Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 12
আনুমানিক সময়: 50 Mins
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

শিলা

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যক্রম "আমাদের পৃথিবী" (অধ্যায় ৩: শিলা ও মাটি)-র জন্য তৈরি এই প্রামাণ্য ও সমৃদ্ধ পাঠ্য সহায়িকায় স্বাগত। পৃথিবীর কঠিনতম বহিঃআবরণকে বলা হয় অশ্মমণ্ডল (Lithosphere, গ্রিক শব্দ Lithos = শিলা)। ভূত্বক সম্পূর্ণরূপে শিলা এবং তার চূর্ণবিচূর্ণ অবশেষ মৃত্তিকা দ্বারা আবৃত। ভূ-বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী, এক বা একাধিক খনিজের সমন্বয়ে গঠিত প্রাকৃতিক কঠিন উপাদানকে শিলা (Rock) বলে। উৎপত্তি অনুসারে শিলাকে প্রধান তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: (১) আগ্নেয় শিলা (Igneous Rocks)—পৃথিবী সৃষ্টির আদিম উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ও ভূ-পৃষ্ঠের লাভা শীতল ও কঠিন হয়ে গঠিত প্রথম শিলা, যা অপ্রস্তরীভূত, স্ফটিকাকার, অত্যন্ত কঠিন এবং সম্পূর্ণ জীবাশ্মহীন হওয়ায় একে প্রাথমিক বা জনক শিলা বলে (যেমন পাতালিক গ্রানাইট এবং নিঃসারী ব্যাসাল্ট); (২) পাললিক শিলা (Sedimentary Rocks)—আবহবিকার ও ক্ষয়ের পর নদী বা সমুদ্রের তলদেশে পলি সঞ্চিত হয়ে এবং দীর্ঘকালীন ভূ-গর্ভস্থ চাপে সংকুচিত ও জমাটবদ্ধ হয়ে (শিলায়ন) গঠিত স্তরযুক্ত গৌণ শিলা, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য স্তরায়ন তল, ছিদ্রময়তা এবং উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ জীবাশ্মের একমাত্র উপস্থিতি (যেমন বেলেপাথর, শেল, চুনাপাথর ও কয়লা); এবং (৩) রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rocks)—ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রচণ্ড উত্তাপ ($২০০^\circ-৮০০^\circ\text{C}$), প্রচণ্ড পার্শ্বচাপ ও রাসায়নিক ক্রিয়ায় না গলে কঠিন অবস্থাতেই পুনর্বিন্যস্ত হওয়া শিলা, যার বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য পত্রায়ন বা ব্যান্ডিং (যেমন চুনাপাথর থেকে মার্বেল, বেলেপাথর থেকে কোয়ার্টজাইট, কাদাপাথর থেকে স্লেট এবং গ্রানাইট থেকে নিশ)। বিজ্ঞানী জেমস হাটনের নীতি অনুসারে এই তিন প্রকার শিলা ভূ-তাত্ত্বিক শিলাচক্রের (Rock Cycle) মাধ্যমে অবিরাম একে অপরে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। এছাড়া আবহবিকারের ফলে শিলা চূর্ণ হয়ে রেগোলিথ গঠন করে, যা ডকুচায়েভের পাঁচটি মৃত্তিকা সৃষ্টি নিয়ন্ত্রকের ($S = f(cl, o, r, p, t)$) মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ মাটির পরীলেখে (O, A ধৌত স্তর, B সঞ্চয় স্তর, C রেগোলিথ ও R আদি শিলা) পরিণত হয়। এই অধ্যায়ে রয়েছে ৫টি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য মডিউল, ২৫টি অনুচ্ছেদ, উচ্চমানের ভেক্টর এসভিজি ডায়াগ্রাম ($৯২০ \times ৫২০$), ৮টি বৈজ্ঞানিক সূত্র, ৮টি সমাধানকৃত পাঠ্য উদাহরণ ও গাণিতিক কেস স্টাডি, ৭টি সতর্কবার্তা, ৮টি মাস্টার সারাংশ ও ৫টি সিবিটি এমসিকিউ।

🪨 পৃথিবীর কঠিন বর্ম: উত্তপ্ত ম্যাগমা থেকে ফসিল ও ফসল ফলানো মাটির মহাকাব্য!

তোমরা কি জানো, আমরা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি তার নিচে মহাদেশগুলো গ্রানাইটের বিশাল ভেলা হয়ে মহাসাগরের ভারী ব্যাসাল্ট মেঝের ওপর ভাসছে?

মানুষের প্রাচীন সব স্থাপত্যের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে শিলার ইতিহাস: আগ্রার বিশ্ববিখ্যাত তাজমহল ও কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরি হয়েছে একসময় সমুদ্রের নিচে থাকা চুনাপাথর রূপান্তরিত হয়ে মার্বেলে পরিণত হওয়ার পর; দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লা তৈরি হয়েছে প্রাচীন মরুভূমির বালির স্তর জমে তৈরি বেলেপাথর দিয়ে; আর ভারতের যে কালো মাটিতে তুলোর বিপুল ফলন হয়, তা তৈরি হয়েছে প্রাচীন ডেকান ট্র্যাপের লাভা জমে কঠিন হওয়া ব্যাসাল্ট শিলা চূর্ণ হয়ে!

এসো জেনে নিই কেমন করে গলিত লাভা ঠান্ডা হয়ে প্রাথমিক শিলা জন্মায়, সমুদ্রের নিচে প্রাচীন ফসিল সংরক্ষিত হয়, প্রবল চাপে পাথর চকচকে রূপ নেয় এবং হাজার বছরে শিলা ভেঙে জন্ম নেয় প্রাণদায়ী মাটি—স্বাগত শিলা ও মাটি অধ্যায়ে!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যক্রম "আমাদের পৃথিবী" (অধ্যায় ৩: শিলা ও মাটি)-র জন্য তৈরি এই প্রামাণ্য ও সমৃদ্ধ পাঠ্য সহায়িকায় স্বাগত। পৃথিবীর কঠিনতম বহিঃআবরণকে বলা হয় অশ্মমণ্ডল (Lithosphere, গ্রিক শব্দ Lithos = শিলা)। ভূত্বক সম্পূর্ণরূপে শিলা এবং তার চূর্ণবিচূর্ণ অবশেষ মৃত্তিকা দ্বারা আবৃত। ভূ-বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী, এক বা একাধিক খনিজের সমন্বয়ে গঠিত প্রাকৃতিক কঠিন উপাদানকে শিলা (Rock) বলে। উৎপত্তি অনুসারে শিলাকে প্রধান তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: (১) আগ্নেয় শিলা (Igneous Rocks)—পৃথিবী সৃষ্টির আদিম উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমা ও ভূ-পৃষ্ঠের লাভা শীতল ও কঠিন হয়ে গঠিত প্রথম শিলা, যা অপ্রস্তরীভূত, স্ফটিকাকার, অত্যন্ত কঠিন এবং সম্পূর্ণ জীবাশ্মহীন হওয়ায় একে প্রাথমিক বা জনক শিলা বলে (যেমন পাতালিক গ্রানাইট এবং নিঃসারী ব্যাসাল্ট); (২) পাললিক শিলা (Sedimentary Rocks)—আবহবিকার ও ক্ষয়ের পর নদী বা সমুদ্রের তলদেশে পলি সঞ্চিত হয়ে এবং দীর্ঘকালীন ভূ-গর্ভস্থ চাপে সংকুচিত ও জমাটবদ্ধ হয়ে (শিলায়ন) গঠিত স্তরযুক্ত গৌণ শিলা, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য স্তরায়ন তল, ছিদ্রময়তা এবং উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ জীবাশ্মের একমাত্র উপস্থিতি (যেমন বেলেপাথর, শেল, চুনাপাথর ও কয়লা); এবং (৩) রূপান্তরিত শিলা (Metamorphic Rocks)—ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রচণ্ড উত্তাপ ($২০০^\circ-৮০০^\circ\text{C}$), প্রচণ্ড পার্শ্বচাপ ও রাসায়নিক ক্রিয়ায় না গলে কঠিন অবস্থাতেই পুনর্বিন্যস্ত হওয়া শিলা, যার বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য পত্রায়ন বা ব্যান্ডিং (যেমন চুনাপাথর থেকে মার্বেল, বেলেপাথর থেকে কোয়ার্টজাইট, কাদাপাথর থেকে স্লেট এবং গ্রানাইট থেকে নিশ)। বিজ্ঞানী জেমস হাটনের নীতি অনুসারে এই তিন প্রকার শিলা ভূ-তাত্ত্বিক শিলাচক্রের (Rock Cycle) মাধ্যমে অবিরাম একে অপরে রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। এছাড়া আবহবিকারের ফলে শিলা চূর্ণ হয়ে রেগোলিথ গঠন করে, যা ডকুচায়েভের পাঁচটি মৃত্তিকা সৃষ্টি নিয়ন্ত্রকের ($S = f(cl, o, r, p, t)$) মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ মাটির পরীলেখে (O, A ধৌত স্তর, B সঞ্চয় স্তর, C রেগোলিথ ও R আদি শিলা) পরিণত হয়। এই অধ্যায়ে রয়েছে ৫টি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্য মডিউল, ২৫টি অনুচ্ছেদ, উচ্চমানের ভেক্টর এসভিজি ডায়াগ্রাম ($৯২০ \times ৫২০$), ৮টি বৈজ্ঞানিক সূত্র, ৮টি সমাধানকৃত পাঠ্য উদাহরণ ও গাণিতিক কেস স্টাডি, ৭টি সতর্কবার্তা, ৮টি মাস্টার সারাংশ ও ৫টি সিবিটি এমসিকিউ।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস (ভূত্বক, গুরুমণ্ডল ও কেন্দ্রমণ্ডল) সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা।
  • রাসায়নিক উপাদান, খনিজ ও শিলার মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন।
  • পদার্থের অবস্থার পরিবর্তন: গলিত তরল অবস্থা (ম্যাগমা/লাভা) বনাম কঠিন স্ফটিকাকার অবস্থা।
  • আবহবিকার, ক্ষয়ীভবন, নদী দ্বারা পরিবাহিত হওয়া এবং সমুদ্রের নিচে পলি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • শিলার সংজ্ঞা প্রদান, এক-খনিজ ও বহু-খনিজ শিলার পার্থক্য নির্ণয় এবং প্রধান শিলাগঠনকারী খনিজ চিহ্নিতকরণ।
  • মোজের কাঠিন্য মানকের ১০টি খনিজের ক্রম মুখস্থ করা এবং পাতলা অ্যাসিড বিক্রিয়া পরীক্ষার প্রয়োগ জানা।
  • আগ্নেয় শিলার শ্রেণিবিভাগ (পাতালিক গ্রানাইট বনাম নিঃসারী ব্যাসাল্ট, আম্লিক বনাম ক্ষারকীয়) এবং এর প্রাথমিক চরিত্র বিশ্লেষণ।
  • পাললিক শিলার উৎপত্তি ব্যাখ্যা, সংঘাতজাত, রাসায়নিক ও জৈব শিলার বিভাজন এবং এতে জীবাশ্ম মেলার কারণ অনুধাবন।
  • রূপান্তরিত শিলার রূপান্তর প্রক্রিয়া (তাপজ, আঞ্চলিক, গতিজ), পত্রায়ন ও ব্যান্ডিং এবং মূল শিলা থেকে রূপান্তরের তালিকা তৈরি।
  • জেমস হাটনের ভূতাত্ত্বিক শিলাচক্রের (Rock Cycle) চিত্রসহ সম্পূর্ণ রূপান্তর প্রক্রিয়া বর্ণনা।
  • ডকুচায়েভের মৃত্তিকা সৃষ্টি সমীকরণ ($S = f(cl, o, r, p, t)$) ও মাটির পরীলেখের স্তরসমূহ (O, A, B, C, R) বিশ্লেষণ।
  • ভারতের প্রধান চার প্রকার মাটির উৎস ও বৈশিষ্ট্য জানা এবং ক্ষয়রোধে আধুনিক মৃত্তিকা সংরক্ষণ পদ্ধতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. পৃথিবীর অশ্মমণ্ডল, শিলার ভিত্তি...
2 ২. আগ্নেয় শিলা: প্রাথমিক ভূত্বক গঠ...
3 ৩. পাললিক শিলা: নগ্নীভবন, স্তরায়ন...
4 ৪. রূপান্তরিত শিলা: তাপ, চাপ ও প্রা...
5 ৫. আবহবিকার, মৃত্তিকা সৃষ্টি, মাটির...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. পৃথিবীর অশ্মমণ্ডল, শিলার ভিত্তি ও খনিজবিজ্ঞান

১.১ অশ্মমণ্ডল ও ভূতাত্ত্বিক ভূত্বক (SIAL বনাম SIMA)

পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের কঠিন পাথুরে শক্ত খোলককে বলা হয় অশ্মমণ্ডল (Lithosphere), যা এসেছে গ্রিক শব্দ Lithos (শিলা বা পাথর) থেকে। এটি ভূত্বক এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে ওপরের কঠিন অংশ নিয়ে গঠিত, যা সমুদ্রে প্রায় $৭০-১০০\text{ কিমি}$ এবং মহাদেশের নিচে প্রায় $১৫০-২০০\text{ কিমি}$ গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূত্বক প্রধান দুটি অংশে বিভক্ত:

  • মহাদেশীয় ভূত্বক (সিয়াল / SIAL): সিলিকা ($\text{SiO}_2$) এবং অ্যালুমিনিয়াম ($\text{Al}_2\text{O}_3$) দ্বারা সমৃদ্ধ। এর গড় ঘনত্ব প্রায় $২.৭\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$ এবং প্রধান উপাদান হালকা রঙের গ্রানাইট শিলা।
  • মহাসাগরীয় ভূত্বক (সিমা / SIMA): সিলিকা ($\text{SiO}_2$) এবং ম্যাগনেসিয়াম ($\text{MgO}$) সমৃদ্ধ। এর ঘনত্ব বেশি, প্রায় $৩.০\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$ এবং প্রধান উপাদান ভারী কৃষ্ণবর্ণের ব্যাসাল্ট শিলা।
  • কনরাড বিযুক্তি (Conrad Discontinuity): মহাদেশীয় হালকা সিয়াল স্তর এবং নিচের ভারী সিমা স্তরের মধ্যকার বিভাজন তল।

১.২ শিলার বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা: এক-খনিজ ও বহু-খনিজ শিলা

ভূ-বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী, এক বা একাধিক খনিজ বা খনিজজাত পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত ভূত্বকের যে কোনো প্রাকৃতিক কঠিন উপাদানকে শিলা (Rock) বলে। শিলা কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ নয়; এতে বিভিন্ন খনিজ কণার মিশ্রণ থাকে। খনিজের সংখ্যা অনুসারে শিলা দুই প্রকার:

শ্রেণি সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য প্রধান উদাহরণ ও উপাদান খনিজ
এক-খনিজ শিলা (Monomineralic Rock) যে শিলা মূলত একটিমাত্র খনিজ দ্বারা গঠিত (প্রায় $>৯৫\%$ অংশ একটি খনিজ)। চুনাপাথর (একমাত্র ক্যালসাইট খনিজ, $\text{CaCO}_3$ দ্বারা গঠিত); মার্বেল (বিশুদ্ধ ক্যালসাইটের রূপান্তর); কোয়ার্টজাইট বা বিশুদ্ধ বেলেপাথর (কেবলমাত্র কোয়ার্টজ খনিজ দ্বারা গঠিত); রক সল্ট (হ্যালাইট খনিজ, $\text{NaCl}$)।
বহু-খনিজ শিলা (Polymineralic Rock) যে শিলা দুই বা ততোধিক ভিন্ন খনিজের মিশ্রণে গঠিত। গ্রানাইট (কোয়ার্টজ, পটাশ ফেল্ডস্পার ও বায়োটাইট মাইকার সমাহার); ব্যাসাল্ট (প্লাজিওক্লেজ ফেল্ডস্পার, অগাইট ও অলিভিনের মিশ্রণ); গ্যাব্রো।

১.৩ প্রধান শিলাগঠনকারী খনিজ ও আকরিকের ধারণা

পৃথিবীতে ৪,০০০-এর বেশি খনিজ পাওয়া গেলেও ভূত্বকের প্রায় ৯০% অংশ গঠিত হয়েছে কয়েকটি মাত্র সিলিকেট খনিজ দ্বারা, যাদের শিলাগঠনকারী খনিজ বলে:

  • কোয়ার্টজ (Quartz / কোয়ার্টজাইট): সিলিকন ডাই-অক্সাইড ($\text{SiO}_2$)। অত্যন্ত কঠিন ($H=৭$), কাঁচের মতো চকচকে, রাসায়নিক আবহবিকারে ক্ষয়হীন। গ্রানাইট ও বেলেপাথরের মূল উপাদান।
  • ফেল্ডস্পার (Feldspar): অ্যালুমিনোসিলিকেট খনিজ। ভূত্বকের অর্ধেকেরও বেশি (৫০%+) অংশ ফেল্ডস্পার দিয়ে তৈরি। আবহবিকারে এটি সহজে কেওলিন বা চীনামাটিতে পরিণত হয়।
  • মাইকা বা অভ্র (Mica): পাতের মতো স্তরে স্তরে সহজে ভেঙে যাওয়া নমনীয় খনিজ। সাদা অভ্র (মাস্কোভাইট) ও কালো অভ্র (বায়োটাইট)। এটি বিদ্যুৎ ও তাপের উত্তম কুপরিবাহী।
  • ক্যালসাইট (Calcite): ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($\text{CaCO}_3$)। চুনাপাথর ও মার্বেলের প্রধান উপাদান; অ্যাসিডে দ্রুত দ্রবীভূত হয়।
  • খনিজ বনাম আকরিক: প্রকৃতিতে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মযুক্ত অজৈব উপাদান হলো খনিজ। আর যে খনিজ থেকে সহজে ও কম খরচে বাণিজ্যিকভাবে ধাতু নিষ্কাশন করা যায়, তাকে আকরিক (Ore) বলে। যেমন—বক্সাইট হলো অ্যালুমিনিয়ামের আকরিক, হেমাটাইট লোহার আকরিক। তাই: "সকল আকরিকই খনিজ, কিন্তু সকল খনিজ আকরিক নয়।"

১.৪ মোজের কাঠিন্য মানক (Mohs Hardness Scale)

১৮১২ সালে জার্মান খনিজবিদ ফ্রেডরিখ মোজ (Friedrich Mohs) খনিজের আপেক্ষিক আঁচড় কাটার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত একটি কাঠিন্য মানক প্রবর্তন করেন:

মানকের ক্রম প্রামাণ্য খনিজ রাসায়নিক সংকেত ব্যবহারিক পরীক্ষা করার সাধারণ মাধ্যম
১ট্যাল্ক (Talc)$\text{Mg}_3\text{Si}_4\text{O}_{10}(\text{OH})_2$সবচেয়ে নরম খনিজ; নখ দিয়ে সহজে গুঁড়ো করা যায় (ট্যালকম পাউডার)
২জিপসাম (Gypsum)$\text{CaSO}_4 \cdot 2\text{H}_2\text{O}$মানুষের নখের আঁচড়ে দাগ কাটে (নখের কাঠিন্য প্রায় ২.৫)
৩ক্যালসাইট (Calcite)$\text{CaCO}_3$তামার পয়সার আঁচড়ে দাগ পড়ে (তামার কাঠিন্য প্রায় ৩.৫)
৪ফ্লুরাইট (Fluorite)$\text{CaF}_2$লোহার পেরেক বা পকেট ছুরির ডগায় দাগ কাটে
৫অ্যাপাটাইট (Apatite)$\text{Ca}_5(\text{PO}_4)_3(\text{F,Cl,OH})$জানালা কাঁচ বা সাধারণ ইস্পাত দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে আঁচড় কাটে ($৫.৫$)
৬অর্থোক্লেজ ফেল্ডস্পার$\text{KAlSi}_3\text{O}_8$কাঁচের ওপর দাগ কাটে; ইস্পাতের ফাইলের আঁচড়ে দাগ পড়ে ($৬.৫$)
৭কোয়ার্টজ (Quartz)$\text{SiO}_2$কাঁচ ও ইস্পাত উভয়কেই সহজে কেটে দাগ ফেলতে পারে
৮টোপাজ (Topaz / পীতমণি)$\text{Al}_2\text{SiO}_4(\text{F,OH})_2$মূল্যবান রত্নপাথর; কোয়ার্টজকে সহজে আঁচড় কাটে
৯কোরান্ডাম (Corundum)$\text{Al}_2\text{O}_3$অত্যন্ত কঠিন রত্ন (চুনি, নীলকান্তমণি); শিল্পে ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত
১০হীরা (Diamond)বিশুদ্ধ কার্বন ($\text{C}$)প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পদার্থ; অন্য সব পদার্থকে আঁচড় কাটতে পারে

১.৫ শিলা শনাক্তকরণ ও লঘু অ্যাসিড পরীক্ষা

মাঠে শিলা চেনার জন্য প্রধান ৫টি শারীরিক ধর্ম পরীক্ষা করা হয়:

  • রং ও দ্যুতি: হালকা রঙের শিলায় সিলিকা বেশি (যেমন গ্রানাইট), অন্ধকার কালো শিলায় লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম বেশি (যেমন ব্যাসাল্ট)।
  • রেখা পরীক্ষা (Streak Test): অমসৃণ চীনামাটির প্লেটে খনিজ ঘষলে যে গুঁড়োর রং পাওয়া যায়। যেমন হেমাটাইটের রং যাই হোক, এর গুঁড়োর রেখা সর্বদা চেরি-লাল রঙের হয়।
  • লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড পরীক্ষা: চুনাপাথর বা মার্বেল পাথরে এক ফোঁটা লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($\text{HCl}$) ফেললে সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বুদবুদসহ তীব্র ফেনা সৃষ্টি হয়: $$\text{CaCO}_3 + 2\text{HCl} \to \text{CaCl}_2 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2 \uparrow$$ কিন্তু গ্রানাইট, ব্যাসাল্ট বা বেলেপাথরে অ্যাসিড ফেললে কোনো বিক্রিয়া বা বুদবুদ হয় না।

২. আগ্নেয় শিলা: প্রাথমিক ভূত্বক গঠন ও ম্যাগমার বিবর্তন

২.১ আগ্নেয় শিলার উৎপত্তি ও প্রাথমিক বা জনক শিলা বলার কারণ

ল্যাটিন শব্দ Ignis কথার অর্থ আগুন। আনুমানিক ৪৬০ কোটি বছর আগে পৃথিবী সৃষ্টির শুরুতে গ্রহটি ছিল এক উত্তপ্ত ফুটন্ত জ্বলন্ত গ্যাসীয় বাষ্পপিণ্ড। কালক্রমে মহাশূন্যে উত্তাপ বিকিরণ করে পৃথিবীর ওপরের অংশ প্রথম জমাট বেঁধে শক্ত কঠিন আবরণে পরিণত হয়। এই প্রথম গঠিত শিলাকে বলা হয় আগ্নেয় শিলা (Igneous Rocks)। যেহেতু অন্য সকল শিলা (পাললিক ও রূপান্তরিত) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই আগ্নেয় শিলার ধ্বংসাবশেষ বা পরিবর্তনের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছে, তাই আগ্নেয় শিলাকে পৃথিবীর প্রাথমিক শিলা (Primary Rocks) বা জনক শিলা (Parent Rocks) বলা হয়।

আগ্নেয় শিলার মৌলিক সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • স্ফটিকাকার বা রবাদার গঠন (Crystalline): ম্যাগমা ধীরে বা দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার সময় খনিজগুলো কেলাস বা স্ফটিক তৈরি করে পরস্পরের সাথে শক্তভাবে এঁটে থাকে।
  • ছিদ্রহীন ও কঠিন (Compact & Non-porous): খনিজ কণাগুলোর মাঝে কোনো ফাঁক থাকে না, ফলে এগুলো অত্যন্ত দৃঢ় ও অপ্রবেশ্য।
  • অস্তরীভূত গঠন (Non-stratified): পলির মতো একটার ওপর একটা স্তরে জমে তৈরি হয় না বলে এতে কোনো স্তরায়ন তল থাকে না।
  • সম্পূর্ণ জীবাশ্মহীন (Devoid of Fossils): ভূগর্ভের ম্যাগমার উষ্ণতা থাকে প্রায় $৭০০^\circ\text{C}$ থেকে $১৩০০^\circ\text{C}$। এই উত্তাপে যে কোনো জীবদেহ সঙ্গে সঙ্গে পুড়ে ছাই বা বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তাই আগ্নেয় শিলায় কোনো ফসিল বা জীবাশ্ম থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই।

২.২ নিঃসারী আগ্নেয় শিলা (Extrusive / Volcanic Rocks)

ভূগর্ভের উত্তপ্ত তরল ম্যাগমা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বা ভূত্বকের ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে লাভা (Lava) বলে। ভূপৃষ্ঠে বাতাস ও জলের সংস্পর্শে লাভা খুব দ্রুত তাপ বিকিরণ করে জমাট বাঁধে। খনিজগুলো বড় স্ফটিক তৈরি করার সময় পায় না, ফলে শিলা হয় সূক্ষ্ম দানাদার (Aphanitic) বা কাঁচের মতো মসৃণ:

নিঃসারী শিলা শীতলীকরণের প্রকৃতি ও গঠন বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও ভূমিরূপ
ব্যাসাল্ট (Basalt) ক্ষারকীয় তরল লাভা ভূপৃষ্ঠে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধে; সূক্ষ্ম দানাদার, গাঢ় ধূসর বা কালো বর্ণের ভারী শিলা। মহাসাগরের মেঝে ও বিস্তৃত লাভা মালভূমি গঠন করে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্তম্ভাকার জোড় (Columnar Jointing)—লাভা ঠান্ডা হয়ে সংকুচিত হওয়ার সময় উলম্ব ষড়ভুজাকার স্তম্ভে ফেটে যায়। এটি ক্ষয় হয়ে উর্বর কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর মাটি তৈরি হয়।
অবসিডিয়ান (Obsidian) সিলিকাসমৃদ্ধ লাভা এত দ্রুত জমে যায় যে কোনো কেলাসই তৈরি হতে পারে না; প্রাকৃতিক আগ্নেয় কাঁচ। চকচকে কালো, ভাঙলে কাঁচের মতো অত্যন্ত ধারালো শাঁখের মতো বাঁকা ধার তৈরি হয়। প্রাচীনকালে মানুষ অস্ত্র ও ছুরির ফলা তৈরিতে এটি ব্যবহার করত।
পিউমিস বা ঝাঁঝরা পাথর (Pumice) গ্যাস ও বাষ্পমিশ্রিত লাভা বুদবুদ সহ দ্রুত জমে শক্ত হয়ে যায়; ছিদ্রযুক্ত ফেনা আকৃতির শিলা। অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুকোষ থাকায় এর আপেক্ষিক ঘনত্ব জলের চেয়েও কম ($<১.০\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$)। তাই পিউমিস পাথর জলের ওপর ভাসে! এটি ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত হয়।

২.৩ উদ্ভেদী আগ্নেয় শিলা: পাতালিক ও উপপাতালিক শিলা

যখন ম্যাগমা ভূত্বকের বাইরে বের হতে না পেরে ভূ-অভ্যন্তরেই গভীর শিলাস্তরের নিচে আটকা পড়ে, তখন ওপরের শিলার তাপরোধী আচ্ছাদনের কারণে এটি অত্যন্ত ধীরে ধীরে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ঠান্ডা হয়। ফলে খনিজগুলোর কেলাস খুব বড় ও স্পষ্ট হয় (স্থূল দানাদার / Phaneritic গঠন):

  • পাতালিক শিলা (Plutonic Rocks): ভূগর্ভের অতল গভীরে প্রবল চাপে অতি ধীরে জমাট বাঁধে। উদাহরণ: গ্রানাইট (Granite), গ্যাব্রো (Gabbro)। গ্রানাইটে সাদাটে কোয়ার্টজ, গোলাপি ফেল্ডস্পার ও কালো মাইকার স্পষ্ট বড় বড় দানা চোখে দেখা যায়।
  • উপপাতালিক শিলা (Hypabyssal Rocks): ভূত্বকের মাঝারি গভীরতায় বিভিন্ন ফাটল ও সন্ধিস্থলে জমাট বাঁধে। উদাহরণ: ডলেরাইট (Dolerite) ও পেগম্যাটাইট।
  • উদ্ভেদী শিলার ভূমিরূপ:
    • বাথোলিথ (Batholith): ভূগর্ভে জমাট বাঁধা সুবিশাল গম্বুজাকার পাতালিক শিলার ম্যাগমা ভাণ্ডার।
    • সিল (Sill): পাললিক শিলার স্তরের সমান্তরালে অনুভূমিকভাবে জমাট বাঁধা লাভা পাত।
    • ডাইক (Dyke): শিলাস্তরের আড়াআড়ি উলম্ব দেওয়ালের মতো জমাট বাঁধা লাভা স্তম্ভ।

২.৪ রাসায়নিক শ্রেণিবিভাগ: আম্লিক ও ক্ষারকীয় শিলা

শিলার মধ্যে থাকা সিলিকার ($\text{SiO}_2$) পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে আগ্নেয় শিলাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়:

রাসায়নিক শ্রেণি সিলিকার শতকরা হার ($\%\text{ SiO}_2$) প্রধান খনিজ উপাদান রং ও ঘনত্ব প্রধান শিলার উদাহরণ
আম্লিক আগ্নেয় শিলা (Acidic) $>৬৫\% - ৭৫\%$ কোয়ার্টজ, পটাশ ফেল্ডস্পার (ফেলসিক) হালকা বর্ণ (গোলাপি বা সাদাটে); ঘনত্ব কম ($২.৭\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$) গ্রানাইট (পাতালিক), রায়োলাইট (নিঃসারী)
মধ্যবর্তী শিলা (Intermediate) $৫৫\% - ৬৫\%$ হর্নব্লেন্ড, প্লাজিওক্লেজ ধূসর বর্ণ; মাঝারি ঘনত্ব ($২.৮\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$) ডায়োরাইট (পাতালিক), অ্যান্ডিসাইট (নিঃসারী)
ক্ষারকীয় শিলা (Basic) $৪৫\% - ৫৫\%$ অগাইট, অলিভিন, লোহা-ম্যাগনেসিয়াম (ম্যাফিক) গাঢ় কালো বা সবুজ; ভারী ও ঘন ($৩.০\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$) গ্যাব্রো (পাতালিক), ব্যাসাল্ট (নিঃসারী), ডলেরাইট
অতি-ক্ষারকীয় শিলা (Ultrabasic) $<৪৫\%$ মূলত বিশুদ্ধ অলিভিন ও পাইরক্সিন ঘন কালো বা গাঢ় সবুজ; অতি ভারী ($>৩.৩\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$) পেরিডোটাইট (গুরুমণ্ডলের প্রধান শিলা)

২.৫ আবহবিকার ও আগ্নেয় ভূমিরূপ: টর ও ডেকান ট্র্যাপ

  • গোলাকার আবহবিকার ও টর (Spheroidal Weathering & Tors): আয়তাকার সন্ধিযুক্ত গ্রানাইট শিলার ফাঁক দিয়ে জল প্রবেশ করে রাসায়নিক আর্দ্রবিশ্লেষণ ঘটায়। চারদিকের কোণগুলো ভেঙে গিয়ে পেঁয়াজের খোসার মতো শিলা গোল গোল খণ্ডে পরিণত হয়। চারপাশের আলগা চূর্ণ মাটি অপসারিত হলে পাহাড়ের মাথায় বিশাল গোল গোল বোল্ডার একটার ওপর আরেকটা বিশালাকারভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, একে টর (Tor) বলে (পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় দৃশ্যমান)।
  • ডেকান ট্র্যাপ মালভূমি (Deccan Traps): সুইডিশ শব্দ Trappa কথার অর্থ সিঁড়ি। প্রাচীনকালে কোটি কোটি বছর আগে ভারতের মহারাষ্ট্র ও দাক্ষিণাত্য মালভূমিতে পরপর লাভা স্তরের পর স্তর জমে এক বিশাল ধাপযুক্ত সিঁড়ির মতো লাভা মালভূমি তৈরি করেছে, যাকে ডেকান ট্র্যাপ বলে।

৩. পাললিক শিলা: নগ্নীভবন, স্তরায়ন ও জীবাশ্মের সংগ্রহশালা

৩.১ ভূতাত্ত্বিক উৎপত্তি ও শিলায়ন (Lithification)

ল্যাটিন শব্দ Sedimentum কথার অর্থ নিচে থিতিয়ে পড়া বা তলানি জমা। প্রাচীন শিলা দীর্ঘদিন ধরে আবহবিকার ও নদীর স্রোতে ক্ষয়প্রাপ্ত ও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে জল ও বাতাসের মাধ্যমে বাহিত হয়ে হ্রদ, সাগর বা নদীগর্ভের তলদেশে স্তরে স্তরে জমা হয়। একে পলি (Sediments) বলে। ক্রমাগত ওপরের পলির চাপে নিচে থাকা পলি সংকুচিত হয়, জল বেরিয়ে যায় এবং খনিজ জলীয় দ্রবণের রাসায়নিক সিমেন্টের মতো জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় কঠিন শিলায় পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে শিলায়ন (Lithification) বলে। ভূপৃষ্ঠের স্থলভাগের প্রায় ৭৫% অঞ্চল পাললিক শিলা দ্বারা আবৃত।

৩.২ পাললিক শিলার অনন্য বৈশিষ্ট্য ও জীবাশ্মের গুরুত্ব

  • স্তরায়ন তল (Bedding Planes): একটার ওপর আরেকটা পলি স্তরে স্তরে জমে গঠিত হওয়ায় শিলায় অনুভূমিক সমান্তরাল স্তর স্পষ্ট দেখা যায়। দুটি স্তরের মধ্যকার বিভাজন রেখাকে স্তরবিন্যাস তল বা স্তরায়ন তল বলে।
  • ছিদ্রময়তা ও ভেদ্যতা (Porosity & Permeability): দানার মাঝে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফাঁক থাকে, যার মধ্য দিয়ে জল ও তরল প্রবেশ করতে পারে। তাই পাললিক শিলা হলো ভূগর্ভস্থ ভৌমজল ও খনিজ তেলের প্রধান আধার।
  • জীবাশ্মের অনন্য উপস্থিতি (Preservation of Fossils): সমুদ্র বা জলাশয়ের নিচে পলি জমার সময় বিভিন্ন জলজ প্রাণী, মাছ, শামুক, প্রবাল ও উদ্ভিদের দেহাবশেষ পলির তলায় চাপা পড়ে যায়। বাতাসের অনুপস্থিতিতে সেই জৈব অঙ্গের ছাপ পাথরে স্থায়ীভাবে পাথুরে হয়ে সংরক্ষিত হয়। একে জীবাশ্ম (Fossils) বলে। যেহেতু পাললিক শিলা ঠান্ডায় ও জলে গঠিত হয়, তাই একমাত্র পাললিক শিলাতেই জীবাশ্মের সন্ধান মেলে!
  • পাললিক গঠন: এতে ঢেউয়ের দাগ (রিপল মার্ক) এবং রোদে শুকনো পলির ফাটল (মাড ক্র্যাক) দেখতে পাওয়া যায়।

৩.৩ সংঘাতজাত বা যান্ত্রিক পাললিক শিলা (Mechanically Formed)

অন্যান্য শিলার চূর্ণবিচূর্ণ কণা যান্ত্রিকভাবে স্তুপীকৃত ও সিমেন্টবদ্ধ হয়ে গঠিত হয়:

শ্রেণি (দানার আকার) কণার মাপ প্রধান শিলা ও বিশিষ্ট ধর্ম
স্থূল দানাদার শিলা (Rudaceous) $>২.০\text{ মিমি}$ (নুড়ি ও কাঁকর) কংগ্লোমারেট (Conglomerate): নদীর জলে ঘষা লেগে গোলাকার হওয়া নুড়ি-পাথর সিমেন্টের মতো জমাট বেঁধে তৈরি।
ব্রেকসিয়া (Breccia): জলের ঘষা না লাগা ধারালো কোণযুক্ত পাথরের টুকরো জমাট বেঁধে তৈরি।
বালুকাময় শিলা (Arenaceous) $০.০৬\text{ মিমি} - ২.০\text{ মিমি}$ (বালুকণা) বেলেপাথর (Sandstone): মূলত কোয়ার্টজ বালুকণা জমাট বেঁধে তৈরি। দিল্লির লালকেল্লা, আগ্রার কেল্লা এবং ফতেহপুর সিক্রি যে লাল পাথর দিয়ে তৈরি, তা হলো হেমাটাইট বা আয়রন অক্সাইডযুক্ত লাল বেলেপাথর।
কাদাময় শিলা (Argillaceous) $<০.০৬\text{ মিমি}$ (অতি সূক্ষ্ম কাদা) শেল বা কাদাপাথর (Shale): কাদামাটির অতি সূক্ষ্ম কণা স্তরে স্তরে জমে গঠিত; সহজে পাতলা পাতের মতো আলাদা হয়ে যায় (Fissility)।
লোয়েস (Loess): মরুভূমি থেকে বাতাসে উড়ে আসা অতি সূক্ষ্ম হলুদ পলি (যেমন চীনের হোয়াংহো অববাহিকা)।

৩.৪ রাসায়নিক ও জৈব উপায়ে গঠিত পাললিক শিলা

  • রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় গঠিত শিলা (Chemical Sedimentary Rocks):
    • রক সল্ট বা সৈন্ধব লবণ (Halite, $\text{NaCl}$): মরু অঞ্চলের লবণাক্ত হ্রদের জল বাষ্পীভূত হয়ে তলদেশে লবণের স্ফটিক জমাট বাঁধে।
    • জিপসাম (Gypsum, $\text{CaSO}_4 \cdot 2\text{H}_2\text{O}$): সমুদ্রের জল শুকিয়ে রাসায়নিক অধঃক্ষেপ হিসেবে জমা হয়; প্লাস্টার অব প্যারিস ও সিমেন্ট তৈরিতে লাগে।
    • চুনাপাথরের গুহা ও স্ট্যালাকটাইট: চুনাপাথরের গুহার ছাদ থেকে ক্যালসিয়াম বাইকার্বনেটযুক্ত জলের ফোঁটা চুইয়ে পড়ার সময় জল বাষ্পীভূত হয়ে ছাদ থেকে ঝুলন্ত স্ট্যালাকটাইট ও মেঝে থেকে ওঠা স্ট্যালাগমাইট স্তম্ভ গঠন করে।
  • জৈব উপায়ে গঠিত শিলা (Organically Formed):
    • চুনজাতীয় শিলা (Calcareous): সমুদ্রে বসবাসকারী কোটি কোটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খোলসযুক্ত জীব (ফোরামিনিফেরা), প্রবাল ও শামুকের মৃতদেহ জমায়েত হয়ে গঠিত হয়। যেমন—চক (Chalk) এবং প্রবাল চুনাপাথর।
    • কার্বনজাতীয় শিলা (Coalification Series - কয়লায়ন ক্রম): কোটি কোটি বছর আগে ঘন অরণ্য ভূ-আন্দোলনে মাটির নিচে চাপা পড়ে ভূগর্ভের উত্তাপ ও প্রবল চাপে বায়ুর অনুপস্থিতিতে রূপান্তরিত হয়ে কয়লায় পরিণত হয়: $$\text{পিট (৫০-৬০% C)} \to \text{লিগনাইট (৬০-৭০% C)} \to \text{বিটুমিনাস (৭০-৮৫% C)} \to \text{অ্যানথ্রাসাইট (৯০-৯৫% C)}$$ পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের দামোদর অববাহিকার গণ্ডোয়ানা কয়লাখনি (রানীগঞ্জ ও ঝরিয়া) ভারতের প্রধান কয়লা ভাণ্ডার।

৩.৫ খনিজ তেল ও গ্যাসের আধার

পাললিক শিলার সচ্ছিদ্র বালির স্তরের (Aquifer ও Reservoir Rock) ভেতর খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আটকে থাকে। ওপরে কাদাপাথর বা শেলের মতো অপ্রবেশ্য শিলার ঢাকনা থাকায় তেল ওপরের দিকে পালাতে পারে না এবং ঊর্ধভঙ্গের ফাঁদে জমা হয়।

৪. রূপান্তরিত শিলা: তাপ, চাপ ও প্রাকৃতিক শিলাচক্র

৪.১ শিলার রূপান্তর ও এর প্রধান নিয়ন্ত্রকসমূহ

গ্রিক শব্দ Meta (পরিবর্তন) এবং Morphe (রূপ) থেকে এসেছে Metamorphic বা রূপান্তরিত শিলা। যখন পূর্বে গঠিত আগ্নেয় বা পাললিক শিলা ভূ-গর্ভের প্রচণ্ড তাপ ($২০০^\circ-৮০০^\circ\text{C}$), তীব্র দিকমুখী ভূ-আলোড়নের চাপ এবং রাসায়নিকভাবে সক্রিয় উত্তপ্ত তরলের সংস্পর্শে এসে সম্পূর্ণ না গলে কঠিন অবস্থাতেই তার আদি খনিজ গঠন ও চেহারা পরিবর্তন করে নতুন বৈশিষ্ট্যময় শিলায় পরিণত হয়, তখন তাকে রূপান্তরিত শিলা বলে। লক্ষ্য করো: শিলা যদি গরমে গলে পুরোপুরি তরল হয়ে যায়, তবে তা ম্যাগমা হয়ে যাবে এবং ঠান্ডা হলে আগ্নেয় শিলা হবে, রূপান্তরিত নয়!

রূপান্তরের তিন প্রধান চালিকাশক্তি:

  • তাপ (Heat): ভূগর্ভস্থ ম্যাগমার সংস্পর্শ বা ভূ-তাপীয় নতি ($১^\circ\text{C}$ প্রতি ৩২ মিটারে) শিলার খনিজের আণবিক বন্ধন ভেঙে নতুন কেলাস গঠনে সাহায্য করে।
  • চাপ (Pressure): ওপরের শিলাস্তরের উলম্ব চাপ এবং টেকটনিক পাতের সংঘর্ষের প্রবল পার্শ্বমুখী দিকনির্দেশিত চাপ খনিজগুলোকে চ্যাপ্টা করে সমান্তরালে সাজায়।
  • উত্তপ্ত খনিজ দ্রবণ: শিলাস্তরের ফাঁকে সঞ্চালিত রাসায়নিক আয়নসমৃদ্ধ উত্তপ্ত জলীয় বাষ্প আয়ন বিনিময় ঘটিয়ে রূপান্তর ত্বরান্বিত করে।

৪.২ রূপান্তরের প্রকারভেদ (Contact, Regional & Dynamic)

রূপান্তরের ধরন প্রধান চালিকাশক্তি ও ক্ষেত্র প্রভাব ও সৃষ্ট শিলা
স্পর্শ বা তাপজ রূপান্তর (Contact Metamorphism) উত্তপ্ত গলিত ম্যাগমার সংস্পর্শে আসা আশপাশের এলাকার শিলা প্রচণ্ড গরমে সেঁকে গিয়ে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয় বা ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ ($০.৫-২\text{ কিমি}$ বলয়); এতে তৈরি হয় পত্রায়নহীন কঠিন শিলা যেমন হর্নফেলস, মার্বেল ও কোয়ার্টজাইট।
আঞ্চলিক রূপান্তর (Regional Metamorphism) মহাদেশীয় পাতের সংঘর্ষ ও গিরিজনি ভূ-আলোড়নের সময় বিশাল অঞ্চল জুড়ে তাপ ও প্রবল দিকমুখী পার্শ্বচাপ একসাথে কাজ করে। হিমালয় বা আল্পস পর্বতের গভীর শিকড়ে হাজার হাজার বর্গকিমি অঞ্চল জুড়ে ঘটে; শিলায় সুস্পষ্ট পত্রায়ন ও স্তর তৈরি হয় (যেমন স্লেট, সিস্ট, নিশ)।
গতিজ বা সংঘাত রূপান্তর (Dynamic Metamorphism) চ্যুতিরেখা বরাবর ভূ-আলোড়নের ফলে পাথরে পাথরে তীব্র ঘর্ষণ, পেষণ ও যান্ত্রিক গুঁড়ো হওয়ার মাধ্যমে রূপান্তর। চ্যুতি বলয়ে শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মাইলোনাইট তৈরি করে।

৪.৩ রূপান্তরের গঠন: পত্রায়ন ও ব্যান্ডিং

  • পত্রায়ন বা ফলিয়েশন (Foliation): ভূ-আলোড়নের সময় প্রবল পার্শ্বচাপের ফলে শিলার মধ্যে থাকা চ্যাপ্টা বা পাতলা খনিজগুলো (যেমন মাইকা, ক্লোরাইট) চাপের সাথে সমকোণে পাতলা সমান্তরাল স্তরে স্তরে সজ্জিত হয় (ল্যাটিন Folium = পাতা)। এর ফলে স্লেট বা সিস্ট শিলাকে সহজে পাতলা পাতের মতো আলাদা করে ভাঙা যায়।
  • ব্যান্ডিং গঠন (Gneissose Banding): উচ্চমাত্রার আঞ্চলিক রূপান্তরের সময় খনিজগুলো রাসায়নিকভাবে আলাদা হয়ে গিয়ে হালকা রঙের কোয়ার্টজ-ফেল্ডস্পারের বলয় এবং অন্ধকার কালো রঙের বায়োটাইট-হর্নব্লেন্ডের বলয় একে অপরের সমান্তরালে পর্যায়ক্রমে ডোরাকাটা ব্যান্ডের মতো অবস্থান করে। একে ব্যান্ডিং বলে (যেমন নিশ শিলায়)।
  • দানাদার গঠন (Granoblastic): যেখানে কোয়ার্টজ বা ক্যালসাইটের মতো সমান দানার খনিজ চাপমুক্ত তাপীয় রূপান্তরের ফলে চারদিকে নিরেট চিনির দানার মতো শক্তভাবে এঁটে থাকে (যেমন মার্বেল ও কোয়ার্টজাইট)।

৪.৪ মূল শিলা থেকে রূপান্তরিত শিলার রূপান্তরের তালিকা

পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদের পরীক্ষায় বারবার আসা কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের তুলনামূলক ছক:

মূল আদি শিলা (Parent Rock) আদি শিলার শ্রেণি সৃষ্ট রূপান্তরিত শিলা রূপান্তরের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারিক প্রয়োগ
গ্রানাইট (Granite) পাতালিক আগ্নেয় নিশ (Gneiss) সমান্তরাল সাদা ও কালো খনিজের ডোরাকাটা ব্যান্ডিং; রেললাইনের ব্যালাস্ট ও বাড়ি তৈরিতে লাগে।
ব্যাসাল্ট (Basalt) নিঃসারী আগ্নেয় অ্যাম্ফিবোলাইট (Amphibolite) অগাইট পাইরক্সিন পরিবর্তিত হয়ে গাঢ় হর্নব্লেন্ডে পরিণত হয়; রাস্তা তৈরির শক্ত পাথর।
বেলেপাথর (Sandstone) পাললিক (বালুকাময়) কোয়ার্টজাইট (Quartzite) বালুকণাগুলো পুরোপুরি গলে মিশে এক অখণ্ড স্ফটিকে পরিণত হয়; অত্যন্ত শক্ত আবহবিকাররোধী পাথর ($H=৭$)।
চুনাপাথর (Limestone) পাললিক (জৈব/রাসায়নিক) মার্বেল (Marble) ক্যালসাইট কণা স্ফটিকের মতো জমায়েত হয়; তাজমহল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও ভাস্কর্য নির্মাণে সেরা।
কাদাপাথর বা শেল (Shale) পাললিক (কাদাময়) স্লেট (Slate) $\to$ ফাইলাইট $\to$ সিস্ট ধারাবাহিক আঞ্চলিক রূপান্তর: কাদা পাথর প্রথমে স্লেট (ঘরের ছাদ ও ব্ল্যাকবোর্ড), পরে ফাইলাইট ও শেষে চকচকে সিস্টে পরিণত হয়।
বিটুমিনাস কয়লা (Coal) পাললিক (কার্বনজাত) অ্যানথ্রাসাইট $\to$ গ্রাফাইট $\to$ হীরা তাপ ও চাপে উদ্বায়ী পদার্থ বেরিয়ে গিয়ে খাঁটি কার্বনের গ্রাফাইট ($H=১$) এবং অতল গভীরে অতিমূল্যবান হীরা ($H=১০$) উৎপন্ন হয়।

৪.৫ ভূ-তাত্ত্বিক শিলাচক্র (Geological Rock Cycle)

১৭৮৫ সালে আধুনিক ভূ-বিজ্ঞানের জনক জেমস হাটন (James Hutton) বলেছিলেন—"প্রকৃতিতে সৃষ্টির কোনো চিহ্ন আমরা দেখি না, আবার ধ্বংসেরও কোনো শেষ নেই।"

শিলাচক্রের স্বাভাবিক রূপান্তর পর্যায়:

  1. ভূগর্ভের গলিত ম্যাগমা শীতল হয়ে তৈরি করে আগ্নেয় শিলা।
  2. আগ্নেয় শিলা নদী ও আবহবিকারে ক্ষয় হয়ে তলদেশে জমে সৃষ্টি করে পাললিক শিলা।
  3. পাললিক ও আগ্নেয় শিলা ভূ-গর্ভের উত্তাপ ও চাপে রূপান্তরিত হয়ে জন্ম দেয় রূপান্তরিত শিলা।
  4. রূপান্তরিত শিলা আরও গভীরে পাত সংস্থান প্রক্রিয়ায় সাবডাকশন বলয়ে নেমে গিয়ে অতিরিক্ত গরমে পুনরায় গলে গিয়ে পরিণত হয় গলিত ম্যাগমায়!
  5. সংক্ষিপ্ত পথ বা শর্টকাট: আগ্নেয় শিলা সরাসরি চাপে রূপান্তরিত শিলায় রূপ নিতে পারে; আবার রূপান্তরিত শিলা সরাসরি ক্ষয় হয়ে পাললিক শিলা হতে পারে। এভাবেই চক্রাকারে কোটি কোটি বছর ধরে আবর্তিত হচ্ছে শিলাচক্র।

৫. আবহবিকার, মৃত্তিকা সৃষ্টি, মাটির পরীলেখ ও পরিবেশীয় সংরক্ষণ

৫.১ আবহবিকার ও রেগোলিথ সৃষ্টির কার্যপ্রণালী

ভূপৃষ্ঠের উন্মুক্ত শিলাসমূহ স্থান পরিবর্তন না করে একই স্থানে স্বস্থানে চূর্ণবিচূর্ণ ও রাসায়নিকভাবে বিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে আবহবিকার (Weathering) বলে:

  • যান্ত্রিক আবহবিকার: খনিজের রাসায়নিক পরিবর্তন ছাড়াই শিলার বাহ্যিক ভাঙন। মরু অঞ্চলে তাপমাত্রার দৈনিক দ্রুত হ্রাস-বৃদ্ধির ফলে শিলা পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে যাওয়া (শল্কমোচন), হিমশীতল পর্বতচূড়ায় ফাটলের ভেতরে জল জমে বরফ হলে আয়তনে ৯% বৃদ্ধি পেয়ে পাথরে ফাটল ধরানো (তুহিন খণ্ডীকরণ) ও ক্ষুদ্রকণা বিশ্লিষ্টকরণ।
  • রাসায়নিক আবহবিকার: খনিজের রাসায়নিক পরিবর্তন ও বিয়োজন। আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এটি সবচেয়ে বেশি ঘটে। যেমন জারণ (বাতাসের অক্সিজেনের সাথে লোহার বিক্রিয়ায় মরচে পড়া), অঙ্গারযোজন (কার্বনিক অ্যাসিডযুক্ত জলের ক্রিয়ায় চুনাপাথর দ্রবীভূত হওয়া) এবং আর্দ্রবিশ্লেষণ।
  • জৈব আবহবিকার: উদ্ভিদের মূলের চাপে পাথরে ফাটল ধরা, কেঁচো ও পোকামাকড়ের গর্ত খোঁড়া এবং লাইকেন-শৈবালের নিঃসৃত অ্যাসিড দ্বারা শিলা ক্ষয়।
  • রেগোলিথ (Regolith): কঠিন আদি শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভূত্বকের ওপর যে শিথিল নরম অসংবদ্ধ শিলাচূর্ণের স্তর তৈরি করে, তাকে রেগোলিথ বলে। এই রেগোলিথ থেকেই পরবর্তীকালে প্রকৃত উর্বর মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়!

৫.২ ডকুচায়েভের মৃত্তিকা সৃষ্টির সমীকরণ ($S = f(cl, o, r, p, t)$)

১৮৮৩ সালে আধুনিক মৃত্তিকা বিজ্ঞানের (Pedology) জনক রাশিয়ান বিজ্ঞানী ভাসিলি ডকুচায়েভ (Vasiliy Dokuchaev) প্রমাণ করেন যে মাটি কোনো নিছক পাথরের গুঁড়ো নয়, বরং পাঁচটি পরিবেশীয় উপাদানের জটিল মিথস্ক্রিয়ায় গড়ে ওঠা এক জীবন্ত প্রাকৃতিক মাধ্যম:

ডকুচায়েভের মৌলিক সমীকরণ:
$$S = f(cl, \, o, \, r, \, p, \, t)$$
  • $cl$ (Climate / জলবায়ু): তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত রাসায়নিক আবহবিকারের গতি ও উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ করে।
  • $o$ (Organisms / জীবজগৎ): ঝরা পাতা ও মৃত উদ্ভিদ মাটির ব্যাকটেরিয়া ও কেঁচোর সাহায্যে পচে পুষ্টিকর কালো হিউমাসে পরিণত হয়।
  • $r$ (Relief / ভূপ্রকৃতি): খাড়া পাহাড়ের ঢালে জল দ্রুত বয়ে যায় বলে মাটি ধরে রাখতে পারে না (পাতলা মাটি); অন্যদিকে সমভূমিতে জল চুইয়ে ধীরে জমে গভীর উর্বর মাটি গঠিত হয়।
  • $p$ (Parent Material / আদি শিলা): মূল শিলা মাটির প্রাথমিক খনিজ ধর্ম, বর্ণ ও বুনট নির্ধারণ করে (ব্যাসাল্ট ক্ষয় হয়ে কালো মাটি হয়; গ্রানাইট থেকে লাল মাটি হয়)।
  • $t$ (Time / সময়): পূর্ণাঙ্গ পরিণত মাটি তৈরিতে শত শত বছর সময় লাগে (মাত্র ১ সেমি উর্বর শীর্ষ মৃত্তিকা তৈরি হতে ২০০ থেকে ৪০০ বছর লাগে!)।

৫.৩ মাটির পরীলেখ ও প্রধান পাঁচটি স্তর (Soil Profile)

ভূপৃষ্ঠ থেকে নিচে কঠিন আদি শিলা পর্যন্ত মাটির যে উলম্ব প্রস্থচ্ছেদ দেখা যায়, তাকে মাটির পরীলেখ (Soil Profile) বলে। একটি আদর্শ পরিণত মাটিতে ৫টি প্রধান স্তর থাকে:

মাটির স্তর স্তরের নাম ও স্বরূপ মৃত্তিকাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য
O স্তর জৈব স্তর (Organic Litter Layer) একেবারে ওপরের বনভূমির স্তর; ঝরে পড়া পাতা, গাছের ডালপালা ও অপচিত জৈব আবর্জনা দ্বারা গঠিত।
A স্তর শীর্ষ মৃত্তিকা / Topsoil (ধৌত স্তর / Eluviation) কালো বা গাঢ় বাদামি রঙের অতি উর্বর স্তর; হিউমাস ও বিভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়ায় সমৃদ্ধ। উদ্ভিদের মূল এই স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে। ওপর থেকে চুইয়ে নামা জল খনিজ ও কাদা কণা ধুয়ে নিচের স্তরে নামিয়ে দেয় বলে একে ধৌত স্তর (Zone of Eluviation) বলে।
B স্তর উপমৃত্তিকা / Subsoil (সঞ্চয় স্তর / Illuviation) হালকা রঙের শক্ত ও নিরেট স্তর। A স্তর থেকে ধুয়ে নেমে আসা সূক্ষ্ম কাদা, লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড এই স্তরে এসে জমা ও সঞ্চিত হয় বলে একে সঞ্চয় স্তর (Zone of Illuviation) বলে। এতে হিউমাস প্রায় থাকে না।
C স্তর রেগোলিথ স্তর (আংশিক চূর্ণ আদি শিলা) অর্ধ-বিচূর্ণ ও আবহবিকারগ্রস্ত আদি শিলার আলগা খণ্ড দ্বারা গঠিত স্তর। এতে কোনো জৈব উপাদান বা উদ্ভিদের মূল থাকে না।
R / D স্তর কঠিন আদি শিলা ভিত্তি (Bedrock) একেবারে তলদেশে অবস্থিত অক্ষত কঠিন অবিচূর্ণ আদি শিলা (যেমন কঠিন গ্রানাইট বা ব্যাসাল্ট), যা মাটির প্রাকৃতিক ভিত্তি।

৫.৪ ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের প্রধান চার প্রকার মাটি

  • পলিমাটি (Alluvial Soil): নদী দ্বারা বাহিত পলি সঞ্চিত হয়ে গঙ্গা ও বদ্বীপ অঞ্চলে গঠিত। অত্যন্ত উর্বর, পটাশ সমৃদ্ধ; ধান, গম ও পাট চাষে আদর্শ।
  • কৃষ্ণ মৃত্তিকা বা রেগুর (Black Regur Soil): দাক্ষিণাত্যের ব্যাসাল্ট শিলা চূর্ণ হয়ে গঠিত। মন্টমোরিলোনাইট কাদা সমৃদ্ধ হওয়ায় দীর্ঘকাল জল ধরে রাখতে পারে; তুলো চাষের জন্য সেরা।
  • লাল মাটি (Red Soil): গ্রানাইট ও নিশ শিলা আবহবিকারপ্রাপ্ত হয়ে গঠিত। লোহা অক্সাইডের কারণে রং লাল। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় প্রচুর দেখা যায়।
  • ল্যাটেরাইট মাটি (Laterite Soil): পর্যায়ক্রমিক আর্দ্র ও শুষ্ক জলবায়ুতে সিলিকা ধুয়ে অপসারিত হয়ে কেবল লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের শক্ত আস্তরণ পড়ে থাকে। শুকালে ইটের মতো শক্ত হয় (ল্যাটিন Later = ইট)। পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলে দেখা যায়।

৫.৫ ভূতাত্ত্বিক সম্পদের সংকট ও আধুনিক মৃত্তিকা সংরক্ষণ

অনিয়ন্ত্রিত পাথর খাদান খনন ও ডিনামাইট বিস্ফোরণ পাহাড়ি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করে এবং পাথর ভাঙার ধুলোয় শ্রমিকদের মরণব্যাধি সিলিকোসিস (Silicosis) ফুসফুসের রোগ ঘটায়। উপরন্তু অরণ্য নিধনের ফলে খোয়াই ও খাত ক্ষয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টন উর্বর মাটি ধুয়ে সমুদ্রে চলে যাচ্ছে। মৃত্তিকা সংরক্ষণে প্রধান প্রকৌশলগত পদক্ষেপ:

  • সমোন্নতি রেখা বরাবর চাষ (Contour Ploughing): পাহাড়ের ঢালের সমউচ্চতাযুক্ত রেখা বরাবর আড়াআড়ি লাঙল দেওয়া, যা বৃষ্টির জলের গতি রোধ করে।
  • ধাপ চাষ (Terrace Cultivation): খাড়া পাহাড়ি ঢালে সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে জমি তৈরি করে জলপ্রবাহের বেগ কমানো।
  • বায়ুরোধক বৃক্ষরোপণ (Shelterbelts): কৃষিভূমির সীমানা বরাবর বাতাসের প্রবাহের আড়াআড়ি ঘন গাছের সারি লাগিয়ে ঝোড়ো বাতাসে মাটি ওড়া বন্ধ করা।
  • মালচিং ও শস্য পর্যায়: শুকনো খড়কুটো দিয়ে মাটির ওপরের ভাগ ঢেকে রাখা এবং জমিতে পর্যায়ক্রমে ডালশস্য চাষ করে মাটির নাইট্রোজেন বৃদ্ধি করা।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

মোজের খনিজ কাঠিন্য মানক ক্রম
নখের কাঠিন্য ≈ ২.৫, তামার পয়সা ≈ ৩.৫, ইস্পাতের ছুরি ≈ ৫.৫, চীনামাটির প্লেট ≈ ৬.৫
প্রকৃতির সবচেয়ে নরম খনিজ ট্যাল্ক (১) এবং সবচেয়ে কঠিনতম পদার্থ হীরা (১০)।
আগ্নেয় শিলার সিলিকাভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
গ্রানাইট (≈ ৭২\% SiO_2, \, ≈ ২.৭ গ্রাম/ঘনসেমি) বনাম ব্যাসাল্ট (≈ ৫০\% SiO_2, \, ≈ ৩.০ গ্রাম/ঘনসেমি)
বেশি সিলিকা শিলাকে হালকা ও কম ঘন করে; কম সিলিকা শিলাকে অন্ধকার ও ভারী করে।
ডকুচায়েভের মৃত্তিকা সৃষ্টি সমীকরণ
cl = জলবায়ু, o = জীবজগৎ/হিউমাস, r = ভূপ্রকৃতি/ঢাল, p = আদি শিলা, t = সময়
প্রমাণ করে যে মাটি শুধুই চূর্ণ পাথর নয়, বরং এটি একটি স্বতস্ফূর্ত জীবন্ত জৈব মাধ্যম।
কার্বনেট লঘু অ্যাসিড বিক্রিয়া সমীকরণ
V_{gas} > 0 (কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের তীব্র বুদবুদ ও ফেনা সৃষ্টি)
সিলিকেট শিলায় ঠান্ডা লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ফেললে কোনো বিক্রিয়া ঘটে না।
শিলার আপেক্ষিক ঘনত্ব ও ওজন অনুপাত
পিউমিস ( < ১.০ গ্রাম/ঘনসেমি) < গ্রানাইট (২.৬৫) < ব্যাসাল্ট (৩.০) < গ্যাব্রো (৩.২)
বাতাসের বুদবুদের কারণে পিউমিস পাথরের ঘনত্ব জলের চেয়ে কম হওয়ায় এটি জলে ভাসে।
মৃত্তিকার সচ্ছিদ্রতা সূচক (Porosity)
বেলে মাটি: ৩৫-৪৫\% বনাম এঁটেল মাটি: ৫০-৬০\% (অধিক আণুবীক্ষণিক রন্ধ্র)
এঁটেল মাটিতে মোট রন্ধ্রের পরিমাণ বেশি হলেও বেলে মাটিতে রন্ধ্রের আকার বড় হওয়ায় প্রবেশ্যতা বেশি।
ভূত্বকে স্বাভাবিক ভূ-তাপীয় নতি (Geothermal Gradient)
$$T(z) = T_0 + \left(\frac{\Delta T}{\Delta z}\right) \cdot z$$
১০-১৫ কিমি গভীরে তাপমাত্রা ৩০০°-৪৫০°C পৌঁছায়, যা শিলা না গলিয়েই আঞ্চলিক রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম।
জলে পলি অবক্ষেপণের গতিবেগ নীতি (Stokes' Law)
নদীর মোহনায় ভারী নুড়ি ও বালি আগে থিতিয়ে পড়ে; সূক্ষ্ম কাদা সমুদ্রে দূর পর্যন্ত যায়
এই কারণেই পাললিক শিলায় মোটা দানার স্তর নিচে এবং সূক্ষ্ম কাদার স্তর ওপরে জমাট বাঁধে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
একটি পরীক্ষাগারে তিনটি অজ্ঞাত শিলার নমুনা X, Y এবং Z রাখা আছে। X নমুনাটি হালকা রঙের, যাতে কোয়ার্টজ ও গোলাপি ফেল্ডস্পারের স্পষ্ট বড় বড় কেলাস দেখা যায় এবং এটি অ্যাসিডে কোনো বিক্রিয়া করে না। Y নমুনাটি ভারী, গাঢ় কালো রঙের, সূক্ষ্ম দানাদার এবং এতে ষড়ভুজাকার উলম্ব ফাটল বা স্তম্ভের আকার রয়েছে। Z নমুনাটি সাদা রঙের, কেলাসাকার, তামার পয়সা দিয়ে এতে সহজেই আঁচড় কাটা যায় এবং লঘু অ্যাসিড ফেললে তীব্র বুদবুদ সহ ফেনা ওঠে। তিনটি শিলার নাম, উৎপত্তিগত শ্রেণি ও কারণ চিহ্নিত করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. X নমুনার শনাক্তকরণ:

  • পর্যবেক্ষণ: হালকা রঙের (ফেলসিক), স্পষ্ট বড় বড় কেলাসাকার দানাযুক্ত (Phaneritic), কোয়ার্টজ ও অর্থোক্লেজ ফেল্ডস্পার সমৃদ্ধ, অ্যাসিডে নির্লিপ্ত।
  • সিদ্ধান্ত: ভূগর্ভের অতল গভীরে ম্যাগমা অত্যন্ত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে এই বড় স্ফটিক গঠন করেছে।
  • শিলার নাম: গ্রানাইট (Granite)।
  • শ্রেণি: উদ্ভেদী পাতালিক আগ্নেয় শিলা।

২. Y নমুনার শনাক্তকরণ:

  • পর্যবেক্ষণ: গাঢ় কালো রঙের (ম্যাফিক), ভারী, সূক্ষ্ম দানাদার (Aphanitic) এবং স্তম্ভাকার জোড় (Columnar jointing) যুক্ত।
  • সিদ্ধান্ত: ভূপৃষ্ঠে বা সমুদ্রের নিচে ক্ষারকীয় লাভা দ্রুত ঠান্ডা হয়ে জমাট বাঁধার সময় সংকুচিত হয়ে স্তম্ভের আকার নিয়েছে।
  • শিলার নাম: ব্যাসাল্ট (Basalt)।
  • শ্রেণি: নিঃসারী লাভা আগ্নেয় শিলা।

৩. Z নমুনার শনাক্তকরণ:

  • পর্যবেক্ষণ: সাদা, স্ফটিকাকার, কাঠিন্য প্রায় ৩ (তামার পয়সায় আঁচড় পড়ে) এবং লঘু অ্যাসিডে তীব্র কার্বন ডাই-অক্সাইড বুদবুদ উৎপন্ন করে।
  • রাসায়নিক বিক্রিয়া: $\text{CaCO}_3 + 2\text{HCl} \to \text{CaCl}_2 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2 \uparrow$।
  • সিদ্ধান্ত: এটি বিশুদ্ধ ক্যালসাইট খনিজের স্ফটিকসমৃদ্ধ মার্বেল পাথর, যা প্রাচীন চুনাপাথরের রূপান্তরের ফলে তৈরি।
  • শিলার নাম: মার্বেল (Marble)।
  • শ্রেণি: অ-পত্রায়িত রূপান্তরিত শিলা।

উপসংহার: X হলো গ্রানাইট (আগ্নেয়), Y হলো ব্যাসাল্ট (আগ্নেয়) এবং Z হলো মার্বেল (রূপান্তরিত)।

উদাহরণ 2
একটি শুকনো সচ্ছিদ্র বেলেপাথরের নমুনার মোট আয়তন ৫০০ ঘনসেমি এবং এর শুষ্ক ভর ১০৬০ গ্রাম। যদি কোয়ার্টজ কণার প্রকৃত আপেক্ষিক ঘনত্ব ২.৬৫ গ্রাম/ঘনসেমি হয়, তবে নির্ণয় করো: (ক) বেলেপাথরটির আপাত শুষ্ক ঘনত্ব, এবং (খ) শিলাটির সচ্ছিদ্রতার শতকরা হার। এই বেলেপাথর কি ভূগর্ভস্থ জলের আধার হিসেবে কাজ করতে পারবে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. আপাত শুষ্ক ঘনত্ব নির্ণয় ($\rho_b$): $$\rho_b = \frac{\text{ভর}}{\text{মোট আয়তন}} = \frac{\text{১০৬০ গ্রাম}}{\text{৫০০ ঘনসেমি}} = \mathbf{২.১২\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}}$$ ২. কঠিন কোয়ার্টজ কণার প্রকৃত আয়তন নির্ণয় ($V_s$): $$V_s = \frac{\text{ভর}}{\text{কণার ঘনত্ব}} = \frac{\text{১০৬০ গ্রাম}}{\text{২.৬৫ গ্রাম/ঘনসেমি}} = \mathbf{৪০০\text{ ঘনসেমি}}$$ ৩. ফাঁকা রন্ধ্রের আয়তন নির্ণয় ($V_{\text{voids}}$): $$V_{\text{voids}} = V_{\text{total}} - V_s = \text{৫০০} - \text{৪০০} = \mathbf{১০০\text{ ঘনসেমি}}$$ ৪. সচ্ছিদ্রতার শতকরা হার ($n$): $$n = \left(\frac{V_{\text{voids}}}{V_{\text{total}}}\right) \times ১০০\% = \left(\frac{\text{১০০}}{\text{৫০০}}\right) \times ১০০\% = \mathbf{২০.০\%}$$ ঘনত্ব সূত্রের সাহায্যে: $$n = \left(১ - \frac{\rho_b}{\rho_p}\right) \times ১০০\% = \left(১ - \frac{২.১২}{২.৬৫}\right) \times ১০০\% = (১ - ০.৮০) \times ১০০\% = \mathbf{২০.০\%}$$ উপসংহার: বেলেপাথরটির সচ্ছিদ্রতা ২০.০%। ২০% সচ্ছিদ্রতাযুক্ত এবং পরস্পর যুক্ত রন্ধ্রবিশিষ্ট বেলেপাথর প্রচুর পরিমাণে জল সঞ্চয় ও পরিবহন করতে পারে, ফলে এটি একটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ও কার্যকর ভৌমজলবাহী শিলাস্তর (Aquifer) হিসেবে কাজ করবে।
উদাহরণ 3
ভূত্বকে স্বাভাবিক ভূ-তাপীয় নতি প্রতি ৩২ মিটারে ১°C ধরা হলে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২০°C হলে ভূ-অভ্যন্তরে ১২ কিলোমিটার গভীরে তাপমাত্রা কত হবে হিসাব করো। এই তাপমাত্রা কীভাবে গ্রানাইট থেকে নিশ রূপান্তরে সাহায্য করে ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. তাপমাত্রা বৃদ্ধির সূত্র:

$$\Delta T = \left(\frac{\Delta z}{\text{৩২ মিটার}}\right) \times ১^\circ\text{C}$$

২. প্রদত্ত মানসমূহ:

  • গভীরতা $\Delta z = \text{১২ কিমি} = \text{১২,০০০ মিটার}$
  • ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা $T_{\text{surface}} = ২০^\circ\text{C}$

৩. তাপমাত্রা বৃদ্ধি ($\Delta T$):

$$\Delta T = \frac{\text{১২,০০০}}{\text{৩২}} = ৩৭৫^\circ\text{C}$$

৪. ১২ কিমি গভীরতায় মোট ভূ-তাপমাত্রা:

$$T = ২০^\circ\text{C} + ৩৭৫^\circ\text{C} = \mathbf{৩৯৫^\circ\text{C}}$$

৫. নিশ শিলা সৃষ্টিতে এই তাপমাত্রার গুরুত্ব:

  • ১২ কিমি গভীরে ৩৯৫°C তাপমাত্রায় গ্রানাইট শিলা পুরোপুরি গলে তরল হয় না (কারণ গ্রানাইট গলতে প্রায় ৭০০°C তাপমাত্রা লাগে)।
  • কিন্তু এই উত্তাপ শিলার ভেতরের খনিজগুলোর পারমাণবিক বন্ধন আলগা করে কঠিন অবস্থাতেই নতুন করে কেলাসিত হতে সাহায্য করে।
  • টেকটনিক পাতের প্রবল দিকমুখী পার্শ্বচাপের সাথে যুক্ত হয়ে সাদা কোয়ার্টজ-ফেল্ডস্পার এবং কালো মাইকার কণাগুলো আলাদা আলাদা বলয়ে সজ্জিত হয়ে গ্রানাইটকে ব্যান্ডিংযুক্ত নিশ (Gneiss) শিলায় রূপান্তরিত করে।

উপসংহার: ১২ কিমি গভীরে তাপমাত্রা প্রায় ৩৯৫°C পৌঁছায়, যা গ্রানাইটের আঞ্চলিক রূপান্তরের জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করে।

উদাহরণ 4
চুনাপাথর বা শেলের মতো পাললিক শিলায় প্রচুর পরিমাণে জীবাশ্ম পাওয়া গেলেও গ্রানাইট বা ব্যাসাল্টের মতো আগ্নেয় শিলায় জীবাশ্ম সম্পূর্ণ অনুপস্থিত কেন? ভূতাত্ত্বিক কারণ বিশ্লেষণ করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. আগ্নেয় শিলার উৎপত্তি ও জীবাশ্ম ধ্বংসের কারণ:

  • আগ্নেয় শিলা সৃষ্টি হয় ভূগর্ভস্থ গলিত ম্যাগমা বা ভূপৃষ্ঠের লাভার শীতলীকরণের মাধ্যমে।
  • ম্যাগমা ও লাভার উষ্ণতা থাকে প্রায় ৭০০°C থেকে ১৩০০°C।
  • এই ফুটন্ত লাভার সংস্পর্শে কোনো গাছপালা, শাঁখ বা প্রাণীর দেহ এলে তা সঙ্গে সঙ্গে ভস্মীভূত, পুড়ে ছাই ও গ্যাসীয় বাষ্পে পরিণত হয়। কোনো ধরনের জৈব কাঠামো বা ছাপের এই তাপে টিকে থাকা ভৌতিকভাবেই অসম্ভব।
  • ফলে আগ্নেয় শিলা সর্বদাই সম্পূর্ণ জীবাশ্মহীন হয়।

২. পাললিক শিলায় জীবাশ্ম সংরক্ষণের অনুকূল পরিবেশ:

  • পাললিক শিলা গঠিত হয় নদী, হ্রদ বা সমুদ্রের তলদেশে স্বাভাবিক শীতল তাপমাত্রায় (৫°C - ২৫°C)।
  • জলজ শামুক, ঝিনুক, প্রবাল, মাছ এবং পাড়ে মরে পড়ে থাকা গাছপালা জলের নিচে দ্রুত পলি, কাদা বা বালির নিচে চাপা পড়ে যায়।
  • দ্রুত পলি জমে যাওয়ায় বাতাস প্রবেশ করতে পারে না (অক্সিজেনহীন পরিবেশ), ফলে মৃতদেহ দ্রুত পচে নষ্ট হয় না।
  • লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভৌমজলে দ্রবীভূত সিলিকা বা ক্যালসিয়াম জৈব অণুর স্থানে প্রতিস্থাপিত হয়ে পাথুরে আকার ধারণ করে বা নরম কাদায় তাদের নিখুঁত ছাপ মুদ্রিত হয়ে যায়।

উপসংহার: পাললিক শিলার শীতল ও সুরক্ষিত জলজ অবক্ষেপণ পরিবেশ জীবাশ্ম সংরক্ষণে সাহায্য করে, অন্যদিকে আগ্নেয় শিলার উত্তপ্ত গলিত আগুন সমস্ত জৈব চিহ্ন ধ্বংস করে দেয়।

উদাহরণ 5
উদ্ভিদের অবশেষ থেকে শুরু করে উৎকৃষ্ট অ্যানথ্রাসাইট কয়লা ও গ্রাফাইট তৈরির সম্পূর্ণ কয়লায়ন ক্রম (Coalification Series) চার পর্যায়ের কার্বনের শতকরা হার ও বৈশিষ্ট্যের তুলনামূলক বিবরণে লেখো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

কোটি কোটি বছর আগে জলাভূমির ঘন অরণ্য ভূত্বকের নিচে চাপা পড়ে গভীরতার চাপ ও উত্তাপে পর্যায়ক্রমে চারটি প্রধান কয়লায়ন ধাপ অতিক্রম করে:

১. প্রথম পর্যায়: পিট কয়লা (Peat)

  • কার্বনের পরিমাণ: ৫০% – ৬০%
  • বৈশিষ্ট্য: বাদামি বর্ণের, হালকা, স্পঞ্জের মতো আঁশযুক্ত উদ্ভিজ্জ পদার্থ। প্রচুর ধোঁয়া সহ অল্প তাপ ($<৩,০০০\text{ kcal/kg}$) দেয়; এটি কয়লা তৈরির আদি কাঁচা স্তর।

২. দ্বিতীয় পর্যায়: লিগনাইট বা বাদামি কয়লা (Lignite)

  • কার্বনের পরিমাণ: ৬০% – ৭০%
  • বৈশিষ্ট্য: নরম, ভঙ্গুর, গাঢ় বাদামি রঙের কয়লা। কাঠের আঁশের ছাপ দেখা যায়; কয়লার মধ্যে কম তাপ উৎপাদন ক্ষমতাযুক্ত (যেমন তামিলনাড়ুর নেভেলি)।

৩. তৃতীয় পর্যায়: বিটুমিনাস বা কালো কয়লা (Bituminous)

  • কার্বনের পরিমাণ: ৭০% – ৮৫%
  • বৈশিষ্ট্য: শক্ত, ভঙ্গুর, পিচের মতো কুচকুচে কালো রঙের স্তরযুক্ত কয়লা। তাপনমূল্য অত্যন্ত বেশি ($৬,৫০০-৮,০০০\text{ kcal/kg}$); শিল্প ও তাপবিদ্যুতের মূল চালিকাশক্তি (যেমন রানীগঞ্জ ও ঝরিয়ার কয়লা)।

৪. চতুর্থ পর্যায়: অ্যানথ্রাসাইট কয়লা (Anthracite)

  • কার্বনের পরিমাণ: ৯০% – ৯৫%
  • বৈশিষ্ট্য: সর্বোচ্চ স্তরের রূপান্তরিত কয়লা। অত্যন্ত শক্ত, ধাতব দ্যুতিযুক্ত, হাতে কোনো কালি লাগে না। ধোঁয়াহীন নীল শিখায় সবচেয়ে তীব্র তাপ ($>৮,৫০০\text{ kcal/kg}$) উৎপন্ন করে।

৫. চূড়ান্ত রূপান্তর: গ্রাফাইট (Graphite)

  • অতিরিক্ত আঞ্চলিক রূপান্তরে সমস্ত উদ্বায়ী পদার্থ বেরিয়ে গিয়ে ১০০% খাঁটি কার্বনের নরম পিচ্ছিল গ্রাফাইট ($H=১$) স্ফটিকে পরিণত হয়।

উপসংহার: কয়লায়ন ক্রমে ধারাবাহিকভাবে কার্বনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায় এবং আর্দ্রতা ও উদ্বায়ী পদার্থ হ্রাস পেয়ে তাপনমূল্য বৃদ্ধি পায়।

উদাহরণ 6
উৎপত্তি, স্ফটিকের আকার, খনিজ গঠন এবং সৃষ্ট ভূমিরূপের নিরিখে গ্রানাইট এবং ব্যাসাল্ট শিলার মধ্যে একটি তুলনামূলক পার্থক্য ছক তৈরি করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ভূত্বকের দুই প্রধান প্রতিনিধি আগ্নেয় শিলার তুলনামূলক পার্থক্য:

১. উৎপত্তি ও শীতলীকরণের প্রকৃতি:

  • গ্রানাইট: উদ্ভেদী পাতালিক শিলা; ভূগর্ভের অতল গভীরে ম্যাগমা অত্যন্ত ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গঠিত।
  • ব্যাসাল্ট: নিঃসারী লাভা শিলা; ভূত্বকের বাইরে বাতাসে লাভা দ্রুত তাপ বিকিরণ করে ঠান্ডা হয়ে গঠিত।

২. দানার আকার ও বুনট:

  • গ্রানাইট: স্থূল দানাদার (Phaneritic); স্ফটিকগুলো বড় বড় এবং খালি চোখেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
  • ব্যাসাল্ট: সূক্ষ্ম দানাদার (Aphanitic) থেকে কাঁচের মতো; দ্রুত ঠান্ডার কারণে কেলাস তৈরি হতে পারে না।

৩. রাসায়নিক ও খনিজ সংযুক্তি:

  • গ্রানাইট: আম্লিক শিলা (সিলিকা $>৬৫-৭৫\%$); হালকা বর্ণের কোয়ার্টজ ও ফেল্ডস্পার দ্বারা গঠিত; ঘনত্ব কম ($২.৭\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$)।
  • ব্যাসাল্ট: ক্ষারকীয় শিলা (সিলিকা $৪৫-৫৫\%$); গাঢ় কালো পাইরক্সিন ও অলিভিন দ্বারা গঠিত; ভারী ও ঘন ($৩.০\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$)।

৪. ভূমিরূপ ও আবহবিকার:

  • গ্রানাইট: গোলাকার আবহবিকারে পেঁয়াজের মতো খোসা ছাড়িয়ে মাথায় গোল গোল বোল্ডার বা টর (Tor) গঠন করে (মহাদেশীয় সিয়াল ভূত্বক)।
  • ব্যাসাল্ট: উলম্ব স্তম্ভাকার জোড় এবং সিঁড়ির মতো ধাপযুক্ত মালভূমি ট্র্যাপ (Traps) সৃষ্টি করে এবং ক্ষয় হয়ে উর্বর কালো রেগুর মাটি তৈরি করে (মহাসাগরীয় সিমা ভূত্বক)।

উপসংহার: গ্রানাইট হলো ধীর-শীতল, স্থূলদানাদার, হালকা মহাদেশীয় শিলা; আর ব্যাসাল্ট হলো দ্রুত-শীতল, সূক্ষ্মদানাদার, ভারী লাভা শিলা।

উদাহরণ 7
একজন মৃত্তিকাবিদ মাঠে মাটি খনন করে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি কীভাবে বর্ণ, হিউমাসের পরিমাণ, মাটির প্রক্রিয়া ও শিকড়ের বিস্তারের ভিত্তিতে A স্তর (শীর্ষ মৃত্তিকা) এবং B স্তরকে (উপমৃত্তিকা) পৃথক করবেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

মাটির উলম্ব পরীলেখে A স্তর এবং B স্তরকে স্পষ্টভাবে চারটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে পৃথক করা যায়:

১. মাটির বর্ণ ও বাহ্যিক রূপ:

  • A স্তর: প্রচুর পরিমাণে জৈব হিউমাসের উপস্থিতির কারণে মাটির রং হয় কুচকুচে কালো বা কালচে গাঢ় বাদামি।
  • B স্তর: হিউমাসের অভাব এবং ওপর থেকে ধুয়ে নামা লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম জমার কারণে এর রং হয় হালকা লালচে, হলুদ বা মেটে রঙের।

২. জৈব হিউমাস ও জীবজগতের সক্রিয়তা:

  • A স্তর: হিউমাস, কেঁচো, ব্যাকটেরিয়ায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ; এটি এক জীবন্ত প্রাকৃতিক স্তর।
  • B স্তর: এতে জৈব হিউমাসের পরিমাণ নগণ্য এবং জীবাণুর উপস্থিতি অতি বিরল।

৩. প্রধান মৃত্তিকাতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া (ধৌতকরণ বনাম সঞ্চয়ন):

  • A স্তর (ধৌত স্তর / Eluviation): ওপর থেকে চুইয়ে নামা বৃষ্টির জল দ্রবণীয় খনিজ ও সূক্ষ্ম কাদা কণাকে ধুয়ে নিচের দিকে নামিয়ে দেয়।
  • B স্তর (সঞ্চয় স্তর / Illuviation): A স্তর থেকে নেমে আসা কাদা, লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম এখানে এসে জমা ও সঞ্চিত হয়, ফলে এটি এক শক্ত এঁটেল স্তরে রূপ নেয়।

৪. উদ্ভিদের মূলের বিস্তার ও কৃষিকাজ:

  • A স্তর: রন্ধ্রযুক্ত ও নরম ঝুরঝুরে বুনট হওয়ায় ঘাস, শস্য ও অধিকাংশ ফসলের মূল এই স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে। এটিই ফসলি শীর্ষ মাটি।
  • B স্তর: নিরেট ও ঘন মাটির স্তর হওয়ায় কেবল বড় বৃক্ষের গভীর প্রধান মূল (Taproot) একে ভেদ করে নিচে যেতে পারে।

উপসংহার: A স্তর হলো জৈবসমৃদ্ধ আলগা ধৌত শীর্ষ মাটি, অন্যদিকে B স্তর হলো খনিজসমৃদ্ধ নিরেট সঞ্চয় উপমৃত্তিকা।

উদাহরণ 8
দাক্ষিণাত্যের ব্যাসাল্ট শিলা থেকে সৃষ্ট কালো রেগুর মাটি দীর্ঘ গ্রীষ্মকালেও ভিজে থাকে ও আর্দ্রতা ধরে রাখে, অথচ বেলেমাটি দ্রুত শুকিয়ে যায় কেন? আদি শিলার খনিজ ও বুনটের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. আদি শিলার খনিজ গঠন:

  • কালো রেগুর মাটি: ক্ষারকীয় লাভা শিলা ব্যাসাল্ট চূর্ণ হয়ে তৈরি হয়। ব্যাসাল্টের খনিজ ক্ষয় হয়ে বিশেষ ধরণের কাদা খনিজ মন্টমোরিলোনাইট (Montmorillonite) সৃষ্টি করে।
  • বেলে মাটি: গ্রানাইট বা বেলেপাথরের যান্ত্রিক ক্ষয়ে তৈরি, যার মূল উপাদান নিষ্ক্রিয় কোয়ার্টজ ($\text{SiO}_2$) বালি।

২. দানার আকার ও পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল:

  • রেগুর মাটির কাদা কণা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ($<০.০০২\text{ মিমি}$)। এক গ্রাম মন্টমোরিলোনাইট কাদার অভ্যন্তরীণ পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল প্রায় ৮০০ বর্গমিটার পর্যন্ত হতে পারে!
  • কিন্তু বালুকণা বেশ মোটা ($০.০৬-২\text{ মিমি}$), ফলে এর পৃষ্ঠতলের ক্ষেত্রফল নগণ্য।

৩. কৈশিক আকর্ষণ ও জলধারণ ক্ষমতা:

  • মন্টমোরিলোনাইট কাদার আণবিক স্তরের ফাঁকে বিপুল পরিমাণ জল শোষিত হয়ে স্থায়ীভাবে আটকে থাকে।
  • সূক্ষ্ম রন্ধ্রের কৈশিক টানে জল চুইয়ে নিচে বা বাষ্প হয়ে ওপরে সহজে যেতে পারে না।
  • কিন্তু বেলে মাটিতে বড় বড় ফাঁক থাকায় ঢালা জল মহাকর্ষ টানে তৎক্ষণাৎ নিচে নেমে যায় (প্রবেশ্যতা বেশি, জলধারণ ক্ষমতা নেই)।

৪. কৃষিক্ষেত্রে তাৎপর্য:

  • গ্রীষ্মের দাবদাহে রেগুর মাটির উপরিভাগ সংকুচিত হয়ে গভীর ফাটল দেখা দেয়, কিন্তু নিচের স্তর ভিজে নরম থাকে। ফলে শুষ্ক ঋতুতেও সেচ ছাড়াই তুলোর গাছ পর্যাপ্ত জল পায়।

উপসংহার: ব্যাসাল্টজাত মন্টমোরিলোনাইট কাদার বিপুল পৃষ্ঠতল ও ক্ষুদ্র রন্ধ্রই রেগুর মাটির দীর্ঘস্থায়ী জলধারণ ক্ষমতার মূল বৈজ্ঞানিক কারণ।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

সব কঠিন পাথরই আগ্নেয় শিলা—এমন ভুল ধারণা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

কোয়ার্টজাইট হলো একটি রূপান্তরিত শিলা (বেলেপাথরের রূপান্তর) এবং চার্ট হলো পাললিক শিলা। এদের কাঠিন্য মূলত কোয়ার্টজ খনিজের ($H=৭$) কারণে, উৎপত্তির জন্য নয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

সব শিলাতেই জীবাশ্ম পাওয়া যায় বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

জীবাশ্ম একমাত্র এবং কেবলমাত্র পাললিক শিলাতেই (যেমন চুনাপাথর, শেল, কয়লা) পাওয়া যায়। আগ্নেয় শিলার উত্তাপে জীব পুড়ে ছাই হয়ে যায় এবং রূপান্তরের চাপে জীবাশ্ম চূর্ণ হয়ে নষ্ট হয়ে যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

রূপান্তরিত শিলা গলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

রূপান্তর প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ কঠিন অবস্থাতেই ঘটে (Solid-state)। শিলা যদি পুরোপুরি গলে তরল হয়ে যায়, তবে তা ম্যাগমা হয়ে যাবে এবং জমে আগ্নেয় শিলা তৈরি হবে!

সাধারণ ভুল ধারণা

মার্বেল ও কোয়ার্টজাইটের আদি শিলা উল্টে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

চুনাপাথর রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয় মার্বেল ($ ext{CaCO}_3$); বেলেপাথর রূপান্তরিত হয়ে তৈরি হয় কোয়ার্টজাইট ($ ext{SiO}_2$)।

সাধারণ ভুল ধারণা

আবহবিকার এবং ক্ষয়ীভবনকে এক জিনিস মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

আবহবিকার হলো স্বস্থানে শিলা চূর্ণ হওয়ার একটি অনড় (স্থৈতিক) প্রক্রিয়া। আর ক্ষয়ীভবন হলো নদী, বাতাস বা হিমবাহের দ্বারা সেই চূর্ণ অপসারিত ও পরিবাহিত হওয়ার গতিশীল প্রক্রিয়া।

সাধারণ ভুল ধারণা

মাটির A স্তর ও B স্তরকে গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

A স্তর হলো শীর্ষ মৃত্তিকা (ধৌত স্তর), যা হিউমাসসমৃদ্ধ এবং যেখানে উদ্ভিদের মূল থাকে। B স্তর হলো উপমৃত্তিকা (সঞ্চয় স্তর), যা নিরেট ও খনিজসমৃদ্ধ।

সাধারণ ভুল ধারণা

ব্যাসাল্টকে পাতালিক শিলা বলে দাগানো।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ব্যাসাল্ট হলো নিঃসারী আগ্নেয় শিলা, যা লাভা রূপে ভূপৃষ্ঠে বেরিয়ে দ্রুত ঠান্ডা হয়। গ্রানাইট হলো ভূগর্ভে ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়া পাতালিক শিলা।

ভূ-তাত্ত্বিক শিলাচক্র, প্রধান তিন শিলাশ্রেণি ও মাটির পরীলেখ

ভূ-তাত্ত্বিক শিলাচক্র, প্রধান তিন শিলাশ্রেণি ও মাটির পরীলেখ (WBBSE অষ্টম শ্রেণি) প্রাকৃতিক শিলা রূপান্তর চক্র (ROCK CYCLE) ভূ-অভ্যন্তরীণ তাপ ও সৌর আবহবিকার দ্বারা চালিত অবিরাম রূপান্তর ব্যবস্থা গলিত ভূগর্ভস্থ ম্যাগমা উত্তপ্ত সান্দ্র তরল শিলা উষ্ণতা: ৭০০°C – ১৩০০°C আগ্নেয় শিলা প্রাথমিক বা জনক শিলা • পাতালিক: গ্রানাইট, গ্যাব্রো • নিঃসারী: ব্যাসাল্ট, অবসিডিয়ান পাললিক শিলা গৌণ বা স্তরীভূত শিলা • বেলেপাথর, কাদাপাথর, শেল • চুনাপাথর, কয়লা (জীবাশ্মযুক্ত) রূপান্তরিত শিলা তাপ ও চাপে রূপান্তরিত • নিশ, সিস্ট, স্লেট • মার্বেল, কোয়ার্টজাইট শীতলীকরণ ও স্ফটিকায়ন আবহবিকার ও পলি সঞ্চয় (শিলায়ন) উত্তাপ ও চাপ (রূপান্তর প্রক্রিয়া) গলন ও অধোগমন তিন প্রধান শিলা পরিবারের মূল বৈশিষ্ট্য আগ্নে আগ্নেয় শিলা (IGNEOUS) কঠিন, স্ফটিকাকার, ছিদ্রহীন, স্তরায়ণহীন, কোনো জীবাশ্ম নেই। উদা: গ্রানাইট (পাতালিক), ব্যাসাল্ট (নিঃসারী লাভা শিলা)। পাল পাললিক শিলা (SEDIMENTARY) স্পষ্ট স্তরযুক্ত, ছিদ্রময়, নরম, এতে একমাত্র জীবাশ্ম মেলে। উদা: বেলেপাথর, শেল, চুনাপাথর, কয়লা (জৈব সঞ্চয়)। রূপা রূপান্তরিত শিলা (METAMORPHIC) তাপ ও চাপে পুনর্বিন্যস্ত, অধিক ঘন ও দৃঢ়, পত্রায়নযুক্ত। রূপান্তর: গ্রানাইট→নিশ | চুনাপাথর→মার্বেল বেলেপাথর→কোয়ার্টজাইট | কাদাপাথর→স্লেট | কয়লা→গ্রাফাইট মাটির পরীলেখ ও স্তরবিন্যাস (SOIL PROFILE) আবহবিকারপ্রাপ্ত রেগোলিথ থেকে হাজার বছরে সৃষ্টি: S = f(cl, o, r, p, t) O স্তর (জৈব আবর্জনা ও হিউমাস স্তর) ঝরা পাতা ও পচা জৈব পদার্থ A স্তর (শীর্ষ মৃত্তিকা / Topsoil) ধৌত স্তর (Eluviation) | পুষ্টি ও খনিজ সমৃদ্ধ, উদ্ভিদের মূল বিস্তার B স্তর (উপমৃত্তিকা / Subsoil) সঞ্চয় স্তর (Illuviation) | ওপর থেকে নেমে আসা সূক্ষ্ম কাদা ও লৌহ-অ্যালুমিনিয়াম C স্তর (রেগোলিথ / Regolith) আংশিক চূর্ণ-বিচূর্ণ আদি শিলার টুকরো, শিলা থেকে মাটির রূপান্তর R / D স্তর (কঠিন আদি শিলা / Bedrock) অক্ষত কঠিন আদি ভূ-গর্ভ ভিত্তি

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
অশ্মমণ্ডল (Lithosphere) মহাদেশীয় গ্রানাইটিক সিয়াল (SIAL) এবং মহাসাগরীয় ব্যাসাল্টিক সিমা (SIMA) ভূত্বক নিয়ে গঠিত।
মূল বিষয় 2
এক বা একাধিক খনিজের সমাহারে শিলা গঠিত হয়; এটি এক-খনিজ (চুনাপাথর, মার্বেল) বা বহু-খনিজ (গ্রানাইট, ব্যাসাল্ট) হতে পারে।
মূল বিষয় 3
মোজের কাঠিন্য মানকে ১ ট্যাল্ক থেকে ১০ হীরা পর্যন্ত খনিজের আপেক্ষিক আঁচড় কাটার শক্তি নির্দেশ করা হয়; কোয়ার্টজের মান ৭।
মূল বিষয় 4
আগ্নেয় শিলা হলো পৃথিবীর আদি প্রাথমিক শিলা, যা স্ফটিকাকার, শক্ত, নিরেট ও জীবাশ্মহীন; এটি পাতালিক (গ্রানাইট) ও নিঃসারী (ব্যাসাল্ট) ভাগে বিভক্ত।
মূল বিষয় 5
পাললিক শিলা পলি সঞ্চয় ও শিলায়নের মাধ্যমে স্তরযুক্ত হয়ে গঠিত হয়; এতে স্তরায়ন তল, সচ্ছিদ্রতা এবং একমাত্র জীবাশ্মের সন্ধান মেলে।
মূল বিষয় 6
রূপান্তরিত শিলা না গলে কঠিন অবস্থাতেই প্রচণ্ড তাপ ও চাপে আণবিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে পত্রায়ন ও ব্যান্ডিংযুক্ত শিলায় পরিণত হয়।
মূল বিষয় 7
শিলাচক্রের মাধ্যমে ম্যাগমা → আগ্নেয় → পলি → পাললিক → রূপান্তরিত → ম্যাগমা—এই অবিরাম রূপান্তর ব্যবস্থা কোটি কোটি বছর ধরে চলমান।
মূল বিষয় 8
আবহবিকারে সৃষ্ট রেগোলিথ থেকে ডকুচায়েভের ৫টি নিয়ন্ত্রকে (জলবায়ু, জীবজগৎ, ভূপ্রকৃতি, আদি শিলা ও সময়: S=f(cl,o,r,p,t)) ৫টি স্তরযুক্ত মাটির পরীলেখ (O, A, B, C, R) গঠিত হয়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

শিলা অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।