Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 5
আনুমানিক সময়: ৬৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস (অতীত ও ঐতিহ্য) পঞ্চম অধ্যায়: 'ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ'-এর প্রামাণ্য ও বিস্তারিত পাঠ্য রূপরেখায় স্বাগত। এই অধ্যায়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় সমাজের দ্বিবিধ প্রতিক্রিয়া উন্মোচিত হয়েছে—একদিকে কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষা ও আইনসম্মত সমাজ সংস্কারের প্রয়াস (রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও ও নব্যবঙ্গ, মেকলে মিনিট, উডের ডেসপ্যাচ), অন্যদিকে গ্রামীণ কৃষক ও অরণ্যচারী আদিবাসীদের শোষণমুক্তির সশস্ত্র প্রতিরোধ (সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, চুয়াড় বিদ্রোহ, রংপুর ডিং, কোল বিদ্রোহ, সাঁওতাল হুল, তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ ও ফরায়েজি আন্দোলন)। এই গণবিক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক মহাবিদ্রোহে, যা ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে ১৮৫৮ সালের মহারানীর ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজমুকুটের প্রত্যক্ষ শাসন প্রবর্তন করে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

কেন ঊনবিংশ শতকের বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশ সহযোগিতার মাধ্যমে সমাজ সংস্কার ও শিক্ষার প্রসারে ব্রতী হয়েছিল, অথচ গ্রামীণ দরিদ্র কৃষক ও অরণ্যচারী আদিবাসী সমাজ সর্বস্ব হারিয়ে এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল যা ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহে চরম রূপ ধারণ করে?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

এই অধ্যায়টি আয়ত্ত করা আধুনিক ভারতের ইতিহাস অনুধাবনের জন্য অপরিহার্য। এটি স্পষ্ট করে যে কীভাবে ব্রিটিশ শাসনের ঔপনিবেশিক শোষণ একদিকে কলকাতায় এক সংস্কারক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল, অন্যদিকে গ্রামীণ ভারতে ভূমিহীন কৃষক ও জনজাতিদের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে বাধ্য করেছিল। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের মাধ্যমে কোম্পানির এক শতাব্দীর বাণিজ্যিক শোষণের অবসান ঘটে এবং ভারতের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের এক নতুন দিগন্ত সূচিত হয়।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পলাশী (১৭৫৭) ও বক্সারের (১৭৬৪) যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য এবং ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ
  • ঔপনিবেশিক ভূমি রাজস্ব নীতি: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩), কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ অর্থনীতির বিনাশ
  • রেগুলেটিং অ্যাক্ট ও চার্টার অ্যাক্টের মাধ্যমে কোম্পানির কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থার বিকাশ

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • উনিশ শতকের বাংলায় রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং ডিরোজিওর সংস্কার আন্দোলনের চরিত্র ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন করা।
  • প্রাচ্যবাদী-পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক থেকে শুরু করে মেকলে মিনিট (১৮৩৫), উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪) এবং তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৭) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার বিশ্লেষণ করা।
  • আদিপর্বের কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহসমূহের (সন্ন্যাসী-ফকির, চুয়াড়, রংপুর ডিং এবং কোল বিদ্রোহ) পটভূমি, নেতৃত্ব ও সাবঅল্টার্ন বৈশিষ্ট্য অনুধাবন করা।
  • সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬), তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ (বাঁশের কেল্লা ১৮৩১) এবং ফরায়েজি আন্দোলনের গণমুখী কৃষক চরিত্র পরীক্ষা করা।
  • ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহের বহুমুখী কারণ, সামরিক বিস্তার, নেতৃত্ব ও চরিত্র বিতর্ক অনুধাবন করা এবং ১৮৫৮ সালের মহারানীর ঘোষণাপত্রের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 অধ্যায় ১: সংস্কার ও সহযোগিতা: সমাজ...
2 অধ্যায় ২: আদিপর্বের কৃষক ও আদিবাসী...
3 অধ্যায় ৩: সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬) ও...
4 অধ্যায় ৪: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবি...
5 অধ্যায় ৫: মহারানীর ঘোষণাপত্র (১৮৫৮...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

অধ্যায় ১: সংস্কার ও সহযোগিতা: সমাজ সংস্কার ও পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার (১৮১৫–১৮৫৭)

১.১ ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বিমুখী রূপ: সহযোগিতা বনাম বিদ্রোহ

বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভারতীয় সমাজের প্রতিক্রিয়ায় দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারার বিকাশ ঘটে। একদিকে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত নব্য মধ্যবিত্ত সমাজ (ভদ্রলোক শ্রেণি) ব্রিটিশ প্রশাসনের সাথে সহযোগিতা করে সমাজ সংস্কার ও আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারে উদ্যোগী হয়। অন্যদিকে বাংলার পল্লী অঞ্চলে সর্বস্বান্ত কৃষক, কারিগর ও অরণ্যবাসী আদিবাসীরা ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুটের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশ্বাস করত যে ব্রিটিশ শাসন মধ্যযুগীয় সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে এবং যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। কিন্তু তাদের এই আন্দোলন প্রধানত উচ্চবর্ণ ও শহরকেন্দ্রিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে গ্রামীণ মেহনতি জনতার গভীর অর্থনৈতিক দুর্দশার সাথে এর কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল না।

১.২ রাজা রামমোহন রায় ও আধুনিক সমাজ সংস্কারের সূচনা

রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩)-কে আধুনিক ভারতের জনক ও নবজাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। তিনি যুক্তি ও মানবতাবাদের ভিত্তিতে একাধিক যুগান্তকারী সংস্কারের সূচনা করেন:

  • ধর্মীয় সংস্কার ও আত্মীয় সভা (১৮১৫): বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতা বর্জন করে উপনিষদের একেশ্বরবাদী দর্শনের ভিত্তিতে রামমোহন ১৮১৫ সালে কলকাতায় আত্মীয় সভা স্থাপন করেন। ১৮২৮ সালে তিনি ব্রাহ্মসভা (পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা জাতিভেদহীন একেশ্বরবাদী উপাসনার পথ উন্মোচন করে।
  • সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন (১৮২৯): উনিশ শতকের বাংলায় বিধবা নারীদের মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার অমানবিক সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। রামমোহন প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র (যেমন মনুসংহিতা) উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে বৈদিক শাস্ত্রে সতীদাহের কোনো সমর্থন নেই। তিনি রক্ষণশীলদের তীব্র আক্রমণ উপেক্ষা করে জনমত গঠন করেন এবং বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর সহায়তায় ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ১৭ নম্বর রেগুলেশন (Regulation XVII) জারি করে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও নরহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
  • পাশ্চাত্য শিক্ষার সপক্ষে প্রচার: ১৮২৩ সালে রামমোহন বড়োলাট লর্ড আমহার্স্টকে এক বিখ্যাত চিঠি লিখে সংস্কৃত কলেজের পরিবর্তে আধুনিক গণিত, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও ইংরেজি শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের দাবি জানান। তিনি হিন্দু কলেজ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন এবং ১৮১৫ সালে অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল ও ১৮২৬ সালে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
১.৩ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গল বা নব্যবঙ্গ আন্দোলন

কলকাতার হিন্দু কলেজের তরুণ ও প্রখর মেধা সম্পন্ন অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১)-র অনুপ্রেরণায় একদল ছাত্র প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র বৌদ্ধিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই দলটি 'ইয়ং বেঙ্গল' (Young Bengal) বা 'নব্যবঙ্গ দল' নামে পরিচিত:

  • যুক্তিবাদ ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরোধিতা: ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন—"সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে বিচার করো, সত্যকে ভালোবাসো এবং কোনো অন্ধ কর্তৃত্বের কাছে মাথা নত কোরো না।" ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ডিরোজিওর শিষ্যরা হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
  • অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন ও পত্রিকা: ১৮২৮ সালে ডিরোজিও অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামক বিতর্ক সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের মতামত প্রকাশের জন্য পার্থেনন (Parthenon), হেস্পেরাস, ও এনকোয়ারার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই দলের বিশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
  • আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা: ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক ও আবেগসর্বস্ব। প্রকাশ্য রাজপথে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ বা উপবীত ছেঁড়ার মতো আচরণ রক্ষণশীল সমাজকে আঘাত করলেও গ্রামীণ কৃষক সমাজের দুর্দশার সাথে তাঁদের কোনো বাস্তব সংযোগ ছিল না। রক্ষণশীলদের চাপে ১৮৩১ সালের এপ্রিল মাসে ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং ওই বছরই মাত্র ২২ বছর বয়সে কলেরায় তাঁর মৃত্যু হয়।
১.৪ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বিধবাবিবাহ আন্দোলন

পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) ছিলেন অসামান্য পাণ্ডিত্য, নির্ভীক তেজস্বিতা এবং গভীর মানবতাবোধের প্রতীক। ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়ে তিনি ব্রাহ্মণ ছাড়াও অন্যান্য বর্ণের ছাত্রদের জন্য কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং সহজ পাঠ বর্ণপরিচয় রচনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।

বিদ্যাসাগরের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কীর্তি হলো বিধবাবিবাহ আন্দোলন:

  • তৎকালীন হিন্দু সমাজে কৌলীন্য প্রথা ও বাল্যবিবাহের ফলে অসংখ্য শিশুকন্যা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে অসহনীয় কৃচ্ছ্রসাধন ও লাঞ্ছনার শিকার হতো।
  • বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতার একটি বিশেষ শ্লোক উদ্ধার করে প্রমাণ করেন যে শাস্ত্র অনুসারেই বিধবাবিবাহ বৈধ: "নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ..."।
  • রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল 'ধর্মসভা'-র তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালে সরকারের কাছে প্রায় এক হাজার বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষর সংবলিত আবেদনপত্র জমা দেন।
  • অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই পঞ্চদশ বিধি (Act XV of 1856) পাস করে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু বিধবাবিবাহকে আইনসিদ্ধ ঘোষণা করে (আইনের খসড়া তৈরি হয়েছিল লর্ড ডালহৌসির আমলে এবং পাস হয় লর্ড ক্যানিং-এর আমলে)। ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও কালীমতী দেবীর মধ্যে, যার সম্পূর্ণ ব্যয় বিদ্যাসাগর বহন করেছিলেন।
  • স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার: ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সহযোগিতায় বিদ্যাসাগর ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল (বর্তমান বেথুন স্কুল) এবং নিজ ব্যয়ে বাংলায় ৩৫টিরও বেশি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
১.৫ পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার: মেকলে মিনিট থেকে উডের ডেসপ্যাচ

১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দের পর প্রাচ্য ভাষা বনাম ইংরেজি ভাষার পক্ষে চরম বিতর্ক বাঁধে, যা প্রাচ্যবাদী-পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত:

নীতি / নথি সাল ও প্রণেতা মূল বিষয়বস্তু ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
মেকলে মিনিট ১৮৩৫
টমাস ব্যাবিংটন মেকলে
প্রাচ্য শিক্ষাকে তাচ্ছিল্য করে মেকলে বলেন—"একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি মাত্র তাকের বই সমগ্র ভারত ও আরবের সাহিত্যের সমান।" তিনি চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব (Downward Filtration Theory) প্রচার করেন—উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের নিম্নস্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
লর্ড বেন্টিঙ্কের শিক্ষানীতি ১৮৩৫ (মার্চ)
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক
মেকলের প্রস্তাব মেনে সরকারি নীতি হিসেবে ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করা হয় এবং ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়।
উডের ডেসপ্যাচ ১৮৫৪ (জুলাই)
স্যার চার্লস উড
একে ভারতে 'ইংরেজি শিক্ষার মহাসনদ' (Magna Carta) বলা হয়। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সুবিন্যস্ত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়: (১) প্রতিটি প্রদেশে জনশিক্ষা দপ্তর (DPI) গঠন, (২) বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান (Grants-in-aid), (৩) নারীশিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ, (৪) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।
তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ১৮৫৭
কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ
উডের সুপারিশ অনুসারে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতে আধুনিক উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে।

অধ্যায় ২: আদিপর্বের কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮৩৪)

২.১ গ্রামীণ অসন্তোষের পটভূমি ও ঔপনিবেশিক রাজস্ব শোষণ

কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় চালু হয় চরম ভূমি রাজস্ব শোষণ। তার সাথে যোগ হয় ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) ছিয়াত্তরের ভয়াবহ মন্বন্তর, যাতে বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। এই চরম সংকটেও কোম্পানির সরকার খাজনা মকুব তো করেইনি, বরং কঠোরভাবে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখে। ফলে গ্রামীণ বাংলার কৃষক, কারিগর, পদচ্যুত পাইক সেনা এবং আদিবাসীরা অস্ত্র তুলে নিতে বাধ্য হয়।

২.২ সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮০০)

কোম্পানি শাসনের বিরুদ্ধে বাংলায় প্রথম দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিল সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, যা উত্তর ও পূর্ব বাংলায় (রংপুর, দিনাজপুর, মালদা, ঢাকা, ময়মনসিংহ) ছড়িয়ে পড়েছিল:

  • বিদ্রোহের কারণ: বেদান্তবাদী হিন্দু গিরি সন্ন্যাসী এবং মাদারিয়া সুফি মুসলিম ফকিররা বাংলায় তীর্থভ্রমণের পাশাপাশি অর্থলগ্নি ও ব্যবসা করতেন। ১৭৭০-এর মন্বন্তরের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁদের ওপর বৈষম্যমূলক তীর্থকর আরোপ করে এবং তাঁদের গতিবিধির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে তাঁদের 'দস্যু' ও 'লুণ্ঠনকারী' বলে আখ্যা দেয়।
  • বিদ্রোহের গতিপ্রকৃতি: ফকির নেতা মজনু শাহ, চিরাগ আলি এবং সন্ন্যাসী নেতা ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী-র নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা ঐক্যবদ্ধ হন। তাঁরা কোম্পানির নীলকুঠি, রাজস্ব দপ্তর (খাজাঞ্চিখানা) ও দেশীয় জমিদারদের গুদাম আক্রমণ করে অনাহারক্লিষ্ট কৃষকদের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণ করতেন।
  • দমন ও তাৎপর্য: উত্তরবঙ্গের দুর্গম জঙ্গল থেকে গেরিলা কায়দায় যুদ্ধ চালিয়ে বিদ্রোহীরা ক্যাপ্টেন টমাসের মতো ব্রিটিশ সেনাপতিকে পরাস্ত ও হত্যা করেন। শেষ পর্যন্ত ওয়ারেন হেস্টিংস বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে অষ্টাদশ শতকের শেষে এই বিদ্রোহ দমন করেন। এই ঐতিহাসিক সংগ্রামকে কেন্দ্র করেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ (১৮৮২)—যা থেকে বন্দেমাতরম্ সংগীতের উৎপত্তি—এবং দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪)।
২.৩ জঙ্গলমহলের চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৮–১৭৯৯)

মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও মানভূমের আদিম ভূমিজ ও কুড়মি অধিবাসীদের ব্রিটিশরা অবজ্ঞাসূচকভাবে 'চুয়াড়' (অভদ্র বা বর্বর) বলত। এই অঞ্চলে দু-দফায় তীব্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে:

  • কারণ: চুয়াড়রা স্থানীয় জমিদারদের অধীনে বংশানুক্রমিকভাবে পাইক বা রক্ষীর কাজ করত এবং বিনিময়ে করমুক্ত 'পাইকান জমি' ভোগ করত। কোম্পানি শাসন প্রবর্তনের পর জমিদারদের ওপর বিপুল রাজস্ব চাপানো হয় এবং পাইকদের নিষ্কর পাইকান জমি বাজেয়াপ্ত করে চড়া মূল্যে বহিরাগতদের ইজারা দেওয়া হয়।
  • প্রথম পর্ব (১৭৬৮–৬৯): ধলভূমের রাজা জগন্নাথ সিংহ-এর নেতৃত্বে চুয়াড়রা বিদ্রোহের সূচনা করেন। লেফটেন্যান্ট ফার্গুসনের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বাহিনীকে তারা নাস্তানাবুদ করে।
  • দ্বিতীয় পর্ব (১৭৯৮–৯৯): রায়পুরের পদচ্যুত জমিদার দুর্জন সিংহ এবং কর্ণগড়ের সাহসী রাণী শিরোমণি (যাঁকে 'মেদিনীপুরের লক্ষ্মীবাঈ' বলা হয়)-র নেতৃত্বে হাজার হাজার চুয়াড় ব্রিটিশ থানা, নীলকুঠি ও সরকারি দপ্তর জ্বালিয়ে দেয়। ব্রিটিশ ফৌজ চরম নিষ্ঠুরতায় বিদ্রোহীদের দমন করে এবং রাণী শিরোমণিকে বন্দি করে মেদিনীপুর জেলে পাঠায়।
  • প্রশাসনিক সংস্কার: বিদ্রোহের গভীরতা উপলব্ধি করে ব্রিটিশ সরকার ১৮০৫ সালের ১৮ নম্বর রেগুলেশন অনুযায়ী মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও বীরভূমের জঙ্গলঘেরা এলাকা নিয়ে পৃথক জঙ্গলমহল জেলা (Jungle Mahals District) গঠন করতে বাধ্য হয়।
২.৪ রংপুর ডিং বা বিদ্রোহ (১৭৮৩): ইজারাদারি শোষণের বিরুদ্ধে কৃষক একতা

উত্তরবঙ্গের রংপুর ও দিনাজপুরে ১৭৮৩ সালে হিন্দু ও মুসলিম কৃষকদের এক অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়, যা রংপুর ডিং (বিদ্রোহ) নামে খ্যাত:

  • কোম্পানি সরকার রংপুর ও দিনাজপুরের রাজস্ব আদায়ের ইজারা দেয় কুখ্যাত অত্যাচারী দেবী সিংহ-কে। দেবী সিংহ ও তাঁর দেওয়ান হরেকৃষ্ণ সিং কৃষকদের ওপর অস্বাভাবিক অতিরিক্ত আবওয়াব (বেআইনি কর) ধার্য করেন এবং খাজনা দিতে না পারলে কৃষকদের উল্টো করে ঝুলিয়ে চাবুক মারা, আগুনে পোড়ানো ও গরু-বাছুর কেড়ে নেওয়ার মতো অকথ্য নির্যাতন চালান।
  • প্রতিকার না পেয়ে কাজিরহাটের কৃষক নেতা নুরুলুদ্দীন (যাঁকে কৃষকরা 'নবাব' ঘোষণা করেন) এবং দয়ারাম শীল-এর নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা সমান্তরাল স্বাধীন কৃষক সরকার গঠন করেন।
  • বিদ্রোহীরা যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য চাঁদা হিসেবে 'ধিং-টাকা' আদায় করেন এবং দেবী সিংহের কর্মচারীদের বিতাড়িত করেন। শেষ পর্যন্ত মুঘলহাটের যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের ব্রিটিশ বাহিনী নুরুলুদ্দীনকে হত্যা করে বিদ্রোহ দমন করে। তবে এই গণআন্দোলনের ফলেই কোম্পানি দেবী সিংহের ইজারা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
২.৫ ছোটনাগপুরের কোল বিদ্রোহ (১৮৩১–১৮৩২)

ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলে (রাঁচি, সিংভূম, পালামৌ, হাজারিবাগ) মুণ্ডা, হো ও ওরাওঁ আদিবাসীদের সম্মিলিত সংগ্রাম কোল বিদ্রোহ নামে পরিচিত:

  • কোলরা প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামপ্রধান (মুণ্ডা ও মানকি)-দের অধীনে যৌথভাবে জমি চাষ করত। কিন্তু ব্রিটিশদের আগমনের পর ব্রিটিশ পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার ছত্রচ্ছায়ায় বহিরাগত ব্যবসায়ী, মহাজন ও ইজারাদাররা কোলভূমিতে প্রবেশ করে, যাদের আদিবাসীরা দিকু (Diku বা বহিরাগত শত্রু) বলত।
  • দিকুরা কোলদের চিরাচরিত জমি কেড়ে নেয়, চড়া সুদে ঋণের জালে জড়ায়, বেগার খাটাতে বাধ্য করে এবং কোলদের ঐতিহ্যবাহী পানীয় পঁচুই (Pachwai বা চালের মদ)-এর ওপর অন্যায় শুল্ক চাপায়।
  • ১৮৩১ সালে সোঁনপুরের এক কোল নেতার জমি কেড়ে নেওয়া ও আদিবাসী নারীদের অপমানের ঘটনায় দাবানলের মতো বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বুদ্ধু ভগত, জোয়া ভগত ও মাদারা মাহাতো-র নেতৃত্বে কোলরা তীর-ধনুক ও কুঠার নিয়ে দিকুদের বসতি ও ব্রিটিশ সেনা ছাউনিতে আক্রমণ চালায়।
  • কোয়েল নদীর তীরে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে বুদ্ধু ভগত ও তাঁর অনুগামীরা শহিদ হন। বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সরকার আদিবাসীদের শান্ত করতে ১৮৩৪ সালে ওই অঞ্চলকে পৃথক করে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত এজেন্সি (South-West Frontier Agency বা SWFA) গঠন করে।

অধ্যায় ৩: সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬) ও ওয়াহাবি/ফরায়েজি আন্দোলন

৩.১ সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–১৮৫৬): আদিবাসী গণজাগরণের মহাবিপ্লব

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের ঠিক প্রাক্কালে রাজমহল পাহাড় ও ছোটনাগপুর অঞ্চলে সংঘটিত সাঁওতাল হুল (সাঁওতাল ভাষায় 'হুল' শব্দের অর্থ সশস্ত্র বিদ্রোহ বা বিপ্লব) ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাধিক সুসংগঠিত ও বীরত্বপূর্ণ আদিবাসী অভ্যুত্থান:

৩.১.১ দামিন-ই-কোহ ও শোষণের জাল
  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর আদি বাসস্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে সাঁওতালরা রাজমহল পার্বত্য অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। ১৮৩২–৩৩ সালে ব্রিটিশ সরকার এই অঞ্চলকে দামিন-ই-কোহ (ফারসি শব্দ, যার অর্থ 'পাহাড়ের প্রান্তদেশ') নামে চিহ্নিত করে।
  • সাঁওতালরা রক্ত জল করে গভীর জঙ্গল কেটে চাষযোগ্য উর্বর জমিতে পরিণত করে। কিন্তু জমি আবাদ হতেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে বহিরাগত মহাজন, ব্যবসায়ী ও ব্রিটিশ রাজস্ব কর্মচারীরা।
  • প্রতারক বাটখারা: কেনারাম ও বেচারাম: সহজ-সরল নিরক্ষর সাঁওতালদের ঠকানোর জন্য মহাজনরা দুই ধরনের ভুয়ো পাথরের বাটখারা ব্যবহার করত—ফসলাদি কেনার সময় ভারী বাটখারা (কেনারাম) এবং সাঁওতালদের কাছে লবণ বা তেল বিক্রির সময় হালকা বাটখারা (বেচারাম)। এছাড়া ৫০% থেকে ৫০০% পর্যন্ত চড়া সুদ চাপিয়ে সাঁওতালদের পুরুষানুক্রমিক ক্রীতদাসে (কামিয়াতি ও হারওয়াহি প্রথা) পরিণত করা হতো।
  • রেলপথ তৈরির ব্রিটিশ ঠিকাদারদের অকথ্য অত্যাচার এবং স্থানীয় দারোগা মহেশলাল দত্তের ঘুষ ও জুলুমে সাঁওতালদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায়।
৩.১.২ ভগনাডিহির মহা সমাবেশ ও হুলের সূচনা

১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ভগনাডিহির মাঠে ৪০০টি গ্রামের প্রায় ১০,০০০ সাঁওতাল সমবেত হন। সেখানে চার ভাই—সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব এবং তাঁদের দুই নির্ভীক ভগিনী ফুলো ও ঝানো মুর্মু ঘোষণা করেন যে তাঁদের আরাধ্য দেবতা 'ঠাকুর জিউ' নির্দেশ দিয়েছেন সমস্ত দিকু ও ব্রিটিশদের বিতাড়িত করে স্বাধীন 'সাঁওতাল রাজ' প্রতিষ্ঠা করতে।

  • বার্তা প্রেরণ ও যুদ্ধরীতি: বিদ্রোহের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামে গ্রামে পবিত্র শালগাছের ডাল (ধারওয়াক) পাঠানো হতো। তীর-ধনুক ও টাঙ্গি নিয়ে প্রায় ৫০,০০০ সাঁওতাল যোদ্ধা ময়দানে নামেন।
  • তাঁরা অত্যাচারী দারোগা মহেশলাল দত্তকে হত্যা করেন, মহাজনদের বাড়ি ও নীলকুঠি ধ্বংস করেন এবং ভাগলপুর থেকে রাজমহল পর্যন্ত ব্রিটিশ ডাক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
  • নিষ্ঠুর দমন ও সাঁওতাল পরগনা গঠন: ভীতসন্ত্রস্ত ব্রিটিশ সরকার মেজর বরো ও জেনারেল লয়েডের অধীনে আধুনিক রাইফেল ও কামান সজ্জিত বিশাল সেনাবাহিনী নামায়। কামানের গোলার সামনে সাঁওতালরা তীর-ধনুক নিয়ে বীর বিক্রমে বুক চিতিয়ে লড়াই করে। প্রায় ১৫,০০০ সাঁওতালকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। সিধু ও কানুকে বন্দি করে ভগনাডিহিতে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
  • বিদ্রোহের পরিণতিতে ব্রিটিশ সরকার উপলব্ধি করে যে সাঁওতালদের সাধারণ আইনে শাসন করা সম্ভব নয়। তাই ১৮৫৫ সালের ৩৭ নম্বর রেগুলেশন অনুসারে বীরভূম ও ভাগলপুরের অংশ নিয়ে ৫,৫০০ বর্গমাইল আয়তনের পৃথক সাঁওতাল পরগনা জেলা গঠন করা হয় এবং সেখানে মহাজনী শোষণ নিয়ন্ত্রণের আইন পাস হয়।
৩.২ তিতুমীর ও বারাসাত বিদ্রোহ (১৮৩১): বাঁশের কেল্লার অমর লড়াই

ভারতে ওয়াহাবি আন্দোলন (মূল নাম তারিকাহ্-ই-মুহম্মদিয়া)-এর মূল প্রবক্তা ছিলেন সৈয়দ আহমদ বেরেলভি। কিন্তু বাংলায় এই আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক আপসহীন কৃষক ও তাঁতিদের ব্রিটিশ-বিরোধী গণসংগ্রামে রূপ নেয় সৈয়দ মীর নিসার আলী বা তিতুমীর (১৭৮২–১৮৩১)-এর নেতৃত্বে:

  • জমিদার ও নীলকর শোষণ: চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুরের দরিদ্র মুসলিম ও হিন্দু তাঁতি-কৃষকদের ওপর স্থানীয় জমিদার ও ইংরেজ নীলকররা অবর্ণনীয় অত্যাচার চালাত। পুড়ার কুখ্যাত জমিদার কৃষ্ণদেব রায় তিতুমীরের অনুগামীদের ওপর বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক 'দাড়ির কর' (প্রতি জনের ওপর বার্ষিক আড়াই টাকা) ধার্য করেন।
  • নারকেলবেড়িয়ার বাঁশের কেল্লা: জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তিতুমীর ১৮৩১ সালে বারাসাতের কাছে নারকেলবেড়িয়া গ্রামে তাঁর ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। তিনি নিজেকে স্বাধীন শাসক ঘোষণা করে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘোষণা করেন এবং বিশ্বস্ত শিষ্য গোলাম মাসুম-কে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন।
  • শ্রেণি চরিত্র ও গণঐক্য: তিতুমীর স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কোনো নির্দোষ হিন্দু প্রজার ক্ষতি না হয়। তাঁর যুদ্ধ ছিল কেবল অত্যাচারী জমিদার, নীলকর ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে। ফলে দরিদ্র হিন্দু কৃষকদের একাংশও তিতুমীরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
  • কামানের আঘাত ও তিতুমীরের শাহাদাত: তিতুমীর স্থানীয় জমিদারদের লাঠিয়াল ও পুলিশের বাহিনীকে পরাস্ত করলে আতঙ্কিত ব্রিটিশ সরকার মেজর স্কট-এর নেতৃত্বে অশ্বারোহী বাহিনী ও ভারী কামান পাঠায়। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ গোলন্দাজ বাহিনীর অবিরাম কামান হামলায় তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কামানের গোলার আঘাতে রণক্ষেত্রেই বীর তিতুমীর শহিদ হন। গোলাম মাসুমকে বন্দি করে কেল্লার ধ্বংসাবশেষের সামনে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।
৩.৩ পূর্ব বাংলায় ফরায়েজি আন্দোলন

পূর্ব বাংলার ফরিদপুরে হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০) ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেন। 'ফরায়েজি' শব্দটি এসেছে আরবি 'ফরজ' (বাধ্যতামূলক ধর্মীয় কর্তব্য) থেকে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে 'দার-উল-হারব' (শত্রুর দেশ) বলে ঘোষণা করেন এবং জুম্মা ও ঈদের নামাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।

শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুহসিনউদ্দীন আহমদ ওরফে দুদু মিঞা (১৮১৯–১৮৬২) এই আন্দোলনকে এক বৈপ্লবিক কৃষক সংগঠনে পরিণত করেন:

  • দুদু মিঞা ঐতিহাসিক সাম্যবাদী ঘোষণা করেন: "সমস্ত জমি আল্লাহর দান, সুতরাং জমিতে কারও খাজনা আদায়ের অধিকার নেই।" (Land belongs to Allah)।
  • তিনি পূর্ব বাংলাকে বিভিন্ন প্রশাসনিক চক্রে (হালকা) ভাগ করে গ্রামপ্রধান (মুন্সী) নিয়োগ করেন, নিজস্ব আদালত গঠন করে ব্রিটিশ আদালত বয়কটের ডাক দেন এবং ইংরেজ নীলকর ও অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

অধ্যায় ৪: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ

৪.১ মহাবিদ্রোহের বহুমুখী পটভূমি ও কারণসমূহ

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের মহাবিদ্রোহ কোনো আকস্মিক সামরিক বিশৃঙ্খলা ছিল না; এটি ছিল এক শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ, রাজনৈতিক দমননীতি, অর্থনৈতিক লুণ্ঠন এবং সামাজিক-ধর্মীয় অপমানের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ:

কারণসমূহ নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক কারণ • স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): লর্ড ডালহৌসি ভারতীয় রাজাদের দত্তকপুত্র গ্রহণের অধিকার নাকচ করে সাতারা (১৮৪৮), সম্বলপুর (১৮৪৯), ঝাঁসি (১৮৫৩) ও নাগপুর (১৮৫৪) গ্রাস করেন।
• অযোধ্যা অধিগ্রহণ (১৮৫৬): 'কুশাসনের' অজুহাত দিয়ে ডালহৌসি অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে সিংহাসনচ্যুত করেন। অযোধ্যা ছিল বেঙ্গল আর্মির মূল উৎস (৭৫,০০০ সিপাহি অযোধ্যার সন্তান ছিলেন)।
• দ্বিতীয় পেশোয়া বাজিরাওয়ের দত্তকপুত্র নানা সাহেবের বার্ষিক ৮ লক্ষ টাকার পেনশন বন্ধ করা হয় এবং মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে লালকেল্লা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক কারণ • ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের সস্তা কাপড়ের আগ্রাসনে বাংলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প ও তাঁতিরা ধ্বংস হয়ে যায় (শিল্পের অবলুপ্তি বা De-industrialization)।
• চড়া ভূমি রাজস্বে কৃষকরা ঋণের জালে পিষ্ট হয় এবং ডালহৌসির 'ইনম কমিশন' প্রায় ২০,০০০ ভূস্বামীর নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করায় তালুকদার ও জমিদার শ্রেণি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
সামাজিক ও ধর্মীয় কারণ • খ্রিস্টান মিশনারিদের উগ্র ধর্মান্তরকরণ প্রচেষ্টা এবং ১৮৫৬ সালের রিলিজিয়াস ডিজ্যাবিলিটিজ অ্যাক্ট (খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার বহাল থাকবে) ভারতীয়দের ধর্মনাশের আশঙ্কায় আতঙ্কিত করে।
• সতীদাহ নিবারণ (১৮২৯) ও বিধবাবিবাহ আইন (১৮৫৬)-কে সনাতনপন্থী সমাজ নিজস্ব ধর্মীয় বিধানে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বলে মনে করে।
সামরিক কারণ • ভারতীয় সিপাহিদের ইউরোপীয় সেনাদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেতন দেওয়া হতো, সুবেদারের ওপরে পদোন্নতি নিষিদ্ধ ছিল এবং কথায় কথায় 'কালা আদমি' বা 'শুয়ার' বলে গালি দেওয়া হতো।
• ১৮৫৬ সালের সাধারণ সেবা নিয়োগ আইন (General Service Enlistment Act): সিপাহিদের সমুদ্রপারে যুদ্ধযাত্রার আদেশ বাধ্যতামূলক করা হয়, যা উচ্চবর্ণের হিন্দুদের জাতিনাশের কারণ ছিল (কালাপানি পারাপারের নিষেধাজ্ঞা)।
প্রত্যক্ষ কারণ • এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক: ১৮৫৭ সালের গোড়ার দিকে সেনাবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেল চালু হয়। এর কার্তুজের খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। রটে যায় যে ওই কার্তুজের পিচ্ছিল চর্বি তৈরি হয়েছে গরু (হিন্দুদের কাছে পবিত্র) ও শূকরের (মুসলমানদের কাছে নিষিদ্ধ) চর্বি দিয়ে। ফলে উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিরা বিশ্বাস করে যে কোম্পানি সরকার সচেতনভাবে তাদের ধর্মনাশের চক্রান্ত করেছে।
৪.২ ব্যারাকপুর থেকে মিরাট: বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ
  • ব্যারাকপুরে প্রথম বিদ্রোহ (২৯ মার্চ ১৮৫৭): কলকাতার কাছে ব্যারাকপুর সেনা ছাউনিতে ৩৪ নম্বর বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির তরুণ সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে এনফিল্ড কার্তুজ ব্যবহারে সোজাসুজি অস্বীকার করেন। তিনি উন্মুক্ত প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে ব্রিটিশ সার্জেন্ট-মেজর হিউসন ও লেফটেন্যান্ট বগকে গুলি ও তলোয়ারের আঘাতে ধরাশায়ী করেন। মঙ্গল পাণ্ডেকে বন্দি করে ১৮৫৭ সালের ৮ এপ্রিল ফাঁসি দেওয়া হয় এবং জমাদার ঈশ্বরী প্রসাদকে ২১ এপ্রিল ফাঁসি দেওয়া হয়।
  • মিরাটে মহাবিস্ফোরণ (১০ মে ১৮৫৭): ২৪ এপ্রিল মিরাটের ৩ নম্বর দেশীয় অশ্বারোহী বাহিনীর ৮৫ জন সেনা কার্তুজ ব্যবহারে অস্বীকার করায় তাঁদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে লোহার শিকলে বন্দি করা হয়। ১০ মে ১৮৫৭ রবিবার গোটা মিরাট ছাউনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সিপাহিরা অস্ত্রাগার ও জেলখানা ভেঙে কমরেডদের মুক্ত করে, ব্রিটিশ অফিসারদের হত্যা করে এবং "মারো ফিরিঙ্গি কো!" ধ্বনি তুলে রাতের অন্ধকারে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
৪.৩ প্রধান কেন্দ্র ও নেতৃত্বের দীপ্তি

১১ মে সকালে দিল্লির লালকেল্লায় পৌঁছে সিপাহিরা ৮২ বছর বয়সী বৃদ্ধ মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর-কে ভারতের বৈধ সম্রাট—শাহেনশাহ-ই-হিন্দ ঘোষণা করে। দ্রুত এই বিদ্রোহ সমগ্র উত্তর ও মধ্য ভারতে ছড়িয়ে পড়ে:

বিদ্রোহের কেন্দ্র বিদ্রোহী নেতৃবৃন্দ ব্রিটিশ দমনকারী সেনাপতি ফলাফল ও তাৎপর্য
দিল্লি সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ও সেনাপতি বক্ত খান জন নিকোলসন, হাডসন দিল্লি ৪ মাস বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেপ্টেম্বর ১৮৫৭-তে ব্রিটিশরা দিল্লি দখল করে, হাডসন মুঘল শাহজাদাদের গুলি করে মারে এবং বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।
কানপুর নানা সাহেব, তাঁতিয়া তোপী ও আজিমুল্লাহ খান কলিন ক্যাম্পবেল, হ্যাভলক নানা সাহেব নিজেকে পেশোয়া ঘোষণা করেন। ক্যাম্পবেল ডিসেম্বরে কানপুর পুনর্দখল করলে নানা সাহেব নেপালে চলে যান; তাঁতিয়া তোপী মধ্য ভারতে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান।
ঝাঁসি ও গোয়ালিয়র রাণী লক্ষ্মীবাঈ স্যার হিউ রোজ স্বত্ববিলোপ নীতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন—"মেরা ঝাঁসি নেহি দুঙ্গি!" পুরুষ বেশে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করে কোটাহ-কি-সরাইয়ের যুদ্ধে ১৮ জুন ১৮৫৮ শহিদ হন। হিউ রোজ বলেন—"তিনি ছিলেন বিদ্রোহীদের মধ্যে একমাত্র পুরুষ ও শ্রেষ্ঠ সেনাপতি।"
অযোধ্যা ও লখনউ বেগম হজরত মহল, পুত্র বিরজিস কদর ও মৌলভি আহমদুল্লাহ শাহ হেনরি লরেন্স, ক্যাম্পবেল এখানে বিদ্রোহ তীব্র গণসংগ্রামের রূপ নেয়। হেনরি লরেন্স নিহত হন। শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পবেল লখনউ দখল করলে বেগম হজরত মহল ব্রিটিশ পেনশন প্রত্যাখ্যান করে নেপালের জঙ্গলে আশ্রয় নেন।
বিহার (জগদীশপুর) বীর কুঁয়ার সিংহ (৮০ বছর বয়সী রাজপুত জমিদার) ও অমর সিংহ উইলিয়াম টেলর, ভিনসেন্ট আয়ার গঙ্গার যুদ্ধে গুলিতে জখম হাত নিজেই কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। ৮০ বছর বয়সেও একের পর এক ব্রিটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে ১৮৫৮ সালের এপ্রিলে অপরাজিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
রোহিলখণ্ড (বেরিলি) খান বাহাদুর খান কলিন ক্যাম্পবেল নিজেকে মুঘল সম্রাটের সুবেদার ঘোষণা করে দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলেন। ১৮৬০ সালে বন্দি করে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
৪.৪ বিদ্রোহের চরিত্র ও প্রকৃতি বিতর্ক

১৮৫৭-র বিদ্রোহের ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রবল মতপার্থক্য রয়েছে:

  • ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী মত (নিছক সিপাহি বিদ্রোহ): সমকালীন ব্রিটিশ ইতিহাসকাররা (জন লরেন্স, চার্লস বল, জন কে) দাবি করেন যে এটি ছিল ধর্মের নামে কতিপয় সুযোগসন্ধানী ও অসন্তুষ্ট সেনার 'সিপাহি বিদ্রোহ' মাত্র; এর পেছনে কোনো জাতীয় প্রেরণা ছিল না।
  • জাতীয়তাবাদী মত (ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ): ১৯০৯ সালে বিপ্লবী বিনায়ক দামোদর সাভারকার তাঁর গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে এটি কোনো আকস্মিক দাঙ্গা নয়, বরং ভারতকে স্বাধীন করার এক পরিকল্পিত ও সম্মিলিত "ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ" (First War of Indian Independence)।
  • আধুনিক ইতিহাসবিদদের নির্মোহ মূল্যায়ন:
    • ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার: The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857 গ্রন্থে বিশদ বিশ্লেষণ করে লেখেন—" তথাকথিত ১৮৫৭-র এই জাতীয় সংগ্রাম প্রথমও নয়, জাতীয়ও নয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধও নয়।" তাঁর মতে, নেতারা প্রত্যেকেই নিজের নিজের রাজ্য বা সুযোগসুবিধার জন্য লড়েছিলেন; এক ঐক্যবদ্ধ ভারতের কোনো রাষ্ট্রীয় ধারণা তখনো জন্মায়নি।
    • ড. সুরেন্দ্রনাথ সেন: Eighteen Fifty-Seven গ্রন্থে ভারসাম্যপূর্ণ মত প্রকাশ করেন—"যে লড়াই ধর্মের নামে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়।" কারণ বিদ্রোহীরা সকলেই অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে ব্রিটিশ শক্তিকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিল।
    • মার্কসবাদী ও সাবঅল্টার্ন দৃষ্টিভঙ্গি: পি.সি. যোশী ও ইরফান হাবিব প্রমুখ ঐতিহাসিক দেখিয়েছেন যে সিপাহিদের পাশাপাশি অযোধ্যা ও মধ্য ভারতের লক্ষ লক্ষ সাধারণ কৃষক ও তালুকদার জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিল, যা একে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের রূপ দিয়েছিল।

অধ্যায় ৫: মহারানীর ঘোষণাপত্র (১৮৫৮) ও কোম্পানি শাসনের অবসান

৫.১ ভারত শাসন আইন (আগস্ট ১৮৫৮): কোম্পানি শাসনের চিরতরে অবসান

১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বুঝতে পারে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো একটি বাণিজ্যিক বণিক সংস্থার হাতে ভারতের মতো সুবিশাল সাম্রাজ্যের শাসনভার রাখা আর নিরাপদ নয়। ফলে ১৮৫৮ সালের ২ আগস্ট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় ঐতিহাসিক ভারত শাসন আইন (Government of India Act 1858):

  • ক্ষমতার হস্তান্তর: পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) থেকে সূচিত ১০০ বছরের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটানো হয় এবং ভারতের শাসনভার সরাসরি ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ রাজমুকুট (Crown)-এর অধীনে ন্যস্ত হয়।
  • দ্বৈত শাসনের অবসান: পিটের ভারত শাসন আইন (১৭৮৪) দ্বারা সৃষ্ট বোর্ড অব কন্ট্রোল ও কোর্ট অব ডিরেক্টরস বাতিল করা হয়।
  • ভারত সচিব পদের সৃষ্টি: ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার একজন দায়িত্বশীল ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে ভারত সচিব (Secretary of State for India) পদে নিযুক্ত করা হয়, যাঁর অধীনে লন্ডনে ১৫ সদস্যের একটি ইন্ডিয়া কাউন্সিল গঠন করা হয়।
  • ভাইসরয় পদের সৃষ্টি: ভারতের গভর্নর জেনারেলকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে ভাইসরয় (Viceroy শব্দের অর্থ রাজপ্রতিনিধি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। লর্ড ক্যানিং ছিলেন কোম্পানির শেষ গভর্নর জেনারেল এবং ব্রিটিশ রাজের প্রথম ভাইসরয়।
৫.২ এলাহাবাদ দরবার ও মহারানীর ঘোষণাপত্র (১ নভেম্বর ১৮৫৮)

১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদে এক জাঁকজমকপূর্ণ রাজদরবার ডেকে লর্ড ক্যানিং ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়া-র রাজকীয় ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এই ঘোষণাপত্রে ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশ নীতির মূল আশ্বাসগুলি তুলে ধরা হয়:

  1. সাম্রাজ্য বিস্তার নীতি পরিত্যাগ: ব্রিটিশ সরকার ঘোষণা করে যে তারা ভারতে আর কোনো নতুন রাজ্য বা ভূখণ্ড দখল করবে না। ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি চিরতরে বাতিল করা হয় এবং দেশীয় রাজাদের দত্তকপুত্র গ্রহণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
  2. ধর্মীয় নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি: ভারতীয় প্রজাদের ধর্মবিশ্বাস, পুজো-অর্চনা ও সামাজিক রীতিনীতিতে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না বলে অঙ্গীকার করা হয়।
  3. সরকারি চাকরিতে সমানাধিকার: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল ভারতীয়কে সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
  4. সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা: যেসব বিদ্রোহী সরাসরি কোনো ব্রিটিশ নাগরিকের হত্যার সাথে যুক্ত ছিল না, তাদের নিঃশর্ত মুক্তি ও রাজকীয় ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়।
  5. ঐতিহ্যবাহী স্বত্ব রক্ষা: ভারতীয়দের প্রাচীন রীতিনীতি, ভূস্বামীদের অধিকার এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
৫.৩ রাজকীয় প্রতিশ্রুতির অন্তরালে সাম্রাজ্যবাদী বাস্তবতা

তৎকালীন ব্রিটিশ সমর্থকরা মহারানীর এই ঘোষণাপত্রকে ভারতীয়দের 'মহাসনদ' (Magna Carta) বললেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি ছিল এক অন্তঃসারশূন্য আশ্বাস:

  • বর্ণবৈষম্যের চরম বিস্তার: ১৮৫৭-র পর ব্রিটিশ আমলা ও সামরিক কর্তারা ভারতীয়দের প্রতি গভীর অবিশ্বাস ও ঘৃণা পোষণ করতে শুরু করেন। ইউরোপীয়রা নিরাপদ সিভিল লাইনস ও সেনা ছাউনিতে নিজেদের বন্দি করে বর্ণবিদ্বেষের নতুন প্রাচীর গড়ে তোলে।
  • সেনাবাহিনীর পুনর্বিন্যাস ও 'বিভাজন ও শাসন' নীতি: পীল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বেঙ্গল আর্মিতে ব্রিটিশ ও ভারতীয় সেনার অনুপাত ১:২ করা হয়। ভারী কামান ও আধুনিক অস্ত্রাগার কেবল ইউরোপীয় সেনাদের অধীনে রাখা হয়। ভারতীয় জাতিকে কৃত্রিমভাবে 'সামরিক জাতি' (শিখ, গুর্খা, পাঠান যারা ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল) এবং 'অ-সামরিক জাতি' (বাঙালি, অযোধ্যার ব্রাহ্মণ যারা বিদ্রোহ করেছিল)-তে ভাগ করা হয়।
  • সাম্প্রদায়িক বিভাজন: ১৮৫৭-র বিদ্রোহে হিন্দু ও মুসলমানের অভূতপূর্ব একতা দেখে ব্রিটিশ শাসকরা শঙ্কিত হয়। ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ রোধে তারা সূক্ষ্ম ও সুপরিকল্পিত 'বিভাজন ও শাসন' (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করে ধর্মীয় মেরুকরণ শুরু করে।
  • আমলাতন্ত্রে প্রবেশে বাধা: প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও আইসিএস পরীক্ষা লন্ডনে অনুষ্ঠিত হতো এবং বয়সসীমা ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ করা হয়, যাতে কোনো যোগ্য ভারতীয় শীর্ষ পদে পৌঁছাতে না পারেন।

সুতরাং, কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটলেও ভারতীয়দের পরাধীনতার নাগপাশ শিথিল হয়নি; বরং ব্রিটিশ সরকারের প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্ম দেয়।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

ঔপনিবেশিক প্রতিক্রিয়ার মূল সময়পঞ্জি (১৭৬৩–১৮৫৮)
সহযোগিতা ও বিদ্রোহের কালরেখা
১৭৭০-এর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ছিল উত্তরবঙ্গের কৃষক ক্ষোভের মূল অনুঘটক।
আদর্শগত দ্বৈততা: সহযোগিতা (সংস্কার) বনাম বিদ্রোহ (সশস্র সংগ্রাম)
প্রতিক্রিয়ার দ্বিমুখী রূপ
শিক্ষিতরা ব্রিটিশ শাসনকে আধুনিকতার বাহন ভেবেছিল, আর কৃষকরা দেখেছিল অর্থনৈতিক ধ্বংস।
আদিপর্বের কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহের তুলনামূলক ম্যাট্রিক্স
পাঁচটি আদি বিদ্রোহ
সাঁওতাল হুলের ফলে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল পরগনা জেলা গঠিত হয়।
সমাজ সংস্কারক ত্রয়ী ও আইন প্রণয়ন ছক
বাংলার সংস্কার ত্রয়ী
রামমোহন মনুসংহিতা ব্যবহার করেছিলেন; বিদ্যাসাগর ব্যবহার করেছিলেন পরাশর সংহিতা।
সাঁওতাল হুল বনাম তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহের তুলনা
কৃষক বিদ্রোহের রূপরেখা
উভয় আন্দোলনই সমান্তরাল বিদ্রোহী আদালত ও কর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের বহুমুখী কারণ সংক্ষেপ
বহুমুখী কারণের সমন্বয়
এনফিল্ড রাইফেলের গরু ও শূকরের চর্বিমিশ্রিত কার্তুজ ছিল বারুদস্তূপে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো।
মহাবিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র, নেতৃত্ব ও ব্রিটিশ দমনকারী ম্যাট্রিক্স
মহাবিদ্রোহের রণক্ষেত্র
স্যার হিউ রোজ রাণী লক্ষ্মীবাঈকে বিদ্রোহীদের মধ্যে 'একমাত্র পুরুষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বীর' আখ্যা দেন।
১৮৫৮-র ভারত শাসন আইন বনাম মহারানীর ঘোষণাপত্র
প্রত্যক্ষ রাজশাসন রূপান্তর
লর্ড ক্যানিং ছিলেন ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম ভাইসরয়।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
কেন বাংলার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা করেছিল, অথচ কৃষক ও আদিবাসীরা সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ কৃষক-আদিবাসীদের এই বিপরীতমুখী অবস্থানের মূল কারণ ছিল তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভিন্নতা: ১. শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি:

  • আধুনিকতার বিশ্বাস: রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ শাসনের মাধ্যমে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ও আইনের শাসন আসবে, যা সতীদাহ বা বাল্যবিবাহের মতো অন্ধ কুসংস্কার দূর করতে সাহায্য করবে।
  • ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী: উকিল, শিক্ষক ও কেরানি হিসেবে তাঁদের জীবিকা ছিল কোম্পানি প্রশাসনের সাথে যুক্ত; তাই তাঁরা হিংসাত্মক পথ না নিয়ে আইনি আবেদন ও প্রচারের পথ নিয়েছিলেন। ২. কৃষক ও আদিবাসী সমাজের বাস্তবতা:
  • চরম অর্থনৈতিক ধ্বংস: কোম্পানি শাসনের ফলে প্রবর্তিত চড়া খাজনা, অরণ্য অধিকার হরণ, এবং মহাজন ও নীলকরদের অকথ্য শোষণ তাঁদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছিল।
  • জীবন-মরণের প্রশ্ন: চুয়াড়, কোল ও সাঁওতালদের কাছে কোনো আইনি আদালত ছিল না; মহাজনদের হাত থেকে পৈতৃক ভিটেমাটি বাঁচাতে সশস্ত্র সংগ্রামই ছিল তাঁদের একমাত্র পথ।
উদাহরণ 2
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কীভাবে সনাতনীদের বিরোধিতা পরাস্ত করে ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহ আইন পাস করিয়েছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
বিদ্যাসাগর শাস্ত্রীয় যুক্তি, তীব্র বৌদ্ধিক বিতর্ক এবং অদম্য সাহসের মাধ্যমে বিধবাবিবাহের আইনি স্বীকৃতি আদায় করেন: ১. শাস্ত্রীয় রণকৌশল: রক্ষণশীল পণ্ডিতরা বলতেন কলিযুগে বিধবাবিবাহ নিষিদ্ধ। বিদ্যাসাগর সংস্কৃত শাস্ত্র মন্থন করে পরাশর সংহিতা থেকে একটি অভ্রান্ত শ্লোক উদ্ধার করেন, যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে—স্বামী নিখোঁজ হলে, মারা গেলে, সন্ন্যাস নিলে বা পতিত হলে নারী পুনরায় বিবাহ করতে পারে। ২. জনমত গঠন: ১৮৫৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন তাঁর বিখ্যাত পুস্তিকা 'বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব', যা হাজার হাজার কপি বিক্রি হয় এবং ধর্মসভার রক্ষণশীল যুক্তির ভিত নাড়িয়ে দেয়। ৩. আইনি লড়াই: তিনি প্রায় ১০০০ বিশিষ্ট ব্যক্তির স্বাক্ষর সংবলিত আবেদনপত্র সরকারের কাছে পেশ করেন। ফলে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই ১৫ নম্বর বিধি (Act XV of 1856) পাস হয়ে বিধবাবিবাহ আইনসিদ্ধ হয় এবং ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর নিজ ব্যয়ে প্রথম বিধবাবিবাহ সম্পন্ন করান।
উদাহরণ 3
দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে মহাজনদের প্রতারক বাটখারা 'কেনারাম' ও 'বেচারাম' কীভাবে সাঁওতাল হুলের আগুন জ্বালিয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬)-এর পেছনে প্রধান কারণ ছিল দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে বহিরাগত দিকু মহাজনদের চরম প্রতারণা: ১. দামিন-ই-কোহ-এর ফাঁদ: রাজমহল পাহাড়ের জঙ্গল কেটে সাঁওতালরা যে উর্বর খেত তৈরি করেছিল, সেখানে মহাজনরা জেঁকে বসে চড়া সুদে ঋণ দিতে শুরু করে। ২. কেনারাম ও বেচারাম বাটখারা:

  • কেনারাম: সাঁওতালদের কাছ থেকে শস্য ও তেলবীজ কেনার সময় মহাজনরা এক বিশেষ ভারী পাথরের বাটখারা ব্যবহার করত, যাতে প্রকৃত ওজনের চেয়ে অনেক বেশি ফসল কেড়ে নেওয়া যেত।
  • বেচারাম: সাঁওতালদের কাছে নুন, তেল বা কাপড় বিক্রির সময় ব্যবহার করা হতো হালকা ওজনের বাটখারা, যার ফলে সাঁওতালরা প্রাপ্যের চেয়ে অনেক কম জিনিস পেত। ৩. দাসত্ব ও বিদ্রোহ: চড়া সুদের জালে জড়িয়ে সাঁওতালরা বংশানুক্রমিক দাসে পরিণত হয়। এই শোষণ থেকে বাঁচতেই ৩০ জুন ১৮৫৫ সালে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে ভগনাডিহিতে সমবেত হয়ে সাঁওতালরা স্বাধীন সাঁওতাল রাজের ডাক দেয়।
উদাহরণ 4
তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ (১৮৩১) কীভাবে ধর্মীয় সংস্কার থেকে জমিদারি ও নীলকর-বিরোধী কৃষক সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ওয়াহাবি ধর্মীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলেও তাঁর আন্দোলন ছিল মূলত কৃষক শোষণমুক্তির লড়াই: ১. ধর্মীয় সংস্কার: মক্কা থেকে ফিরে তিতুমীর মুসলিম তাঁতি ও কৃষকদের অনৈসলামিক কুসংস্কার ত্যাগ করতে এবং একেশ্বরবাদী হতে আহ্বান জানান। ২. জমিদারদের আক্রমণ: পুড়ার জমিদার কৃষ্ণদেব রায় দরিদ্র মুসলিম প্রজাদের ওপর অপমানজনক 'দাড়ির কর' ধার্য করেন। তিতুমীর এই করের বিরুদ্ধে কৃষকদের একতাবদ্ধ করেন। ৩. নীলকর ও জমিদার বিরোধী যুদ্ধ: তিতুমীরের নেতৃত্বে হিন্দু ও মুসলিম প্রজারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অত্যাচারী জমিদার ও নীলকরদের আক্রমণ করে। তিনি ১৮৩১ সালে নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা তৈরি করে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘোষণা করেন। ৪. শাহাদাত: শেষ পর্যন্ত ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর মেজর স্কটের ব্রিটিশ গোলন্দাজ বাহিনী কামানের গোলায় বাঁশের কেল্লা গুঁড়িয়ে দেয় এবং তিতুমীর বীরের মতো যুদ্ধ করে শহিদ হন।
উদাহরণ 5
লর্ড ডালহৌসির স্বত্ববিলোপ নীতি ও অযোধ্যা অধিগ্রহণ কীভাবে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্যবাদী নীতি ভারতীয় রাজন্যবর্গ ও সাধারণ সেনাদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল: ১. স্বত্ববিলোপ নীতি (Doctrine of Lapse): দেশীয় রাজাদের বংশপরম্পরায় দত্তকপুত্র গ্রহণের অধিকার কেড়ে নিয়ে ডালহৌসি সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর ও সম্বলপুর ইংরেজ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। এর ফলে ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাঈ এবং পেশোয়ার দত্তকপুত্র নানা সাহেব কোম্পানির চরম শত্রুতে পরিণত হন। ২. অযোধ্যা অধিগ্রহণ (১৮৫৬): এক শতাব্দীর বিশ্বস্ত মিত্র হওয়া সত্ত্বেও 'কুশাসনের' মিথ্যা অভিযোগে ডালহৌসি অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে সিংহাসনচ্যুত করেন। ৩. সৈন্যবাহিনীর প্রতিক্রিয়া: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেঙ্গল আর্মির প্রায় ৭৫,০০০ সিপাহি ছিল অযোধ্যার বাসিন্দা। অযোধ্যা দখলের ফলে তাদের পারিবারিক জমিজমার ওপর চড়া ব্রিটিশ রাজস্ব চাপানো হয় এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়। ফলে সিপাহিরা কোম্পানির ওপর ক্ষোভে ফেটে পড়ে।
উদাহরণ 6
এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক কীভাবে মহাবিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে ব্যারাকপুর ও মিরাটে বিস্ফোরণ ঘটায়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বারুদস্তূপে অগ্নিসংযোগ করে: ১. কার্তুজ সংকট: নতুন এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজের খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরতে হতো। ছাউনিগুলিতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি মেশানো হয়েছে। এতে হিন্দু ও মুসলিম সিপাহিরা নিশ্চিত হয় যে কোম্পানি তাদের ধর্মনাশ করতে চায়। ২. ব্যারাকপুরের স্ফুলিঙ্গ (২৯ মার্চ ১৮৫৭): মঙ্গল পাণ্ডে কার্তুজ ব্যবহারে অস্বীকার করে ব্রিটিশ অফিসারদের ওপর আক্রমণ চালান। ৮ এপ্রিল তাঁর ফাঁসি ভারতীয় সেনাদের মধ্যে সাহসের সঞ্চার করে। ৩. মিরাট বিস্ফোরণ (১০ মে ১৮৫৭): মিরাটে ৮৫ জন সিপাহির কারাদণ্ড হলে সমগ্র মিরাট সেনা ছাউনি বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১০ মে রাতে তারা শৃঙ্খল ভেঙে অফিসারদের হত্যা করে দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করে, যা এক সর্বভারতীয় গণমহাবিদ্রোহে রূপ নেয়।
উদাহরণ 7
১৮৫৭-র বিদ্রোহের চরিত্র সম্পর্কে সাভারকার ও ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতামতের মূল পার্থক্য কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৮৫৭-র বিদ্রোহের প্রকৃতি নিয়ে ভারতীয় ঐতিহাসিকদের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য রয়েছে: ১. বিনায়ক দামোদর সাভারকারের মত (প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ): ১৯০৯ সালে সাভারকার যুক্তি দেন যে এটি নিছক সিপাহি বিদ্রোহ নয়; এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা ও স্বধর্ম রক্ষার জন্য এক পরিকল্পিত ও সম্মিলিত 'প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ'। ২. ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের মত (স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়): ড. মজুমদার তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে বিদ্রোহে কোনো সামগ্রিক জাতীয় পরিকল্পনা ছিল না। প্রত্যেক নেতা (নানা সাহেব পেনশনের জন্য, লক্ষ্মীবাঈ ঝাঁসির জন্য) নিজ স্বার্থে লড়েছিলেন। আধুনিক ভারতের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারণাই তখন ছিল না। তাই তিনি মন্তব্য করেন—'এটি প্রথমও নয়, জাতীয়ও নয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধও নয়।' ৩. উপসংহার: যদিও ড. মজুমদারের যুক্তি বাস্তবসম্মত, তবুও এ কথা সত্য যে বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি ছিল বিদেশি শাসনকে উৎখাত করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
উদাহরণ 8
১৮৫৮ সালের মহারানীর ঘোষণাপত্রকে কেন 'কাগুজে প্রতিশ্রুতি' বা অন্তঃসারশূন্য বলা হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৮৫৮ সালের ১ নভেম্বর এলাহাবাদে লর্ড ক্যানিং পঠিত মহারানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্রটি বাস্তবে ছিল এক চতুর সাম্রাজ্যবাদী মিথ্যা আশ্বাস: ১. প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব:

  • চাকরিতে সমতা: যোগ্যতার ভিত্তিতে ভারতীয়দের উচ্চপদে নিয়োগের কথা বলা হলেও আইসিএস পরীক্ষা হতো লন্ডনে এবং বয়স কমিয়ে ১৯ করায় ভারতীয়দের পক্ষে ঢোকা অসম্ভব ছিল।
  • বর্ণবৈষম্য বৃদ্ধি: সাম্যের বদলে সমাজে ব্রিটিশদের তীব্র বর্ণবিদ্বেষ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়; ভারতীয়দের ওপর চরম অবজ্ঞা বর্ষিত হয়।
  • বিভাজন ও শাসন: হিন্দু-মুসলমানের একতা ভাঙতে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে বিভেদের বীজ রোপণ করা হয়। ২. উপসংহার: বিপিনচন্দ্র পাল ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো জাতীয়তাবাদী নেতারা পরবর্তীকালে দেখান যে মহারানীর ঘোষণাপত্র ছিল নিছক 'কাগুজে প্রতিশ্রুতি' (Pious intentions), যা সাম্রাজ্যবাদী শাসন টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই রচিত হয়েছিল।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ ও বিধবাবিবাহ আইনের সাল এবং বড়োলাটের নাম গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সতীদাহ প্রথা রদ হয় ১৮২৯ সালে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে (রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায়)। বিধবাবিবাহ আইন পাস হয় ১৮৫৬ সালে লর্ড ক্যানিং-এর আমলে (বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে)।

সাধারণ ভুল ধারণা

সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহকে কেবল একটি ধর্মীয় যুদ্ধ বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮০০) ছিল মূলত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০), তীর্থকর এবং কোম্পানির অবাধ লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে এক কৃষক ও সন্ন্যাসীদের যৌথ অর্থনৈতিক সংগ্রাম।

সাধারণ ভুল ধারণা

কোল বিদ্রোহ ও সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃবৃন্দকে এক করে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

কোল বিদ্রোহ (১৮৩১–৩২) হয়েছিল ছোটনাগপুরে বুদ্ধু ভগত ও জোয়া ভগতের নেতৃত্বে। সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬) হয়েছিল রাজমহলের দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে।

সাধারণ ভুল ধারণা

তিতুমীরের বিদ্রোহকে কেবল ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

তিতুমীরের প্রাথমিক লড়াই ছিল অত্যাচারী দেশীয় জমিদার (যেমন পুড়ার কৃষ্ণদেব রায় যিনি দাড়ির কর বসিয়েছিলেন) এবং ইংরেজ নীলকরদের বিরুদ্ধে। জমিদারদের রক্ষার জন্যই ব্রিটিশ সেনাবাহিনী আসে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ব্যারাকপুরের মঙ্গল পাণ্ডের ঘটনা ও মিরাট অভ্যুত্থানের তারিখ গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে মঙ্গল পাণ্ডে ব্যক্তিগত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। সংগঠিত মহাবিদ্রোহের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল ১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাট সেনা ছাউনিতে।

সাধারণ ভুল ধারণা

লর্ড ডালহৌসিকে মহাবিদ্রোহের সময়ের বড়োলাট মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

লর্ড ডালহৌসি ১৮৫৬ সালে ভারত ত্যাগ করেন। বিদ্রোহের সময় ভারতের বড়োলাট ছিলেন লর্ড ক্যানিং এবং তিনিই ১৮৫৮ সালের মহারানীর ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনে ভারতীয়রা স্বশাসন পেয়েছিল বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

১৮৫৮ সালের আইনে কেবল শাসনক্ষমতা বণিক কোম্পানি থেকে ব্রিটিশ রাজমুকুটের হাতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ঔপনিবেশিক শোষণ ও পরাধীনতা বজায় ছিল।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহের ধারাবাহিক রূপরেখা (১৭৬৩–১৮৫৮)

পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ৫ কনসেপ্ট ম্যাপ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮৫৮) অতীত ও ঐতিহ্য অধ্যায় ৫ পর্ব ১ (১৮১৫–৫৭) সংস্কার ও সহযোগিতা সমাজ সংস্কার ও পাশ্চাত্য শিক্ষা রামমোহন ও বিদ্যাসাগর • সতীদাহ নিবারণ আইন (১৮২৯) • বিধবাবিবাহ আইন (১৮৫৬) • বেথুন বালিকা বিদ্যালয় (১৮৪৯) ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গল • হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও • যুক্তিবাদ ও প্রচলিত প্রথায় আঘাত • অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তার • মেকলে মিনিট (১৮৩৫) • চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব (Filtration) • উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪) • ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা (১৮৫৭) ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ব্রিটিশ আইন ও সহযোগিতায় সমাজ সংস্কার চেয়েছিল; পক্ষান্তরে গ্রামীণ মেহনতি জনতা মুখোমুখি হয় চরম ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণের। পর্ব ২ (১৭৬৩–৩৪) কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শোষণ ও গণবিক্ষোভ সন্ন্যাসী-ফকির (১৭৬৩–১৮০০) • ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ও তীর্থকর • নীলকুঠি ও খাজাঞ্চিখানা লুঠ • মজনু শাহ, ভবানী পাঠক ও দেবী চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৮–৯৯) • মেদিনীপুর ও জঙ্গলমহল অঞ্চল • নিষ্কর পাইকান জমি বাজেয়াপ্ত • দুর্জন সিংহ ও রাণী শিরোমণি রংপুর ডিং ও কোল বিদ্রোহ • রংপুর ডিং (১৭৮৩): নুরুলুদ্দীন • ইজারাদার দেবী সিংহের শোষণ • কোল বিদ্রোহ (১৮৩১–৩২): বুদ্ধু ভগত • দিকু উৎখাত ও SWFA গঠন সাবঅল্টার্ন বৈশিষ্ট্য অরণ্য অধিকার হরণ ও চড়া খাজনার বিরুদ্ধে প্রান্তিক কৃষক ও আদিবাসীদের স্বতঃস্ফূর্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ, যা ব্রিটিশ সামরিক শক্তিতে সাময়িক দমিত হলেও অনুপ্রেরণা জোগায়। পর্ব ৩ (১৮৩১–৫৬) সাঁওতাল হুল ও ওয়াহাবি ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রাম ও বিদ্রোহ সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬) • দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে মহাজন শোষণ • কেনারাম ও বেচারাম বাটখারা • সিধু, কানু, চাঁদ, ভৈরব, ফুলো, ঝানো ভগনাডিহির মহা ঘোষণা • ৩০ জুন ১৮৫৫: ১০,০০০ সাঁওতাল • স্বাধীন সাঁওতাল রাজ প্রতিষ্ঠা • পৃথক সাঁওতাল পরগনা জেলা (১৮৫৫) তিতুমীর ও ফরায়েজি আন্দোলন • বারাসাত বিদ্রোহ (১৮৩১): তিতুমীর • নারকেলবেড়িয়ার বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা • হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিঞা • "জমি আল্লাহর দান, কর অবৈধ" সংগঠিত গণজাগরণ শালগাছের ডাল পাঠিয়ে বার্তা প্রচার, নিজস্ব খাজনা ব্যবস্থা ও হিন্দু-মুসলিম কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেয়। পর্ব ৪ (১৮৫৭–৫৮) ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ সিপাহি অসন্তোষ ও রাজশাসন বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ (১৮৫৭) • এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ বিতর্ক • মঙ্গল পাণ্ডে (ব্যারাকপুর ২৯ মার্চ) • মিরাট সেনা ছাউনি অভ্যুত্থান (১০ মে) প্রধান কেন্দ্র ও নেতৃত্ব • দিল্লি: দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ জাফর • কানপুর: নানা সাহেব ও তাঁতিয়া তোপী • ঝাঁসি: রাণী লক্ষ্মীবাঈ চরিত্র ও ঘোষণাপত্র (১৮৫৮) • সিপাহি বিদ্রোহ বনাম স্বাধীনতা যুদ্ধ • ভারত শাসন আইন (আগস্ট ১৮৫৮) • মহারানীর ঘোষণাপত্র (১ নভেম্বর ১৮৫৮) • লর্ড ক্যানিং: প্রথম ভাইসরয় যুগান্তকারী পরিবর্তন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১০০ বছরের বণিক শাসনের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে আসে এবং আধুনিক রাজনৈতিক চেতনার নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়। TARGETEXAMS • পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ৫ কনসেপ্ট ম্যাপ

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. দ্বিবিধ প্রতিক্রিয়া: উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়—কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের আইনি সংস্কার ও পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার, এবং পল্লী অঞ্চলে কৃষক ও আদিবাসীদের সশস্ত্র গণবিদ্রোহ।
মূল বিষয় 2
২. নবজাগরণের অগ্রদূত: রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ নিবারণ (১৮২৯) ও ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি গড়েন; ডিরোজিও ও ইয়ং বেঙ্গল যুক্তিবাদ প্রচার করেন; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন (১৮৫৬) ও নারীশিক্ষা বিস্তার করেন।
মূল বিষয় 3
৩. শিক্ষানীতির রূপরেখা: মেকলে মিনিট (১৮৩৫)-এর চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব ইংরেজিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়; উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪)-এর ভিত্তিতে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।
মূল বিষয় 4
৪. আদি কৃষক ও আদিবাসী বিদ্রোহ: ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮০০), জঙ্গলমহলে দুর্জন সিংহ ও রাণী শিরোমণির নেতৃত্বে চুয়াড় বিদ্রোহ (১৭৬৮–৯৯), নুরুলুদ্দীনের রংপুর ডিং (১৭৮৩) এবং বুদ্ধু ভগতের কোল বিদ্রোহ (১৮৩১–৩২) সংঘটিত হয়।
মূল বিষয় 5
৫. সাঁওতাল হুল (১৮৫৫–৫৬): দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে মহাজনদের কেনারাম-বেচারাম বাটখারা ও সুদের শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে সিধু ও কানুর নেতৃত্বে ভগনাডিহিতে সাঁওতালরা হুল ঘোষণা করে এবং সাঁওতাল পরগনা জেলা গঠিত হয়।
মূল বিষয় 6
৬. বাংলার কৃষক প্রতিরোধ: তিতুমীর ১৮৩১ সালে নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা বানিয়ে দাড়ির কর ও নীলকরদের বিরুদ্ধে লড়ে শহিদ হন; পূর্ব বাংলায় দুদু মিঞা ফরায়েজিদের সংগঠিত করে ঘোষণা করেন 'জমি আল্লাহর দান'।
মূল বিষয় 7
৭. ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহ: এনফিল্ড কার্তুজ ও মঙ্গল পাণ্ডের আত্মত্যাগের পর ১০ মে মিরাটে বিদ্রোহ শুরু হয়; দিল্লি (বাহাদুর শাহ), কানপুর (নানা সাহেব), ঝাঁসি (লক্ষ্মীবাঈ) ও বিহারে (কুঁয়ার সিংহ) বীরত্বপূর্ণ লড়াই চলে।
মূল বিষয় 8
৮. মহারানীর ঘোষণাপত্র (১৮৫৮): ভারত শাসন আইনে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে; লর্ড ক্যানিং প্রথম ভাইসরয় হিসেবে এলাহাবাদে মহারানীর ঘোষণা পাঠ করেন, যদিও বর্ণবিদ্বেষ ও 'বিভাজন ও শাসন' নীতি অব্যাহত থাকে।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
কোন শাস্ত্রীয় প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিদ্যাসাগর হিন্দু বিধবাবিবাহের সপক্ষে আন্দোলন করেছিলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতার একটি বিশেষ শ্লোক উদ্ধার করেন, যেখানে বলা হয়েছে—স্বামী নিখোঁজ হলে, মারা গেলে, সন্ন্যাস গ্রহণ করলে বা পতিত হলে নারীর পুনর্বিবাহ শাস্ত্রসম্মত।
মুনি পরাশরের নামাঙ্কিত সংহিতার কথা ভাবুন।
2
দামিন-ই-কোহ অঞ্চলে সাঁওতালদের শোষণে ব্যবহৃত 'কেনারাম' ও 'বেচারাম' বাটখারা কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কেনারাম ছিল মহাজনদের ব্যবহৃত এক ভারী পাথরের বাটখারা যার মাধ্যমে ফসল কেনার সময় বেশি মাল নেওয়া হতো; আর বেচারাম ছিল হালকা বাটখারা যার মাধ্যমে সাঁওতালদের জিনিস বিক্রির সময় কম মাল দিয়ে ঠকানো হতো।
বাংলায় কেনা মানে ক্রয় করা এবং বেচা মানে বিক্রয় করা।
3
কেন ১৮৫৬ সালের অযোধ্যা অধিগ্রহণ ব্রিটিশদের জন্য চরম সামরিক বিপদের কারণ হয়ে উঠেছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: অযোধ্যাকে বলা হতো ব্রিটিশ বেঙ্গল আর্মির সুতিকাগার বা নার্সারি। প্রায় ৭৫,০০০ সিপাহি ছিল অযোধ্যার অধিবাসী। অযোধ্যা দখল করায় সিপাহিদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে এবং তাদের পরিবারের জমির ওপর চড়া কর বসে, ফলে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
বেঙ্গল আর্মির অধিকাংশ সিপাহির বাসস্থান ছিল এই প্রদেশে।
4
১৮৫৭-র বিদ্রোহ সম্পর্কে ভি.ডি. সাভারকার এবং ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের ব্যাখ্যার মূল পার্থক্য কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সাভারকার একে 'ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ' বলে আখ্যা দেন যা জাতীয় স্বাধীনতার জন্য পরিকল্পিত ছিল। পক্ষান্তরে ড. আর.সি. মজুমদার দেখান যে এটি 'প্রথমও নয়, জাতীয়ও নয় এবং স্বাধীনতা যুদ্ধও নয়', কারণ নেতারা পৃথক স্বার্থে লড়েছিলেন এবং ঐক্যবদ্ধ ভারতের ধারণা ছিল না।
জাতীয়তাবাদী আবেগ বনাম নির্মোহ ঐতিহাসিক পর্যালোচনার তুলনা।
5
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইনে কোন প্রধান প্রশাসনিক পদগুলি বাতিল ও সৃষ্টি করা হয়েছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: বোর্ড অব কন্ট্রোল ও কোর্ট অব ডিরেক্টরস বাতিল করা হয়। নতুন পদ হিসেবে লন্ডনে 'ভারত সচিব' (Secretary of State) এবং ভারতে গভর্নর জেনারেলকে 'ভাইসরয়' (Viceroy) পদে উন্নীত করা হয়।
কোম্পানির দ্বৈত শাসনের অবসান এবং ভারত সচিব ও ভাইসরয় পদের কথা ভাবুন।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।