Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 6
আনুমানিক সময়: ৬৫ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস (অতীত ও ঐতিহ্য) পাঠ্যক্রমের অধ্যায় ৬: 'জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ'-এর সম্পূর্ণ ধারণাগত নির্দেশিকায় স্বাগত। এই অধ্যায়ে প্রাক্-কংগ্রেস পর্বের সভা-সমিতি (বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, জমিদারী সভা, হিন্দু মেলা, ভারত সভা) থেকে শুরু করে লর্ড লিটনের দমনমূলক নীতি, ১৮৮৩ সালের ইলবার্ট বিল বিতর্ক, ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, নরমপন্থীদের আবেদন-নিবেদন ও সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব এবং ১৯০৫ সালের ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

কখনও কি ভেবে দেখেছেন?

কীভাবে আঞ্চলিক জমিদারদের আবেদন-নিবেদন ও সভা-সমিতির রাজনীতি রূপান্তরিত হলো এক সর্বভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং সূচনা হলো ঐতিহাসিক বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন?

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পাঠ্যক্রমে 'জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ' অধ্যায়টি অধ্যয়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়টি স্পষ্ট করে কীভাবে বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক সভা-সমিতি, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব এবং বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী গণআন্দোলন ভারতের অখণ্ড স্বাধীনতা সংগ্রামের মজবুত ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পলাশী (১৭৫৭) ও বক্সারের (১৭৬৪) যুদ্ধের পর বাংলায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
  • ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ও পরবর্তী মহারানীর ঘোষণাপত্র (১৮৫৮) অনুযায়ী কোম্পানির শাসনের অবসান এবং ব্রিটিশ রাজের প্রত্যক্ষ শাসন প্রতিষ্ঠা
  • ঊনবিংশ শতকে পাশ্চাত্য ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও 'ভদ্রলোক' শ্রেণির আত্মপ্রকাশ

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • কংগ্রেস-পূর্ব যুগের বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতির (১৮৩৬–১৮৮৪) উৎপত্তি, চরিত্র ও সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করতে পারা।
  • লর্ড লিটনের প্রতিক্রিয়াশীল দমনমূলক নীতি এবং ইলবার্ট বিল বিতর্কের (১৮৮৩) ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও সর্বভারতীয় রাজনৈতিক ঐক্যের ক্ষেত্র প্রস্তুতের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, এর প্রথম অধিবেশন এবং 'সুরক্ষা কপাট' (সেফটি ভালভ) বনাম 'বিদ্যুৎ পরিবাহী' (লাইটনিং কন্ডাক্টর) তত্ত্বের তুলনামূলক মূল্যায়ন করতে পারা।
  • নরমপন্থীদের '৩-পি' নীতি (আবেদন, নিবেদন ও প্রতিবাদ) এবং দাদাভাই নাওরোজী ও রমেশচন্দ্র দত্তের 'সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব' (Drain of Wealth) ব্যাখ্যা করতে পারা।
  • চরমপন্থী ধারার উত্থান (লাল-বাল-পাল), লর্ড কার্জনের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য, স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন, রাখীবন্ধন উৎসব এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করতে পারা।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 মডিউল ১: প্রাক্-কংগ্রেস পর্বের সভা-...
2 মডিউল ২: লর্ড লিটনের দমনমূলক নীতি,...
3 মডিউল ৩: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প...
4 মডিউল ৪: নরমপন্থী পর্ব ও অর্থনৈতিক...
5 মডিউল ৫: চরমপন্থার উত্থান ও বঙ্গভঙ্...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

মডিউল ১: প্রাক্-কংগ্রেস পর্বের সভা-সমিতি ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ (১৮৩৬–১৮৮৪)

১.১ প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সূচনা ও বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬)

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিরোধ ছিল মূলত আঞ্চলিক, উপজাতীয় বা কৃষক বিদ্রোহের রূপ ধারণ করত। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভবের ফলে উনিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে সাংবিধানিক পথে আন্দোলন ও সভা-সমিতির রাজনীতির সূচনা ঘটে। ঐতিহাসিক অনিল শীল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে 'সভা-সমিতির যুগ' বলে অভিহিত করেছেন।

ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, যা ১৮৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা রামমোহন রায়ের অনুগামী গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ, কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এই সভা গড়ে ওঠে। সরকারি করনীতি, বিশেষ করে নিষ্কর বা দেবোত্তর জমির ওপর ব্রিটিশদের অন্যায় খাজনা বসানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই সভা প্রতিবাদ জানায়। ঐতিহাসিক ড. যোগেশচন্দ্র বাগল একে "বাঙলা তথা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান" বলে আখ্যায়িত করেছেন।

১.২ জমিদারী সভা (১৮৩৮) ও বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি (১৮৪৩)

১৮৩৮ সালে রাজা রাধাকান্ত দেব ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিদারী সভা (Landholders' Society)। এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) দ্বারা প্রদত্ত জমিদারদের সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করা। যদিও এটি ছিল একটি ধনী ভূস্বামীদের শ্রেণিগত সংগঠন, তবুও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালানো এবং লন্ডনে জন ক্রফোর্ডকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দরবার করার সূচনা এর মাধ্যমেই ঘটেছিল।

জমিদারদের সংকীর্ণ স্বার্থের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ ও কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরার জন্য ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং ব্রিটিশ সমাজসেবক জর্জ থম্পসনের উদ্যোগে ১৮৪৩ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি।

পরবর্তীতে এই দুই ভিন্নমুখী সংগঠনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে ১৮৫১ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ভারত সভা নামেও পরিচিত ছিল)। রাজা রাধাকান্ত দেব ছিলেন এর সভাপতি এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদক। ১৮৫৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট বা সনদ আইনের পূর্বে এই সভা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্মারকলিপি পাঠিয়ে আইন পরিষদে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব, বিচার ও শাসন বিভাগের পৃথকীকরণ এবং লবণের ওপর কর হ্রাসের জোর দাবি জানায়।

১.৩ হিন্দু মেলা (১৮৬৭) ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক দাবিপত্র পেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর একটি সুগভীর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শারীরিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। এই লক্ষ্য নিয়ে ১৮৬৭ সালে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু মেলা (যার আদি নাম ছিল চৈত্র মেলা)।

রাজনারায়ণ বসুর 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা' ও পুস্তিকার প্রেরণায় নবগোপাল মিত্র (যাঁকে দেশবাসী শ্রদ্ধায় 'ন্যাশনাল মিত্র' বলতেন) এবং ঠাকুর পরিবারের গণেন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু মেলা প্রতি বছর আয়োজিত হতো। হিন্দু মেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি:

  • আত্মশক্তি ও দেশীয় শিল্পের বিকাশ: মেলায় দেশীয় তাঁতের বস্ত্র, মৃৎশিল্প, কুটিরশিল্প ও কৃষিদ্রব্যের প্রদর্শনী হতো, যা পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
  • শারীরিক সক্ষমতা ও বীরত্ব চর্চা: কুস্তি, লাঠিখেলা, তরবারি চালনা ও শরীরচর্চার প্রদর্শনী আয়োজন করে ইংরেজদের দেওয়া 'বাঙালিরা অলস ও ভীরু জাতি' অপবাদ ভেঙে ফেলা হতো।
  • দেশপ্রেমমূলক সংস্কৃতির প্রসার: মেলায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও কবিতা পাঠ হতো। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত জাতীয় সঙ্গীত "মিলে সবে ভারত সন্তান, একতান মনপ্রাণ, গাও ভারতের জয়" এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের "মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি" হিন্দু মেলার মঞ্চ থেকেই জাতির প্রাণে দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিল।
১.৪ ভারত সভা / ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৭৬): মধ্যবিত্তের প্রথম সর্বভারতীয় কণ্ঠস্বর

ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রধানত ভূস্বামী ও অভিজাতদের স্বার্থ দেখায় উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত—আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের নিজস্ব একটি মঞ্চের প্রয়োজন তীব্র হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক তাগিদে ১৮৭৬ সালের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভা। এর সাথে যুক্ত ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী ও দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভার চারটি ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য ঘোষণা করেছিলেন:

  1. সমগ্র ভারতে একটি শক্তিশালী ও সুসংবদ্ধ জনমত গড়ে তোলা।
  2. অভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও আকাঙ্খার ভিত্তিতে ভারতের বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করা।
  3. হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর মৈত্রী ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা।
  4. সাধারণ জনসাধারণকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে শামিল করা।

ভারত সভা অল্পকালের মধ্যেই ১৮৭৭–৭৮ সালের সিভিল সার্ভিস আন্দোলন, আসামের চা-বাগানের কুলিদের ওপর অত্যাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ১৮৮৩ সালের ইলবার্ট বিল আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে সর্বভারতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।

১.৫ বোম্বাই ও মাদ্রাজের সমিতি এবং জাতীয় সম্মেলন (১৮৮৩ ও ১৮৮৫)

বাংলার পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য প্রেসিডেন্সিতেও আঞ্চলিক সংগঠনের বিকাশ ঘটেছিল:

  • পুনা সার্বজনীন সভা (১৮৭০): মহারাষ্ট্রে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও জি. ভি. যোশীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করত।
  • মাদ্রাজ মহাজন সভা (১৮৮৪): এম. বীররাঘবাচারিয়ার ও পি. আনন্দ চার্লুর উদ্যোগে দক্ষিণ ভারতে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়।
  • বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৫): ফিরোজশাহ মেহতা, কে. টি. তেলং এবং বদরুদ্দিন তায়েবজির (যাঁদের 'বোম্বাই ত্রয়ী' বলা হতো) নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে।

এই সমস্ত আঞ্চলিক সংগঠনকে এক ছাতার তলায় আনতে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারত সভা ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় প্রথম জাতীয় সম্মেলন (National Conference) আহ্বান করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এরপর ১৮৮৫ সালের ২৫–২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনই ছিল কার্যত ১৮৮৫ সালের বোম্বাই কংগ্রেসের প্রকৃত মহড়া ও অনুপ্রেরণা।

মডিউল ২: লর্ড লিটনের দমনমূলক নীতি, সিভিল সার্ভিস আন্দোলন ও ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৭৭–১৮৮৪)

২.১ দুর্ভিক্ষের মাঝে ১৮৭৭ সালের দিল্লি দরবার: রাজকীয় অপচয়

ভারতের বড়লাট লর্ড লিটনের (১৮৭৬–১৮৮০) শাসনকাল ছিল ঔপনিবেশিক ঔদ্ধত্য এবং গণবিরোধী দমননীতির এক চরম দৃষ্টান্ত। ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে এক সর্বনাশা খরার কারণে দক্ষিণ ও মধ্য ভারতে দেখা দেয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে মাদ্রাজ, মহীশূর, হায়দ্রাবাদ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সির প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায়।

গ্রামের পর গ্রাম যখন লাশের স্তূপে পরিণত হচ্ছিল, ঠিক সেই সময়েই লর্ড লিটন মহারানী ভিক্টোরিয়াকে 'কাইজার-ই-হিন্দ' (ভারতের সম্রাজ্ঞী) উপাধিতে ভূষিত করার জন্য ১৮৭৭ সালের ১ জানুয়ারি দিল্লিতে এক বিশাল রাজকীয় দরবার আয়োজন করেন। লক্ষ লক্ষ ভারতীয় করদাতার অর্থ ব্যয় করা হয় জমকালো তাঁবু, ভোজ ও সামরিক শোভাযাত্রায়। কলকাতার অমৃতবাজার পত্রিকা এই অমানবিক ঘটনার তীব্র নিন্দা করে লেখে: "রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল; আর ভারত যখন অনাহারে মরছিল, লিটন তখন দিল্লিতে ভোজের উৎসবে মেতেছিলেন।"

২.২ দেশীয় সংবাদপত্র আইন / ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট (১৮৭৮)

দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা এবং আফগান যুদ্ধের অমিতব্যয়িতা নিয়ে ভারতীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলির নির্ভীক সমালোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে লর্ড লিটন ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে কুখ্যাত দেশীয় সংবাদপত্র আইন (Vernacular Press Act, যা 'গ্যাগিং অ্যাক্ট' বা মুখবন্ধ আইন নামে পরিচিত) পাস করেন:

  • জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের ক্ষমতা দেওয়া হয় যে তাঁরা দেশীয় ভাষার সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মুদ্রকদের কাছ থেকে জামানত বন্ড দাবি করতে পারবেন, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে এমন কিছু না ছাপার অঙ্গীকার থাকবে।
  • আইন অমান্য করলে কোনো পূর্ব নোটিশ বা আদালতের বিচার ছাড়াই ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করার অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
  • ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো সাধারণ আদালতে আপিল করার অধিকার ভারতীয়দের ছিল না।
  • চরম বর্ণবিদ্বেষ: এই আইনটি কেবল ভারতীয় ভাষার পত্রিকার ওপর প্রযোজ্য ছিল; ইউরোপীয়দের মালিকানাধীন ইংরেজি ভাষার পত্রিকাগুলি এর আওতামুক্ত ছিল।

এই আইনকে অকার্যকর করতে শিশিরকুমার ঘোষ ও মতিলাল ঘোষ সম্পাদিত সুপরিচিত সংবাদপত্র অমৃতবাজার পত্রিকা এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। ১৮৭৮ সালের ২১ মার্চ পত্রিকাটি রাতারাতি দ্বিভাষিক (বাংলা-ইংরেজি) রূপ বদলে পুরোপুরি ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়ে আইনের হাত থেকে বেঁচে যায় এবং সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন অব্যাহত রাখে!

২.৩ ভারতীয় অস্ত্র আইন (১৮৭৮) ও সিভিল সার্ভিস আন্দোলনের পটভূমি

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি লর্ড লিটন পাস করেন ১৮৭৮ সালের ভারতীয় অস্ত্র আইন (Arms Act)। এর দ্বারা লাইসেন্স ছাড়া কোনো ভারতীয়র কাছে অস্ত্র রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে ঘোষিত হয়। কিন্তু ইংরেজ, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও ইউরোপীয়দের এই আইনের আওতা থেকে পুরোপুরি ছাড় দেওয়া হয়, যা আইনগতভাবে ভারতীয়দের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করে।

একই সাথে ১৮৭৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (ICS) পরীক্ষায় বসার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করে দেয়। পরীক্ষাটি হতো লন্ডনে এবং পাঠ্যক্রম ছিল লাতিন, গ্রিক ও ইংরেজি সাহিত্যের ওপর। মাত্র ১৯ বছর বয়সে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে লন্ডনে গিয়ে ইংরেজ ছাত্রদের সাথে প্রতিযোগিতা করা ভারতীয় যুবকদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব ছিল। ব্রিটিশদের আসল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের উচ্চ প্রশাসনিক পদে প্রবেশ বন্ধ করা।

এর বিরুদ্ধে ভারত সভা গর্জে ওঠে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র উত্তর ও পশ্চিম ভারতে (লাহোর, অমৃতসর, দিল্লি, আগ্রা, পুনা, বোম্বাই) এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সফর করেন এবং বিশাল বিশাল জনসভা করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এটিই ছিল ভারতীয় ইতিহাসের প্রথম সর্বভারতীয় সফর ও রাজনৈতিক প্রচার অভিযান।

২.৪ ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৮৩): শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী বিদ্রোহ

লর্ড লিটনের পর উদারপন্থী বড়লাট লর্ড রিপন (১৮৮০–১৮৮৪) ভারতে আসেন। তিনি বিচারব্যবস্থায় বিদ্যমান বর্ণবৈষম্য দূর করতে উদ্যোগী হন। তৎকালীন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী মফস্বল অঞ্চলে কোনো ভারতীয় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা দায়রা জজ কোনো ইউরোপীয় অপরাধীর বিচার করতে পারতেন না; এমনকি একজন ভারতীয় বিচারক পদমর্যাদায় যত উচ্চই হোন না কেন, ইউরোপীয় আসামির বিচার করার ক্ষমতা কেবল শ্বেতাঙ্গ বিচারকদেরই ছিল।

লর্ড রিপনের আইন সচিব স্যার কোর্টনি পেরিগ্ৰিন ইলবার্ট (C.P. Ilbert) ১৮৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক বিল আনেন, যা ইলবার্ট বিল নামে পরিচিত। বিলে ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচার করার সম-অধিকার প্রস্তাব করা হয়।

এই বিল প্রকাশিত হওয়ামাত্রই কলকাতা ও আসামের ইউরোপীয় চা-কর, ব্যবসায়ী ও সিভিলিয়ানরা উন্মত্ত বর্ণবিদ্বেষী আন্দোলনে ফেটে পড়ে:

  • শ্বেতাঙ্গরা দেড় লক্ষাধিক টাকা চাঁদা তুলে ইউরোপীয় ও অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন গঠন করে।
  • ইংরেজ সংবাদপত্র ইংলিশম্যান-এ ভারতীয় বিচারক ও শিক্ষিত ভারতীয়দের বিরুদ্ধে চরম কুৎসাপূর্ণ লেখা শুরু হয়।
  • ইউরোপীয়রা বড়লাট লর্ড রিপনকে লাঞ্ছিত করার, এমনকি চাঁদপাল ঘাট থেকে জাহাজে তুলে জোর করে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়ার গোপন ষড়যন্ত্র করে।
২.৫ আপসমূলক রদবদল ও ভারতীয়দের ঐতিহাসিক শিক্ষা

শ্বেতাঙ্গদের এই চরম বিদ্রোহ বা 'হোয়াইট মিউটিনি'র মুখে অসহায় হয়ে লর্ড রিপন মাথা নত করেন। ১৮৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে মূল বিলটি সংশোধন করে আপস করা হয়: কোনো ইউরোপীয় অভিযুক্ত ব্যক্তি ভারতীয় বিচারকের আদালতে হাজির হলে সে দাবি করতে পারবে যে তার বিচারের জুরিদের মধ্যে অন্তত অর্ধেক (৫০%) সদস্য শ্বেতাঙ্গ হতে হবে।

ইলবার্ট বিলের এই ব্যর্থতা শিক্ষিত ভারতীয়দের রাজনৈতিক চেতনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দেয়:

  1. ব্রিটিশদের আসল রূপ প্রকাশ: ভারতীয়রা স্পষ্ট বুঝলেন যে ব্রিটিশরা মুখে 'আইনের শাসন' ও 'সাম্যের' কথা বললেও বাস্তবে জাতিগত অহংকার ও বর্ণবৈষম্যই তাদের শাসনের মূল ভিত্তি।
  2. সংগঠিত আন্দোলনের শক্তি: শ্বেতাঙ্গরা কীভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে পারে, তা ভারতীয়রা প্রত্যক্ষ করলেন।
  3. সর্বভারতীয় ঐক্যের তাগিদ: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য নেতারা উপলব্ধি করলেন যে, বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক সমিতি দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা অসম্ভব। নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য ভারতীয়দের একটি স্থায়ী, সুসংগঠিত সর্বভারতীয় রাজনৈতিক মঞ্চ অবিলম্বে গড়ে তোলা দরকার।

মডিউল ৩: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা (১৮৮৫): প্রেক্ষাপট, বিতর্ক ও গুরুত্ব

৩.১ অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম ও ১৮৮৩ সালের ঐতিহাসিক চিঠি

ইলবার্ট বিল আন্দোলনের উত্তাপের মধ্যেই অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (A.O. Hume) ভারতীয়দের একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৮৮৩ সালের ১ মার্চ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের উদ্দেশে একটি মর্মস্পর্শী খোলা চিঠি লেখেন:

"ব্যক্তিই হোক বা জাতি, সমস্ত প্রকৃত উন্নতি ভেতর থেকেই আসতে হয়... যদি পঞ্চাশ জন সৎ ও ত্যাগী মানুষ এগিয়ে আসেন, তবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা যাবে এবং ভবিষ্যৎ কাজ সহজ হবে... যদি দেশের জন্য সামান্য ত্যাগ স্বীকার করতে না পারো, তবে রাজনৈতিকভাবে পদানত থাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই।"

হিউম বোম্বাই, মাদ্রাজ ও কলকাতার শীর্ষ নেতাদের সাথে আলোচনা করেন এবং বড়লাট লর্ড ডাফরিনের সাথে বৈঠক করে সরকারের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন।

৩.২ বোম্বাইয়ে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন (ডিসেম্বর ১৮৮৫)

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন প্রথমে পুনা শহরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুনায় হঠাৎ মারাত্মক কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে স্থান পরিবর্তন করে দ্রুত বোম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৮৮৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় বোম্বাইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্কের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত কলেজে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। ভারতের সমস্ত প্রদেশ ও প্রেসিডেন্সি থেকে ৭২ জন প্রতিনিধি এই ঐতিহাসিক সভায় উপস্থিত ছিলেন:

  • প্রাদেশিক প্রতিনিধিত্ব: বোম্বাই ও সিন্ধু থেকে ৩৮ জন, মাদ্রাজ থেকে ২১ জন, বাংলা থেকে ৩ জন (উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মনমোহন ঘোষ ও নরেন্দ্রনাথ সেন), উত্তরপ্রদেশ ও অযোধ্যা থেকে ৭ জন এবং পাঞ্জাব থেকে ৩ জন প্রতিনিধি যোগ দেন।
  • উপস্থিত বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ: দাদাভাই নাওরোজী, দিনশ ওয়াচা, ফিরোজশাহ মেহতা, কাশীনাথ ত্রিম্বক তেলং, বদরুদ্দিন তায়েবজি, জি. সুব্রহ্মণ্য আয়ার এবং পি. আনন্দ চার্লু। উল্লেখ্য, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একই সময়ে কলকাতায় দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলনের সভাপতিত্ব করায় এই প্রথম অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
  • প্রথম সভাপতি: বিশিষ্ট আইনজীবী উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (ডব্লিউ. সি. ব্যানার্জি) সর্বসম্মতিক্রমে কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন এবং এ. ও. হিউম হন সাধারণ সম্পাদক।
৩.৩ কংগ্রেসের মূল লক্ষ্য ও প্রথম নয়টি প্রস্তাব

সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চারটি প্রধান লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন:

  1. দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত নিঃস্বার্থ কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করা।
  2. ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিক সংকীর্ণতা দূর করে সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয় ঐক্যের মনোভাব সুদৃঢ় করা।
  3. তৎকালীন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নাবলি সম্পর্কে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সুচিন্তিত মতামত লিপিবদ্ধ করা।
  4. পরবর্তী এক বছরের জন্য ভারতীয় জননেতাদের কর্মপন্থা ও জনস্বার্থমূলক কাজের দিশা নির্ধারণ করা।

এই অধিবেশনে শাসনব্যবস্থার সংস্কার চেয়ে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়—যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: ভারত শাসনের তদন্তে রাজকীয় কমিশন গঠন, ভারত সচিবের কাউন্সিল বিলোপ, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের বিস্তার ও নির্বাচিত ভারতীয় প্রতিনিধি গ্রহণ, ভারতে ও ইংল্যান্ডে একই সাথে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা গ্রহণ এবং সামরিক ব্যয় হ্রাস।

৩.৪ 'সুরক্ষা কপাট' (Safety Valve) বনাম 'বিদ্যুৎ পরিবাহী' (Lightning Conductor) তত্ত্ব

কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এবং হিউমের ভূমিকা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে:

  • সুরক্ষা কপাট বা সেফটি ভালভ তত্ত্ব: ১৯১৬ সালে চরমপন্থী নেতা লালা লাজপত রায় তাঁর 'Young India' গ্রন্থে এই তত্ত্বের অবতারণা করেন এবং পরবর্তীতে মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ রজনী পাম দত্ত ('India Today' গ্রন্থে) এটিকে বিস্তারিত করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, হিউম সিমলায় পুলিশের সাত খণ্ড গোপন গোয়েন্দা রিপোর্ট পড়ে জানতে পারেন যে ব্রিটিশ শোষণ ও দুর্ভিক্ষের কারণে ভারতীয় কৃষকদের মধ্যে এক তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং যে কোনো মুহূর্তে ১৮৫৭ সালের মতো আরেকটি রক্তক্ষয়ী মহাবিদ্রোহ ঘটে যেতে পারে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বাঁচাতে হিউম বড়লাট ডাফরিনের সাথে পরামর্শ করে ভারতীয় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ক্ষোভকে অহিংস আলোচনার পথে বের করে দেওয়ার জন্য 'সুরক্ষা কপাট' (সেফটি ভালভ) হিসেবে কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
  • বিদ্যুৎ পরিবাহী বা লাইটনিং কন্ডাক্টর তত্ত্ব: ১৯১৩ সালে নরমপন্থী নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে এই ধারণার জোরালো জবাব দেন। তিনি বলেন: "কোনো ভারতীয় যদি এমন একটি সর্বভারতীয় সংগঠন গড়ার উদ্যোগ নিতেন, তবে সরকার শুরুতেই তা নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে দিত... হিউম একজন বিশিষ্ট ইংরেজ এবং প্রাক্তন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন বলেই কর্তৃপক্ষ কংগ্রেসকে সূতিকাগারেই হত্যা করতে পারেনি।" ভারতীয় নেতারা হিউমকে বজ্রপাত নিরোধক বা 'বিদ্যুৎ পরিবাহী' হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যাতে সরকারের রোষ থেকে নবজাতক কংগ্রেস রক্ষা পায়।

আধুনিক ঐতিহাসিক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে কংগ্রেস ব্রিটিশদের দয়ায় তৈরি কোনো আকস্মিক প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং ১৮৩৬ থেকে চলে আসা সভা-সমিতির দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা এবং সুরেন্দ্রনাথের জাতীয় সম্মেলনেরই এক স্বাভাবিক ও অপরিহার্য পরিণতি ছিল জাতীয় কংগ্রেস।

৩.৫ প্রাথমিক সামাজিক ভিত্তি ও ব্রিটিশ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

কংগ্রেসের প্রাথমিক বছরগুলিতে এর সামাজিক ভিত্তি ছিল মূলত ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত—আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাধারণ কৃষক, শ্রমিক ও নিম্নবর্ণের মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ তখন ছিল না বললেই চলে। তবে নেতারা কখনোই নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখেননি, তাঁরা সমগ্র জাতির সমস্যা তুলে ধরেছিলেন।

শুরুতে ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিল। ১৮৮৬ সালের দ্বিতীয় কলকাতা অধিবেশনে প্রতিনিধিদের বড়লাট লর্ড ডাফরিন রাজভবনে এক প্রীতিভোজে আপ্যায়ন করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস যখনই আইন পরিষদের সংস্কার, সামরিক ব্যয় হ্রাস ও অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করল, তখনই ব্রিটিশদের মনোভাব দ্রুত শত্রুতাপূর্ণ হয়ে উঠল। ১৮৮৮ সালে লর্ড ডাফরিন প্রকাশ্যেই কংগ্রেসকে ব্যঙ্গ করে বলেন যে এটি সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে না, কেবল দেশের "একটি আণুবীক্ষণিক সংখ্যালঘিষ্ঠ শ্রেণির" (Microscopic Minority) প্রতিনিধি!

মডিউল ৪: নরমপন্থী পর্ব ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ (১৮৮৫–১৯০৫)

৪.১ নরমপন্থী নেতৃত্ব ও ৩-পি (3Ps) নীতি: আবেদন, নিবেদন ও প্রতিবাদ

১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পরিচালনা করতেন যে নেতৃত্ব, ইতিহাসে তাঁরা নরমপন্থী (Moderates) নামে পরিচিত। এই ধারার প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্বরা ছিলেন দাদাভাই নাওরোজী, ফিরোজশাহ মেহতা, দিনশ ওয়াচা, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দমোহন বসু এবং রমেশচন্দ্র দত্ত।

নরমপন্থীদের মূল রাজনৈতিক দর্শন ছিল নিম্নরূপ:

  • ব্রিটিশ ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা: তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশ জাতি ও পার্লামেন্ট স্বভাবতই ন্যায়পরায়ণ ও গণতন্ত্রকামী। ভারতে যে শোষণ ও নিপীড়ন চলছে, তা ব্রিটিশ চরিত্রদোষ নয়, বরং ভারতের দায়িত্বে থাকা স্বার্থপর ইংরেজ আমলাদের কারসাজি।
  • ৩-পি নীতি (Prayer, Petition, Protest): নরমপন্থীরা কোনো আইন অমান্য বা বিপ্লবী পথে যাননি। তাঁদের আন্দোলনের মূল পদ্ধতি ছিল আবেদন (Prayer), নিবেদন (Petition) এবং যুক্তিসঙ্গত প্রতিবাদ (Protest)। তাঁরা তথ্যবহুল স্মারকলিপি তৈরি করতেন, বার্ষিক অধিবেশনে প্রস্তাব পাস করতেন এবং জনমত প্রভাবিত করতে লন্ডনে প্রতিনিধি পাঠাতেন।
  • ক্রমবিকাশমূলক সংস্কার: তাঁরা তাৎক্ষণিক স্বাধীনতা বা ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের দাবি জানাননি; ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো স্বায়ত্তশাসন (Dominion Status) লাভই ছিল তাঁদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য।
৪.২ সাংবিধানিক দাবি ও ১৮৯২ সালের ভারতীয় পরিষদ আইন

নরমপন্থীদের সবচেয়ে প্রধান রাজনৈতিক স্লোগান ছিল: "প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনো কর নয়!" (No taxation without representation)।

তাঁদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ সরকার ১৮৯২ সালের ভারতীয় পরিষদ আইন (Indian Councils Act of 1892) পাস করতে বাধ্য হয়। যদিও এটি ছিল অত্যন্ত সীমিত ও ত্রুটিপূর্ণ, তবুও এর মাধ্যমে আইন পরিষদে বেসরকারি ভারতীয় সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং পৌরসভা, বিশ্ববিদ্যালয় ও বণিকসভার মাধ্যমে পরোক্ষ নির্বাচনের নীতির স্বীকৃতি মেলে। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় সদস্যরা বাজেটের ওপর সাধারণ বিতর্ক করার এবং প্রশাসনকে প্রশ্ন করার অধিকার লাভ করেন—যা ফিরোজশাহ মেহতা ও গোপালকৃষ্ণ গোখলের মতো নেতারা ব্রিটিশদের নীতিহীনতা তুলে ধরতে অসাধারণ দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেছিলেন।

তাঁদের অন্যান্য দাবির মধ্যে ছিল: ভারতে ও ইংল্যান্ডে একই সাথে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা নেওয়া (যা ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ কমন্স সভায় নীতিগতভাবে পাস হয়), সামরিক ব্যয় কমানো, লবণের ওপর কর বিলোপ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সারা ভারতে সম্প্রসারণ করা।

৪.৩ দাদাভাই নাওরোজী ও সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব (Drain of Wealth)

নরমপন্থী জাতীয়তাবাদীদের সর্বশ্রেষ্ঠ ও ঐতিহাসিক অবদান ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক শোষণকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাহায্যে জাতির সামনে উন্মোচন করা। এই অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ ছিলেন দাদাভাই নাওরোজী, যাঁকে দেশবাসী পরম শ্রদ্ধায় "ভারতের মহান বৃদ্ধ" (The Grand Old Man of India) বলে ডাকতেন।

১৯০১ সালে প্রকাশিত তাঁর জগদ্বিখ্যাত গ্রন্থ "Poverty and Un-British Rule in India"-তে দাদাভাই নাওরোজী তাঁর অমর সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব (Drain of Wealth) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করেন যে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ (কয়েক কোটি পাউন্ড) ভারত থেকে একতরফাভাবে ব্রিটেনে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার বিনিময়ে ভারত কোনো আর্থিক, বৈষয়িক বা বাণিজ্যিক প্রতিদানই পাচ্ছে না।

এই সম্পদ নির্গমনের প্রধান পথগুলি ছিল:

  1. গৃহব্যয় বা স্বরাষ্ট্রীয় খরচ (Home Charges): ব্রিটেনে বসবাসকারী ইংরেজ সামরিক ও বেসামরিক অফিসারদের উচ্চ বেতন, অবসরকালীন পেনশন, ছুটি ভাতা এবং লন্ডনে অবস্থিত ভারত সচিবের দপ্তরের সমস্ত খরচ ভারতীয় রাজস্ব থেকে দেওয়া হতো।
  2. রেলপথে নিশ্চিত মুনাফা (Guaranteed Railway Interest): ভারতে রেললাইন তৈরির জন্য ব্রিটিশ পুঁজিপতিদের ৫ শতাংশ নিশ্চিত মুনাফা দেওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছিল, যা ভারতীয় কৃষকের করের টাকায় মেটানো হতো।
  3. বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফা: ভারতে বিদেশি ব্যাংক, জাহাজ কোম্পানি, চা ও নীল বাগান এবং পাটকলের অর্জিত বিপুল মুনাফা সরাসরি ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যেত।
  4. একতরফা রপ্তানি উদ্বৃত্ত: ভারত কাঁচামাল (তুলা, পাট, গম) প্রচুর রপ্তানি করত, কিন্তু তার বদলে ভারতে সোনা বা সম্পদ ঢুকত না; সেই উদ্বৃত্ত টাকা দিয়ে ইংল্যান্ডে হোম চার্জ মেটানো হতো।
৪.৪ রমেশচন্দ্র দত্ত ও মহাদেব গোবিন্দ রানাডের মূল্যায়ন

দাদাভাই নাওরোজীর পাশাপাশি প্রাক্তন আই.সি.এস. অফিসার এবং ১৮৯৯ সালের লখনউ কংগ্রেসের সভাপতি রমেশচন্দ্র দত্ত (আর. সি. দত্ত) তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ "The Economic History of India" (দুই খণ্ডে)-তে ব্রিটিশদের ভূমিরাজস্ব নীতির ধ্বংসাত্মক চরিত্র তুলে ধরেন। তিনি দেখিয়েছিলেন যে সরকারের অত্যধিক খাজনার বোঝা কৃষকদের সর্বস্বান্ত করে বারবার দুর্ভিক্ষ ডেকে এনেছে। তিনি হিসাব করে দেখান যে, ভারতের মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেক অংশ প্রতি বছর সরাসরি ইংল্যান্ডে পাচার হয়ে যায়।

একই সাথে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ভারতের অবশিল্পায়ন (De-industrialization) এবং চিরাচরিত বস্ত্র ও কুটিরশিল্প ধ্বংসের করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি প্রমাণ করেন কীভাবে ভারতকে ব্রিটেনের শিল্প কারখানার সস্তা কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং তাদের তৈরি মালের একচেটিয়া বাজারে পরিণত করা হয়েছে।

৪.৫ নরমপন্থীদের মূল্যায়ন ও সীমাবদ্ধতা

নরমপন্থীদের ঐতিহাসিক অবদান বিশাল হলেও তাঁদের কিছু সহজাত দুর্বলতা ছিল:

  • সংকীর্ণ সামাজিক ভিত্তি: তাঁদের আন্দোলন মূলত শহরের ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; কোটি কোটি সাধারণ কৃষক ও শ্রমিকদের আন্দোলনে শামিল করতে তাঁরা ব্যর্থ হন।
  • ভিক্ষাবৃত্তির রাজনীতি (Political Mendicancy): অতিমাত্রায় রাজভক্তি এবং আবেদনের রাজনীতিকে পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ বিপ্লবীরা "রাজনৈতিক ভিক্ষাবৃত্তি" বলে ব্যঙ্গ করেছিলেন।
  • সামান্য অর্জন: সরকারের কাছ থেকে তাঁরা সামান্য কিছু সাংবিধানিক সুযোগ ছাড়া বাস্তব কোনো দাবি আদায় করতে পারেননি।

তা সত্ত্বেও তাঁদের ঋণ অনস্বীকার্য: নরমপন্থীরাই সমগ্র ভারতকে প্রথম একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তায় বেঁধেছিলেন, ভারতীয়দের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছিলেন এবং ব্রিটিশ শাসনের নৈতিক মুখোশ খুলে দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন।

মডিউল ৫: চরমপন্থার উত্থান ও বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫–১৯১১)

৫.১ চরমপন্থী ধারার বিকাশ ও লাল-বাল-পাল

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে নরমপন্থীদের ব্যর্থতা এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা (যেমন ১৮৯৬ সালে ইতালির বিরুদ্ধে ইথিওপিয়ার জয় এবং ১৯০৫ সালে ক্ষুদ্র এশীয় শক্তি জাপানের কাছে রাশিয়ার পরাজয়) ভারতীয় তরুণদের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। এর ফলে কংগ্রেসে চরমপন্থা বা উগ্র জাতীয়তাবাদী ধারার (Extremism) বিকাশ ঘটে। এই ধারার প্রধান পুরোধা ছিলেন বিখ্যাত লাল-বাল-পাল—পাঞ্জাবের লালা লাজপত রায়, মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর তিলক এবং বাংলার বিপিনচন্দ্র পাল; তাঁদের সাথে ছিলেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ।

চরমপন্থীরা ব্রিটিশদের ন্যায়পরায়ণতায় বিশ্বাস করতেন না। তাঁরা ঘোষণা করেন যে অধিকার প্রার্থনা করে পাওয়া যায় না, তা সংগ্রামের মাধ্যমে ছিনিয়ে নিতে হয়। বাল গঙ্গাধর তিলক মারাঠি পত্রিকা 'কেশরী'-র মাধ্যমে জাতিকে জাগ্রত করেন এবং গণপতি উৎসব (১৮৯৩) ও শিবাজী উৎসব (১৮৯৫) প্রবর্তন করে জাতীয় আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যান। তিলকের অমর বাণী ছিল: "স্বরাজ আমার জন্মগত অধিকার, এবং আমি তা অর্জন করবই!"

৫.২ লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা (১৯০৫): সাম্রাজ্যবাদী বিভাজন নীতি

জাতীয় আন্দোলনের এই উত্তাল পর্বে ভারতের বড়লাট লর্ড কার্জন (১৮৯৯–১৯০৫) জাতীয়তাবাদী শক্তিকে চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য বঙ্গভঙ্গের (Partition of Bengal) কুখ্যাত চক্রান্ত করেন।

১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা ঘোষণা করে এবং ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ তারিখে তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয়। বাংলাকে দুটি প্রদেশে বিভক্ত করা হয়:

  • পূর্ববঙ্গ ও আসাম: ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিভাগ ও আসাম নিয়ে গঠিত হয়, যার রাজধানী হয় ঢাকা। মোট ৩ কোটি ১০ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে মুসলিমরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ (প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ)।
  • পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা: পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ওড়িশা নিয়ে গঠিত হয় এবং এর রাজধানী থাকে কলকাতা। ৫ কোটি ৪০ লক্ষ জনসংখ্যার এই প্রদেশে বাঙালিরা (১ কোটি ৭০ লক্ষ) নিজেদের প্রদেশেই হিন্দি ও ওড়িয়া ভাষাভাষীদের তুলনায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হন।

কার্জন সরকারিভাবে দাবি করেন যে ৭৮ লক্ষ জনসংখ্যার এক বিশাল প্রদেশকে একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের পক্ষে শাসন করা অসম্ভব, তাই প্রশাসনিক সুবিধার জন্যই এই বিভাজন। কিন্তু ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ. এইচ. রিজলে তাঁর গোপন সরকারি নথিতে আসল সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য ফাঁস করে লিখেছিলেন:

"যুক্ত বাংলা একটি শক্তি; বিভক্ত বাংলা বিভিন্ন দিকে টানবে... আমাদের মূল উদ্দেশ্যগুলির একটি হলো আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেওয়া এবং দুর্বল করা।"

কার্জনের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয়তাবাদের কেন্দ্রস্থল বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে আঘাত করা এবং হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে চিরস্থায়ী ধর্মীয় বিভেদ তৈরি করা।

৫.৩ স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন: প্রতিরোধের জোড়া হাতিয়ার

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাংলা গর্জে ওঠে। ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী টাউন হলে এক বিশাল প্রতিবাদ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ঐতিহাসিক স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। কৃষ্ণকুমার মিত্র তাঁর 'সঞ্জীবনী' পত্রিকায় প্রথম বিলিতি পণ্য বর্জনের ডাক দেন।

এই আন্দোলনের ছিল দুটি পরিপূরক স্তম্ভ:

  1. বয়কট (Boycott): এটি ছিল আন্দোলনের নেতিবাচক কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্র। ব্রিটিশদের তৈরি ম্যানচেস্টারের কাপড়, লিভারপুলের লবণ, বিলিতি চিনি ও বিলাসদ্রব্য বর্জন করা হয়। ছাত্ররা বিলিতি কাপড়ের দোকানের সামনে পিকেটিং শুরু করে; ধোপারা বিলিতি কাপড় কাচতে অস্বীকার করে; ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা বিলিতি লবণ বা কাপড়ের উপহারযুক্ত বিয়েতে পৌরোহিত্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। কলকাতার রাজপথে বিলিতি কাপড়ের বিশাল বিশাল বহ্নি-উৎসব জ্বলে ওঠে।
  2. স্বদেশী (Swadeshi): এটি ছিল আন্দোলনের ইতিবাচক ও গঠনমূলক রূপ—যার ভিত্তি ছিল 'আত্মশক্তি' ও স্বাবলম্বন। দেশীয় শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যের এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটে:
    • আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠা করেন সুবিখ্যাত বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস।
    • দেশীয় কাপড়ের চাহিদা মেটাতে গড়ে ওঠে বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস।
    • এছাড়াও দেশীয় সাবান কারখানা, দিয়াশলাই কারখানা, চিনামাটির পাত্র তৈরির কারখানা এবং ভারতীয়দের নিজস্ব ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি গড়ে ওঠে।
৫.৪ রাখীবন্ধন, অরন্ধন ও জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন

স্বদেশী আন্দোলন কেবল অর্থনৈতিক বর্জনেই আটকে থাকেনি, তা বাঙালির অন্তরের গভীরতম সাংস্কৃতিক আবেগে পরিণত হয়েছিল:

  • রাখীবন্ধন উৎসব (১৬ অক্টোবর ১৯০৫): যেদিন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়, সেদিন সমগ্র বাংলায় জাতীয় শোক দিবস ও সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই দিনটিকে কেন্দ্র করে প্রবর্তন করেন ঐতিহাসিক রাখীবন্ধন উৎসব। গঙ্গাস্নানের পর খালি পায়ে রাজপথে গান গাইতে গাইতে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরের কবজিতে হলুদ সুতোর রাখী বেঁধে দিয়ে এই শপথ নেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বাংলার আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে কখনোই ভাঙতে পারবে না।
  • অরন্ধন: বিশিষ্ট পণ্ডিত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আহ্বানে বাংলার ঘরে ঘরে উনুন না জ্বালিয়ে 'অরন্ধন' পালিত হয় শোক ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে।
  • দেশপ্রেমমূলক গান: রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন "বাংলার মাটি, বাংলার জল" এবং "আমার সোনার বাংলা" (যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হয়)। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় লেখেন "ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা" এবং চারণকবি মুকুন্দ দাস গ্রামে গ্রামে স্বদেশী যাত্রাপালা ও গান পরিবেশন করে গণজাগরণ ঘটান।
  • জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন: ছাত্ররা স্বদেশী পিকেটিংয়ে অংশ নেওয়ায় ব্রিটিশ সরকার দমনমূলক কার্লাইল সার্কুলার জারি করে সরকারি স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রদের বহিষ্কারের হুমকি দেয়। এর জবাবে জাতীয় নেতারা বিকল্প জাতীয় শিক্ষা গড়ে তোলার ডাক দেন। সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ডন সোসাইটি (প্রতিষ্ঠিত ১৯০২) এর নেতৃত্ব দেয়। ১৯০৬ সালের ১৫ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education) এবং গড়ে ওঠে বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ, যার প্রথম অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন শ্রী অরবিন্দ ঘোষ।
৫.৫ সুরাট ভাঙন (১৯০৭) ও বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১)

আন্দোলনের ব্যাপকতা বৃদ্ধির সাথে সাথে কংগ্রেসের অন্দরে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে নীতিগত সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯০৬ সালের কলকাতা অধিবেশনে দাদাভাই নাওরোজী মধ্যস্থতা করে স্বরাজ, স্বদেশী, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষার চারটি প্রস্তাব গ্রহণ করে সাময়িক ঐক্য রক্ষা করেন। কিন্তু ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচন এবং বয়কটের পরিধি সারা ভারতে বাড়ানো নিয়ে দুই দলের বিরোধ চরমে ওঠে। তুমুল হট্টগোল ও মারামারির মধ্যে কংগ্রেস দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় (যা সুরাট বিভাজন নামে পরিচিত)। এর ফলে জাতীয় কংগ্রেস মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ সরকার এই সুযোগে তীব্র দমননীতি চালায়। বাল গঙ্গাধর তিলককে গ্রেপ্তার করে ছয় বছরের জন্য ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলে পাঠানো হয়; লালা লাজপত রায় ও অজিত সিংকে নির্বাসিত করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও জনতার প্রতিরোধ স্তব্ধ করা যায়নি; পাশাপাশি অরবিন্দ ঘোষ, বাঘা যতীন ও ক্ষুদিরাম বসুদের হাত ধরে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন জন্ম নেয়।

অবশেষে অপ্রতিরোধ্য ভারতীয় গণআন্দোলনের কাছে নতি স্বীকার করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে দিল্লির দরবারে পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। বাংলা পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়। তবে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে শাস্তি দিতে ব্রিটিশরা একই সাথে সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করে। স্বদেশী আন্দোলন প্রমাণ করেছিল যে, ঐক্যবদ্ধ গণসংগ্রামের মাধ্যমে ব্রিটিশ সিংহকেও পিছু হটতে বাধ্য করা সম্ভব।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশের সময়পঞ্জি (১৮৩৬–১৯১১)
১৮৩৬–১৯১১ ঐতিহাসিক অগ্রগতি
পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদের অষ্টম শ্রেণির ইতিহাসের কালানুক্রমিক প্রশ্নের জন্য অপরিহার্য।
কংগ্রেস-পূর্ব যুগের প্রধান সভা-সমিতির তুলনামূলক ছক
সভা-সমিতির তুলনামূলক রূপরেখা
অ্যালবার্ট হলে ১৮৭৬ সালের ভারত সভা প্রতিষ্ঠা ছিল সাধারণ মধ্যবিত্তের প্রথম সর্বভারতীয় উত্থান।
নরমপন্থী বনাম চরমপন্থী মতাদর্শের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
নরমপন্থী ও চরমপন্থী তুলনা
১৯০৭ সালের সুরাট বিভাজনের মূল কারণ ছিল এই দুই ধারার কর্মপদ্ধতির সংঘাত।
দাদাভাই নাওরোজীর সম্পদের নির্গমন সমীকরণ (Drain of Wealth)
ঔপনিবেশিক শোষণ সমীকরণ
দাদাভাই নাওরোজীর ১৯০১ সালের 'Poverty and Un-British Rule in India' গ্রন্থে বিশদ ব্যাখ্যাত।
লর্ড লিটনের দমনমূলক আইনের তালিকা (১৮৭৬–১৮৮০)
লিটনের তিনটি দমনমূলক স্তম্ভ
অমৃতবাজার পত্রিকা রাতারাতি ইংরেজি রূপ নিয়ে ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট ফাঁকি দেয়।
সেফটি ভালভ বনাম লাইটনিং কন্ডাক্টর তত্ত্বের তুলনা
প্রতিষ্ঠা বিতর্ক মডেল
লালা লাজপত রায় (১৯১৬) সেফটি ভালভ এবং গোপালকৃষ্ণ গোখলে (১৯১৩) লাইটনিং কন্ডাক্টর তত্ত্ব প্রচার করেন।
স্বদেশী অর্থনীতির স্বদেশী উদ্যোগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছক
স্বদেশী স্বাবলম্বন ত্রয়ী
ডন সোসাইটি (১৯০২, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়) জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের পথপ্রদর্শক ছিল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বনাম ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ ছক
বঙ্গভঙ্গ বনাম রদ প্রভাব
রিজলে স্পষ্ট স্বীকার করেছিলেন বাঙালি ঐক্যে ফাটল ধরাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
ভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের ইতিহাসে ১৮৩৬ সালকে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক বলা হয় কেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৮৩৬ সালকে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক যুগান্তকারী সূচনা বলে গণ্য করা হয় কারণ এই বছরই কলকাতায় বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা প্রতিষ্ঠিত হয়: ১. প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান: রাজা রামমোহন রায়ের অনুগামীদের (কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর প্রমুখ) উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই সভাই ছিল ভারতের প্রথম সংগঠন যা সরকারের নীতি ও আইন নিয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু করে। ২. নাগরিক স্বার্থের সচেতনতা: কোম্পানি সরকার কর্তৃক নিষ্ক বা দেবোত্তর নিষ্কর জমির ওপর অন্যায়ভাবে খাজনা বসানোর সরকারি আদেশের বিরুদ্ধে এই সভা প্রথম জোরালো নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল। ৩. ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা: বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. যোগেশচন্দ্র বাগল একে 'বাঙলা তথা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান' বলেছেন, কারণ এটিই জমিদারী সভা ও ভারত সভার মতো পরবর্তী সংগঠনগুলির পথপ্রদর্শক হয়েছিল।
উদাহরণ 2
১৮৭৮ সালের দেশীয় সংবাদপত্র আইন (Vernacular Press Act) কেন প্রণীত হয়েছিল এবং অমৃতবাজার পত্রিকা কীভাবে একে পরাস্ত করে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
লর্ড লিটনের দেশীয় সংবাদপত্র আইন (১৮৭৮) ছিল ঔপনিবেশিক দমননীতির চরম রূপ: ১. প্রণয়নের কারণ: ১৮৭৬–৭৮ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের অব্যবস্থা এবং আফগান যুদ্ধের অমিতব্যয়িতা নিয়ে ভারতীয় ভাষার সংবাদপত্রগুলির কঠোর সমালোচনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটিশ সরকার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে এই মুখবন্ধ আইন জারি করে। ২. আইনের বৈষম্যমূলক চরিত্র: এই আইন কেবল ভারতীয় ভাষার পত্রিকার ওপর প্রযোজ্য ছিল; কোনো বিচার ছাড়াই ছাপাখানা বাজেয়াপ্ত করা যেত এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ আদালতে আপিল করা যেত না। ইংরেজি ভাষার ইউরোপীয় পত্রিকাগুলি সম্পূর্ণ ছাড় পেয়েছিল। ৩. অমৃতবাজার পত্রিকার ঐতিহাসিক কৌশল: শিশিরকুমার ঘোষ ও মতিলাল ঘোষ সম্পাদিত অমৃতবাজার পত্রিকাকে শায়েস্তা করাই ছিল সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু আইনের ফাঁক বুঝে সম্পাদকদ্বয় ১৮৭৮ সালের ২১ মার্চ এক রাতের মধ্যে মুদ্রাক্ষর বদলে পত্রিকাকে সম্পূর্ণ ইংরেজি ভাষার দৈনিকে রূপান্তরিত করেন! ফলে আইনটি এই পত্রিকার ওপর প্রয়োগ করা যায়নি এবং সরকার চরম অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে।
উদাহরণ 3
১৮৮৩ সালের ইলবার্ট বিল বিতর্কের মূল বিষয় কী ছিল এবং এর থেকে ভারতীয়রা কী শিক্ষা লাভ করেছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

ইলবার্ট বিল (১৮৮৩) ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার নগ্ন বর্ণবৈষম্যকে সবার সামনে উন্মোচিত করে দেয়: ১. বিতর্কের বিষয়: তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী মফস্বলের কোনো ভারতীয় জেলা জজ কোনো শ্বেতাঙ্গ বা ইউরোপীয় আসামির বিচার করতে পারতেন না। লর্ড রিপনের আইন সচিব স্যার সি. পি. ইলবার্ট ভারতীয় বিচারকদের শ্বেতাঙ্গদের বিচার করার সম-অধিকার দিয়ে একটি বিল আনেন। ২. শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী বিদ্রোহ: বিলের বিরুদ্ধে ইংরেজ চা-কর, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মচারীরা 'ইউরোপীয় ডিফেন্স অ্যাসোসিয়েশন' গঠন করে violently বিদ্রোহ ঘোষণা করে, রিপনকে লাঞ্ছিত করার চক্রান্ত করে। শেষ পর্যন্ত রিপন মাথা নত করে জুরির অর্ধেক সদস্য শ্বেতাঙ্গ রাখার আপস করেন। ৩. ভারতীয়দের ঐতিহাসিক শিক্ষা:

  • ব্রিটিশদের কথিত 'আইনের চোখে সবাই সমান' নীতি যে চরম মিথ্যা, তা ভারতীয়রা উপলব্ধি করেন।
  • শ্বেতাঙ্গরা কীভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের স্বার্থ আদায় করল, তা দেখে ভারতীয়রা বুঝতে পারেন যে অধিকার পেতে গেলে আঞ্চলিক প্রতিবাদ নয়, একটি স্থায়ী সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন গঠন করা একান্ত জরুরি।
উদাহরণ 4
জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে 'সুরক্ষা কপাট তত্ত্ব' (Safety Valve Theory) সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
'সুরক্ষা কপাট তত্ত্ব' অনুসারে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ছিল ব্রিটিশদের আত্মরক্ষার এক রাজনৈতিক চক্রান্ত: ১. তত্ত্বের দাবি: ১৯১৬ সালে লালা লাজপত রায় (এবং পরবর্তীতে রজনী পাম দত্ত) দাবি করেন যে, অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজ সিভিলিয়ান এ. ও. হিউম সিমলায় পুলিশের সাত খণ্ড গোপন গোয়েন্দা নথি দেখে নিশ্চিত হন যে দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষের কারণে কৃষকদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ আসন্ন। ২. বাষ্প নিষ্কাশনের কৌশল: এই সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে হিউম বড়লাট লর্ড ডাফরিনের পরামর্শে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের আলোচনার জন্য কংগ্রেস গড়ে তোলেন, যাতে ফুটন্ত বয়লারের বাষ্প সেফটি ভালভের মাধ্যমে নিরাপদে বের হয়ে যায়। ৩. আধুনিক মূল্যায়ন: আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই তত্ত্ব অতিরঞ্জিত। সুরেন্দ্রনাথের জাতীয় সম্মেলন প্রমাণ করে ভারতীয়রা নিজেরাই একটি সর্বভারতীয় প্ল্যাটফর্ম গড়ার দিকে এগোচ্ছিলেন; আর গোখলের মতে, হিউম ছিলেন 'লাইটনিং কন্ডাক্টর'—যাঁকে রক্ষাঢাল হিসেবে ভারতীয়রা ব্যবহার করেছিলেন।
উদাহরণ 5
দাদাভাই নাওরোজী কীভাবে তাঁর 'সম্পদের নির্গমন তত্ত্বে' (Drain of Wealth) ব্রিটিশ শোষণের রূপ দেখিয়েছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৯০১ সালে প্রকাশিত 'Poverty and Un-British Rule in India' গ্রন্থে দাদাভাই নাওরোজী দেখান যে ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ সম্পদের একমুখী নির্গমন: ১. নির্গমনের অর্থ: দেশের মোট জাতীয় আয়ের একটি বিশাল অংশ কোনো বস্তুগত বা অর্থনৈতিক প্রতিদান ছাড়াই বাইরে (ব্রিটেনে) চলে যাওয়াকে সম্পদের নির্গমন বলা হয়। ২. নির্গমনের প্রধান উৎস:

  • স্বরাষ্ট্রীয় ব্যয় (Home Charges): ব্রিটিশ অফিসারদের উচ্চ বেতন, অবসরকালীন পেনশন এবং লন্ডনে ভারত সচিবের অফিসের ব্যয়।
  • রেলে নিশ্চিত মুনাফা: ভারতীয় করদাতার টাকা থেকে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের নিশ্চিত ৫% মুনাফা প্রদান।
  • একতরফা রপ্তানি: ভারত থেকে কাঁচামাল বাইরে যেত কিন্তু তার অর্থমূল্য ভারতের উন্নয়নে ব্যয় না হয়ে ব্রিটিশদের ঋণ পরিশোধে লাগত। ৩. ফলাফল: এই নির্গমনের ফলে ভারতের সঞ্চিত মূলধন পুরোপুরি ধ্বংস হয়, যার কারণে দেশে বারংবার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্য স্থায়ী রূপ ধারণ করে।
উদাহরণ 6
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের প্রকৃত সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ব্রিটিশরা কী সরকারি অজুহাত দিয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

লর্ড কার্জনের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল এক অত্যন্ত কুৎসিত সাম্রাজ্যবাদী বিভাজন চক্রান্ত: ১. সরকারি অজুহাত (প্রশাসনিক সুবিধা): ব্রিটিশরা প্রচার করেছিল যে বাংলা, বিহার ও ওড়িশা নিয়ে গঠিত প্রায় ৮ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল প্রদেশকে একজন ছোটলাটের (লেফটেন্যান্ট গভর্নর) পক্ষে সুচারুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ২. আসল সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য (বিভাজন ও শাসন):

  • জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করা: বাংলা ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান প্রাণকেন্দ্র। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের ঐক্যে ফাটল ধরানোই ছিল ব্রিটিশদের মূল উদ্দেশ্য। স্বরাষ্ট্র সচিব রিজলে পরিষ্কার লিখেছিলেন: "যুক্ত বাংলা একটি শক্তি; বিভক্ত বাংলা বিভিন্ন দিকে টানবে।"
  • বাঙালিদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা: পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি ও ওড়িয়া ভাষাভাষীদের প্রাধান্য দিয়ে বাঙালিদের সংখ্যালঘুতে নামিয়ে আনা হয়।
  • সাম্প্রদায়িক বিভাজন: পূর্ববঙ্গে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের জন্য আলাদা সুযোগের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে চিরস্থায়ী ধর্মীয় অনৈক্য তৈরি করা।
উদাহরণ 7
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কীভাবে রাখীবন্ধন উৎসবকে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক করেছিলেন?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর যেদিন বঙ্গভঙ্গ আইন কার্যকর হয়, সেদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঐতিহ্যবাহী রাখীবন্ধন উৎসবকে এক অনন্য জাতীয় প্রতিরোধের হাতিয়ারে পরিণত করেন: ১. ঐক্যের শপথ: রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ গঙ্গাস্নান করে পরস্পরের কবজিতে হলুদ রাখী পরিয়ে দেন। এটি ছিল এই অঙ্গীকার যে কাগজের আইনে ব্রিটিশরা বাংলার আত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐক্যকে বিভক্ত করতে পারবে না। ২. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: হিন্দু ও মুসলিমরা একে অপরকে রাখী পরিয়ে ভ্রাতৃত্বের শপথ নেন, যা কার্জনের সাম্প্রদায়িক বিভাজন নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। ৩. জনজাগরণমূলক সঙ্গীত: রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে পদযাত্রায় গাওয়া হয় তাঁর সদ্য রচিত সঙ্গীত "বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।" এটি স্বদেশী আন্দোলনকে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক আবেগের তুঙ্গে পৌঁছে দেয়।
উদাহরণ 8
১৯০৭ সালের সুরাট বিভাজনের মূল কারণ ও ঐতিহাসিক ফলাফল কী ছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১৯০৭ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে নরমপন্থী ও চরমপন্থীদের মধ্যে চরম ফাটল দেখা দেয়: ১. মূল কারণসমূহ:

  • বয়কটের পরিধি: চরমপন্থীরা বয়কট আন্দোলনকে সারা ভারতে বিস্তার এবং সরকারি স্কুল, আদালত ও আইন পরিষদ পর্যন্ত প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন; নরমপন্থীরা একে কেবল বাংলায় এবং বিলিতি পণ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন।
  • স্বরাজের সংজ্ঞা: নরমপন্থীরা চাইতেন সাম্রাজ্যের অধীনে স্বায়ত্তশাসন (Dominion Status); আর চরমপন্থীরা চাইতেন পূর্ণ স্বরাজ।
  • সভাপতি নির্বাচন: নরমপন্থীদের প্রার্থী ছিলেন ড. রাসবিহারী ঘোষ এবং চরমপন্থীদের প্রার্থী ছিলেন লালা লাজপত রায়। এই নিয়ে চরম উত্তেজনা ও হাতাহাতি বাধে। ২. ফলাফল: কংগ্রেস থেকে চরমপন্থীদের বহিষ্কার করা হয় এবং নরমপন্থীরা একক আধিপত্য কায়েম করে। এর ফলে জাতীয় কংগ্রেস জনবিচ্ছিন্ন হয়ে দুর্বল পড়ে এবং ব্রিটিশরা চরমপন্থী নেতাদের (তিলক, লাজপত রায়) ওপর তীব্র দমনপীড়ন শুরু করার সুবর্ণ সুযোগ পায়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬) ও জমিদারী সভাকে (১৮৩৮) গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা ১৮৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটিই ছিল নীতি নিয়ে আলোচনাকারী প্রথম সভা। জমিদারী সভা ১৮৩৮ সালে বিশেষভাবে জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় গড়ে উঠেছিল।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৮৭৮ সালের ভার্নাকুলার প্রেস অ্যাক্ট সব সংবাদপত্রের ওপর জারি হয়েছিল বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

এই আইনটি কেবল দেশীয় ভারতীয় ভাষার পত্রিকার ওপর প্রযোজ্য ছিল। ইংরেজি ভাষার পত্রিকাগুলি আইনের বাইরে ছিল বলেই অমৃতবাজার পত্রিকা রাতারাতি ইংরেজি হয়ে নিজেকে বাঁচিয়েছিল।

সাধারণ ভুল ধারণা

কলকাতার জাতীয় সম্মেলন ও বোম্বাইয়ের জাতীয় কংগ্রেসকে এক মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় ১৮৮৩ ও ১৮৮৫ সালের জাতীয় সম্মেলনের উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৮৮৫ সালের ডিসেম্বরে কলকাতায় দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন চলার কারণেই তিনি বোম্বাই অধিবেশনে থাকতে পারেননি।

সাধারণ ভুল ধারণা

এ. ও. হিউমকে জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক। প্রথম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন বাঙালি আইনজীবী উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (W.C. Bonnerjee)।

সাধারণ ভুল ধারণা

'সেফটি ভালভ' এবং 'লাইটনিং কন্ডাক্টর' তত্ত্বের প্রবক্তাদের নাম গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সেফটি ভালভ তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন লালা লাজপত রায় (১৯১৬)। আর লাইটনিং কন্ডাক্টর (বিদ্যুৎ পরিবাহী) তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন নরমপন্থী নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলে (১৯১৩)।

সাধারণ ভুল ধারণা

স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনকে সম্পূর্ণ একই অর্থবহ ভাবা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

বয়কট ছিল নেতিবাচক দিক—বিলিতি বস্ত্র, লবণ ও সামগ্রী বর্জন করা। আর স্বদেশী ছিল ইতিবাচক গঠনমূলক দিক—দেশীয় শিল্প, তাঁত, সাবান, রাসায়নিক ও বিদ্যালয় গড়ে তোলা।

সাধারণ ভুল ধারণা

১৯১১ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ রদ করেছিলেন বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেছিলেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করেন তৎকালীন বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ এবং তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ।

ভারতে জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশের রূপরেখা (১৮৩৬–১৯১১)

পশ্চিমবঙ্গ পর্ষদ অষ্টম শ্রেণি ইতিহাস • অধ্যায় ৬ কনসেপ্ট ম্যাপ ভারতে জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ (১৮৩৬–১৯১১) অতীত ও ঐতিহ্য অধ্যায় ৬ পর্ব ১ (১৮৩৬–৮৪) প্রাক্-কংগ্রেস পর্ব সভা-সমিতির যুগ ও জাতীয় চেতনা প্রথম রাজনৈতিক সমিতি • বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা (১৮৩৬) • জমিদারী সভা (১৮৩৮) সাংস্কৃতিক ও আঞ্চলিক সংস্থা • হিন্দু মেলা (১৮৬৭, নবগোপাল) • দেশীয় শিল্প ও শরীরচর্চা • পুনা সার্বজনীন সভা (১৮৭০) ভারত সভা (১৮৭৬) • সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় • অ্যালবার্ট হলে প্রতিষ্ঠা • সিভিল সার্ভিস আন্দোলন ঐতিহাসিক মাইলফলক ১৮৮৩ ও ১৮৮৫ সালের কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রত্যক্ষ মহড়া ছিল। অনুঘটক (১৮৭৭–৮৪) ঔপনিবেশিক দমননীতি লিটনের আইন ও ইলবার্ট বিল বিতর্ক সাম্রাজ্যবাদী ঔদ্ধত্য • দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিল্লি দরবার (১৮৭৭) • আই.সি.এস বয়স হ্রাস (২১ থেকে ১৯) দমনমূলক আইন • দেশীয় সংবাদপত্র আইন (১৮৭৮) • অমৃতবাজার পত্রিকা রাতারাতি ইংরেজি • বৈষম্যমূলক অস্ত্র আইন (১৮৭৮) ইলবার্ট বিল বিতর্ক (১৮৮৩) • ভারতীয় বিচারকদের সম-অধিকার • শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবিদ্বেষী বিদ্রোহ • লর্ড রিপনের আপসমূলক পিছুহটা ঐতিহাসিক শিক্ষা ইলবার্ট বিল বিতর্কে শ্বেতাঙ্গদের সংঘবদ্ধতা দেখিয়ে দেয় যে, অধিকার আদায়ে ভারতীয়দের একটি সর্বভারতীয় মঞ্চ অপরিহার্য। পর্ব ২ (১৮৮৫–০৫) কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা নরমপন্থী ৩-পি ও সম্পদ নির্গমন বোম্বাই অধিবেশন (১৮৮৫) • গোকুলদাস তেজপাল কলেজ • উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় • ৭২ জন প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত বিতর্ক • অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম • সেফটি ভালভ তত্ত্ব (লালা লাজপত) • লাইটনিং কন্ডাক্টর (গোখলে) অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ • দাদাভাব নাওরোজী: ড্রেন অফ ওয়েল্থ • রমেশচন্দ্র দত্ত: Economic History • আবেদন-নিবেদন নীতি (3Ps) নরমপন্থীদের অবদান সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি, ব্রিটিশ শোষণের অর্থনৈতিক স্বরূপ উন্মোচন এবং সর্বভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। পর্ব ৩ (১৯০৫–১১) স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গ ও চরমপন্থী ধারা কার্জনের বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) • হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে আঘাত • কার্যকর: ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ স্বদেশী ও বয়কট • বিলিতি বস্ত্র ও লবণ বর্জন • বেঙ্গল কেমিক্যাল (প্রফুল্লচন্দ্র রায়) • বঙ্গলক্ষ্মী কটন মিলস সংস্কৃতি ও শিক্ষা • রাখীবন্ধন উৎসব (রবীন্দ্রনাথ) • জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (১৯০৬) • লাল-বাল-পাল ও সুরাট ভাঙন চূড়ান্ত বিজয় (১৯১১) গণআন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় এবং সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
১. কংগ্রেস-পূর্ব সভা-সমিতির সূচনা: ১৮৩৬ সালে বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা ও ১৮৩৮ সালে জমিদারী সভার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির সূচনা ঘটে এবং ১৮৭৬ সালে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারত সভা একে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সর্বভারতীয় গণস্বার্থের মঞ্চে রূপান্তরিত করে।
মূল বিষয় 2
২. সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ: নবগোপাল মিত্র ও রাজনারায়ণ বসুর প্রতিষ্ঠিত হিন্দু মেলা (১৮৬৭) দেশীয় শিল্প, শরীরচর্চা, স্বদেশী পণ্য ও জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে জাতীয়তাবোধকে বাঙালির আত্মিক সংস্কারে পরিণত করে।
মূল বিষয় 3
৩. লর্ড লিটনের গণবিরোধী নীতি: দুর্ভিক্ষের মাঝে ১৮৭৭ সালের দিল্লির জাঁকজমক দরবার, ১৮৭৮ সালের দেশীয় সংবাদপত্র আইন ও অস্ত্র আইন এবং সিভিল সার্ভিসে বয়স হ্রাস (২১ থেকে ১৯) ভারতীয়দের মধ্যে সর্বভারতীয় ক্ষোভের সঞ্চার করে।
মূল বিষয় 4
৪. ইলবার্ট বিলের শিক্ষা (১৮৮৩): শ্বেতাঙ্গদের চরম বর্ণবিদ্বেষী বিদ্রোহের মুখে ভারতীয় বিচারকদের অধিকার খর্ব হওয়ায় ভারতীয়রা প্রত্যক্ষ করেন যে, অধিকার রক্ষায় একটি ঐক্যবদ্ধ সর্বভারতীয় সংগঠন অপরিহার্য।
মূল বিষয় 5
৫. জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা (১৮৮৫): এ. ও. হিউমের উদ্যোগে বোম্বাইয়ের গোকুলদাস তেজপাল কলেজে ৭২ জন প্রতিনিধি নিয়ে সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে জাতীয় কংগ্রেসের সূচনা ঘটে, যাকে গোখলে 'লাইটনিং কন্ডাক্টর' বলে অভিহিত করেন।
মূল বিষয় 6
৬. নরমপন্থী পর্যায় ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ: ১৮৮৫–১৯০৫ পর্বে নরমপন্থীরা ৩-পি নীতিতে আন্দোলন করেন এবং দাদাভাই নাওরোজী ও রমেশচন্দ্র দত্ত ব্রিটিশদের 'সম্পদের নির্গমন তত্ত্ব' (Drain of Wealth) প্রকাশ করে ঔপনিবেশিক শোষণের ভিত্তি ভেঙে দেন।
মূল বিষয় 7
৭. বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন (১৯০৫): লর্ড কার্জনের চক্রান্তমূলক বাংলা বিভাজনের প্রতিবাদে শুরু হয় ঐতিহাসিক স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন, রবীন্দ্রনাথের রাখীবন্ধন উৎসব এবং জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠন।
মূল বিষয় 8
৮. চরমপন্থার বিকাশ ও বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১): লাল-বাল-পাল ও তিলকের 'স্বরাজ' মন্ত্রের প্রভাবে আন্দোলন গণসংগ্রামে পরিণত হয়, সুরাট বিভাজন সত্ত্বেও জনতার চাপে ১৯১১ সালে ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ রদ করতে এবং রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরাতে বাধ্য হয়।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারত সভার (ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন) প্রধান উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে প্রতিষ্ঠিত ভারত সভার চারটি প্রধান লক্ষ্য ছিল: (১) সমগ্র ভারতে শক্তিশালী ও সংহত জনমত তৈরি করা, (২) অভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সমস্ত ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করা, (৩) হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা, এবং (৪) সাধারণ জনগণকে রাজনৈতিক আন্দোলনে শামিল করা।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষিত চারটি ঐতিহাসিক লক্ষ্যের কথা স্মরণ করো।
2
১৮৭৭ সালে আই.সি.এস. পরীক্ষায় বসার বয়সসীমা কমানোয় ভারতীয়দের কী ক্ষতি হয়েছিল?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: সর্বোচ্চ বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ বছর করা হয়েছিল। পরীক্ষা কেবল লন্ডনে হতো এবং প্রশ্নপত্র হতো লাতিন ও গ্রিক ভাষায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভারতীয় ছাত্রদের লন্ডনে গিয়ে ইংরেজদের সাথে প্রতিযোগিতা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যার ফলে উচ্চ সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের প্রবেশের পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে যায়।
বয়সসীমা, পরীক্ষার স্থান এবং পাঠ্যক্রমের ভাষার কথা বিবেচনা করো।
3
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে 'সেফটি ভালভ তত্ত্ব' ও 'লাইটনিং কন্ডাক্টর তত্ত্বের' মূল পার্থক্য কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: 'সেফটি ভালভ তত্ত্ব' (লালা লাজপত রায়) দাবি করে যে ব্রিটিশরা সম্ভাব্য কৃষক বিদ্রোহ আটকাতে আত্মরক্ষার স্বার্থে হিউমের মাধ্যমে কংগ্রেস গড়েছিল। অন্যদিকে 'লাইটনিং কন্ডাক্টর তত্ত্ব' (গোপালকৃষ্ণ গোখলে) বলে যে ভারতীয় নেতারাই ব্রিটিশদের দমনপীড়ন থেকে নবজাতক কংগ্রেসকে বাঁচাতে হিউমের ইংরেজ পরিচয়কে বজ্রপাত নিরোধক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
একটি তত্ত্বে ব্রিটিশ স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, অন্যটিতে ভারতীয় নেতাদের দূরদর্শিতাকে।
4
সম্পদের নির্গমনে 'স্বরাষ্ট্রীয় ব্যয়' বা 'হোম চার্জেস' বলতে দাদাভাই নাওরোজী কী বুঝিয়েছিলেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: হোম চার্জেস হলো ভারত শাসনের নাম করে ইংল্যান্ডে প্রতি বছর প্রেরিত বিপুল পরিমাণ অর্থ, যার মধ্যে ছিল: (১) লন্ডনে ভারত সচিব ও তাঁর দপ্তরের সমস্ত খরচ, (২) ইংল্যান্ডে বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ বেসামরিক ও সামরিক কর্মচারীদের মোটাতাজা পেনশন ও ছুটি ভাতা, এবং (৩) ভারতের রেলপথ ও পাবলিক ঋণের ওপর নিশ্চিত সুদ।
ভারত থেকে লন্ডনে ব্রিটিশদের নিজস্ব গৃহ-সরকারের জন্য পাঠানো অর্থের হিসাব।
5
১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের সাম্রাজ্যের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নিয়েছিল কেন?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর: কলকাতা ও বাংলা ছিল ভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ, স্বদেশী বয়কট ও সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের প্রধান অগ্নিকুণ্ড। বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে ব্রিটিশ প্রশাসনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে এবং উত্তর ভারতের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতীক দিল্লিতে শাসন সুরক্ষিত করতেই রাজধানী স্থানান্তর করা হয়েছিল।
কলকাতার বিপ্লবী রাজনৈতিক উত্তাপ এড়িয়ে চলা এবং দিল্লির ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কেন্দ্রিকতা।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।