বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভারতীয় সমাজের প্রতিক্রিয়ায় দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ধারার বিকাশ ঘটে। একদিকে কলকাতায় ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত নব্য মধ্যবিত্ত সমাজ (ভদ্রলোক শ্রেণি) ব্রিটিশ প্রশাসনের সাথে সহযোগিতা করে সমাজ সংস্কার ও আধুনিক পাশ্চাত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রসারে উদ্যোগী হয়। অন্যদিকে বাংলার পল্লী অঞ্চলে সর্বস্বান্ত কৃষক, কারিগর ও অরণ্যবাসী আদিবাসীরা ঔপনিবেশিক শোষণ ও লুটের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়।
শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিশ্বাস করত যে ব্রিটিশ শাসন মধ্যযুগীয় সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে এবং যুক্তিবাদী সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। কিন্তু তাদের এই আন্দোলন প্রধানত উচ্চবর্ণ ও শহরকেন্দ্রিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল, ফলে গ্রামীণ মেহনতি জনতার গভীর অর্থনৈতিক দুর্দশার সাথে এর কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ ছিল না।
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩)-কে আধুনিক ভারতের জনক ও নবজাগরণের অগ্রদূত বলা হয়। তিনি যুক্তি ও মানবতাবাদের ভিত্তিতে একাধিক যুগান্তকারী সংস্কারের সূচনা করেন:
- ধর্মীয় সংস্কার ও আত্মীয় সভা (১৮১৫): বহুদেববাদ ও পৌত্তলিকতা বর্জন করে উপনিষদের একেশ্বরবাদী দর্শনের ভিত্তিতে রামমোহন ১৮১৫ সালে কলকাতায় আত্মীয় সভা স্থাপন করেন। ১৮২৮ সালে তিনি ব্রাহ্মসভা (পরবর্তীকালে ব্রাহ্মসমাজ) প্রতিষ্ঠা করেন, যা জাতিভেদহীন একেশ্বরবাদী উপাসনার পথ উন্মোচন করে।
- সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আন্দোলন (১৮২৯): উনিশ শতকের বাংলায় বিধবা নারীদের মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার অমানবিক সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। রামমোহন প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র (যেমন মনুসংহিতা) উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেন যে বৈদিক শাস্ত্রে সতীদাহের কোনো সমর্থন নেই। তিনি রক্ষণশীলদের তীব্র আক্রমণ উপেক্ষা করে জনমত গঠন করেন এবং বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক-এর সহায়তায় ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ১৭ নম্বর রেগুলেশন (Regulation XVII) জারি করে সতীদাহ প্রথাকে আইনত নিষিদ্ধ ও নরহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেন।
- পাশ্চাত্য শিক্ষার সপক্ষে প্রচার: ১৮২৩ সালে রামমোহন বড়োলাট লর্ড আমহার্স্টকে এক বিখ্যাত চিঠি লিখে সংস্কৃত কলেজের পরিবর্তে আধুনিক গণিত, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা ও ইংরেজি শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের দাবি জানান। তিনি হিন্দু কলেজ (১৮১৭) প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেন এবং ১৮১৫ সালে অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল ও ১৮২৬ সালে বেদান্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
কলকাতার হিন্দু কলেজের তরুণ ও প্রখর মেধা সম্পন্ন অধ্যাপক হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১)-র অনুপ্রেরণায় একদল ছাত্র প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র বৌদ্ধিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এই দলটি 'ইয়ং বেঙ্গল' (Young Bengal) বা 'নব্যবঙ্গ দল' নামে পরিচিত:
- যুক্তিবাদ ও অন্ধ কুসংস্কারের বিরোধিতা: ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের শিখিয়েছিলেন—"সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে বিচার করো, সত্যকে ভালোবাসো এবং কোনো অন্ধ কর্তৃত্বের কাছে মাথা নত কোরো না।" ফরাসি বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ডিরোজিওর শিষ্যরা হিন্দু সমাজের জাতিভেদ প্রথা, অস্পৃশ্যতা ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
- অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন ও পত্রিকা: ১৮২৮ সালে ডিরোজিও অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন নামক বিতর্ক সভা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের মতামত প্রকাশের জন্য পার্থেনন (Parthenon), হেস্পেরাস, ও এনকোয়ারার পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই দলের বিশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে ছিলেন কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার, প্যারিচাঁদ মিত্র, রামগোপাল ঘোষ ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়।
- আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা: ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন ছিল মূলত শহরকেন্দ্রিক ও আবেগসর্বস্ব। প্রকাশ্য রাজপথে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণ বা উপবীত ছেঁড়ার মতো আচরণ রক্ষণশীল সমাজকে আঘাত করলেও গ্রামীণ কৃষক সমাজের দুর্দশার সাথে তাঁদের কোনো বাস্তব সংযোগ ছিল না। রক্ষণশীলদের চাপে ১৮৩১ সালের এপ্রিল মাসে ডিরোজিওকে হিন্দু কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং ওই বছরই মাত্র ২২ বছর বয়সে কলেরায় তাঁর মৃত্যু হয়।
পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) ছিলেন অসামান্য পাণ্ডিত্য, নির্ভীক তেজস্বিতা এবং গভীর মানবতাবোধের প্রতীক। ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়ে তিনি ব্রাহ্মণ ছাড়াও অন্যান্য বর্ণের ছাত্রদের জন্য কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করেন এবং সহজ পাঠ বর্ণপরিচয় রচনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
বিদ্যাসাগরের সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক কীর্তি হলো বিধবাবিবাহ আন্দোলন:
- তৎকালীন হিন্দু সমাজে কৌলীন্য প্রথা ও বাল্যবিবাহের ফলে অসংখ্য শিশুকন্যা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে অসহনীয় কৃচ্ছ্রসাধন ও লাঞ্ছনার শিকার হতো।
- বিদ্যাসাগর পরাশর সংহিতার একটি বিশেষ শ্লোক উদ্ধার করে প্রমাণ করেন যে শাস্ত্র অনুসারেই বিধবাবিবাহ বৈধ: "নষ্টে মৃতে প্রব্রজিতে ক্লীবে চ পতিতে পতৌ..."।
- রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল 'ধর্মসভা'-র তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর ১৮৫৫ সালে সরকারের কাছে প্রায় এক হাজার বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষর সংবলিত আবেদনপত্র জমা দেন।
- অবশেষে ১৮৫৬ সালের ২৬ জুলাই পঞ্চদশ বিধি (Act XV of 1856) পাস করে ব্রিটিশ সরকার হিন্দু বিধবাবিবাহকে আইনসিদ্ধ ঘোষণা করে (আইনের খসড়া তৈরি হয়েছিল লর্ড ডালহৌসির আমলে এবং পাস হয় লর্ড ক্যানিং-এর আমলে)। ১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় প্রথম বিধবাবিবাহ অনুষ্ঠিত হয় শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও কালীমতী দেবীর মধ্যে, যার সম্পূর্ণ ব্যয় বিদ্যাসাগর বহন করেছিলেন।
- স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার: ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সহযোগিতায় বিদ্যাসাগর ১৮৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ক্যালকাটা ফিমেল স্কুল (বর্তমান বেথুন স্কুল) এবং নিজ ব্যয়ে বাংলায় ৩৫টিরও বেশি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।
১৮১৩ সালের চার্টার অ্যাক্টে ভারতীয়দের শিক্ষার জন্য বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দের পর প্রাচ্য ভাষা বনাম ইংরেজি ভাষার পক্ষে চরম বিতর্ক বাঁধে, যা প্রাচ্যবাদী-পাশ্চাত্যবাদী বিতর্ক নামে পরিচিত:
| নীতি / নথি | সাল ও প্রণেতা | মূল বিষয়বস্তু ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব |
|---|---|---|
| মেকলে মিনিট | ১৮৩৫ টমাস ব্যাবিংটন মেকলে |
প্রাচ্য শিক্ষাকে তাচ্ছিল্য করে মেকলে বলেন—"একটি ভালো ইউরোপীয় গ্রন্থাগারের একটি মাত্র তাকের বই সমগ্র ভারত ও আরবের সাহিত্যের সমান।" তিনি চুঁইয়ে পড়া তত্ত্ব (Downward Filtration Theory) প্রচার করেন—উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ইংরেজি শিক্ষা দিলে তা স্বাভাবিকভাবেই সমাজের নিম্নস্তরে ছড়িয়ে পড়বে। |
| লর্ড বেন্টিঙ্কের শিক্ষানীতি | ১৮৩৫ (মার্চ) লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক |
মেকলের প্রস্তাব মেনে সরকারি নীতি হিসেবে ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করা হয় এবং ফারসির বদলে ইংরেজিকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়। |
| উডের ডেসপ্যাচ | ১৮৫৪ (জুলাই) স্যার চার্লস উড |
একে ভারতে 'ইংরেজি শিক্ষার মহাসনদ' (Magna Carta) বলা হয়। এতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত একটি সুবিন্যস্ত শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়: (১) প্রতিটি প্রদেশে জনশিক্ষা দপ্তর (DPI) গঠন, (২) বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি অনুদান (Grants-in-aid), (৩) নারীশিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ, (৪) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে প্রেসিডেন্সি শহরগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। |
| তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা | ১৮৫৭ কলকাতা, বোম্বাই, মাদ্রাজ |
উডের সুপারিশ অনুসারে ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতে আধুনিক উচ্চশিক্ষার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করে। |