর্শ দেন। মোহন লালের সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করে নবাব যুদ্ধ থামানোর নির্দেশ দেন। নবাবের পিছু হটার সুযোগে ক্লাইভ অতর্কিত আক্রমণ চালান। বিশাল নবাব সেনাদলের নেতৃত্বে থাকা মির জাফর, রায় দুর্লভ ও ইয়ার লতিফ নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে যুদ্ধ দেখা ছাড়া কিছুই করলেন না।
  • সিরাজের পলায়ন ও নির্মম হত্যাকাণ্ড: নবাবের সেনাদল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফিরে পরে পাটনার দিকে পালানোর চেষ্টা করেন। রাজমহলের কাছে এক ফকিরের (দানা শাহ) মাধ্যমে ধরা পড়ে তিনি বন্দি হন। ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই রাতে মির জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদি বেগ সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
২.৩ পলাশীর গুরুত্ব: যুদ্ধের মোড়কে রাজনৈতিক অভ্যুত্থান

সামরিক দিক থেকে পলাশী কোনো বিরাট যুদ্ধ ছিল না—বিশ্বাসঘাতকতা ও ঘুষের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত একটি ক্ষুদ্র সংঘর্ষ মাত্র। যুদ্ধে ইংরেজদের ২২ জন এবং নবাবের প্রায় ৫০০ জন মারা যান। কিন্তু এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল অপরিসীম। ইংরেজ কোম্পানি নিছক বণিক সমিতি থেকে বাংলার সিংহাসনের নিয়ন্ত্রক ও 'নবাব নির্মাতা'য় (Kingmaker) পরিণত হয়। স্যার যদুনাথ সরকারের ভাষায়, "১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভারতে মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং আধুনিক যুগের সূচনা হয়।"

২.৪ 'পলাশী লুণ্ঠন' (Plassey Plunder) ও বাংলার অর্থনৈতিক সর্বনাশ

১৭৫৭ সালের ২৯ জুন ক্লাইভ মির জাফরকে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসান। এর বিনিময়ে নবাব কোম্পানির দাবি মেটাতে গিয়ে রাজকোষ উন্মুক্ত করে দেন, যা ইতিহাসে পলাশী লুণ্ঠন (Plassey Plunder) নামে খ্যাত:

আদায়ের ধরন প্রাপক অর্থের পরিমাণ ফলাফল ও তাৎপর্য
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা (£২.২ মিলিয়ন) নগদ রৌপ্যমুদ্রায় পরিশোধ; নবাবের রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে।
ব্যক্তিগত নজরানা ও ঘুষ রবার্ট ক্লাইভ ও কাউন্সিল সদস্যবর্গ ক্লাইভ পান ২৩.৪ লক্ষ টাকা ও জায়গির; কাউন্সিল পায় ৫৮ লক্ষ টাকা ক্লাইভ বিলেতে ফিরে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন।
জমিদারির রাজস্ব অধিকার কোম্পানি ২৪ পরগনার জমিদারি (24 Parganas) কোম্পানির স্থায়ী ভূমি রাজস্বের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
শুল্কহীন অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ কর্মচারীবৃন্দ লবণ, সুপারি ও তামাকের একচেটিয়া ব্যবসা বাংলার তাঁতি ও দেশীয় বণিক শ্রেণির চরম সর্বনাশ ঘটে।

প্রখ্যাত মার্কিন অর্থনীতিবিদ ব্রুকস অ্যাডামস (Brooks Adams) তাঁর The Law of Civilization and Decay গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা থেকে লুটের যে বিপুল স্বর্ণ ও রৌপ্য ইংল্যান্ডে পাচার হয়েছিল, সেই মূলধনই বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার এবং ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবকে (Industrial Revolution) গতিশীল করেছিল। 'ধনে-ধান্যে পুষ্পে ভরা' বাংলাকে কয়েক বছরের মধ্যে এক সর্বস্বান্ত অঞ্চলে পরিণত করা হয়।

মডিউল ৩: মির কাসিম, বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) ও দেওয়ানি লাভ (১৭৬৫)

৩.১ মির জাফরের ব্যর্থতা ও মির কাসিমের সিংহাসন লাভ (১৭৬০)

পুতুল নবাব মির জাফর অল্পকালের মধ্যেই ইংরেজদের অফুরন্ত অর্থের দাবি মেটাতে অসমর্থ হন। কোম্পানির ঋণ পরিশোধের জন্য তিনি সোনার থালাবাসন ও প্রাসাদের রত্ন গলিয়ে বিক্রি করতে বাধ্য হন। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি ওলন্দাজদের সঙ্গে হাত মেলানোর চেষ্টা করলে ১৭৫৯ সালে বিদরার যুদ্ধে ইংরেজরা ওলন্দাজদের পরাজিত করে।

১৭৬০ সালে নতুন গভর্নর হেনরি ভ্যান্সিটার্ট একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটিয়ে মির জাফরকে পদচ্যুত করেন এবং তাঁর জামাতা মির কাসিমকে (Mir Qasim) নবাব নিযুক্ত করেন। বিনিময়ে মির কাসিম কোম্পানিকে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম জেলার রাজস্ব অধিকার হস্তান্তর করেন।

৩.২ মির কাসিমের স্বাধীনচেতা সংস্কারসমূহ

মির কাসিম পুতুল নবাব হয়ে থাকতে রাজি ছিলেন না। তিনি বাংলার শাসন ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন:

  1. রাজধানী স্থানান্তর (মুঙ্গের): কলকাতা কাউন্সিলের অযাচিত নজরদারি ও হস্তক্ষেপ এড়াতে ১৭৬২ সালে তিনি রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গেরে (Munger) স্থানান্তর করেন।
  2. সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন: ইউরোপীয় রীতির অনুকরণে তিনি সেনাবাহিনীকে নতুন করে গড়ে তোলেন। জার্মান সেনাপতি ওয়াল্টার রেইনহার্ড (সমরু) এবং আর্মেনীয় সেনাপতি গুর্গিন খাঁকে (মার্কার) সামরিক প্রশিক্ষণের দায়িত্ব দেন। মুঙ্গেরে আধুনিক তোপখানা ও বন্দুক তৈরির কারখানা স্থাপন করে উন্নত মানের ফ্লিন্টলক বন্দুক প্রস্তুত করেন।
  3. রাজস্ব ও আর্থিক শৃঙ্খলা: দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীদের দমন করে বকেয়া রাজস্ব আদায় করেন এবং রাজকোষ পূর্ণ করতে সামর্থ্যবান জমিদারদের ওপর কিছু নতুন কর (আবওয়াব) আরোপ করেন।
৩.৩ দস্তক বিতর্ক ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের ঘোষণা (১৭৬২–১৭৬৩)

ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তকের বেআইনি ব্যবহার চরমে পৌঁছেছিল। ইংরেজরা কোনো শুল্ক দিত না, অথচ ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পণ্য পরিবহনে ঘাটে ঘাটে ৪০% পর্যন্ত চড়া শুল্ক দিতে হতো। ফলে দেশীয় বাণিজ্য ধ্বংস হতে বসেছিল।

গভর্নর ভ্যান্সিটার্টের সঙ্গে মির কাসিম ৯% শুল্কের একটি সমঝোতায় পৌঁছালেও উদ্ধত কলকাতা কাউন্সিল তা প্রত্যাখ্যান করে। তখন ক্ষুব্ধ ও দেশপ্রেমিক মির কাসিম ১৭৬৩ সালের মার্চ মাসে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন: তিনি আগামী দুই বছরের জন্য বাংলা ও বিহারে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সমস্ত বণিকের অভ্যন্তরীণ শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন (Abolition of all transit duties)। ফলে দেশীয় বণিকরা ইংরেজদের সঙ্গে সমান সুযোগে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পায়।

নিজেদের একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা হাতছাড়া হওয়ায় কলকাতা কাউন্সিল ক্রুদ্ধ হয়ে ১৭৬৩ সালের জুলাই মাসে মির কাসিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং পুনরায় বৃদ্ধ মির জাফরকে মসনদে বসায়। একে একে কাটোয়া, গিরিয়া ও উদয়নালায় (১৭৬৩) পরাজিত হয়ে মির কাসিম পাটনা হয়ে অযোধ্যায় পালিয়ে যান।

৩.৪ বক্সারের যুদ্ধ (২২ অক্টোবর ১৭৬৪ / Battle of Buxar)

অযোধ্যায় গিয়ে মির কাসিম ইংরেজদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় মোর্চা (Triple Alliance) গঠন করেন:

  • মির কাসিম: বাংলার ক্ষমতাচ্যুত নবাব।
  • সুজা-উদ-দৌলা: অযোধ্যার শক্তিশালী নবাব ওয়াজির।
  • দ্বিতীয় শাহ আলম: দিল্লির মুঘল সম্রাট।

এই সম্মিলিত বাহিনীর প্রায় ৪০,০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি মেজর হেক্টর মনরো (Major Hector Munro)-র নেতৃত্বে মাত্র ৭,০৭২ জন সৈন্য (৮৫৭ ইউরোপীয় ও ৬,২১৫ সিপাহি) নিয়ে অগ্রসর হন। ১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বিহারের গঙ্গার তীরে বক্সার (Buxar) নামক স্থানে চূড়ান্ত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভারতীয় রাজন্যবর্গের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সমন্বয়হীনতার সুযোগে হেক্টর মনরোর উন্নত গোলন্দাজ বাহিনী সম্মিলিত মোর্চাকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে।

পলাশীর চেয়ে বক্সারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কেন বহুগুণ বেশি?

পলাশী ছিল একটি অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধাভাস, কিন্তু বক্সার ছিল খোলা ময়দানে সম্মুখ সমরে ইংরেজদের সামরিক শৃঙ্খলার এক বিরাট বিজয়। এই যুদ্ধে ইংরেজরা কেবল বাংলার এক সুবাদারকে নয়, একসঙ্গে পরাস্ত করেছিল সমগ্র ভারতের মুঘল সম্রাট এবং উত্তর ভারতের প্রধান শক্তি অযোধ্যার নবাবকে। বক্সারের বিজয়ের ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের অপ্রতিরোধ্যতার মোহ ভেঙে যায় এবং বাংলা থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত সমগ্র উত্তর ভারতে ব্রিটিশ কোম্পানির অপ্রতিদ্বন্দ্বী সার্বভৌম কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

৩.৫ এলাহাবাদের সন্ধি ও ঐতিহাসিক দেওয়ানি লাভ (১২ আগস্ট ১৭৬৫)

১৭৬৫ সালের মে মাসে রবার্ট ক্লাইভ পুনরায় গভর্নর হয়ে বাংলায় ফিরে আসেন। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট তিনি মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম এবং অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলার সঙ্গে ঐতিহাসিক এলাহাবাদের সন্ধি (Treaty of Allahabad) স্বাক্ষর করেন:

  1. সুজা-উদ-দৌলার সঙ্গে চুক্তি: অযোধ্যা সুজা-উদ-দৌলাকে ফেরত দেওয়া হয় ৫০ লক্ষ টাকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে। তবে অযোধ্যা থেকে কোড়া ও এলাহাবাদ জেলা দুটি কেটে মুঘল সম্রাটকে দেওয়া হয় এবং অযোধ্যায় ইংরেজ সৈন্য রাখার ব্যবস্থা হয়।
  2. সম্রাট শাহ আলমের সঙ্গে চুক্তি: সম্রাটকে কোড়া ও এলাহাবাদ জেলা প্রদান করা হয় এবং বাৎসরিক ২৬ লক্ষ টাকা রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোম্পানি তাঁকে এলাহাবাদ দুর্গে তাদের আশ্রয়ে রাখে।
  3. দেওয়ানি সনদ লাভ (Grant of Diwani): এর বিনিময়ে ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট মুঘল সম্রাট এক রাজকীয় ফরমান জারি করে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি (ভূমি রাজস্ব আদায় ও দেওয়ানি বিচার পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকার) চিরদিনের জন্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রদান করেন।
৩.৬ রবার্ট ক্লাইভের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (দ্বৈত শাসন, ১৭৬৫–১৭৭২)

দেওয়ানি লাভের পর ক্লাইভ বাংলায় এক অদ্ভুত ও বিধ্বংসী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন, যা দ্বৈত শাসন (Dual Government) নামে পরিচিত:

  • দেওয়ানি (কোম্পানির হাতে): কোম্পানির হাতে রইল দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও রাজস্বের সম্পূর্ণ অর্থ। কোম্পানি রেজা খাঁ (বাংলায়) ও সেতাব রায়কে (বিহারে) নায়েব দেওয়ান পদে বসিয়ে নির্মমভাবে রাজস্ব আদায় করতে থাকে, কিন্তু প্রজাসাধারণের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা শাসন পরিচালনার কোনো দায় কোম্পানি নিল না।
  • নিজামত (নবাবের হাতে): পুতুল নবাব নজম-উদ-দৌলার হাতে রইল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পুলিশ ও ফৌজদারি বিচার পরিচালনার সব দায় নবাবের, কিন্তু এই কাজ চালানোর জন্য তাঁর হাতে না ছিল এক পয়সা অর্থ, না ছিল সেনাবাহিনী।

এই 'দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীন দায়িত্ব'-এর ফলে বাংলায় প্রশাসনিক নৈরাজ্য ও শোষণের তাণ্ডবলীলা শুরু হয়। কোম্পানি কর্মচারীদের লাগামহীন লুণ্ঠন এবং খরার বছরেও পূর্ণ রাজস্ব আদায়ের ফলে বাংলায় নেমে আসে মানব ইতিহাসের এক চরমতম ট্র্যাজেডি—ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (Great Bengal Famine of 1770 / ১১৭৬ বঙ্গাব্দ), যাতে অনাহারে ও মহামারীতে বাংলার প্রায় ১ কোটি মানুষ (মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ) মৃত্যুবরণ করে। ১৭৭২ সালে গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস এসে এই কলঙ্কিত দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানির হাতে প্রত্যক্ষ শাসনভার তুলে নেন।

মডিউল ৪: ঔপনিবেশিক শাসনের চার প্রশাসনিক স্তম্ভ (আইন, প্রশাসন ও চার স্তম্ভ)

৪.১ শাসনতান্ত্রিক কাঠামো: রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩) ও পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪)

কোম্পানির আর্থিক দুর্নীতি দমন এবং ভারতীয় সাম্রাজ্যকে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করে:

  • রেগুলেটিং অ্যাক্ট (১৭৭৩): লর্ড নর্থের আমলে পাস হওয়া এই আইনে বাংলার গভর্নর পদটিকে 'গভর্নর জেনারেল অফ ফোর্ট উইলিয়াম' (বাংলার গভর্নর জেনারেল) পদে উন্নীত করা হয় এবং ওয়ারেন হেস্টিংস হন প্রথম গভর্নর জেনারেল। তাঁর সহায়তার জন্য ৪ সদস্যের সুপ্রিম কাউন্সিল গঠিত হয়। মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিকে বাংলার অধীনে আনা হয়। এই আইনের ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ১৭৭৪ সালে কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Calcutta) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্যার এলিজা ইম্পে হন প্রথম প্রধান বিচারপতি।
  • পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪): ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট জুনিয়র এই আইন প্রণয়ন করেন। এর ফলে ব্রিটেনে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ (Dual System of Control) প্রতিষ্ঠিত হয়: রাজনৈতিক, সামরিক ও রাজস্ব সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ৬ সদস্যের সরকারি বোর্ড অফ কন্ট্রোল (Board of Control) গঠিত হয় এবং বাণিজ্যিক কাজকর্মের দায়িত্বে থাকে কোম্পানির কোর্ট অফ ডিরেক্টর্স (Court of Directors)।
৪.২ প্রথম স্তম্ভ: সিভিল সার্ভিস বা আমলাতন্ত্র (Civil Service)

লর্ড কর্নওয়ালিসকে (১৭৮৬–১৭৯৩) ভারতে 'সিভিল সার্ভিসের জনক' (Father of Indian Civil Service) বলা হয়। তিনি কর্মচারীদের দুর্নীতিগ্রস্ত অবস্থাকে একটি আধুনিক দক্ষ আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রে পরিণত করেন:

  1. বাণিজ্য ও প্রশাসনের পৃথকীকরণ: কোম্পানির বাণিজ্যিক কাজকর্ম থেকে শাসন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা করা হয়।
  2. ঘুষ ও ব্যক্তিগত ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ: সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা, উপহার (নজর) ও ঘুষ গ্রহণ কড়াভাবে নিষিদ্ধ করা হয় এবং বদলে আকর্ষণীয় বেতন চালু করা হয় (একজন জেলা কালেক্টর মাসে ১,৫০০ টাকা বেতন ও রাজস্ব আদায়ের ১% কমিশন পেতেন)।
  3. নগ্ন বর্ণবিদ্বেষ ও ভারতীয়দের বর্জন: কর্নওয়ালিসের চরম বর্ণবাদী ধারণা ছিল যে "হিন্দুস্থানের প্রতিটি দেশীয় মানুষই দুর্নীতিগ্রস্ত।" তিনি বছরে ৫০০ পাউন্ডের বেশি বেতনযুক্ত সমস্ত উচ্চপদ থেকে ভারতীয়দের আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন। ভারতীয়দের জন্য বরাদ্দ ছিল কেবল কেরানি, আমিন বা দারোগার মতো পদ।
  4. ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০): লর্ড ওয়েলেসলি ভারতে আগত তরুণ ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের ভারতীয় ভাষা (বাংলা, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃত), আইন ও সংস্কৃতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৮০৬ সালে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ইংল্যান্ডের হেইলিবারি কলেজে (Haileybury College) সরিয়ে নেওয়া হয়।
৪.৩ দ্বিতীয় স্তম্ভ: ঔপনিবেশিক সেনাবাহিনী (The Colonial Army)

সামরিক বলপ্রয়োগই ছিল ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তিপ্রস্তর:

  • সিপাহি সৈন্যদল: সেনাবাহিনীর ৮৫%-এর বেশি ছিল ভারতীয় সিপাহি (Sepoys), যাদের মূলত অবধ, বিহার এবং উত্তর প্রদেশের উচ্চবর্ণের কৃষক পরিবার (ভোজপুরি, রাজপুত ও ব্রাহ্মণ) থেকে নিয়োগ করা হতো। ১৮৫৭ সালের আগে কোম্পানির সৈন্যসংখ্যা ছিল ৩ লক্ষেরও বেশি।
  • শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য: সামরিক বিভাগে ভারতীয়দের ওপর চরম বর্ণবৈষম্য চাপানো হয়। কোনো ভারতীয়কে কমিশনড অফিসারের পদ দেওয়া হতো না। পদাতিক বাহিনীতে একজন ভারতীয় সর্বোচ্চ সুবেদার (Subedar) এবং অশ্বারোহী বাহিনীতে রিসালদার হতে পারত, যার বেতন ব্রিটিশ সাধারণ সৈনিকের চেয়েও কম ছিল।
  • রাজস্বের অপচয়: ভারতের রাজস্বের প্রায় ৪০% থেকে ৫০% ব্যয় হতো এই বিশাল সেনাবাহিনী পালনে, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে এবং বার্মা, আফগানিস্তান ও চীনে ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হতো।
৪.৪ তৃতীয় স্তম্ভ: পুলিশ ব্যবস্থা (The Police System)

পূর্বে গ্রামাঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল স্থানীয় জমিদার এবং তাঁদের অধীনস্থ পাইকদের ওপর। লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালের রেগুলেশনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে এক আধুনিক কেন্দ্রীভূত পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন:

  • জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব: জমিদারদের পুলিশি ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং পাইক বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া হয়।
  • থানা ও দারোগা ব্যবস্থা: জেলাগুলিকে ২০ বর্গমাইল আয়তনের কয়েকটি থানায় (Thana) ভাগ করা হয়। প্রতিটি থানার দায়িত্বে দেওয়া হয় একজন ভারতীয় পুলিশ আধিকারিক, যাঁর নাম দারোগা (Daroga)।
  • পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট (SP): ১৮০৮ সালে প্রতিটি বিভাগের জন্য ইউরোপীয় পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট (SP) পদ তৈরি করা হয়, যিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে পুলিশের কাজ তদারক করতেন।
  • পুলিশি অত্যাচার: দারোগারা হয়ে ওঠেন গ্রামীণ শোষণের প্রতীক। স্বল্প বেতন ও অপরিসীম ক্ষমতার কারণে দারোগারা জমিদার ও মহাজনদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাধারণ প্রজা ও কৃষকদের ওপর চরম অত্যাচার ও চাঁদাবাজি চালাতেন।
৪.৫ চতুর্থ স্তম্ভ: বিচার ব্যবস্থা ও আইন সংহিতা (Judiciary & Law)

ব্রিটিশরা ভারতের ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েত ও কাজি আদালতের বদলে একটি স্তরভিত্তিক পশ্চিমা বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে:

  1. ওয়ারেন হেস্টিংসের বিচার পরিকল্পনা (১৭৭২): হেস্টিংস প্রতি জেলায় দুটি আদালত স্থাপন করেন:
    • জেলা দেওয়ানি আদালত: সম্পত্তি ও দেওয়ানি মামলার জন্য, যার বিচারক ছিলেন ইউরোপীয় কালেক্টর (হিন্দু পণ্ডিত ও মুসলিম কাজিদের সাহায্যে)।
    • জেলা ফৌজদারি আদালত: অপরাধমূলক মামলার জন্য, যেখানে কাজি ও মুফতিরা বিচার করতেন এবং কালেক্টর তা তদারক করতেন।
    • কলকাতায় সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে সদর দেওয়ানি আদালত এবং সদর নিজামত আদালত স্থাপন করা হয়।
  2. আইনের সংহিতাবদ্ধকরণ: ভারতীয় ভাষা ও প্রাচীন আইনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ব্রিটিশ আইনজ্ঞরা ভারতীয় আইনের অনুবাদ করেন:
    • ১৭৭৬ সালে ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড হিন্দু আইন সংকলন করে A Code of Gentoo Laws নামে প্রকাশ করেন।
    • ১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোন্স এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৭৯৪ সালে মনুস্মৃতি অনুবাদ করেন।
  3. কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট (১৭৭৪): রেগুলেটিং অ্যাক্ট বলে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি হন স্যার এলিজা ইম্পে। ১৭৭৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস ও ইম্পে মিলে মহারাজ নন্দকুমারকে একটি মিথ্যা জালিয়াতি মামলায় ব্রিটিশ আইন প্রয়োগ করে ফাঁসি দেন, যা ইতিহাসে 'বিচার বিভাগীয় হত্যাকাণ্ড' (Judicial Murder) নামে কলঙ্কিত।
  4. কর্নওয়ালিস কোড (১৭৯৩) ও ক্ষমতার পৃথকীকরণ: কর্নওয়ালিস তাঁর ৪৮টি ধারার বিখ্যাত সংহিতায় (Cornwallis Code) রাজস্ব আদায় ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতাকে পৃথক করেন। জেলা কালেক্টরের কাছ থেকে সমস্ত বিচারিক ও ফৌজদারি ক্ষমতা প্রত্যাহার করে তা নবগঠিত ইউরোপীয় জেলা জজের (District Judge) হাতে ন্যস্ত করা হয়।

মডিউল ৫: আগ্রাসী সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি: অধীনতামূলক মিত্রতা ও স্বত্ববিলোপ নীতি

৫.১ লর্ড ওয়েলেসলি ও অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance, ১৭৯৮)

১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলি যখন ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন, তখন ফ্রান্সে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটেছিল। নেপোলিয়ন যদি ভারতে এসে টিপু সুলতানের মতো ব্রিটিশ-বিরোধী শক্তির সঙ্গে জোট বাঁধেন, সেই আশঙ্কায় ওয়েলেসলি দেশীয় রাজ্যগুলিকে ব্রিটিশদের তাঁবেদারে পরিণত করতে একটি কূটকৌশল প্রয়োগ করেন, যা ইতিহাসে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) নামে খ্যাত।

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির মূল শর্তাবলি:
  • পররাষ্ট্র নীতি বিসর্জন: মিত্রতায় আবদ্ধ রাজ্য কোম্পানির অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো দেশীয় বা বৈদেশিক শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ, শান্তি বা কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে না।
  • ইউরোপীয়দের বহিষ্কার: ব্রিটিশ ছাড়া অন্য সমস্ত ইউরোপীয়কে (বিশেষত ফরাসিদের) রাজ্য ও সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কার করতে হবে।
  • ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন: দেশীয় রাজা তাঁর নিজস্ব সেনাবাহিনী ভেঙে দেবেন এবং রাজ্যের সুরক্ষার অজুহাতে একটি ব্রিটিশ সৈন্যদল রাজ্যে মোতায়েন রাখবেন।
  • বিপুল আর্থিক ব্যয়ভার বা ভূখণ্ড সমর্পণ: ব্রিটিশ সৈন্যদলের বিশাল ব্যয়ভার রাজাকে নগদ অর্থে বহন করতে হবে। কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে রাজ্যের উর্বর অংশ কোম্পানিকে চিরদিনের জন্য হস্তান্তর করতে হবে।
  • ব্রিটিশ রেসিডেন্ট (Resident): রাজদরবারে একজন ইংরেজ প্রতিনিধি বা রেসিডেন্ট থাকবেন। অভ্যন্তরীণ শাসনে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও রেসিডেন্ট বস্তুত রাজ্যের সর্বেসর্বা হয়ে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অনধিকার চর্চা করতেন।
৫.২ অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির শিকার হওয়া রাজ্যসমূহ
  • হায়দরাবাদের নিজাম (১৭৯৮ ও ১৮০০): প্রথম ভারতীয় শাসক হিসেবে এই অপমানজনক নীতি গ্রহণ করেন। ১৮০০ সালে সৈন্যের খরচ মেটাতে না পেরে তিনি বেল্লারি, কুডাপ্পা ও অনন্তপুর (Ceded Districts) কোম্পানিকে লিখে দেন।
  • মহীশূর (১৭৯৯): চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে বীর টিপু সুলতান শ্রীঅঙ্গপত্তনমের দুর্গে লড়াই করতে করতে শহীদ হলে ওয়েলেসলি ওডেয়ার বংশের এক শিশুকে বসিয়ে এই নীতি চাপিয়ে দেন।
  • অযোধ্যা (১৮০১): নবাব সাদাত আলি খানকে বাধ্য করে রাজ্যের অর্ধেক উর্বর অংশ (রোহিলখণ্ড ও গোরখপুর) কেড়ে নেওয়া হয়।
  • মারাঠা পেশওয়া (১৮০২): হোলকারের ভয়ে ভীত কাপুরুষ পেশওয়া দ্বিতীয় বাজিরাও ১৮০২ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংরেজদের সঙ্গে অপমানজনক বেসিনের সন্ধি (Treaty of Bassein) স্বাক্ষর করে নিজের স্বাধীনতা বিক্রি করে দেন। এর ফলে দ্বিতীয় ইঙ্গ-মারাঠা যুদ্ধ (১৮০৩–০৫) বাধে এবং ভোঁসলে ও সিন্ধিয়াও মিত্রতা মেনে নিতে বাধ্য হয়।
৫.৩ লর্ড ডালহৌসি ও স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse, ১৮৪৮)

১৮৪৮ সালে লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮–১৮৫৬) গভর্নর জেনারেল হয়ে আসেন। তিনি ছিলেন এক চরম সাম্রাজ্যবাদী শাসক। ভারতীয় রাজন্যবর্গের 'অকর্মণ্য শাসন' অবসান ঘটিয়ে সমগ্র দেশকে সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আনার লক্ষ্যে তিনি যে আইনানুগ ছল ছুতো প্রয়োগ করেন, তা ইতিহাসে স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) নামে পরিচিত।

প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র ও ঐতিহ্য অনুযায়ী অপুত্রক কোনো রাজা দত্তক পুত্র গ্রহণ করতে পারতেন এবং সেই দত্তক পুত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজসিংহাসন উভয়েরই বৈধ উত্তরাধিকারী হতো। ডালহৌসি রাজ্যগুলিকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেন:

  1. স্বাধীন রাজ্য: যারা কখনোই ব্রিটিশদের অধীন ছিল না; তাদের দত্তক গ্রহণের পূর্ণ অধিকার বজায় রাখা হয়।
  2. অধীনস্থ আশ্রিত রাজ্য: পূর্বে মুঘল বা পেশওয়ার অধীন ছিল কিন্তু পরে ব্রিটিশ প্রাধান্য মেনে নিয়েছে; তাদের দত্তক গ্রহণে ব্রিটিশদের পূর্বানুমতি লাগত।
  3. কোম্পানি সৃষ্ট বা সম্পূর্ণ আশ্রিত রাজ্য: যেসব রাজ্য ব্রিটিশদের অনুকম্পায় গঠিত বা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে দত্তক পুত্র কেবল রাজার ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক হবে, কিন্তু রাজসিংহাসন বা সার্বভৌম ক্ষমতার কোনো দাবি থাকবে না। রাজা অপুত্রক মারা গেলে সেই রাজ্যটি সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত (Lapse) হবে।
৫.৪ স্বত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে গ্রাস করা রাজ্যসমূহ
ভুক্ত রাজ্য সাল শাসক ও দত্তক পুত্র অধিগ্রহণের পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়া
সাতারা (Satara) ১৮৪৮ রাজা আপ্পা সাহেব (দত্তক পুত্র ভেঙ্কোজি) স্বত্ববিলোপ নীতির প্রথম শিকার; দত্তক পুত্রের দাবি বাতিল করে রাজ্য দখল।
জয়তপুর ও সম্বলপুর ১৮৪৯ রাজা নারায়ণ সিং (সম্বলপুর) অপুত্রক রাজার মৃত্যুর পর সম্বলপুরে সুরেন্দ্র সাই তীব্র গণবিদ্রোহ গড়ে তোলেন।
বাঘাট ও উদয়পুর ১৮৫০ ও ১৮৫২ পাহাড়ি রাজ্য দখল করা হলেও ১৮৬০ সালে লর্ড ক্যানিং এই দুটি রাজ্য ফেরত দেন।
ঝাঁসি (Jhansi) ১৮৫৩ গঙ্গাধর রাও / রানি লক্ষ্মীবাঈ দত্তক পুত্র দামোদর রাওয়ের অধিকার নাকচ করায় ক্ষুব্ধ রানি লক্ষ্মীবাঈ ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
নাগপুর (Nagpur) ১৮৫৪ তৃতীয় রঘুজী ভোঁসলে (দত্তক যশবন্ত রাও) বিশাল তুলো উৎপাদক রাজ্য দখল; রাজপ্রাসাদের সমস্ত অলংকার ও হাতি কলকাতায় প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করা হয়।
৫.৫ কুশাসনের অজুহাতে অযোধ্যা অধিগ্রহণ (ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬)

ডালহৌসির সবচেয়ে নিন্দনীয় ও চক্রান্তমূলক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ছিল অযোধ্যা অধিগ্রহণ (১৮৫৬)। অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের অনেক পুত্রসন্তান থাকায় সেখানে স্বত্ববিলোপ নীতি খাটানো সম্ভব ছিল না। উপরন্তু ১৭৬৫ সাল থেকে অযোধ্যা ছিল ইংরেজদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র রাজ্য।

ডালহৌসি ব্রিটিশ রেসিডেন্ট জেমস আউট্রামের দ্বারা একটি পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট তৈরি করান, যাতে অযোধ্যায় চরম অপশাসন ও আর্থিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগ তোলা হয়। নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করে ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে "চরম কুশাসনের" (Chronic Misgovernance) অজুহাতে অযোধ্যা দখল করা হয় এবং নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত করা হয়।

এই ন্যাক্কারজনক আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক:

  1. তালুকদারদের অসন্তোষ: ১৮৫৬ সালের 'সামারি সেটেলমেন্টে' অযোধ্যার প্রায় ২১,০০০ তালুকদারের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
  2. সিপাহিদের ক্ষোভ: ব্রিটিশ বেঙ্গল আর্মির প্রায় ৭৫,০০০ সিপাহির বাড়ি ছিল অযোধ্যায় (অযোধ্যাকে বলা হতো "বেঙ্গল আর্মির নার্সারি")। পরিবারের জমি ও সামাজিক মর্যাদা হারানোর বেদনায় সিপাহিরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
  3. মহাবিদ্রোহের বারুদ: রাজন্যবর্গ, তালুকদার এবং সিপাহিদের এই সম্মিলিত ক্ষোভ ১৮৫৬ সালে যে বারুদের স্তূপ তৈরি করেছিল, তা-ই ১৮৫৭ সালে ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহের (Great Revolt of 1857) মহাবিস্ফোরণ ঘটায়।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কালানুক্রমিক ধারা (১৭৪৬–১৮৫৬)
১৭৪৬–১৮৫৬ সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্বের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
পলাশী দিয়ে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, বক্সার ও দেওয়ানি দিয়ে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং ডালহৌসির আমলে ভৌগোলিক পূর্ণতা লাভ করে।
কর্ণাটকের তিনটি যুদ্ধের তুলনামূলক চিত্র
ফরাসি শক্তির পতন ও ইংরেজদের উত্থান
১৭৬০ সালে বন্দিবাসের যুদ্ধে স্যার আয়ার কূটের জয় ভারতে ফরাসি সাম্রাজ্যের আশা শেষ করে দেয়।
পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) বনাম বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) তুলনামূলক বিশ্লেষণ
পলাশী বনাম বক্সারের চরিত্র ও ফলাফলের পার্থক্য
পলাশীতে কেবল একজন প্রাদেশিক নবাব পরাজিত হয়েছিলেন; বক্সারে পরাস্ত হয়েছিলেন ভারতের মুঘল সম্রাট স্বয়ং।
রবার্ট ক্লাইভের দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার কাঠামো (১৭৬৫–১৭৭২)
দায়িত্বহীন ক্ষমতা বনাম ক্ষমতাহীন দায়িত্ব
১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস সরাসরি রাজস্ব আদায় শুরু করে দ্বৈত শাসন বিলোপ করেন।
ঔপনিবেশিক শাসনের চার প্রশাসনিক স্তম্ভের তুলনামূলক ছক
ঔপনিবেশিক লৌহকাঠামো (Steel Frame)
সমস্ত উচ্চপদ শ্বেতাঙ্গদের জন্য সংরক্ষিত ছিল; ভারতীয়দের কেবল অধস্তন পদ দেওয়া হতো।
অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি বনাম স্বত্ববিলোপ নীতি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
পরোক্ষ পঙ্গুত্ব বনাম প্রত্যক্ষ রাজ্যগ্রাস
ওয়েলেসলি রাজ্যগুলিকে অভ্যন্তরীণভাবে পঙ্গু ও আশ্রিত বানাতেন; ডালহৌসি সরাসরি সাম্রাজ্যভুক্ত করতেন।
প্রধান গভর্নর জেনারেল ও তাঁদের সাম্রাজ্যবাদী নীতিসমূহ
প্রশাসনিক ও সাম্রাজ্যিক রূপকারদের তালিকা
পর্ষদের পরীক্ষায় 'স্তম্ভ মেলাও' বা সংক্ষেপ উত্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এলাহাবাদের সন্ধি (১৭৬৫) ও দেওয়ানি লাভের কাঠামোগত রূপরেখা
ভারতে ব্রিটিশ সার্বভৌম কর আদায়ের জন্মমুহূর্ত
রবার্ট ক্লাইভ মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে এই সনদ আদায় করেন।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের প্রধান তিনটি কারণ কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের পেছনে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ ছিল: ১. দস্তকের অপব্যবহার (Misuse of Dastak): ১৭১৭ সালের ফারুকশিয়ারের ফরমান অনুযায়ী কোম্পানি বিনা শুল্কে বৈদেশিক বাণিজ্য করার অধিকার পেয়েছিল। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত লাভজনক ব্যবসায় বেআইনিভাবে দস্তক ব্যবহার করতে থাকে এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে। এতে নবাব বিপুল শুল্ক রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হন এবং দেশীয় বণিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২. কলকাতায় বেআইনি দুর্গ সংস্কার: ফরাসিদের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কায় ইংরেজরা নবাবের অনুমতি ছাড়াই ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের চারদিকে প্রাচীর ও পরিখা নির্মাণ করতে শুরু করে। সিরাজ দুর্গ সংস্কার অবিলম্বে বন্ধের নির্দেশ দিলেও ইংরেজ গভর্নর ড্রেক উদ্ধতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। ৩. রাজদ্রোহী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দান: বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আত্মসাৎকারী ঢাকার দেওয়ান রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণদাস সরকারি ধনসম্পদ নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে গেলে ইংরেজরা তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং সিরাজের প্রেরিত দূতকে তাড়িয়ে দিয়ে নবাবকে চরম অপমান করে। ৪. প্রাসাদ চক্রান্তে মদত: ইংরেজরা সিরাজের প্রতিদ্বন্দ্বী ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তরুণ নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল।
উদাহরণ 2
অন্ধকূপ হত্যা (Black Hole Tragedy) বিতর্কটি ব্যাখ্যা করো। আধুনিক ঐতিহাসিকরা কেন এটিকে একটি মনগড়া কাহিনি বলে মনে করেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৭৫৬ সালের ২০ জুন সিরাজউদ্দৌলা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করার পর জন যেফানিয়া হলওয়েল নামক এক ইংরেজ কর্মচারী অন্ধকূপ হত্যার (Black Hole Tragedy) কাহিনি প্রচার করেন: ১. হলওয়েলের বিবরণ: হলওয়েলের দাবি অনুযায়ী, নবাবের সৈন্যরা ১৪৬ জন ইংরেজ যুদ্ধবন্দিকে ১৮ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট ১০ ইঞ্চি চওড়া একটি ক্ষুদ্র ঘরে আটকে রাখে, যার ফলে তীব্র গরমে দম আটকে ১২৩ জন মারা যান। ২. গাণিতিক অসম্ভাব্যতা: আধুনিক গবেষক ভোলানাথ চন্দ্র এবং আচার্য যদুনাথ সরকার পরিমাপ করে দেখিয়েছেন যে ২৬৭ বর্গফুটের একটি ক্ষুদ্র কামরায় কোনো অবস্থাতেই ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে রাখা শারীরিকভাবে অসম্ভব (মাথাপিছু মাত্র ১.৮ বর্গফুট স্থান মেলে)। ৩. সমকালীন তথ্যের অভাব: গোলাম হোসেনের সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন বা অন্য কোনো ভারতীয় নথিতে এই মর্মান্তিক ঘটনার কোনো উল্লেখ নেই। তৎকালীন ইংরেজ নথিপত্রেও বন্দির সংখ্যা নিয়ে ব্যাপক অসঙ্গতি রয়েছে। ৪. উপসংহার: ইংরেজ ঐতিহাসিকরা সিরাজকে এক নিষ্ঠুর, রক্তপিপাসু প্রাচ্য স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে তুলে ধরে ইংল্যান্ড ও মাদ্রাজে যুদ্ধোন্মাদনা সৃষ্টি করতে এবং ভারতে ক্লাইভের নগ্ন আগ্রাসনকে নৈতিক যুক্তি দিতে এই বানোয়াট ও অতিরঞ্জিত কাহিনির জন্ম দিয়েছিলেন।
উদাহরণ 3
পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) গুরুত্ব আলোচনা করো এবং 'পলাশী লুণ্ঠন' (Plassey Plunder) বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে কোনো সামরিক যুদ্ধ ছিল না, বরং ক্লাইভ, মির জাফর ও জগৎ শেঠদের ষড়যন্ত্রের ফসল: ১. রাজনৈতিক গুরুত্ব: মাত্র ২২ জন ব্রিটিশ সৈন্যের বিনিময়ে কোম্পানি বাংলার স্বাধীন নবাবের পতন ঘটায় এবং মির জাফরকে পুতুল নবাব বানিয়ে মসনদের নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়। যদুনাথ সরকারের মতে, এর ফলে ভারতে মধ্যযুগের অবসান ঘটে আধুনিক যুগের সূচনা হয়। ২. পলাশী লুণ্ঠন (Plassey Plunder): পলাশীর বিজয়ের পর ইংরেজ কোম্পানি ও কর্মচারীরা নবাবের রাজকোষ থেকে যে নির্বিচার অর্থ লুণ্ঠন করেছিল, তাকে ব্রুকস অ্যাডামস 'পলাশী লুণ্ঠন' বলে অভিহিত করেছেন:

  • যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ: মির জাফরের কাছ থেকে কোম্পানি নগদ ১ কোটি ৭৭ লক্ষ টাকা আদায় করে।
  • ব্যক্তিগত ঘুষ: রবার্ট ক্লাইভ নিজে ২৩.৪ লক্ষ টাকা নগদ ও বিপুল জায়গির লাভ করেন; সিলেক্ট কমিটির সদস্যরা পান প্রায় ৫৮ লক্ষ টাকা।
  • ২৪ পরগনার জমিদারি: কোম্পানি কলকাতার দক্ষিণে ২৪ পরগনার রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে।
  • বাণিজ্যিক ক্ষতি: কোম্পানির কর্মচারীরা বিনা শুল্কে লবণ ও সুপারির একচেটিয়া বাণিজ্য করে বাংলার দেশীয় অর্থনীতি ও তাঁতিদের ধ্বংস করে দেয়। এই লুণ্ঠিত অর্থ বিলেতে পাচার হয়ে ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লবকে সমৃদ্ধ করেছিল।
উদাহরণ 4
সামরিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের বিচারে বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) কেন পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) অপেক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ঐতিহাসিকদের মতে, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পলাশীর চেয়ে বক্সারের যুদ্ধ (২২ অক্টোবর ১৭৬৪) বহুগুণ বেশি নির্ণায়ক ছিল। এর কারণগুলি হলো: ১. প্রকৃত সম্মুখ সমর: পলাশী ছিল বৃষ্টিভেজা বারুদ এবং মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতানির্ভর একটি প্রহসন। কিন্তু বক্সার ছিল খোলা ময়দানে হেক্টর মনরোর অনুগত গোলন্দাজ ও সিপাহি বাহিনীর রণকৌশলগত প্রকৃত সামরিক বিজয়। ২. সর্বভারতীয় শক্তির বিরুদ্ধে জয়: পলাশীতে ইংরেজরা পরাস্ত করেছিল কেবল বাংলার এক তরুণ নবাবকে। কিন্তু বক্সারে ইংরেজরা একযোগে উত্তর ভারতের তিনটি শীর্ষ শক্তিকে বিধ্বস্ত করে:

  • মির কাসিম (বাংলার ক্ষমতাচ্যুত নবাব),
  • সুজা-উদ-দৌলা (অযোধ্যার পরাক্রমশালী নবাব), এবং
  • দ্বিতীয় শাহ আলম (সমগ্র ভারতের মুঘল সম্রাট)। ৩. মুঘল শক্তির অসারতা প্রকাশ: মুঘল সম্রাটের শোচনীয় পরাজয় ও আত্মসমর্পণ প্রমাণ করে যে সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের প্রতিরোধ করার মতো আর কোনো সর্বভারতীয় শক্তি অবশিষ্ট নেই। ৪. দেওয়ানি লাভের পটভূমি: বক্সারের বিজয়ের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবে ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদের সন্ধি হয় এবং কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে সার্বভৌম শাসকে পরিণত হয়।
উদাহরণ 5
রবার্ট ক্লাইভের 'দ্বৈত শাসন' (Dual Government, ১৭৬৫–১৭৭২) কী ছিল এবং কেন এটি ব্যর্থ হয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভের পর রবার্ট ক্লাইভ বাংলায় যে শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, তাকে দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (১৭৬৫–১৭৭২) বলা হয়: ১. ক্ষমতা ও দায়িত্বের বিভাজন:

  • দেওয়ানি (কোম্পানির হাতে): রাজস্ব আদায়, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক ক্ষমতা কোম্পানির হাতে থাকে। অর্থাৎ কোম্পানি ভোগ করে দায়িত্বহীন পরম ক্ষমতা।
  • নিজামত (নবাবের হাতে): শাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা ও বিচার রক্ষার ভার থাকে পুতুল নবাব নজম-উদ-দৌলার হাতে। অর্থাৎ নবাব পান ক্ষমতাহীন গুরুদায়িত্ব। ২. ব্যর্থতার কারণ ও ভয়াবহ কুফল:
  • প্রশাসনিক অচলাবস্থা: নবাবের হাতে অর্থ বা সেনাবাহিনী না থাকায় আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
  • নির্মম রাজস্ব শোষণ: কোম্পানির রেজা খাঁ ও সেতাব রায়ের মতো নায়েব দেওয়ানরা কৃষকদের ওপর চাবুক চালিয়ে অসম্ভব হারে রাজস্ব আদায় করতে থাকে।
  • ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ / ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ): ১৭৬৯ সালে অনাবৃষ্টির পর নবাবের কোনো ত্রাণের ক্ষমতা ছিল না, আর কোম্পানি কর মকুব না করে দ্বিগুণ কঠোরতায় রাজস্ব আদায় করে। ফলে অনাহারে বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ (১ কোটি লোক) প্রাণ হারায়। ৩. অবসান: ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস এসে এই ব্যর্থ ও অমানবিক দ্বৈত শাসন সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেন।
উদাহরণ 6
লর্ড কর্নওয়ালিস কীভাবে সিভিল সার্ভিস এবং পুলিশ ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দুটি মূল স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৮৬–১৭৯৩) ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে দুটি প্রাতিষ্ঠানিক স্তম্ভ নির্মাণ করেন: ১. সিভিল সার্ভিস বা আমলাতন্ত্র (প্রথম স্তম্ভ):

  • পেশাদারিত্ব: বাণিজ্যিক কাজ থেকে শাসন বিভাগকে পৃথক করেন। কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা, ঘুষ ও উপহার নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।
  • উচ্চ বেতন কাঠামো: দুর্নীতি রোধে জেলা কালেক্টরদের জন্য মাসে ১,৫০০ টাকা বেতন ও সংগৃহীত রাজস্বের ওপর ১% কমিশনের ব্যবস্থা করেন।
  • বর্ণবাদী নীতি: কর্নওয়ালিস চরম অবজ্ঞায় ভারতীয়দের অবিশ্বস্ত মনে করতেন এবং ৫০০ পাউন্ডের বেশি বার্ষিক বেতনের সমস্ত উচ্চপদে ভারতীয়দের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন।
  • প্রশিক্ষণ: পরবর্তীতে লর্ড ওয়েলেসলি তরুণ ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের দেশীয় ভাষা ও আইনে দক্ষ করতে ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ২. পুলিশ ব্যবস্থা (তৃতীয় স্তম্ভ):
  • জমিদারদের ক্ষমতা খর্ব: ১৭৯৩ সালের রেগুলেশনে জমিদারদের পুলিশি দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে তাঁদের পাইক বাহিনীকে ভেঙে দেওয়া হয়।
  • থানা ও দারোগা ব্যবস্থা: জেলাগুলিকে ২০ বর্গমাইল আয়তনের কতগুলি থানায় ভাগ করা হয় এবং প্রতি থানায় একজন ভারতীয় দারোগা নিয়োগ করা হয়।
  • সুপারিন্টেন্ডেন্ট (SP): ১৮০৮ সালে বিভাগীয় স্তরে ইউরোপীয় পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট (SP) পদ সৃষ্টি হয়।
  • চরিত্র: পুলিশ ব্যবস্থা প্রজাদের সেবার জন্য নয়, বরং ঔপনিবেশিক কর আদায় ও বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
উদাহরণ 7
লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির (Subsidiary Alliance) মূল শর্তগুলি কী ছিল এবং এটি কীভাবে দেশীয় রাজ্যগুলির স্বাধীনতা হরণ করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৭৯৮ সালে লর্ড ওয়েলেসলি নেপোলিয়নের আক্রমণ ভীতি ও ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি প্রবর্তন করেন: ১. মূল শর্তাবলি:

  • পররাষ্ট্র নীতি সমর্পণ: মিত্রতাবদ্ধ রাজ্য কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা কোনো সন্ধি করতে পারত না।
  • ইউরোপীয়দের বিতাড়ন: ব্রিটিশ ব্যতীত অন্য কোনো ইউরোপীয়কে (বিশেষত ফরাসিদের) রাজদরবারে বা সেনাবাহিনীতে রাখা যেত না।
  • ব্রিটিশ সেনাদল মোতায়েন: দেশীয় রাজা নিজ সৈন্য ভেঙে দিয়ে রাজ্যে একদল ব্রিটিশ সৈন্য মোতায়েন রাখবেন।
  • বিপুল সামরিক ব্যয়ভার: সৈন্যদলের যাবতীয় ব্যয় রাজাকে বহন করতে হতো; ব্যর্থ হলে রাজ্যের উর্বর অংশ কোম্পানিকে লিখে দিতে হতো (যেমন নিজাম ও অযোধ্যার নবাব দিয়েছিলেন)।
  • ব্রিটিশ রেসিডেন্ট: রাজদরবারে একজন ইংরেজ রেসিডেন্ট থাকতেন, যিনি প্রত্যক্ষভাবে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে খবরদারি চালাতেন। ২. স্বাধীনতা হরণ: হায়দরাবাদ (১৭৯৮), মহীশূর (১৭৯৯), অযোধ্যা (১৮০১) এবং মারাঠা পেশওয়া (১৮০২) এই ফাঁদে পা দিয়ে কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়ে। রাজারা সামরিক আত্মরক্ষার ক্ষমতা হারিয়ে বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেন এবং তাদের সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়ায় হাজার হাজার দেশীয় সৈন্য জীবিকা হারিয়ে দস্যুদলে (পিন্ডারি) পরিণত হয়।
উদাহরণ 8
লর্ড ডালহৌসির 'স্বত্ববিলোপ নীতি' (Doctrine of Lapse) পর্যালোচনা করো। ১৮৫৬ সালে অযোধ্যা অধিগ্রহণ কেন ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহকে ত্বরান্বিত করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮–১৮৫৬) ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে আইনগত চাতুরীর মাধ্যমে স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) প্রয়োগ করেন: ১. স্বত্ববিলোপ নীতির বিধান: ভারতীয় হিন্দু প্রথা অনুযায়ী দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার সম্পূর্ণ বৈধ হলেও ডালহৌসি ঘোষণা করেন যে, কোম্পানি সৃষ্ট বা অধীনস্থ আশ্রিত রাজ্যের কোনো রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে তাঁর দত্তক পুত্র কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিক হবে, কিন্তু রাজসিংহাসনের দাবিদার হতে পারবে না। ফলে রাজ্যটি সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে বিলুপ্ত (Lapse) হবে। ২. ভুক্ত রাজ্যসমূহ: সাতারা (১৮৪৮, প্রথম শিকার), জয়তপুর ও সম্বলপুর (১৮৪৯), বাঘাট (১৮৫০), উদয়পুর (১৮৫২), ঝাঁসি (১৮৫৩ - গঙ্গাধর রাওয়ের দত্তক পুত্র দামোদর রাওকে অস্বীকার) এবং নাগপুর (১৮৫৪)। ৩. ১৮৫৬ সালে অযোধ্যা অধিগ্রহণ: নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের বৈধ সন্তান থাকায় সেখানে স্বত্ববিলোপ নীতি খাটানো যায়নি। তাই জেমস আউট্রামের মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ডালহৌসি ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'চরম কুশাসনের' (Chronic Misgovernance) অজুহাতে অযোধ্যা দখল করেন এবং নবাবকে কলকাতায় নির্বাসিত করেন। ৪. মহাবিদ্রোহের বিস্ফোরণ:

  • অযোধ্যার ২১,০০০ তালুকদারের জমিদারি বাজেয়াপ্ত করা হয়।
  • ব্রিটিশ বেঙ্গল আর্মির প্রায় ৭৫,০০০ সিপাহির বাড়ি ছিল অযোধ্যায়; তাঁদের পরিবার জমি ও বিশেষ আইনি সুযোগ হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
  • এই অবিচার সিপাহি ও কৃষক উভয়কেই ক্ষুব্ধ করে এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের (Great Revolt of 1857) প্রধান আগুনে ঘৃতাহুতি দেয়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) এবং বক্সারের যুদ্ধের (১৭৬৪) সামরিক চরিত্রের মধ্যে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

প্রকৃতপক্ষে পলাশী ছিল মির জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্রের ফসল (একটি ছোট সংঘর্ষ মাত্র); অপরদিকে বক্সার ছিল খোলা ময়দানে সুশৃঙ্খল কামান ও পদাতিক সৈন্যের সাহায্যে ব্রিটিশদের একটি খাঁটি সামরিক ও রক্তক্ষয়ী বিজয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

পলাশীর যুদ্ধের পরপরই রবার্ট ক্লাইভ দেওয়ানি পেয়েছিলেন বলে ভুল ধারণা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

পলাশীর যুদ্ধের পর নয়; ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে জয়ের পর ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট এলাহাবাদের সন্ধির মাধ্যমে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানিকে দেওয়ানি প্রদান করেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

'অন্ধকূপ হত্যা' ঘটনাটিকে একটি প্রশ্নাতীত ঐতিহাসিক সত্য বলে মেনে নেওয়া।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আধুনিক ইতিহাসচর্চায় প্রমাণিত যে ২৬৭ বর্গফুটের ঘরে ১৪৬ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সংকুলান গাণিতিকভাবে অসম্ভব; হলওয়েল ব্রিটিশ আগ্রাসনকে নৈতিক বৈধতা দিতে এই কাল্পনিক কাহিনি বানিয়েছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

মির কাসিম কেবল ইংরেজদের ক্ষতি করতে শুল্ক তুলে দিয়েছিলেন বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

মির কাসিম ১৭৬৩ সালে ভারতীয় ও ইউরোপীয় সমস্ত বণিকের জন্যই অভ্যন্তরীণ শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছিলেন, যাতে ইংরেজদের দস্তকের অবৈধ সুবিধার বিরুদ্ধে দেশীয় বণিকরা সমান সুযোগে বাণিজ্য করতে পারে।

সাধারণ ভুল ধারণা

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি এবং স্বত্ববিলোপ নীতির প্রবর্তকদের নাম গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (Subsidiary Alliance) প্রবর্তন করেন লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮); স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) প্রবর্তন করেন লর্ড ডালহৌসি (১৮৪৮)।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৮৫৬ সালে অযোধ্যাকে স্বত্ববিলোপ নীতির অধীনে দখল করা হয়েছিল বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের একাধিক পুত্রসন্তান ছিল, তাই সেখানে স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করা যায়নি। ডালহৌসি 'চরম কুশাসনের' (Chronic Misgovernance) অজুহাত দেখিয়ে অযোধ্যা অধিগ্রহণ করেছিলেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

ঔপনিবেশিক আমলে ভারতীয়রা উচ্চ সামরিক বা বেসামরিক পদে আসীন হতে পারত বলে ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

কর্নওয়ালিসের চরম বর্ণবাদী নিয়মে ভারতীয়দের ৫০০ পাউন্ডের বেশি বেতনযুক্ত সমস্ত পদ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতীয়দের সর্বোচ্চ সামরিক পদ ছিল সুবেদার এবং সিভিল সার্ভিসে আমিন বা দারোগা।

ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাঠামোগত রূপরেখা (WBBSE Class 8 Chapter 3 Concept Map)

পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ৩ কনসেপ্ট ম্যাপ ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা (পলাশী, বক্সার, চার স্তম্ভ ও সাম্রাজ্য বিস্তার) অতীত ও ঐতিহ্য অধ্যায় ৩ স্তম্ভ ১ কর্ণাটক ও বাংলা সংঘাত ইংরেজ-ফরাসি ও সিরাজউদ্দৌলা কর্ণাটকের যুদ্ধ (১৭৪৬-৬৩) • ডুপ্লে বনাম ক্লাইভ প্রতিদ্বন্দ্বিতা • বন্দিবাসের যুদ্ধ (১৭৬০) • ফরাসি শক্তির চরম পরাজয় সিরাজউদ্দৌলার বিরোধ (১৭৫৬) • দস্তকের ব্যাপক অপব্যবহার • ফোর্ট উইলিয়ামে অবৈধ প্রাচীর • কৃষ্ণদাসকে ইংরেজদের আশ্রয় অন্ধকূপ হত্যা ও আলিনগর • হলওয়েলের অন্ধকূপের মনগড়া গল্প • ক্লাইভ কর্তৃক কলকাতা পুনর্দখল • আলিনগরের সন্ধি (ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭) ঐতিহাসিক মোড় বণিক কোম্পানি কূটকৌশলে ও সামরিক শক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে বাংলার সার্বভৌম নবাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত হয়। স্তম্ভ ২ পলাশী থেকে দেওয়ানি বিশ্বাসঘাতকতা, বক্সার ও দ্বৈত শাসন পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) • ক্লাইভের ষড়যন্ত্র: মির জাফর • জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের চুক্তি • ২৩ জুন ১৭৫৭ চরম বিশ্বাসঘাতকতা পলাশী লুণ্ঠন ও মির কাসিম • কোষাগার লুণ্ঠন ও ক্লাইভের বিত্ত • মুঙ্গেরে রাজধানী ও সেনা সংস্কার • শুল্কমুক্ত দেশীয় বাণিজ্যের ঘোষণা বক্সার ও দেওয়ানি (১৭৬৪-৬৫) • ত্রিপক্ষীয় মোর্চা পর্যুদস্ত (১৭৬৪) • দেওয়ানি সনদ লাভ (১২ আগস্ট ১৭৬৫) • ক্লাইভের দ্বৈত শাসন (১৭৬৫-৭২) অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি দায়িত্বহীন রাজস্ব ক্ষমতা পেয়ে বাংলার সম্পদ দেদার লুণ্ঠন করে ১১৭৬-এর মন্বন্তর ডেকে আনে। স্তম্ভ ৩ প্রশাসনের চার স্তম্ভ আমলাতন্ত্র, সেনা, পুলিশ ও আইন সিভিল সার্ভিস (ICS) • কর্নওয়ালিস: সিভিল সার্ভিসের জনক • ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ (১৮০০) • ভারতীয়দের উচ্চপদে সম্পূর্ণ বর্জন সেনাবাহিনী ও পুলিশ • সিপাহি বাহিনী ও শ্বেতাঙ্গ অফিসার • কর্নওয়ালিসের থানা ব্যবস্থা (১৭৯৩) • দারোগা ও পুলিশ সুপারিন্টেন্ডেন্ট বিচার ব্যবস্থা ও আইন কোড • কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট (১৭৭৪) • সদর দেওয়ানি ও নিজামত আদালত • কর্নওয়ালিস কোড (ক্ষমতার পৃথকীকরণ) শাসকীয় লৌহকাঠামো রাজস্ব আদায় সুনিশ্চিত করা ও জনগণকে দমন করার জন্য একটি কঠোর ও বৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক যন্ত্র গড়ে তোলা হয়। স্তম্ভ ৪ সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি মিত্রতা ও স্বত্ববিলোপ নীতি অধীনতামূলক মিত্রতা (১৭৯৮) • লর্ড ওয়েলেসলির কূটনীতি • ব্রিটিশ সেনা ও রেসিডেন্ট মোতায়েন • হায়দরাবাদ, মহীশূর ও অযোধ্যা স্বত্ববিলোপ নীতি (১৮৪৮) • লর্ড ডালহৌসির রাজ্যগ্রাস নীতি • দত্তক পুত্রের উত্তরাধিকার খারিজ • সাতারা, সম্বলপুর, ঝাঁসি ও নাগপুর অযোধ্যা গ্রাস (১৮৫৬) • 'কুশাসনের' ছল ছুতোয় দখল • ওয়াজেদ আলি শাহ কলকাতায় নির্বাসিত • ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের মূল স্ফুলিঙ্গ সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ব দেশীয় রাজ্যগুলিকে গ্রাস করে বা পঙ্গু বানিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ১৮৫৬ সালের মধ্যেই সারা ভারতে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করে।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর অবসান: কর্ণাটকের তিনটি যুদ্ধের (১৭৪৬-১৭৬৩) মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা ফরাসিদের ক্ষমতা চূর্ণ করে; ১৭৬০ সালে বন্দিবাসের যুদ্ধে ফরাসিদের চূড়ান্ত পরাজয়ে ভারতে ব্রিটিশদের একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় শক্তিতে পরিণত করে।
মূল বিষয় 2
২. সিরাজউদ্দৌলা ও ১৭৫৬-র সংঘাত: তরুণ নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের বিরোধ বাধে দস্তকের অবাধ অপব্যবহার, ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের বেআইনি প্রাচীর নির্মাণ এবং রাজদ্রোহী কৃষ্ণদাসকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে, যার ফলে সিরাজ কলকাতা দখল করেন।
মূল বিষয় 3
৩. অন্ধকূপ হত্যার অপপ্রচার ও আলিনগরের সন্ধি: হলওয়েল কর্তৃক প্রচারিত অন্ধকূপ হত্যার বানোয়াট ট্র্যাজেডিকে অজুহাত করে ক্লাইভ কলকাতা পুনর্দখল করেন এবং ১৭৫৭-র ফেব্রুয়ারিতে সিরাজকে অপমানজনক আলিনগরের সন্ধিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন।
মূল বিষয় 4
৪. পলাশীর যুদ্ধ (২৩ জুন ১৭৫৭) ও পলাশী লুণ্ঠন: ক্লাইভ সেনাপতি মির জাফর, জগৎ শেঠ ও উমিচাঁদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সিরাজের পতন ঘটান। মির জাফরকে পুতুল নবাব বানিয়ে কোষাগার নিঃশেষ করে শুরু হয় 'পলাশী লুণ্ঠন', যা বিলেতের শিল্প বিপ্লবের ভিত্তি গড়ে তোলে।
মূল বিষয় 5
৫. মির কাসিম, বক্সারের যুদ্ধ ও দেওয়ানি লাভ: স্বাধীনচেতা মির কাসিম রাজধানী মুঙ্গেরে সরিয়ে শুল্কমুক্ত দেশীয় বাণিজ্যের ঘোষণা দিলে যুদ্ধ বাধে। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে ইংরেজরা মুঘল সম্রাট শাহ আলম, সুজা-উদ-দৌলা ও মির কাসিমের ত্রিপক্ষীয় মোর্চাকে পরাস্ত করে এবং ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট দেওয়ানি লাভ করে।
মূল বিষয় 6
৬. ক্লাইভের দ্বৈত শাসন (১৭৬৫–১৭৭২): কোম্পানি রাজস্বের অর্থ ও সামরিক ক্ষমতা ভোগ করত দায়িত্ব ছাড়া, আর নবাবের ওপর ছিল অর্থহীন প্রশাসনের দায়। এই চরম শোষণের ফলে ১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বাংলার ১ কোটি মানুষ অনাহারে মারা যায়।
মূল বিষয় 7
৭. চার প্রশাসনিক স্তম্ভের লৌহকাঠামো: কর্নওয়ালিস ও হেস্টিংস আমলাতন্ত্র (সিভিল সার্ভিসের জনক কর্নওয়ালিস, বর্ণবাদী বর্জন), সামরিক বাহিনী (সিপাহি নির্ভরতা ও শ্বেতাঙ্গ অফিসার একাধিপত্য), পুলিশ (১৭৯৩ থানা ও দারোগা ব্যবস্থা) এবং বিচার ব্যবস্থার (কর্নওয়ালিস কোড ১৭৯৩ ক্ষমতা পৃথকীকরণ, সুপ্রিম কোর্ট ১৭৭৪) মাধ্যমে এক সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলেন।
মূল বিষয় 8
৮. সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি: লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি (১৭৯৮ - হায়দরাবাদ, মহীশূর, অযোধ্যা, পেশওয়া) এবং লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি (১৮৪৮ - সাতারা, সম্বলপুর, ঝাঁসি, নাগপুর) ও ১৮৫৬-র অযোধ্যা অধিগ্রহণ সমগ্র ভারতকে পরাধীন করে এবং ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১৭৫৬ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধের তিনটি মূল কারণ কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: তিনটি প্রধান কারণ হলো: (১) কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে দস্তকের ব্যাপক অপব্যবহার ও শুল্ক ফাঁকি; (২) নবাবের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সামরিক প্রাচীর নির্মাণ; এবং (৩) অর্থ আত্মসাৎকারী পলাতক কৃষ্ণদাসকে ইংরেজদের রাজনৈতিক আশ্রয় দান।
বাণিজ্যিক ছাড়পত্র, কলকাতার দুর্গনির্মাণ এবং ঢাকার দেওয়ানের পলাতক পুত্রের আশ্রয়ের কথা স্মরণ করো।
2
ঐতিহাসিক তাৎপর্যের বিচারে বক্সারের যুদ্ধকে (১৭৬৪) কেন পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: পলাশী ছিল একটি অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধাভাস যাতে কেবল এক প্রাদেশিক নবাব পরাজিত হয়েছিলেন; কিন্তু বক্সার ছিল খোলা ময়দানে সুশৃঙ্খল সম্মুখ সমর যাতে দিল্লির মুঘল সম্রাট শাহ আলম, অযোধ্যার নবাব ও মির কাসিমের সম্মিলিত সর্বভারতীয় মোর্চা শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হয়।
ষড়যন্ত্র বনাম সম্মুখ সমর এবং পরাজিত শক্তির পদের কথা চিন্তা করো।
3
রবার্ট ক্লাইভ প্রবর্তিত 'দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা'র (১৭৬৫-১৭৭২) মূল নীতি ও ত্রুটি কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: মূল ত্রুটি ছিল ক্ষমতা ও দায়িত্বের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ: কোম্পানি দেওয়ানির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সমস্ত অর্থ ও সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করত কিন্তু জনগণের কোনো দায়িত্ব নিত না; আর পুতুল নবাব নিজামতের মাধ্যমে শাসনের পূর্ণ দায়িত্ব পেলেও তাঁর হাতে কোনো অর্থ বা ক্ষমতা ছিল না।
কোম্পানির 'দায়িত্বহীন ক্ষমতা' এবং নবাবের 'ক্ষমতাহীন দায়িত্ব' তুলনা করো।
4
১৭৯৩ সালের কর্নওয়ালিস কোডের (Cornwallis Code) মাধ্যমে জেলা প্রশাসনে কী গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কর্নওয়ালিস কোডের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় ও বিচার বিভাগীয় ক্ষমতা সম্পূর্ণ পৃথক করা হয়; জেলা কালেক্টরের কাছ থেকে সমস্ত বিচারিক ক্ষমতা প্রত্যাহার করে নবগঠিত ইউরোপীয় জেলা জজের (District Judge) হাতে অর্পণ করা হয়।
কালেক্টর এবং জেলা জজের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন মনে করো।
5
স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse) কী এবং ১৮৪৮ সালে কোন রাজ্যটি প্রথম এর শিকার হয়েছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: লর্ড ডালহৌসি প্রবর্তিত এই নীতি অনুযায়ী আশ্রিত কোনো দেশীয় রাজা অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে তাঁর দত্তক পুত্র সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতে পারত না এবং রাজ্যটি সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হতো। ১৮৪৮ সালে সাতারা রাজ্যটি প্রথম এর শিকার হয়।
ডালহৌসির দত্তক পুত্রের অধিকার বাতিল এবং মারাঠা রাজ্যের নাম স্মরণ করো।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

Establishment of Colonial Authority অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।