ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের প্রতিরোধ ছিল মূলত আঞ্চলিক, উপজাতীয় বা কৃষক বিদ্রোহের রূপ ধারণ করত। কিন্তু পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভবের ফলে উনিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে সাংবিধানিক পথে আন্দোলন ও সভা-সমিতির রাজনীতির সূচনা ঘটে। ঐতিহাসিক অনিল শীল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধকে 'সভা-সমিতির যুগ' বলে অভিহিত করেছেন।
ভারতের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে স্বীকৃত বঙ্গভাষা প্রকাশিকা সভা, যা ১৮৩৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা রামমোহন রায়ের অনুগামী গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ, কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং দ্বারকানাথ ঠাকুরের উদ্যোগে এই সভা গড়ে ওঠে। সরকারি করনীতি, বিশেষ করে নিষ্কর বা দেবোত্তর জমির ওপর ব্রিটিশদের অন্যায় খাজনা বসানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই সভা প্রতিবাদ জানায়। ঐতিহাসিক ড. যোগেশচন্দ্র বাগল একে "বাঙলা তথা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান" বলে আখ্যায়িত করেছেন।
১৮৩৮ সালে রাজা রাধাকান্ত দেব ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিদারী সভা (Landholders' Society)। এই সভার মূল লক্ষ্য ছিল লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) দ্বারা প্রদত্ত জমিদারদের সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করা। যদিও এটি ছিল একটি ধনী ভূস্বামীদের শ্রেণিগত সংগঠন, তবুও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালানো এবং লন্ডনে জন ক্রফোর্ডকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দরবার করার সূচনা এর মাধ্যমেই ঘটেছিল।
জমিদারদের সংকীর্ণ স্বার্থের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ ও কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরার জন্য ইয়ং বেঙ্গল গোষ্ঠীর রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং ব্রিটিশ সমাজসেবক জর্জ থম্পসনের উদ্যোগে ১৮৪৩ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটি।
পরবর্তীতে এই দুই ভিন্নমুখী সংগঠনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে ১৮৫১ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ভারত সভা নামেও পরিচিত ছিল)। রাজা রাধাকান্ত দেব ছিলেন এর সভাপতি এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদক। ১৮৫৩ সালের চার্টার অ্যাক্ট বা সনদ আইনের পূর্বে এই সভা ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্মারকলিপি পাঠিয়ে আইন পরিষদে ভারতীয়দের প্রতিনিধিত্ব, বিচার ও শাসন বিভাগের পৃথকীকরণ এবং লবণের ওপর কর হ্রাসের জোর দাবি জানায়।
জাতীয়তাবাদ কেবল রাজনৈতিক দাবিপত্র পেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর একটি সুগভীর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও শারীরিক ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। এই লক্ষ্য নিয়ে ১৮৬৭ সালে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু মেলা (যার আদি নাম ছিল চৈত্র মেলা)।
রাজনারায়ণ বসুর 'জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা' ও পুস্তিকার প্রেরণায় নবগোপাল মিত্র (যাঁকে দেশবাসী শ্রদ্ধায় 'ন্যাশনাল মিত্র' বলতেন) এবং ঠাকুর পরিবারের গণেন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় হিন্দু মেলা প্রতি বছর আয়োজিত হতো। হিন্দু মেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল তিনটি:
- আত্মশক্তি ও দেশীয় শিল্পের বিকাশ: মেলায় দেশীয় তাঁতের বস্ত্র, মৃৎশিল্প, কুটিরশিল্প ও কৃষিদ্রব্যের প্রদর্শনী হতো, যা পরবর্তীতে স্বদেশী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
- শারীরিক সক্ষমতা ও বীরত্ব চর্চা: কুস্তি, লাঠিখেলা, তরবারি চালনা ও শরীরচর্চার প্রদর্শনী আয়োজন করে ইংরেজদের দেওয়া 'বাঙালিরা অলস ও ভীরু জাতি' অপবাদ ভেঙে ফেলা হতো।
- দেশপ্রেমমূলক সংস্কৃতির প্রসার: মেলায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও কবিতা পাঠ হতো। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত জাতীয় সঙ্গীত "মিলে সবে ভারত সন্তান, একতান মনপ্রাণ, গাও ভারতের জয়" এবং দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের "মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি" হিন্দু মেলার মঞ্চ থেকেই জাতির প্রাণে দেশপ্রেমের জোয়ার এনেছিল।
ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন প্রধানত ভূস্বামী ও অভিজাতদের স্বার্থ দেখায় উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত—আইনজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক ও সাংবাদিকদের নিজস্ব একটি মঞ্চের প্রয়োজন তীব্র হয়ে ওঠে। এই ঐতিহাসিক তাগিদে ১৮৭৬ সালের ২৬ জুলাই কলকাতার অ্যালবার্ট হলে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও আনন্দমোহন বসুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভা। এর সাথে যুক্ত ছিলেন শিবনাথ শাস্ত্রী ও দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভারত সভার চারটি ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য ঘোষণা করেছিলেন:
- সমগ্র ভারতে একটি শক্তিশালী ও সুসংবদ্ধ জনমত গড়ে তোলা।
- অভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থ ও আকাঙ্খার ভিত্তিতে ভারতের বিভিন্ন জাতি ও জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করা।
- হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর মৈত্রী ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা।
- সাধারণ জনসাধারণকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে শামিল করা।
ভারত সভা অল্পকালের মধ্যেই ১৮৭৭–৭৮ সালের সিভিল সার্ভিস আন্দোলন, আসামের চা-বাগানের কুলিদের ওপর অত্যাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ১৮৮৩ সালের ইলবার্ট বিল আন্দোলনের পুরোভাগে থেকে সর্বভারতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
বাংলার পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য প্রেসিডেন্সিতেও আঞ্চলিক সংগঠনের বিকাশ ঘটেছিল:
- পুনা সার্বজনীন সভা (১৮৭০): মহারাষ্ট্রে মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ও জি. ভি. যোশীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করত।
- মাদ্রাজ মহাজন সভা (১৮৮৪): এম. বীররাঘবাচারিয়ার ও পি. আনন্দ চার্লুর উদ্যোগে দক্ষিণ ভারতে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়।
- বোম্বাই প্রেসিডেন্সি অ্যাসোসিয়েশন (১৮৮৫): ফিরোজশাহ মেহতা, কে. টি. তেলং এবং বদরুদ্দিন তায়েবজির (যাঁদের 'বোম্বাই ত্রয়ী' বলা হতো) নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে।
এই সমস্ত আঞ্চলিক সংগঠনকে এক ছাতার তলায় আনতে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভারত সভা ১৮৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় প্রথম জাতীয় সম্মেলন (National Conference) আহ্বান করে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শতাধিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এরপর ১৮৮৫ সালের ২৫–২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন। এই সম্মেলনই ছিল কার্যত ১৮৮৫ সালের বোম্বাই কংগ্রেসের প্রকৃত মহড়া ও অনুপ্রেরণা।