১.১ অশ্মমণ্ডল ও ভূতাত্ত্বিক ভূত্বক (SIAL বনাম SIMA)
পৃথিবীর সবচেয়ে বাইরের কঠিন পাথুরে শক্ত খোলককে বলা হয় অশ্মমণ্ডল (Lithosphere), যা এসেছে গ্রিক শব্দ Lithos (শিলা বা পাথর) থেকে। এটি ভূত্বক এবং গুরুমণ্ডলের একেবারে ওপরের কঠিন অংশ নিয়ে গঠিত, যা সমুদ্রে প্রায় $৭০-১০০\text{ কিমি}$ এবং মহাদেশের নিচে প্রায় $১৫০-২০০\text{ কিমি}$ গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভূত্বক প্রধান দুটি অংশে বিভক্ত:
- মহাদেশীয় ভূত্বক (সিয়াল / SIAL): সিলিকা ($\text{SiO}_2$) এবং অ্যালুমিনিয়াম ($\text{Al}_2\text{O}_3$) দ্বারা সমৃদ্ধ। এর গড় ঘনত্ব প্রায় $২.৭\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$ এবং প্রধান উপাদান হালকা রঙের গ্রানাইট শিলা।
- মহাসাগরীয় ভূত্বক (সিমা / SIMA): সিলিকা ($\text{SiO}_2$) এবং ম্যাগনেসিয়াম ($\text{MgO}$) সমৃদ্ধ। এর ঘনত্ব বেশি, প্রায় $৩.০\text{ গ্রাম/ঘনসেমি}$ এবং প্রধান উপাদান ভারী কৃষ্ণবর্ণের ব্যাসাল্ট শিলা।
- কনরাড বিযুক্তি (Conrad Discontinuity): মহাদেশীয় হালকা সিয়াল স্তর এবং নিচের ভারী সিমা স্তরের মধ্যকার বিভাজন তল।
১.২ শিলার বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা: এক-খনিজ ও বহু-খনিজ শিলা
ভূ-বিজ্ঞানের সংজ্ঞানুযায়ী, এক বা একাধিক খনিজ বা খনিজজাত পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত ভূত্বকের যে কোনো প্রাকৃতিক কঠিন উপাদানকে শিলা (Rock) বলে। শিলা কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ নয়; এতে বিভিন্ন খনিজ কণার মিশ্রণ থাকে। খনিজের সংখ্যা অনুসারে শিলা দুই প্রকার:
| শ্রেণি | সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য | প্রধান উদাহরণ ও উপাদান খনিজ |
|---|---|---|
| এক-খনিজ শিলা (Monomineralic Rock) | যে শিলা মূলত একটিমাত্র খনিজ দ্বারা গঠিত (প্রায় $>৯৫\%$ অংশ একটি খনিজ)। | চুনাপাথর (একমাত্র ক্যালসাইট খনিজ, $\text{CaCO}_3$ দ্বারা গঠিত); মার্বেল (বিশুদ্ধ ক্যালসাইটের রূপান্তর); কোয়ার্টজাইট বা বিশুদ্ধ বেলেপাথর (কেবলমাত্র কোয়ার্টজ খনিজ দ্বারা গঠিত); রক সল্ট (হ্যালাইট খনিজ, $\text{NaCl}$)। |
| বহু-খনিজ শিলা (Polymineralic Rock) | যে শিলা দুই বা ততোধিক ভিন্ন খনিজের মিশ্রণে গঠিত। | গ্রানাইট (কোয়ার্টজ, পটাশ ফেল্ডস্পার ও বায়োটাইট মাইকার সমাহার); ব্যাসাল্ট (প্লাজিওক্লেজ ফেল্ডস্পার, অগাইট ও অলিভিনের মিশ্রণ); গ্যাব্রো। |
১.৩ প্রধান শিলাগঠনকারী খনিজ ও আকরিকের ধারণা
পৃথিবীতে ৪,০০০-এর বেশি খনিজ পাওয়া গেলেও ভূত্বকের প্রায় ৯০% অংশ গঠিত হয়েছে কয়েকটি মাত্র সিলিকেট খনিজ দ্বারা, যাদের শিলাগঠনকারী খনিজ বলে:
- কোয়ার্টজ (Quartz / কোয়ার্টজাইট): সিলিকন ডাই-অক্সাইড ($\text{SiO}_2$)। অত্যন্ত কঠিন ($H=৭$), কাঁচের মতো চকচকে, রাসায়নিক আবহবিকারে ক্ষয়হীন। গ্রানাইট ও বেলেপাথরের মূল উপাদান।
- ফেল্ডস্পার (Feldspar): অ্যালুমিনোসিলিকেট খনিজ। ভূত্বকের অর্ধেকেরও বেশি (৫০%+) অংশ ফেল্ডস্পার দিয়ে তৈরি। আবহবিকারে এটি সহজে কেওলিন বা চীনামাটিতে পরিণত হয়।
- মাইকা বা অভ্র (Mica): পাতের মতো স্তরে স্তরে সহজে ভেঙে যাওয়া নমনীয় খনিজ। সাদা অভ্র (মাস্কোভাইট) ও কালো অভ্র (বায়োটাইট)। এটি বিদ্যুৎ ও তাপের উত্তম কুপরিবাহী।
- ক্যালসাইট (Calcite): ক্যালসিয়াম কার্বনেট ($\text{CaCO}_3$)। চুনাপাথর ও মার্বেলের প্রধান উপাদান; অ্যাসিডে দ্রুত দ্রবীভূত হয়।
- খনিজ বনাম আকরিক: প্রকৃতিতে প্রাপ্ত নির্দিষ্ট রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মযুক্ত অজৈব উপাদান হলো খনিজ। আর যে খনিজ থেকে সহজে ও কম খরচে বাণিজ্যিকভাবে ধাতু নিষ্কাশন করা যায়, তাকে আকরিক (Ore) বলে। যেমন—বক্সাইট হলো অ্যালুমিনিয়ামের আকরিক, হেমাটাইট লোহার আকরিক। তাই: "সকল আকরিকই খনিজ, কিন্তু সকল খনিজ আকরিক নয়।"
১.৪ মোজের কাঠিন্য মানক (Mohs Hardness Scale)
১৮১২ সালে জার্মান খনিজবিদ ফ্রেডরিখ মোজ (Friedrich Mohs) খনিজের আপেক্ষিক আঁচড় কাটার ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত একটি কাঠিন্য মানক প্রবর্তন করেন:
| মানকের ক্রম | প্রামাণ্য খনিজ | রাসায়নিক সংকেত | ব্যবহারিক পরীক্ষা করার সাধারণ মাধ্যম |
|---|---|---|---|
| ১ | ট্যাল্ক (Talc) | $\text{Mg}_3\text{Si}_4\text{O}_{10}(\text{OH})_2$ | সবচেয়ে নরম খনিজ; নখ দিয়ে সহজে গুঁড়ো করা যায় (ট্যালকম পাউডার) |
| ২ | জিপসাম (Gypsum) | $\text{CaSO}_4 \cdot 2\text{H}_2\text{O}$ | মানুষের নখের আঁচড়ে দাগ কাটে (নখের কাঠিন্য প্রায় ২.৫) |
| ৩ | ক্যালসাইট (Calcite) | $\text{CaCO}_3$ | তামার পয়সার আঁচড়ে দাগ পড়ে (তামার কাঠিন্য প্রায় ৩.৫) |
| ৪ | ফ্লুরাইট (Fluorite) | $\text{CaF}_2$ | লোহার পেরেক বা পকেট ছুরির ডগায় দাগ কাটে |
| ৫ | অ্যাপাটাইট (Apatite) | $\text{Ca}_5(\text{PO}_4)_3(\text{F,Cl,OH})$ | জানালা কাঁচ বা সাধারণ ইস্পাত দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে আঁচড় কাটে ($৫.৫$) |
| ৬ | অর্থোক্লেজ ফেল্ডস্পার | $\text{KAlSi}_3\text{O}_8$ | কাঁচের ওপর দাগ কাটে; ইস্পাতের ফাইলের আঁচড়ে দাগ পড়ে ($৬.৫$) |
| ৭ | কোয়ার্টজ (Quartz) | $\text{SiO}_2$ | কাঁচ ও ইস্পাত উভয়কেই সহজে কেটে দাগ ফেলতে পারে |
| ৮ | টোপাজ (Topaz / পীতমণি) | $\text{Al}_2\text{SiO}_4(\text{F,OH})_2$ | মূল্যবান রত্নপাথর; কোয়ার্টজকে সহজে আঁচড় কাটে |
| ৯ | কোরান্ডাম (Corundum) | $\text{Al}_2\text{O}_3$ | অত্যন্ত কঠিন রত্ন (চুনি, নীলকান্তমণি); শিল্পে ঘষামাজার কাজে ব্যবহৃত |
| ১০ | হীরা (Diamond) | বিশুদ্ধ কার্বন ($\text{C}$) | প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন পদার্থ; অন্য সব পদার্থকে আঁচড় কাটতে পারে |
১.৫ শিলা শনাক্তকরণ ও লঘু অ্যাসিড পরীক্ষা
মাঠে শিলা চেনার জন্য প্রধান ৫টি শারীরিক ধর্ম পরীক্ষা করা হয়:
- রং ও দ্যুতি: হালকা রঙের শিলায় সিলিকা বেশি (যেমন গ্রানাইট), অন্ধকার কালো শিলায় লোহা ও ম্যাগনেসিয়াম বেশি (যেমন ব্যাসাল্ট)।
- রেখা পরীক্ষা (Streak Test): অমসৃণ চীনামাটির প্লেটে খনিজ ঘষলে যে গুঁড়োর রং পাওয়া যায়। যেমন হেমাটাইটের রং যাই হোক, এর গুঁড়োর রেখা সর্বদা চেরি-লাল রঙের হয়।
- লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড পরীক্ষা: চুনাপাথর বা মার্বেল পাথরে এক ফোঁটা লঘু হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($\text{HCl}$) ফেললে সঙ্গে সঙ্গে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বুদবুদসহ তীব্র ফেনা সৃষ্টি হয়: $$\text{CaCO}_3 + 2\text{HCl} \to \text{CaCl}_2 + \text{H}_2\text{O} + \text{CO}_2 \uparrow$$ কিন্তু গ্রানাইট, ব্যাসাল্ট বা বেলেপাথরে অ্যাসিড ফেললে কোনো বিক্রিয়া বা বুদবুদ হয় না।