১.১ আলফ্রেড ওয়েগনারের মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব (Continental Drift Hypothesis, 1912)
১৯১২ খ্রিস্টাব্দে জার্মান আবহবিদ ও ভূতত্ত্ববিদ আলফ্রেড ওয়েগনার (Alfred Wegener) তাঁর আলোড়ন সৃষ্টিকারী মহীসঞ্চরণ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। ওয়েগনারের মতে, প্রায় ২৫-৩০ কোটি বছর আগে (কার্বনিফেরাস যুগে) পৃথিবীর সমস্ত মহাদেশ পরস্পর সংযুক্ত হয়ে একটিমাত্র অবিভাজ্য অতিকায় আদি মহাদেশ গঠন করেছিল, যার নাম প্যানজিয়া (Pangaea) (গ্রিক শব্দ, যার অর্থ 'সমগ্র পৃথিবী')। এই প্যানজিয়ার চারপাশ ঘিরে অবস্থিত সর্বব্যাপী সুবিশাল আদি মহাসাগরটির নাম ছিল প্যানথালাসা (Panthalassa) ('সমগ্র জলভাগ')।
পরবর্তী মেসোজোয়িক যুগে অভ্যন্তরীণ টানের প্রভাবে প্যানজিয়া ভেঙে দুটি মূল ভূখণ্ডে বিভক্ত হয়:
- লরেশিয়া বা অঙ্গারাল্যান্ড (Laurasia / Angaraland): উত্তর গোলার্ধের ভূভাগ, যা বর্তমান উত্তর আমেরিকা, গ্রিনল্যান্ড, ইউরোপ এবং এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল নিয়ে গঠিত (ভারতীয় উপমহাদেশ ব্যতীত)।
- গন্ডোয়ানাল্যান্ড (Gondwanaland): দক্ষিণ গোলার্ধের ভূভাগ, যা বর্তমান দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা, মাদাগাস্কার, ভারতীয় উপমহাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা নিয়ে গঠিত।
- টেথিস সাগর (Tethys Sea): লরেশিয়া ও গন্ডোয়ানাল্যান্ডের মধ্যবর্তী অংশে সৃষ্ট পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত একটি অগভীর সংকীর্ণ মহীখাত বা সমুদ্র।
১.২ মহীসঞ্চরণের সপক্ষে প্রত্যক্ষ ভূতাত্ত্বিক প্রমাণাবলী
| প্রমাণের বিষয়শ্রেণী | সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও ক্ষেত্রভিত্তিক প্রমাণ | ভূতাত্ত্বিক তাৎপর্য |
|---|---|---|
| উপকূলীয় সাযুজ্য (Jigsaw Fit) | দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব আটলান্টিক উপকূলের স্ফীত অংশটি (ব্রাজিল) আফ্রিকার পশ্চিম গিনি উপকূলের অবতল খাঁজে প্রায় হুবহু খাপ খেয়ে যায়। | প্রমাণ করে যে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা অতীতে একটি অখণ্ড ভূখণ্ড ছিল এবং পরবর্তীতে ছিঁড়ে আলাদা হয়ে গেছে। |
| জীবাশ্মের নিখুঁত সাদৃশ্য | মিঠাজলের ক্ষুদ্র সরীসৃপ মেসোরাস (Mesosaurus)-এর জীবাশ্ম কেবল দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে পাওয়া যায়। এছাড়া গ্লসপটেরিস (Glossopteris) নামক ফার্নজাতীয় উদ্ভিদের জীবাশ্ম ভারত, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও অ্যান্টার্কটিকায় প্রাপ্ত হয়েছে। | এইসব জীব লবণাক্ত মহাসাগর সাঁতরে পাড়ি দিতে অক্ষম; সুতরাং মহাদেশগুলি যখন যুক্ত ছিল তখনই এরা বসবাস করত। |
| হিমবাহের অবক্ষেপ ও টিলাইট (Tillite) | প্রায় ৩০ কোটি বছর আগের প্রাচীন হিমবাহের ঘর্ষণ দাগ ও হিমজাত অবক্ষেপ ভারতের ছোটনাগপুরের তালচের, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় সমবয়সী শিলাস্তরে বিদ্যমান। | এই গ্রীষ্মপ্রধান ভূখণ্ডগুলি একসময় দক্ষিণ মেরুর নিকটে বরফে ঢাকা অবস্থায় একত্রে অবস্থান করছিল। |
| ভূতাত্ত্বিক শিলাকাঠামোর ধারাবাহিকতা | উত্তর আমেরিকার প্রাচীন অ্যাপালেশিয়ান পর্বতমালা আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে গ্রেট ব্রিটেনের ক্যালেডোনিয়ান এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ার পর্বতমালার সঙ্গে শিলার বয়স, প্রকৃতি ও স্তরায়ণে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। | আটলান্টিক মহাসাগর সৃষ্টির পূর্বে এই পর্বতমালা একটি অবিচ্ছিন্ন বলয় ছিল। |
১.৩ আর্থার হোমসের পরিচলন স্রোত তত্ত্ব ও নমনীয় অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার
ওয়েগনারের তত্ত্বের প্রধান দুর্বলতা ছিল মহাদেশের স্থানান্তরের সন্তোষজনক চালিকাশক্তি ব্যাখ্যা করতে না পারা। ১৯২৮-১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ আর্থার হোমস (Arthur Holmes) ভূগর্ভের পরিচলন স্রোত তত্ত্ব (Thermal Convection Currents) উদ্ভাবন করে এই সমস্যার সমাধান করেন।
- অ্যাস্থেনোস্ফিয়ার (Asthenosphere): ভূত্বকের নিচে এবং বহিঃগুরুমণ্ডলের ওপর ১০০ থেকে ২৫০ কিমি গভীরতায় অবস্থিত একটি বিশেষ স্তর। গ্রিক শব্দ 'Asthenes' কথার অর্থ দুর্বল বা নমনীয়। প্রচণ্ড ভূগর্ভস্থ তাপ ও চাপে এখানকার শিলা গলনাঙ্কের কাছাকাছি অবস্থায় পৌঁছে আংশিক সান্দ্র, থকথকে ও পিচ্ছিল প্লাস্টিকের মতো আচরণ করে।
- পরিচলন স্রোতের ক্রিয়া: গুরুমণ্ডলে অবস্থিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ (ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, পটাশিয়াম)-এর ক্রমাগত ভাঙন থেকে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপে উত্তপ্ত হালকা ম্যাগমা ওপরের দিকে ওঠে এবং শীতল অপেক্ষাকৃত ভারী পদার্থ নিচে নেমে যায়। ফলে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে বৃত্তাকার পরিচলন কোষের সৃষ্টি হয়।
- পাতের সঞ্চরণ: এই পরিচলন স্রোতের অনুভূমিক প্রবাহের ওপর ভর করে কঠিন লিথোস্ফিয়ারের পাতগুলি কনভেয়ার বেল্টের মতো ধীরে ধীরে স্থান পরিবর্তন করে।
১.৪ আধুনিক পাত সংস্থান তত্ত্ব (Plate Tectonics Theory)
১৯৬০-এর দশকে ড্যান ম্যাকেঞ্জি, রবার্ট পার্কার, ডব্লিউ. জেসন মরগান এবং জেভিয়ার লে পিচোঁ (Le Pichon)-এর সম্মিলিত গবেষণায় আধুনিক পাত সংস্থান তত্ত্ব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। এই তত্ত্বানুসারে সমগ্র ভূতত্ত্ব কতগুলি পৃথক ও সুদৃঢ় খণ্ডে বা পাতে (Plates) বিভক্ত।
পৃথিবীর ভূতত্ত্ব ৭টি প্রধান পাত এবং বেশ কয়েকটি অপ্রধান পাত দ্বারা গঠিত:
- প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত (Pacific Plate): পৃথিবীর বৃহত্তম পাত, সম্পূর্ণ সামুদ্রিক ভূত্বক দ্বারা গঠিত।
- উত্তর আমেরিকা পাত (North American Plate): উত্তর আমেরিকা ও পশ্চিম উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরীয় তলদেশ।
- দক্ষিণ আমেরিকা পাত (South American Plate): দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ আটলান্টিকের পশ্চিমাংশ।
- ইউরেশীয় পাত (Eurasian Plate): সমগ্র ইউরোপ ও এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল (ভারত ব্যতীত)।
- আফ্রিকা পাত (African Plate): আফ্রিকা মহাদেশ ও পার্শ্ববর্তী আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগরের তলদেশ।
- ইন্দো-অস্ট্রেলীয় পাত (Indo-Australian Plate): ভারতীয় উপমহাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় অববাহিকা।
- অ্যান্টার্কটিকা পাত (Antarctic Plate): অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ও একে বেষ্টনকারী দক্ষিণ মহাসাগরীয় তলদেশ।
উল্লেখযোগ্য অপ্রধান পাতসমূহ: নাজকা পাত (Nazca), কোকোস পাত (Cocos), আরবীয় পাত (Arabian), ফিলিপাইন পাত, ক্যারিবিয়ান পাত, হুয়ান দে ফুকা পাত ও স্কোশিয়া পাত।
১.৫ তিন প্রকার পাত সীমানা ও বেনিয়ফ মণ্ডলের বৈশিষ্ট্য
| পাত সীমানার ধরন | সঞ্চরণের অভিমুখ ও বৈশিষ্ট্য | প্রধান ভূতাত্ত্বিক ফলাফল ও ভূমিরূপ | বিশ্বখ্যাত বাস্তব উদাহরণ |
|---|---|---|---|
| অভিসারী পাত সীমানা (Convergent / Destructive Boundary) | দুটি পাত পরস্পরের মুখোমুখি অগ্রসর হয় (সংনমন বল)। অপেক্ষাকৃত ভারী পাতটি হালকা পাতের নিচে অ্যাস্থেনোস্ফিয়ারে নিমজ্জিত হয়। | ধ্বংসাত্মক সীমানা: নিমজ্জিত পাতের ক্ষয় ও গলন ঘটে। তৈরি হয় গভীর সমুদ্র খাত (Trench), আগ্নেয় দ্বীপমালা এবং বিশাল ভঙ্গিল পর্বতমালা। এখানে প্রায় ৪৫° কোণে হেলে থাকা ভূকম্পন প্রবণ বলয়কে বেনিয়ফ মণ্ডল (Benioff Zone) বলে। | • নাজকা ও দক্ষিণ আমেরিকান পাত $\to$ আন্দিজ পর্বতমালা ও পেরু-চিলি খাত। • ভারতীয় ও ইউরেশীয় পাত $\to$ হিমালয় পর্বতমালা। • প্রশান্ত ও মারিয়ানা পাত $\to$ মারিয়ানা খাত (১১,০৩৪ মি)। |
| প্রতিসারী পাত সীমানা (Divergent / Constructive Boundary) | দুটি পাত পরস্পরের বিপরীত দিকে সরে যায় (টান বল)। মাঝখানের ফাটল দিয়ে ভূগর্ভের ম্যাগমা উপরে উঠে আসে। | গঠনমূলক সীমানা: তরল ব্যাসাল্ট লাভা জমে নতুন মহাসাগরীয় ভূত্বক ও সামুদ্রিক শৈলশিরা সৃষ্টি হয় (সমুদ্রবক্ষের বিস্তার)। তৈরি হয় ফাটল ও গ্রস্ত উপত্যকা। | • মধ্য-আটলান্টিক শৈলশিরা (Mid-Atlantic Ridge) (আমেরিকান ও ইউরেশীয়-আফ্রিকান পাতের বিচ্ছেদ)। • পূর্ব আফ্রিকার বিখ্যাত গ্রস্ত উপত্যকা। |
| নিরপেক্ষ পাত সীমানা (Transform / Conservative Boundary) | দুটি পাত পরস্পরের পাশ কাটিয়ে অনুভূমিকভাবে পিছলে এগিয়ে যায়। উল্লম্ব উত্থান বা নিমজ্জন ঘটে না। | রক্ষণশীল সীমানা: নতুন ভূত্বক গঠিতও হয় না, বা ধ্বংসও হয় না। তবে প্রচণ্ড পার্শ্বীয় ঘর্ষণে ভয়াবহ অগভীর ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। | • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত সান আন্দ্রেয়াস চ্যুতি (San Andreas Fault)। |