Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 13
আনুমানিক সময়: 50 Mins
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যপুস্তক "আমাদের পৃথিবী"-র চতুর্থ অধ্যায় "বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ" (Pressure Belts and Winds)-এর প্রামাণ্য ও সর্বাঙ্গীণ স্টাডি গাইডে স্বাগত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হলো বিভিন্ন গ্যাসের এক বিশাল ও গতিশীল মহাসমুদ্র, যার নিজস্ব ভর ও ওজন রয়েছে এবং যা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূপৃষ্ঠের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে অবিরাম নিম্নমুখী চাপ প্রয়োগ করে। সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ হলো ১০১৩.২৫ মিলিবার (বা টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটারে ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের সমান)। ভূপৃষ্ঠে সূর্যরশ্মির পতনকোণের তারতম্য ও পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে বায়ুচাপের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়ে পৃথিবীব্যাপী ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় গঠিত হয়েছে: তাপজনিত নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রাম্স ও ITCZ); গতিজনিত কর্কটীয় ও মকরীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (অশ্ব অক্ষাংশ); গতিজনিত সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়; এবং তাপজনিত সুমেরু ও কুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয়। বায়ুচাপের সমতা রক্ষার জন্য উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে অনুভূমিকভাবে বাতাস প্রবাহিত হয়, যাকে আমরা বায়ুপ্রবাহ বলি। এই প্রবাহ চাপ ঢাল বল (PGF) দ্বারা চালিত হলেও পৃথিবীর আবর্তনজনিত কোরিওলিস বলের প্রভাবে দিক পরিবর্তন করে, যা ফেরেলের সূত্র (উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বাঁকা) এবং বায়স ব্যালটের সূত্র মেনে চলে। এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে প্রবাহিত হয় তিনটি প্রধান নিয়ত বায়ু: আয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু (যা মহাদেশের পশ্চিমে ক্রান্তীয় মরুভূমি গড়ে তোলে), পশ্চিমা বায়ু (যার কারণে দক্ষিণ গোলার্ধের উন্মুক্ত সমুদ্রে সৃষ্টি হয় গর্জনশীল চল্লিশা, ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ ও চিৎকারকারী ষাট) এবং অতিশীতল মেরু বায়ু। এছাড়াও রয়েছে দিন-রাতের সাময়িক বায়ু (সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু, অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক পার্বত্য বায়ু), ঋতুভিত্তিক মৌসুমি বায়ু, বিভিন্ন মহাদেশের স্থানীয় বায়ু (লু, চিনুক, ফন, সিরোক্কো, হারমাটান, মিস্ট্রাল, বোরা, ব্লিজার্ড) এবং বিধ্বংসী ঘূর্ণবাত ও শান্ত আবহাওয়ার প্রতিপ ঘূর্ণবাত। এই অধ্যায়ে ৫টি সুবিন্যস্ত মডিউলে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, তথ্যবহুল রেসপনসিভ ভেক্টর SVG মানচিত্র, ৮টি বায়ুমণ্ডলীয় ও ভৌগোলিক সূত্র, ৮টি বিশ্লেষণধর্মী পাঠ্যপুস্তকীয় গাণিতিক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুল সংশোধন, ৮টি মূল সারসংক্ষেপ বিন্দু, ৮টি টেকওয়ে, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি CBT ডায়াগনস্টিক বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)।

🌬️ অদৃশ্য দানবের ওজন ও দিগন্তবিস্তৃত ঝড়ের গর্জন: বাতাসের রূপ ও শক্তির রহস্য!

তোমরা কি জানো, এই মুহূর্তে তোমাদের মাথার ওপরে থাকা বাতাস প্রতি বর্গসেন্টিমিটারে প্রায় ১ কিলোগ্রাম চাপ দিচ্ছে—অর্থাৎ তোমাদের পুরো শরীরের ওপর প্রায় ১০ থেকে ১৫ টন বাতাসের অদৃশ্য ওজন চেপে বসে আছে?

অথচ তোমরা তা টেরই পাও না, কারণ তোমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্ত ও তরলের চাপ বাইরের এই বায়ুমণ্ডলীয় চাপকে অবিকল সমানভাবে প্রতিহত করে!

জাহাজের পাল নিস্তেজ হয়ে যাওয়া নিরক্ষীয় শান্তবলয় (Doldrums) এবং তৃষ্ণার্ত নাবিকদের ঘোড়া জলে ফেলে দেওয়ার নির্মম অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes) থেকে শুরু করে দক্ষিণ সমুদ্রের বুক কাঁপানো গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties) ও গাঙ্গেয় সমভূমির তপ্ত লু (Loo)—চলো শুরু করা যাক বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ-র এক রোমাঞ্চকর পাঠ্য ভৌগোলিক অন্বেষণ!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অনুমোদিত অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যপুস্তক "আমাদের পৃথিবী"-র চতুর্থ অধ্যায় "বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ" (Pressure Belts and Winds)-এর প্রামাণ্য ও সর্বাঙ্গীণ স্টাডি গাইডে স্বাগত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল হলো বিভিন্ন গ্যাসের এক বিশাল ও গতিশীল মহাসমুদ্র, যার নিজস্ব ভর ও ওজন রয়েছে এবং যা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানে ভূপৃষ্ঠের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে অবিরাম নিম্নমুখী চাপ প্রয়োগ করে। সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ হলো ১০১৩.২৫ মিলিবার (বা টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটারে ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের সমান)। ভূপৃষ্ঠে সূর্যরশ্মির পতনকোণের তারতম্য ও পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে বায়ুচাপের ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়ে পৃথিবীব্যাপী ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় গঠিত হয়েছে: তাপজনিত নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (নিরক্ষীয় শান্তবলয় বা ডোলড্রাম্স ও ITCZ); গতিজনিত কর্কটীয় ও মকরীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (অশ্ব অক্ষাংশ); গতিজনিত সুমেরুবৃত্ত ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়; এবং তাপজনিত সুমেরু ও কুমেরু দেশীয় উচ্চচাপ বলয়। বায়ুচাপের সমতা রক্ষার জন্য উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে অনুভূমিকভাবে বাতাস প্রবাহিত হয়, যাকে আমরা বায়ুপ্রবাহ বলি। এই প্রবাহ চাপ ঢাল বল (PGF) দ্বারা চালিত হলেও পৃথিবীর আবর্তনজনিত কোরিওলিস বলের প্রভাবে দিক পরিবর্তন করে, যা ফেরেলের সূত্র (উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বাঁকা) এবং বায়স ব্যালটের সূত্র মেনে চলে। এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বজুড়ে প্রবাহিত হয় তিনটি প্রধান নিয়ত বায়ু: আয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু (যা মহাদেশের পশ্চিমে ক্রান্তীয় মরুভূমি গড়ে তোলে), পশ্চিমা বায়ু (যার কারণে দক্ষিণ গোলার্ধের উন্মুক্ত সমুদ্রে সৃষ্টি হয় গর্জনশীল চল্লিশা, ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ ও চিৎকারকারী ষাট) এবং অতিশীতল মেরু বায়ু। এছাড়াও রয়েছে দিন-রাতের সাময়িক বায়ু (সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু, অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক পার্বত্য বায়ু), ঋতুভিত্তিক মৌসুমি বায়ু, বিভিন্ন মহাদেশের স্থানীয় বায়ু (লু, চিনুক, ফন, সিরোক্কো, হারমাটান, মিস্ট্রাল, বোরা, ব্লিজার্ড) এবং বিধ্বংসী ঘূর্ণবাত ও শান্ত আবহাওয়ার প্রতিপ ঘূর্ণবাত। এই অধ্যায়ে ৫টি সুবিন্যস্ত মডিউলে রয়েছে ২৫টি শিক্ষণীয় উপবিভাগ, তথ্যবহুল রেসপনসিভ ভেক্টর SVG মানচিত্র, ৮টি বায়ুমণ্ডলীয় ও ভৌগোলিক সূত্র, ৮টি বিশ্লেষণধর্মী পাঠ্যপুস্তকীয় গাণিতিক উদাহরণ, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও সাধারণ ভুল সংশোধন, ৮টি মূল সারসংক্ষেপ বিন্দু, ৮টি টেকওয়ে, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি CBT ডায়াগনস্টিক বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ)।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • বায়ুমণ্ডলের উপাদানসমূহ (নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলীয় বাষ্প)-এর প্রাথমিক জ্ঞান।
  • বায়ুর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে প্রসারণ ও ঘনত্ব হ্রাস এবং শীতল হলে সংকোচন ও ঘনত্ব বৃদ্ধির ধারণা।
  • পশ্চিম থেকে পূর্বে পৃথিবীর আবর্তন গতি এবং অক্ষ ও অক্ষাংশের (নিরক্ষরেখা, কর্কটক্রান্তি, মকরক্রান্তি) পরিচিতি।
  • বল ও চাপের মৌলিক ধারণা ($ ext{চাপ} = ext{বল} / ext{ক্ষেত্রফল}$) এবং মাধ্যাকর্ষণের টান।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • বায়ুমণ্ডলীয় চাপের সংজ্ঞা, টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটারের কার্যপদ্ধতি এবং সেমি পারদস্তম্ভ থেকে মিলিবারে (mb) রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • বায়ুচাপের তারতম্যের চারটি প্রধান নিয়ন্ত্রক: উষ্ণতা, উচ্চতা, জলীয় বাষ্প এবং পৃথিবীর আবর্তন গতির প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • পৃথিবীর ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয়ের ভৌগোলিক অবস্থান এবং এদের উৎপত্তি (তাপজনিত বনাম গতিজনিত) সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতে পারবে।
  • চাপবলয়গুলির ঋতুভিত্তিক অবস্থান পরিবর্তন এবং ভূমধ্যসাগরীয় বৃষ্টিপাত ও ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে পারবে।
  • চাপ ঢাল বল (PGF), কোরিওলিস বল, ফেরেলের সূত্র এবং বায়স ব্যালটের সূত্রের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারবে।
  • নিয়ত বায়ুপ্রবাহের শ্রেণিবিভাগ (আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু, মেরু বায়ু) এবং দক্ষিণ গোলার্ধের গর্জনশীল চল্লিশা, ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ ও চিৎকারকারী ষাটের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • সাময়িক বায়ু (সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু, অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক বায়ু, মৌসুমি বায়ু) এবং বিশ্বখ্যাত স্থানীয় বায়ুগুলির (লু, চিনুক, ফন, হারমাটান, মিস্ট্রাল) বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করতে পারবে।
  • ঘূর্ণবাত ও প্রতিপ ঘূর্ণবাতের বায়ুর চাপ, আবর্তন দিক ও আবহাওয়ার তুলনা করতে পারবে এবং বাত-পতাকা ও অ্যানিমোমিটারের সাহায্যে বায়ুপ্রবাহ পরিমাপ বুঝতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. বায়ুচাপের ধারণা, তারতম্যের কারণ...
2 ২. পৃথিবীর সাতটি স্থায়ী বায়ুচাপ ব...
3 ৩. বায়ুপ্রবাহের কারণ ও নিয়ন্ত্রক...
4 ৪. নিয়ত বায়ু, সাময়িক বায়ু ও বিশ...
5 ৫. অনিয়মিত বায়ু, ঘূর্ণবাত-প্রতিপ...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. বায়ুচাপের ধারণা, তারতম্যের কারণ ও পরিমাপক যন্ত্র

১.১ বায়ুচাপের ধারণা ও প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ

বায়ু বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদানের একটি মিশ্রণ যার নিজস্ব নির্দিষ্ট ভর ও ওজন রয়েছে। পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের কারণে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অণুগুলি ভূপৃষ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয়। বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheric Pressure) হলো সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রতি একক ক্ষেত্রফলের ওপর উল্লম্বভাবে অবস্থিত সামগ্রিক বায়ুমণ্ডলীয় স্তম্ভের নিম্নমুখী ওজনের পরিমাপ।

সমুদ্রপৃষ্ঠে ৪৫° অক্ষাংশে এবং ০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বায়ুর চাপ ৭৬ সেমি (বা ৭৬০ মিলিমিটার) উঁচু পারদস্তম্ভকে ধরে রাখতে পারে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Standard Atmospheric Pressure) বলে। এর মান:

  • প্রমাণ বায়ুচাপ: ১০১৩.২৫ মিলিবার (mb) বা ১০১৩.২৫ হেক্টোপাস্কাল (hPa), যা প্রতি বর্গমিটারে প্রায় $১.০১৩ \times ১০^৫\text{ নিউটন}$ বলের সমান।
  • উচ্চচাপ (High Pressure): কোনো স্থানের বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবারের বেশি হলে তাকে উচ্চচাপ বলে (সমচাপ রেখায় ১০২০ mb, ১০২৪ mb ইত্যাদি দ্বারা চিহ্নিত)।
  • নিম্নচাপ (Low Pressure): কোনো স্থানের বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবারের কম হলে তাকে নিম্নচাপ বলে (সমচাপ রেখায় ১০০০ mb, ৯৯২ mb বা তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে ৯৬০ mb-এর নিচে নেমে যায়)।

১.২ ব্যারোমিটার: টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটার, ফোরটিন ও অ্যানিরয়েড ব্যারোমিটার

বায়ুর চাপ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রকে ব্যারোমিটার (Barometer) বলে:

ব্যারোমিটারের প্রকার কার্যপদ্ধতি বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার
টরিচেলির সাধারণ পারদ ব্যারোমিটার (১৬৪৩) পারদপূর্ণ একটি একমুখ বন্ধ কাঁচের নলকে উল্টে পারদপাত্রে স্থাপন করা হয়; নলের পারদস্তম্ভ বাইরের বাতাসের চাপ দ্বারা ভারসাম্যে থাকে। নলের শীর্ষে পারদহীন ফাঁকা স্থানকে "টরিচেলির শূন্যস্থান" (Torricellian Vacuum) বলে; এটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।
ফোরটিন ব্যারোমিটার (Fortin's Barometer) পারদস্তম্ভের নিখুঁত উচ্চতা পরিমাপের জন্য হাতির দাঁতের নির্দেশক ও ভার্নিয়ার স্কেলযুক্ত সমন্বিত পারদ ব্যারোমিটার। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের মানক যন্ত্র; অত্যন্ত নিখুঁত কিন্তু কাঁচ ও পারদ থাকায় সহজে স্থানান্তরযোগ্য নয়।
অ্যানিরয়েড ব্যারোমিটার (Aneroid Barometer) তরলহীন (গ্রিক a-neros = তরল ছাড়া); বাতাসশূন্য একটি স্থিতিস্থাপক ধাতব বাক্সের সংকোচন-প্রসারণের দ্বারা কাঁটা ঘুরে পাঠ দেয়। হালকা, টেকসই ও সহজে বহনযোগ্য; পর্বতারোহী, বিমানচালক (উচ্চতামাপক বা Altimeter হিসেবে) এবং জাহাজ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।

১.৩ বায়ুচাপের তারতম্যের কারণ: উষ্ণতা বনাম ঘনত্ব

ভূপৃষ্ঠের সব জায়গায় বায়ুচাপ সমান থাকে না। এর প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো বায়ুর তাপমাত্রা:

  • উষ্ণতার প্রভাব (ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক): বায়ু উত্তপ্ত হলে তার অণুগুলির গতিশক্তি বাড়ে এবং বাতাস প্রসারিত হয়। ফলে বায়ুর ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং তা হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই হালকা প্রসারিত বায়ু ভূপৃষ্ঠে কম চাপ দেয়, ফলে তাপজনিত নিম্নচাপ (Thermal Low) সৃষ্টি হয়।
  • শীতলতার প্রভাব: বাতাস ঠান্ডা হলে সংকুচিত ও ভারী হয়। এই ঘন ভারী বাতাস নিচের দিকে নেমে আসে এবং ভূপৃষ্ঠে জমা হয়ে তাপজনিত উচ্চচাপ (Thermal High) তৈরি করে।
  • মূল ভৌগোলিক নীতি: বায়ুর উষ্ণতা বাড়লে চাপ কমে, আর উষ্ণতা কমলে চাপ বাড়ে।

১.৪ উচ্চতার তারতম্য ও স্বাভাবিক পতন হার

বায়ু সংকোচনশীল হওয়ায় ওপরের সমস্ত বায়ুর চাপে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন নিচের স্তরের বায়ু সবচেয়ে বেশি ঘন ও ভারী হয়। যত ওপরে ওঠা যায়, বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব তত কমে যায়:

  • চাপ হ্রাসের হার: ক্ষোভমণ্ডলের নিচের অংশে প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রায় ১ সেমি পারদস্তম্ভের চাপ হ্রাস পায়, যা প্রতি ৩০০ মিটারে প্রায় ৩৪ মিলিবার (বা প্রতি ৮.৫-৯ মিটারে প্রায় ১ মিলিবার) কমার সমান।
  • উচ্চ পর্বতের অভিজ্ঞতা: মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় (৮,৮৪৮ মিটার) বায়ুর চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপের এক-তৃতীয়াংশেরও কম (মাত্র ৩১৪ মিলিবার) হয়ে যায়। ফলে সেখানে বাতাসের ঘনত্ব এত কম থাকে যে পর্বতারোহীদের শ্বাসকষ্ট হয় ও অতিরিক্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার নিতে হয়।

১.৫ জলীয় বাষ্পের প্রভাব: শুষ্ক বায়ু বনাম আর্দ্র বায়ু

অনেকেই মনে করেন জলে বাষ্প যোগ হলে বাতাস ভারী হয়, কিন্তু বাস্তবে আর্দ্র বায়ু শুষ্ক বায়ুর চেয়ে হালকা:

অ্যাভোগাড্রোর সূত্র ও আণবিক ভর:
১. শুষ্ক বায়ুর প্রধান উপাদান হলো নাইট্রোজেন ($\text{N}_২$, আণবিক ভর ২৮) এবং অক্সিজেন ($\text{O}_২$, আণবিক ভর ৩২)। ফলে শুষ্ক বায়ুর গড় আণবিক ভর প্রায় ২৮.৯৭ গ্রাম/মোল।
২. অন্যদিকে জলীয় বাষ্পের ($\text{H}_২\text{O}$) আণবিক ভর মাত্র $(২ \times ১) + ১৬ = \mathbf{১৮\text{ গ্রাম/মোল}}$।
৩. একই তাপমাত্রা ও চাপে সম-আয়তনের যেকোনো গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু থাকে। তাই বাতাসে জলীয় বাষ্প বাড়লে হালকা জলের অণু ভারী নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণুকে প্রতিস্থাপিত করে।
৪. ফলে আর্দ্র বাতাস শুষ্ক বাতাসের চেয়ে হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায় এবং সেখানে তীব্র নিম্নচাপ সৃষ্টি করে (যেমন—বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়)।

২. পৃথিবীর সাতটি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় ও তাদের অবস্থান পরিবর্তন

২.১ পৃথিবীর সাতটি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয়

ভূপৃষ্ঠে সূর্যরশ্মির অসম পতনজনিত তাপের পার্থক্য এবং পৃথিবীর আবর্তন গতির মিলিত প্রভাবে সমগ্র পৃথিবীব্যাপী ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় (Permanent Pressure Belts) গঠিত হয়েছে:

চাপ বলয়ের নাম অক্ষাংশীয় অবস্থান উৎপত্তির কারণ বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্য
১. নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় ৫° উত্তর – ৫° দক্ষিণ তাপজনিত সারা বছর লম্ব সূর্যরশ্মি, প্রচণ্ড উত্তাপ, হালকা বায়ুর উল্লম্ব পরিচালন উত্থান; অনুভূমিক বায়ুহীন শান্তবলয় বা ডোলড্রাম্স (Doldrums) ও ITCZ।
২. কর্কটীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় ২৫° উত্তর – ৩৫° উত্তর গতিজনিত নিরক্ষরেখা থেকে ওপরে ওঠা শীতল বায়ু এবং মেরুবৃত্ত থেকে আসা বায়ুর অধোগমন বা অবতরণ; মেঘহীন শুষ্ক শান্তবলয়; অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes); সাহারা ও থর মরুভূমি।
৩. মকরীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় ২৫° দক্ষিণ – ৩৫° দক্ষিণ গতিজনিত দক্ষিণ গোলার্ধে বায়ুর অবতরণ; শুষ্ক উচ্চচাপ; আটাকামা, কালাহারি ও অস্ট্রেলীয় মরুভূমি অঞ্চল।
৪. সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় ৬০° উত্তর – ৭০° উত্তর গতিজনিত পৃথিবীর আবর্তন গতির কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে বায়ুর বিচ্ছুরণ এবং উষ্ণ পশ্চিমা বায়ু ও শীতল মেরু বায়ুর সংঘর্ষে বায়ুর ঊর্ধ্বগমন; তীব্র সীমান্ত নিম্নচাপ।
৫. কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় ৬০° দক্ষিণ – ৭০° দক্ষিণ গতিজনিত অ্যান্টার্কটিকার চারপাশের উন্মুক্ত সমুদ্র বলয়ে তীব্র কেন্দ্রাতিগ বিক্ষেপ ও বায়ুর ঊর্ধ্বগমন; প্রবল সাইক্লোনিক ঘূর্ণাবর্ত।
৬. সুমেরু উচ্চচাপ বলয় ৮০° উত্তর – ৯০° উত্তর তাপজনিত তীব্র তীর্যক সূর্যরশ্মি ও দীর্ঘ মেরু রাত; প্রচণ্ড ঠান্ডায় বায়ু সংকুচিত ও ভারী হয়ে স্থায়ী উচ্চচাপ সৃষ্টি করে।
৭. কুমেরু উচ্চচাপ বলয় ৮০° দক্ষিণ – ৯০° দক্ষিণ তাপজনিত অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের তুষারাবৃত বরফভূমির ওপর চরম শৈত্য (মাইনাস ৮৯° সে পর্যন্ত); পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা তীব্র স্থায়ী তাপজনিত উচ্চচাপ।

২.২ নিরক্ষীয় শান্তবলয় (ডোলড্রাম্স) ও ITCZ

নিরক্ষরেখার উভয় পাশে ৫° উত্তর থেকে ৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে এই বলয়টি অবস্থিত:

  • পরিচলন উত্থান ও অনুভূমিক বায়ুর অভাব: সারা বছর সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেওয়ায় বাতাস প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে প্রসারিত ও হালকা হয় এবং সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়। ফলে ভূপৃষ্ঠের সমান্তরালে কোনো অনুভূমিক বায়ুপ্রবাহ অনুভূত হয় না। আবহাওয়া থাকে প্রায় শান্ত। তাই একে নিরক্ষীয় শান্তবলয় (Equatorial Calms) বা ডোলড্রাম্স (Doldrums) বলে। পালতোলা জাহাজের নাবিকেরা এই অঞ্চলে বাতাস না পেয়ে দিনের পর দিন আটকা পড়ে থাকতেন।
  • আন্তঃক্রান্তীয় অভিসরণ অঞ্চল (ITCZ): উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু এই অঞ্চলে এসে পরস্পর মিলিত হয়। তাই একে Inter-Tropical Convergence Zone (ITCZ) বলে। এখানে প্রতিদিন বিকেলে মেঘ জমে মুষলধারে ৪টার পরিচলন বৃষ্টিপাত ঘটায়।

২.৩ উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় ও অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes)

উভয় গোলার্ধে ২৫° থেকে ৩৫° অক্ষাংশের মধ্যে উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় অবস্থিত:

  • গতিজনিত কারণ: নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে ওপরে ওঠা উষ্ণ আর্দ্র বাতাস ওপরের শীতল বায়ুমণ্ডলে ঠান্ডা ও ভারী হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় এবং পৃথিবীর আবর্তনের প্রভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে এই উপক্রান্তীয় অঞ্চলে নিচে নেমে আসে। বাতাস নিচে নামলে তা সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয়, ফলে মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ ও স্থায়ী উচ্চচাপযুক্ত শান্ত আবহাওয়া তৈরি হয়।
  • অশ্ব অক্ষাংশ (Horse Latitudes)-এর নামকরণ: মধ্যযুগে স্পেন ও ইউরোপ থেকে পালতোলা জাহাজে করে আমেরিকা ও পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ঘোড়া পাঠানো হতো। আটলান্টিক মহাসাগরের এই উপক্রান্তীয় শান্ত উচ্চচাপ বলয়ে পৌঁছালে জাহাজের পাল বাতাস না পেয়ে নিশ্চল হয়ে পড়ত এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ জাহাজ আটকে থাকত। জাহাজের খাদ্য ও পানীয় জলের সংকট দেখা দিলে নাবিকেরা ওজন কমাতে এবং নিজেদের পানীয় জল বাঁচাতে অনেক ঘোড়াকে সমুদ্রে ফেলে দিতেন। তাই ২৫° থেকে ৩৫° উত্তর অক্ষাংশকে নাবিকেরা "অশ্ব অক্ষাংশ" (Horse Latitudes) নামে অভিহিত করেন।

২.৪ চাপ বলয়গুলির অবস্থান পরিবর্তন (Seasonal Shifting of Pressure Belts)

পৃথিবীর স্থায়ী চাপবলয়গুলি কিন্তু স্থির থাকে না; সূর্যের আপাত গতির (উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়ন) সঙ্গে সঙ্গে এরাও ঋতুভেদে ৫° থেকে ১০° উত্তরে বা দক্ষিণে সরে যায়:

  • সূর্যের উত্তরায়ন (২১ জুন - কর্কটক্রান্তি দিবস): সূর্য কর্কটক্রান্তিরেখার (২৩.৫° উত্তর) ওপর লম্বভাবে কিরণ দিলে তাপীয় নিরক্ষরেখা ও সমস্ত চাপবলয় ৫° থেকে ১০° উত্তর দিকে সরে যায়। ফলে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ ভারতের ওপর চলে এসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সূচনা ঘটায়।
  • সূর্যের দক্ষিণায়ন (২২ ডিসেম্বর - মকরক্রান্তি দিবস): সূর্য মকরক্রান্তিরেখার (২৩.৫° দক্ষিণ) ওপর লম্বভাবে কিরণ দিলে সমস্ত চাপবলয় ৫° থেকে ১০° দক্ষিণ দিকে সরে যায়।
  • ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুতে প্রভাব: গ্রীষ্মকালে উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় উত্তরে সরে আসায় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল শুষ্ক আয়ন বায়ুর অধীনে থাকে এবং সেখানে বৃষ্টি হয় না (শুষ্ক গ্রীষ্মকাল)। শীতকালে চাপবলয় দক্ষিণে সরে গেলে আর্দ্র পশ্চিমা বায়ু ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায় (আর্দ্র শীতকাল)।

৩. বায়ুপ্রবাহের কারণ ও নিয়ন্ত্রক মৌলিক সূত্রসমূহ

৩.১ বায়ুপ্রবাহের মূল কারণ ও চাপ ঢাল বল (PGF)

বায়ুচাপের পার্থক্যের জন্য উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে বায়ুর অনুভূমিক গতিকে বায়ুপ্রবাহ (Wind) বলে। আর বায়ুর উল্লম্ব গতিকে বায়ুস্রোত (Air Current) বলে।

  • চাপ ঢাল বল (Pressure Gradient Force - PGF): দুটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব সাপেক্ষে বায়ুচাপের পরিবর্তনের হারকে চাপ ঢাল বা চাপ প্রবণেতা বলে: $$PGF = -\frac{1}{\rho} \frac{\Delta P}{\Delta d}$$
  • সমচাপ রেখার ব্যবধান: সমচাপ রেখা (Isobar) হলো মানচিত্রে সমান বায়ুচাপযুক্ত স্থানগুলিকে যুক্তকারী কাল্পনিক রেখা। সমচাপ রেখাগুলি খুব কাছাকাছি অবস্থান করলে চাপ ঢাল খাড়া হয় এবং প্রবল বেগে ঝড়ো বাতাস বয়। সমচাপ রেখা দূরে দূরে থাকলে চাপ ঢাল মৃদু হয় এবং বাতাস ধীরে ধীরে বয়।
  • দিক: চাপ ঢাল বল সর্বদা সমচাপ রেখার সাথে সমকোণে (৯০°) উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপের দিকে ক্রিয়া করে।

৩.২ কোরিওলিস বল (Coriolis Force) ও পৃথিবীর আবর্তন

যদি পৃথিবী স্থির থাকত, তবে বাতাস সোজা সরলরেখায় উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপে চলে যেত। কিন্তু পৃথিবী তার নিজের অক্ষের ওপর পশ্চিম থেকে পূর্বে অবিরত আবর্তন করছে। ১৮৩৫ সালে ফরাসি গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী গাসপার গুস্তাভ দ্য কোরিওলিস (Gaspard-Gustave de Coriolis) প্রমাণ করেন যে, ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর ওপর চলমান যেকোনো বস্তুর (বাতাস ও সমুদ্রস্রোত) ওপর একটি আপাত বিক্ষেপক বল কাজ করে, যাকে কোরিওলিস বল (Coriolis Force) বলে:

কোরিওলিস বলের গাণিতিক রূপ:
$$F_c = 2 m v \Omega \sin \phi$$ যেখানে $m$ বায়ুর ভর, $v$ বায়ুর গতিবেগ, $\Omega$ পৃথিবীর কৌণিক আবর্তন বেগ ($৭.২৯২ \times ১০^{-৫}\text{ rad/s}$), এবং $\phi$ হলো অক্ষাংশ।
১. নিরক্ষরেখায় কোরিওলিস বল শূন্য: নিরক্ষরেখায় $\phi = ০^\circ$, ফলে $\sin ০^\circ = ০$। তাই নিরক্ষরেখায় কোরিওলিস বল সম্পূর্ণ শূন্য থাকে।
২. মেরুতে সর্বোচ্চ: মেরুতে $\phi = ৯০^\circ$, ফলে $\sin ৯০^\circ = ১$। তাই দুই মেরুতে কোরিওলিস বল সবচেয়ে বেশি।
৩. এই বল বায়ুর গতিবেগ বাড়ায় বা কমায় না, কেবল প্রবাহের দিককে বাঁকিয়ে দেয়।

৩.৩ ফেরেলের সূত্র (Ferrel's Law)

১৮৫৫ সালে আমেরিকান আবহাওয়াবিদ উইলিয়াম ফেরেল (William Ferrel) কোরিওলিস বলের বাস্তব প্রয়োগ করে একটি যুগান্তকারী ভৌগোলিক সূত্র প্রণয়ন করেন:

ফেরেলের সূত্র:
পৃথিবীর আবর্তনজনিত কোরিওলিস বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে তাদের গতির ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে তাদের গতির বাঁদিকে বেঁকে প্রবাহিত হয়।
  • আয়ন বায়ুর ক্ষেত্রে: উত্তর গোলার্ধে উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ থেকে নিরক্ষরেখার দিকে আসা বায়ু ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু হিসেবে প্রবাহিত হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে তা বাঁদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু হিসেবে প্রবাহিত হয়।
  • পশ্চিমা বায়ুর ক্ষেত্রে: উত্তর গোলার্ধে উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ থেকে সুমেরুবৃত্তের দিকে যাওয়া বায়ু ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু হয়; দক্ষিণ গোলার্ধে তা বাঁদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু হয়।

৩.৪ বায়স ব্যালটের সূত্র (Buys Ballot's Law)

১৮৫৭ সালে ডাচ আবহাওয়াবিদ সি. এইচ. ডি. বায়স ব্যালট (Buys Ballot) বায়ুপ্রবাহের দিক দেখে বায়ুচাপ বোঝার একটি সহজ নিয়ম আবিষ্কার করেন:

বায়স ব্যালটের সূত্র:
উত্তর গোলার্ধে যেদিক থেকে বাতাস আসছে সেদিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে বামদিকে নিম্নচাপ এবং ডানদিকে উচ্চচাপ অবস্থান করে।
দক্ষিণ গোলার্ধে ঠিক বিপরীত অবস্থা ঘটে: বাতাসের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে ডানদিকে নিম্নচাপ এবং বামদিকে উচ্চচাপ অবস্থান করে।

৩.৫ ঘর্ষণ বল ও জিওস্ট্রফিক বায়ু (Geostrophic Wind)

  • ঘর্ষণ বল (Friction): ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি (১,০০০ মিটারের মধ্যে) পাহাড়, বন ও ঘরবাড়ির ঘর্ষণে বাতাসের গতি কমে যায়। গতি কমলে কোরিওলিস বল দুর্বল হয়, তাই ভূপৃষ্ঠীয় বায়ু সমচাপ রেখার সাথে কোণাকুণি (২০°-৪৫° কোণে) নিম্নচাপের কেন্দ্রে প্রবেশ করে।
  • জিওস্ট্রফিক বায়ু: ভূপৃষ্ঠ থেকে ১ কিমি ওপরে মুক্ত বায়ুমণ্ডলে কোনো ঘর্ষণ থাকে না। সেখানে বাতাসের বেগ বাড়তে বাড়তে চাপ ঢাল বল ও কোরিওলিস বল পরস্পরের সমান ও বিপরীতমুখী হয়ে ভারসাম্য অর্জন করে ($PGF = F_c$)। তখন বাতাস সমচাপ রেখার সাথে সমকোণে না গিয়ে সমচাপ রেখার সমান্তরালে সরলরেখায় প্রবাহিত হয়। একে জিওস্ট্রফিক বায়ু বলে।

৪. নিয়ত বায়ু, সাময়িক বায়ু ও বিশ্বখ্যাত স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ

৪.১ নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (Planetary Winds)

পৃথিবীর স্থায়ী বায়ুচাপ বলয়গুলির মধ্যে সারা বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়মিতভাবে প্রবাহিত বায়ুকে নিয়ত বায়ু (Planetary Winds) বলে। এরা তিন প্রকার:

  • ১. আয়ন বায়ু বা বাণিজ্য বায়ু (Trade Winds):
    • উভয় গোলার্ধের উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (২৫°-৩৫°) থেকে নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয়ের (০°-৫°) দিকে প্রবাহিত হয়।
    • প্রাচীনকালে পালতোলা বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকেরা এই বায়ুর নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন বলে এর নাম হয়েছে বাণিজ্য বায়ু (Trade Winds)।
    • উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু রূপে প্রবাহিত হয়।
    • শীতল অঞ্চল থেকে উষ্ণ অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হওয়ায় বাতাস উষ্ণ হয় এবং এর জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা বাড়ে। ফলে মহাদেশের পূর্ব উপকূলে বৃষ্টি হলেও পশ্চিম উপকূলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বাতাস সম্পূর্ণ শুষ্ক হয়ে যায়। এই কারণে পৃথিবীর সমস্ত প্রধান উষ্ণ মরুভূমিগুলি (সাহারা, আরব, থর, কালাহারি, আটাকামা) ক্রান্তীয় অঞ্চলের মহাদেশসমূহের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত।
  • ২. পশ্চিমা বায়ু (Westerlies):
    • উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় থেকে উভয় গোলার্ধের মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয়ের (৬০°-৭০°) দিকে প্রবাহিত হয়।
    • উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু রূপে প্রবাহিত হয়।
    • উত্তর গোলার্ধে বিশাল মহাদেশ ও পর্বতমালার ঘর্ষণে পশ্চিমা বায়ুর গতি বাধাগ্রস্ত হয়।
    • দক্ষিণ গোলার্ধে ৪০° থেকে ৬০° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে কোনো স্থলভাগ নেই—পুরোটাই উন্মুক্ত সীমাহীন মহাসমুদ্র। কোনো ভূপ্রাকৃতিক বাধা না থাকায় এখানে পশ্চিমা বায়ু উন্মত্ত ও প্রবল গতিতে গর্জন করে প্রবাহিত হয়। নাবিকেরা অক্ষাংশ অনুযায়ী এদের বিশেষ নাম দিয়েছেন:
      • গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties - ৪০°দ): অবিরাম গর্জনকারী ঝড়ো বাতাস।
      • ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ (Furious Fifties - ৫০°দ): উত্তাল ও হিংস্র সামুদ্রিক ঝড়।
      • চিৎকারকারী বা তীব্র ষাট (Screaming / Shrieking Sixties - ৬০°দ): বরফশীতল হুল ফোটানো তুফানি হাওয়া।
  • ৩. মেরু বায়ু (Polar Easterlies):
    • দুই মেরু উচ্চচাপ বলয় (৮০°-৯০°) থেকে মেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপের (৬০°-৭০°) দিকে প্রবাহিত হয়।
    • উত্তর গোলার্ধে উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দক্ষিণ-পূর্ব মেরু বায়ু হিসেবে বয়। এরা অত্যন্ত শুষ্ক, বরফশীতল ও ভারী তুষারঝড় বয়ে আনে।

৪.২ সাময়িক বায়ু: সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু

যেসব বাতাস দিন ও রাতের নির্দিষ্ট সময়ে অথবা বছরের নির্দিষ্ট ঋতুতে নির্দিষ্ট নিয়মে দিক পরিবর্তন করে প্রবাহিত হয়, তাদের সাময়িক বায়ু (Periodic Winds) বলে:

বৈশিষ্ট্য সমুদ্র বায়ু (Sea Breeze) স্থল বায়ু (Land Breeze)
প্রবাহের সময় দিনের বেলা (দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৪টেয় সর্বাধিক বেগ)। রাতের বেলা (ভোরবেলায় সর্বাধিক বেগ)।
তাপীয় কারণ জলের চেয়ে স্থলভাগের আপেক্ষিক তাপ কম, তাই দিনের রোদে মাটি দ্রুত উত্তপ্ত হয়। রাতের বেলা বিকিরণ পদ্ধতিতে মাটি দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়, কিন্তু জল ধীরে জুড়োয়।
চাপের বণ্টন উত্তপ্ত স্থলভাগে স্থানীয় নিম্নচাপ এবং শীতল সমুদ্রে উচ্চচাপ। শীতল স্থলভাগে স্থানীয় উচ্চচাপ এবং তুলনামূলক উষ্ণ সমুদ্রে নিম্নচাপ।
প্রবাহের দিক সমুদ্র থেকে স্থলভাগের দিকে প্রবাহিত হয়। স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়।
আবহাওয়াগত প্রভাব উপকূলের তাপমাত্রা কমিয়ে মনোরম আর্দ্র আবহাওয়া দেয় (দিঘা, পুরী, মুম্বই)। শুষ্ক ও শান্ত বাতাস; উপকূলীয় মৎস্যজীবীরা ভোরে এই বাতাসে পাল তুলে মাছ ধরতে সমুদ্রে যান।

৪.৩ পার্বত্য বায়ু ও উপত্যকা বায়ু (অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক বায়ু)

  • উপত্যকা বায়ু বা অ্যানাবেটিক বায়ু (Anabatic Wind): দিনের বেলা সূর্যের তাপে পর্বতের ঢাল সংলগ্ন বাতাস দ্রুত উত্তপ্ত ও হালকা হয়ে পর্বতের ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে উঠতে থাকে। একে উপত্যকা বায়ু বা অ্যানাবেটিক বায়ু বলে। বিকেলের দিকে পর্বতের চূড়ায় এর প্রভাবে কিউমুলাস মেঘ জমে।
  • পার্বত্য বায়ু বা ক্যাটাবেটিক বায়ু (Katabatic Wind): রাতের বেলা পর্বতের চূড়ার বাতাস দ্রুত তাপ বিকিরণ করে অত্যন্ত শীতল ও ভারী হয়ে যায়। এই ভারী শীতল বাতাস মাধ্যাকর্ষণের টানে পর্বতের ঢাল বেয়ে হুহু করে নিচের উপত্যকার মেঝেতে নেমে আসে। একে পার্বত্য বায়ু বা ক্যাটাবেটিক বায়ু বলে। এর ফলে উপত্যকার নিচে ভারী ঠান্ডা বাতাস জমা হয় এবং ওপরে হালকা উষ্ণ বাতাস ভাসতে থাকে, যাকে উষ্ণতার বৈপরীত্য (Temperature Inversion) বলে। এর ফলে উপত্যকার তলদেশে ঘন কুয়াশা ও তুষারপাত হয়।

৪.৪ মহাদেশীয় সাময়িক বায়ু: মৌসুমি বায়ু (Monsoon)

মৌসুমি হলো সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ুর এক বিশাল মহাদেশীয় সংস্করণ, যা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে ১৮০° ঘুরে যায়:

  • গ্রীষ্মকালীন দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু: গ্রীষ্মকালে এশিয়ার স্থলভাগ প্রচণ্ড উত্তপ্ত হয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি করে। তখন দক্ষিণ গোলার্ধের ভারত মহাসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু নিরক্ষরেখা অতিক্রম করার পর ফেরেলের সূত্রানুসারে ডানদিকে বেঁকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু রূপে ভারতে প্রবেশ করে এবং প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়।
  • শীতকালীন উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু: শীতকালে স্থলভাগ অত্যন্ত শীতল হয়ে উচ্চচাপের কেন্দ্র হয় এবং ভারত মহাসাগরে নিম্নচাপ থাকে। ফলে স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে শুষ্ক ও শীতল উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়।

৪.৫ বিশ্বখ্যাত স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ (Local Winds)

স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও তাপীয় পার্থক্যের কারণে কোনো নির্দিষ্ট ছোট অঞ্চলে প্রবাহিত বায়ুকে স্থানীয় বায়ু (Local Winds) বলে:

বায়ুর নাম প্রকৃতি ও তাপমাত্রা প্রবাহ অঞ্চল ভৌগোলিক ও পরিবেশগত তাৎপর্য
লু (Loo) অত্যন্ত উষ্ণ ও শুষ্ক (৪৫°-৫০° সে) উত্তর ও পশ্চিম ভারত (থর মরুভূমি, গাঙ্গেয় সমভূমি, পশ্চিমবঙ্গ) মে-জুন মাসের ভরদুপুরে প্রবাহিত মারাত্মক গরম বাতাস; সানস্ট্রোক বা হিটস্ট্রোকের কারণ।
চিনুক (Chinook) উষ্ণ ও শুষ্ক ঢালু বাতাস উত্তর আমেরিকার রকি পর্বতের পূর্ব ঢালে রেড ইন্ডিয়ান ভাষায় নাম "বরফখাদক" (Snow Eater); শীতকালে দ্রুত বরফ গলিয়ে তৃণভূমি উন্মুক্ত করে।
ফন (Foehn) উষ্ণ ও শুষ্ক ক্যাটাবেটিক বায়ু ইউরোপের আল্পস পর্বতের উত্তর ঢালে (সুইজারল্যান্ড) বাতাস নিচে নামার সময় রুদ্ধতাপীয় হারে উত্তপ্ত হয়; আঙুর পাকাতে এবং বরফ গলাতে সাহায্য করে।
সিরোক্কো (Sirocco) উষ্ণ, শুষ্ক ও ধূলিময় সাহারা মরুভূমি থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালিতে সাহারার লাল ধূলিকণা বহন করে; বৃষ্টির সাথে এই ধূলিকণা ঝরে পড়লে তাকে "রক্তবৃষ্টি" (Blood Rain) বলে।
হারমাটান (Harmattan) উষ্ণ ও অত্যন্ত শুষ্ক সাহারা মরুভূমি থেকে গিনি উপকূলে (পশ্চিম আফ্রিকা) আর্দ্র উপকূলের অস্বস্তিকর স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করে রোগজীবাণু ধ্বংস করে বলে একে "ডক্টর" (The Doctor) বলা হয়।
মিস্ট্রাল (Mistral) কনকনে ঠান্ডা ও শুষ্ক ফ্রান্সের রোন উপত্যকা দিয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে শীতকালে নদী উপত্যকায় প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়ে দ্রাক্ষাক্ষেত ও কৃষির ক্ষতি করে।
বোরা (Bora) অত্যন্ত শীতল ও ঝড়ো বাতাস জুলিয়ান আল্পস থেকে আড্রিয়াটিক সাগরের উপকূলে (ইতালি) শীতকালীন শক্তিশালী ক্যাটাবেটিক বাতাস, যার গতিবেগ ১৫০ কিমি/ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায়।
ব্লিজার্ড (Blizzard / তুষারঝড়) হিমশীতল তুষারযুক্ত প্রবল ঝড় মেরু অঞ্চল, কানাডা, রাশিয়া ও সাইবেরিয়া হিমাঙ্কের বহু নিচে তাপমাত্রা এবং প্রবল বেগে উড়ন্ত বরফের গুঁড়ো; দৃষ্টিসীমা শূন্যে নামিয়ে আনে।

৫. অনিয়মিত বায়ু, ঘূর্ণবাত-প্রতিপ ঘূর্ণবাত ও আধুনিক পরিমাপ

৫.১ অনিয়মিত বায়ু: ঘূর্ণবাত বনাম প্রতিপ ঘূর্ণবাত

বায়ুমণ্ডলে আকস্মিক স্থানীয় চাপ পার্থক্যের কারণে হঠাৎ যে শক্তিশালী ও পরিবর্তনশীল বায়ু প্রবাহিত হয়, তাকে আকস্মিক বা অনিয়মিত বায়ু (Variable Winds) বলে:

প্যারামিটার ঘূর্ণবাত (Cyclone) প্রতিপ ঘূর্ণবাত (Anticyclone)
কেন্দ্রীয় চাপ কেন্দ্রে গভীর নিম্নচাপ এবং বাইরে ক্রমশ উচ্চচাপ। কেন্দ্রে শক্তিশালী উচ্চচাপ এবং বাইরে ক্রমশ নিম্নচাপ।
বায়ুর গতিপ্রকৃতি বাইরের উচ্চচাপ থেকে বাতাস তীব্র বেগে কেন্দ্রের দিকে ছুটে এসে কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরে ওঠে। কেন্দ্রের ওপর থেকে শীতল বায়ু নিচে নেমে আসে এবং বাইরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে (বিচ্ছুরণ)।
আবর্তনের দিক: উত্তর গোলার্ধ ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Counter-Clockwise)। ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise)।
আবর্তনের দিক: দক্ষিণ গোলার্ধ ঘড়ির কাঁটার দিকে (Clockwise)। ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Counter-Clockwise)।
আবহাওয়ার প্রকৃতি প্রবল ঝড়ো বাতাস, ঘন কালো কিউমুলোনিম্বাস মেঘ, বজ্রবিদ্যুৎসহ মুষলধারে বৃষ্টি ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। শান্ত ও মনোরম আবহাওয়া, মেঘহীন নীল আকাশ, হালকা মিষ্টি বাতাস, শুষ্ক পরিবেশ ও বৃষ্টির লেশমাত্র থাকে না।

৫.২ ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাত ও বিভিন্ন সাগরে আঞ্চলিক নাম

উষ্ণ ক্রান্তীয় সাগরে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা ২৬.৫° সেলসিয়াসের বেশি হলে পানির বাষ্পীভবন থেকে প্রচুর সুপ্ততাপ মুক্ত হয়ে যে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তার আলাদা আলাদা নাম রয়েছে:

  • সাইক্লোন বা ঘূর্ণবাত (Cyclone): বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঝড় (যেমন—আম্ফান, ইয়াস, রেমাল, ফণী এবং বাংলার ঐতিহাসিক আশ্বিনের ঝড়)।
  • টাইফুন (Typhoon): দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর ও জাপান উপকূলে।
  • হারিকেন (Hurricane): ক্যারিবিয়ান সাগর, মেক্সিকো উপসাগর ও উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে (আমেরিকা)।
  • উইলি-উইলি (Willy-Willy): উত্তর-পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার উপকূলীয় সাগরে।
  • টর্নেডো (Tornado): পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকায় কিন্তু সর্বাপেক্ষা ধ্বংসাত্মক বায়বীয় ঘূর্ণাবর্ত; এটি মেঘের তলদেশ থেকে ফানেল বা হাতির শুঁড়ের মতো মাটিতে নেমে আসে এবং এর কেন্দ্রের বাতাসের গতিবেগ ৩০০ থেকে ৪৫০ কিমি/ঘণ্টা ছাড়িয়ে যায় (আমেরিকার মিসিসিপি অববাহিকায় "টর্নেডো অ্যালি" এবং পশ্চিমবঙ্গে স্থানীয় শক্তিশালী কালবৈশাখী)।

৫.৩ ক্রান্তীয় ঘূর্ণবাতের গঠন ও "ঘূর্ণবাতের চোখ"

একটি পরিণত ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ে তিনটি স্পষ্ট অংশ লক্ষ করা যায়:

  • ১. ঘূর্ণবাতের চোখ (Eye of the Cyclone): ঘূর্ণিঝড়ের ঠিক কেন্দ্রস্থল (ব্যাস ১০ থেকে ৩০ কিমি)। এখানে ওপর থেকে বাতাস ধীরে ধীরে নিচে নামার কারণে ঘনীভবন হতে পারে না। ফলে এখানে বাতাস থাকে প্রায় শান্ত, আকাশ পরিষ্কার বা সামান্য মেঘাচ্ছন্ন এবং বৃষ্টি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এখানে বায়ুর চাপ পৃথিবীর সর্বনিম্ন স্তরে নামে।
  • ২. চোখের প্রাচীর (Eye Wall): চোখের চারপাশের ১০-১৫ কিমি চওড়া এলাকাটি হলো ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে প্রলয়ঙ্কর অংশ। এখানে দানবাকৃতি কিউমুলোনিম্বাস মেঘের পাহাড় তৈরি হয়, বাতাস সর্বোচ্চ গতিতে (১৫০-২৫০ কিমি/ঘণ্টা) ঘোরে এবং প্রচণ্ড বজ্রপাতসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়।
  • ৩. সর্পিল মেঘবলয় (Spiral Rain Bands): চোখ থেকে শত শত কিমি দূর পর্যন্ত বাইরের দিকে বিস্তৃত ঘূর্ণায়মান মেঘপুঞ্জ, যা মূল ঝড় আছড়ে পড়ার আগেই দমকা হাওয়া ও বৃষ্টি নামায়।

৫.৪ বায়ুপ্রবাহ মাপক যন্ত্র: অ্যানিমোমিটার ও বাত-পতাকা

আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারে বায়ুপ্রবাহ সংক্রান্ত দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য নথিভুক্ত করা হয়:

  • বাত-পতাকা বা উইন্ড ভেন (Wind Vane): বায়ুর প্রবাহের দিক নির্ণয় করে। একটি উল্লম্ব অক্ষের ওপর একটি মুক্ত ধাতব তীর বসানো থাকে। বাতাসের ধাক্কায় তীরের অগ্রভাগ সর্বদা বাতাস যেদিক থেকে আসছে সেদিকে মুখ করে থাকে। বায়ুপ্রবাহের নাম সর্বদা তার উৎপত্তির দিক অনুসারে হয় (যেমন—পূর্ব দিক থেকে আসা বাতাসকে পুবালি বাতাস বলে)।
  • অ্যানিমোমিটার (Anemometer): বায়ুর গতিবেগ পরিমাপ করে। ১৮৪৬ সালে ডঃ রবিনসন উদ্ভাবিত এই যন্ত্রে একটি উল্লম্ব ঘূর্ণন দণ্ডের মাথায় ৩ বা ৪টি ফাঁপা ধাতব অর্ধগোলাকার বাটি (Cup) বসানো থাকে। বাতাস বাটিগুলিতে ধাক্কা মারলে দণ্ডটি ঘোরে এবং একটি স্পিডোমিটারের মতো ডায়ালে সরাসরি কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (km/h) বা নট (Knot) এককে গতিবেগ রেকর্ড হয় ($১\text{ নট} = ১.৮৫২\text{ কিমি/ঘণ্টা}$)।

৫.৫ পরিবেশবান্ধব শক্তি হিসেবে বায়ুশক্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বায়ুর গতিশক্তি হলো একটি অফুরন্ত, সম্পূর্ণ দূষণহীন ও পুনর্নবীকরণযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। আধুনিক বায়ুকল বা উইন্ড টারবাইন (Wind Turbine) এই গতিশক্তিকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে:

  • ঘনানুপাতিক শক্তির সূত্র: বায়ুকল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎশক্তি বাতাসের গতিবেগের ঘনফলের সমানুপাতিক ($P \propto v^৩$)। অর্থাৎ বায়ুর গতিবেগ যদি দ্বিগুণ হয় ($২v$), তবে উৎপন্ন বিদ্যুতের পরিমাণ বেড়ে হবে ৮ গুণ ($২^৩ = ৮$)!
  • ভারতে অবস্থান: বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত বিশ্বে চতুর্থ স্থানে রয়েছে। তামিলনাড়ুর মুপ্পান্ডাল উইন্ড ফার্ম বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কেন্দ্র; এছাড়া গুজরাট, রাজস্থান ও মহারাষ্ট্রে প্রচুর বায়ুকল রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সাগর দ্বীপ ও বকখালির উপকূলীয় এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালিত হয়।

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

হাইড্রোস্ট্যাটিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপ সূত্র
P_০ = ১৩৬০০ কেজি/মি^৩ × ৯.৮০৬৬৫ মি/সে^২ × ০.৭৬ মি ≈ ১০১৩২৫ প্যাসকাল = ১০১৩.২৫ মিলিবার
টরিচেলির ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের সমতুল্য সমুদ্রপৃষ্ঠের আন্তর্জাতিক প্রমাণ বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবার নির্ণয়ের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ।
অনুভূমিক চাপ ঢাল বল (Pressure Gradient Force - PGF)
PGF P (সমচাপ রেখার ঘনত্বের সমানুপাতিক)
সমচাপ রেখা যত কাছাকাছি থাকে, চাপ ঢাল তত খাড়া হয় এবং বাতাসের গতিবেগ তত বিধ্বংসী ও তীব্র হয়।
কোরিওলিস ত্বরণ ও বিক্ষেপ সূত্র
a_c = ০ (নিরক্ষরেখায় = ০^), a_c = ২ v (মেরুতে সর্বাধিক = ৯০^)
নিরক্ষরেখায় কোরিওলিস বল শূন্য বলেই ০° থেকে ৫° অক্ষাংশের মধ্যে কোনো ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় জন্ম নিতে পারে না।
জিওস্ট্রফিক বায়ু ভারসাম্য সূত্র
PGF = F_{Coriolis} ⇒ বায়ু সরল সমচাপ রেখার সমান্তরালে প্রবাহিত হয়
ভূপৃষ্ঠ থেকে ১ কিমি ওপরে জেট স্ট্রিম ও উচ্চ আকাশের বায়ুপ্রবাহ এই সূত্র মেনে সমচাপ রেখার সমান্তরালে চলে।
আদর্শ গ্যাস সূত্র ও আর্দ্র বায়ুর ঘনত্ব
M_{আর্দ্র বায়ু} < M_{শুষ্ক বায়ু} ⇒ _{আর্দ্র} < _{শুষ্ক} (একই T, P অবস্থায়)
প্রমাণ করে যে জলীয় বাষ্প (১৮ গ্রাম/মোল) বাতাসে যোগ হলে ভারী নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন প্রতিস্থাপিত হয়ে বাতাস হালকা হয় এবং নিম্নচাপ গড়ে তোলে।
ব্যারোমেট্রিক উচ্চতা নির্ধারণ সূত্র (Hypsometric)
P ≈ প্রতি ১১০ মিটারে ১ সেমি পারদ বা প্রতি ৩০০ মিটারে ৩৪ মিলিবার হ্রাস
অ্যানিরয়েড অল্টিমিটার পর্বতের উচ্চতা ও বিমানের উড্ডয়ন উচ্চতা নির্ণয়ে এই নীতির ওপর কাজ করে।
বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন ও গতিশক্তি সূত্র
P v^৩ ⇒ গতিবেগ দ্বিগুণ (২v) হলে উৎপন্ন শক্তি ৮ গুণ বৃদ্ধি পায়
স্পষ্ট করে যে উপকূলবর্তী ও পর্বত উপত্যকার প্রবল বাতাসযুক্ত স্থান কেন বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য আদর্শ।
ঘূর্ণাবর্তের কেন্দ্রাতিগ ত্বরণ ও সাইক্লোস্ট্রফিক ভারসাম্য
v_{cyclone} = {r ≤ft({1}{ P}{ r})} (চোখের প্রাচীরে সর্বাধিক)
ঘূর্ণিঝড়ের চোখের প্রাচীরে তীব্র চাপ ঢাল ও কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে কেন বাতাসের বেগ ২০০-২৫০ কিমি ছাড়ায় তা ব্যাখ্যা করে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
সমুদ্রপৃষ্ঠে একটি টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটারে পারদস্তম্ভের উচ্চতা পাওয়া গেল ৭৬.০ সেমি। পারদের ঘনত্ব ১৩,৬০০ কেজি/ঘনমিটার এবং অভিকর্ষজ ত্বরণ ৯.৮ মি/সে² হলে বায়ুর চাপ প্যাসকালে (N/m²) নির্ণয় করো এবং তা মিলিবারে (mb) রূপান্তর করো। (১ মিলিবার = ১০০ প্যাসকাল)।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. সূত্র: হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ সমীকরণ:

$$P = \rho \cdot g \cdot h$$

  1. প্রদত্ত মান:
    • পারদের ঘনত্ব $\rho = ১৩,৬০০\text{ কেজি/ঘনমিটার}$
    • অভিকর্ষজ ত্বরণ $g = ৯.৮\text{ মি/সে}^২$
    • পারদস্তম্ভের উচ্চতা $h = ৭৬.০\text{ সেমি} = ০.৭৬\text{ মিটার}$ ৩. প্যাসকালে চাপ নির্ণয়:

$$P = ১৩,৬০০ \times ৯.৮ \times ০.৭৬ = ১০১,২৯২.৮\text{ প্যাসকাল} \approx ১০১,৩০০\text{ N/m}^২$$

৪. মিলিবারে রূপান্তর:

$$\text{মিলিবারে বায়ুর চাপ} = \frac{১০১,২৯২.৮}{১০০} \approx ১০১২.৯৩\text{ মিলিবার} \approx ১০১৩\text{ মিলিবার}$$

উপসংহার: ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভের সমতুল্য প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপের মান প্রায় ১০১,৩০০ প্যাসকাল বা আনুমানিক ১০১৩ মিলিবার।

উদাহরণ 2
দুটি আবহাওয়া কেন্দ্র ‘ক’ ও ‘খ’-এর পারস্পরিক অনুভূমিক দূরত্ব ২৫০ কিলোমিটার। ‘ক’ কেন্দ্রে বায়ুচাপ ১০২২ মিলিবার এবং ‘খ’ কেন্দ্রে ১০০২ মিলিবার নথিভুক্ত হলো। প্রতি ১০০ কিলোমিটারে অনুভূমিক চাপ ঢাল কত হবে তা নির্ণয় করো এবং বাতাসের তীব্রতা সম্পর্কে ভৌগোলিক মতামত দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. সূত্র: চাপ ঢাল নির্ণয়ের সমীকরণ:

$$\text{চাপ ঢাল} = \frac{\Delta P}{\Delta d}$$

২. প্রদত্ত মান:

  • চাপের পার্থক্য $\Delta P = ১০২২\text{ mb} - ১০০২\text{ mb} = ২০\text{ মিলিবার}$
  • দুটি কেন্দ্রের দূরত্ব $\Delta d = ২৫০\text{ কিমি}$ ৩. প্রতি কিমিতে চাপ ঢাল:

$$\text{চাপ ঢাল} = \frac{২০\text{ mb}}{২৫০\text{ কিমি}} = ০.০৮\text{ mb/কিমি}$$

৪. প্রতি ১০০ কিলোমিটারে চাপ ঢাল:

$$\text{প্রতি ১০০ কিমিতে চাপ ঢাল} = ০.০৮ \times ১০০ = ৮.০\text{ মিলিবার}$$

ভৌগোলিক মতামত: প্রতি ১০০ কিমিতে ৮.০ মিলিবার চাপ ঢাল একটি অত্যন্ত খাড়া ও মারাত্মক চাপ প্রবণেতা (যা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের পরিচায়ক)। সুতরাং ‘ক’ কেন্দ্র থেকে ‘খ’ কেন্দ্রের দিকে প্রচণ্ড বেগে ঝড়ো বাতাস আছড়ে পড়বে এবং উত্তর গোলার্ধে হলে বাতাস ডানদিকে বেঁকে প্রবাহিত হবে।

উদাহরণ 3
একটি পর্বতারোহী দল সমুদ্রপৃষ্ঠের বেস ক্যাম্পে বায়ুচাপ পেলেন ১০১৩ মিলিবার। হিমালয়ের একটি উঁচুতে ৩ নম্বর ক্যাম্পে পৌঁছে তাদের অ্যানিরয়েড ব্যারোমিটারে পাঠ পাওয়া গেল ৬৭৩ মিলিবার। প্রতি ৮.৮ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে ১ মিলিবার চাপ হ্রাস পেলে ৩ নম্বর ক্যাম্পটির আনুমানিক উচ্চতা কত?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
১. মোট বায়ুচাপ হ্রাসের পরিমাণ ($\Delta P$): $$\Delta P = ১০১৩\text{ mb} - ৬৭৩\text{ mb} = ৩৪০\text{ মিলিবার}$$ ২. উচ্চতার সাথে হ্রাসের হার: প্রতি ১ মিলিবার চাপ হ্রাসের জন্য উচ্চতা বৃদ্ধি পায় ৮.৮ মিটার। ৩. ক্যাম্পের উচ্চতা ($h$): $$h = ৩৪০ \times ৮.৮\text{ মিটার} = ২,৯৯২\text{ মিটার} \approx ৩,০০০\text{ মিটার}$$ উপসংহার: ৩ নম্বর ক্যাম্পটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ মিটার (বা ৩ কিমি) উচ্চতায় অবস্থিত। এই উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চাপ কমে যাওয়ায় পর্বতারোহীদের শ্বাসকষ্ট ও ক্লান্তিবোধ দেখা দেয়।
উদাহরণ 4
ফেরেলের সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করো কেন উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (৩০°উ) থেকে নিরক্ষরেখার দিকে আসা বাতাস "উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু" এবং (৩০°দ) থেকে আসা বাতাস "দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু" নামে পরিচিত হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. মৌলিক প্রবাহ নীতি: বাতাস সর্বদা ৩০° উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ থেকে ০° নিরক্ষীয় নিম্নচাপের দিকে প্রবাহিত হতে চায়। ২. উত্তর গোলার্ধের ক্ষেত্রে:

  • প্রাথমিক চাপ ঢাল বলের দিক: সোজা দক্ষিণমুখী (৩০°উ থেকে ০°)।
  • ফেরেলের সূত্রানুসারে উত্তর গোলার্ধে বাতাস তার গতির ডানদিকে বেঁকে যায়।
  • দক্ষিণমুখী বাতাস ডানদিকে বেঁকে গেলে তার প্রবাহের দিক হয় উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম।
  • বায়ুর নাম সর্বদা তার উৎপত্তির দিক অনুসারে হয়, তাই একে উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু (North-East Trade Wind) বলে। ৩. দক্ষিণ গোলার্ধের ক্ষেত্রে:
  • প্রাথমিক চাপ ঢাল বলের দিক: সোজা উত্তরমুখী (৩০°দ থেকে ০°)।
  • ফেরেলের সূত্রানুসারে দক্ষিণ গোলার্ধে বাতাস তার গতির বাঁদিকে বেঁকে যায়।
  • উত্তরমুখী বাতাস বাঁদিকে বেঁকে গেলে তার প্রবাহের দিক হয় দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিম।
  • তাই একে দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু (South-East Trade Wind) বলে। উপসংহার: কোরিওলিস বল ও ফেরেলের ডান-বাম বাঁকের কারণেই উভয় গোলার্ধে উত্তর-দক্ষিণ প্রবাহ পূর্বালী আয়ন বায়ুতে পরিণত হয়।
উদাহরণ 5
দক্ষিণ গোলার্ধের পশ্চিমা বায়ু উত্তর গোলার্ধের তুলনায় এত বেশি উন্মত্ত ও শক্তিশালী হয় কেন? "গর্জনশীল চল্লিশা", "ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ" ও "চিৎকারকারী ষাট"-এর ভৌগোলিক কারণ ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. স্থলভাগ ও জলভাগের বণ্টনের বৈসাদৃশ্য:

  • উত্তর গোলার্ধে বিশাল বিশাল মহাদেশ ও উচ্চ পর্বতমালা (রকি, আল্পস, হিমালয়) বিস্তৃত থাকায় ভূপৃষ্ঠের ঘর্ষণ পশ্চিমা বায়ুর গতিকে প্রতিহত ও দুর্বল করে দেয়।
  • কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের ৪০° দক্ষিণ থেকে ৬৫° দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে কোনো বড় ভূখণ্ড নেই—পুরোটাই উন্মুক্ত, সীমাহীন মহাসমুদ্র (৮১% জলভাগ)। ২. ঘর্ষণহীন গতিবৃদ্ধি:
  • উন্মুক্ত সমুদ্রে কোনো ভূপ্রাকৃতিক বাধার ঘর্ষণ না থাকায় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ ও কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপের মধ্যবর্তী চাপ ঢাল বলে বাতাস তীব্র গতিতে ত্বরান্বিত হয়। ৩. নাবিকদের ঐতিহাসিক নামকরণ:
  • গর্জনশীল চল্লিশা (৪০°দ): ৪০° দক্ষিণ অক্ষাংশে উন্মুক্ত সমুদ্রে গর্জন করে বয়ে চলা একটানা ঝড়ো পশ্চিমা বায়ু।
  • ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ (৫০°দ): ৫০° দক্ষিণ অক্ষাংশে হিংস্র ও ভয়াবহ সামুদ্রিক দমকা হাওয়া যা ১৫ মিটারের বেশি উঁচু ঢেউ তোলে।
  • চিৎকারকারী ষাট (৬০°দ): ৬০° দক্ষিণ অক্ষাংশে অ্যান্টার্কটিকার শীতল তুষারঝড়ের সাথে মিলিত কান ফাটানো আর্তনাদের মতো শব্দে বয়ে যাওয়া ঝড়। উপসংহার: ভূপ্রাকৃতিক বাধার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতিই দক্ষিণ গোলার্ধের পশ্চিমা বায়ুর এই তাণ্ডবলীলার মূল কারণ।
উদাহরণ 6
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলবর্তী দীঘা বা বকখালিতে দিনের বেলায় সমুদ্র বায়ু এবং গভীর রাতে স্থল বায়ু প্রবাহিত হওয়ার তাপীয় ও বায়ুচাপীয় কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. দিনের বেলায় সমুদ্র বায়ু (Sea Breeze):

  • সকালে সূর্যের আলোয় জলভাগের চেয়ে উপকূলের বালুকাময় স্থলভাগ দ্রুত উত্তপ্ত হয় (বালির আপেক্ষিক তাপ জলের পাঁচ ভাগের এক ভাগ)।
  • উত্তপ্ত স্থলভাগের বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে স্থানীয়ভাবে তাপজনিত নিম্নচাপ তৈরি করে।
  • তুলনামূলক শীতল বঙ্গোপসাগরের ওপরে তখন বায়ুর চাপ বেশি থাকে (উচ্চচাপ)।
  • ফলে দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে সমুদ্রের শীতল আর্দ্র বাতাস প্রবল বেগে স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে, যা সমুদ্র বায়ু নামে পরিচিত। এটি উপকূলকে মনোরম ও ঠান্ডা রাখে। ২. রাতের বেলায় স্থল বায়ু (Land Breeze):
  • সূর্যাস্তের পর স্থলভাগ দীর্ঘ তরঙ্গ বিকিরণ করে দ্রুত জুড়িয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়, কিন্তু সমুদ্রের জল তখনও অপেক্ষাকৃত গরম থাকে।
  • ফলে ভোররাতের দিকে শীতল স্থলভাগে স্থানীয় উচ্চচাপ এবং উষ্ণ সাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়।
  • তখন স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে শুষ্ক ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয়, যাকে স্থল বায়ু বলে। জেলেরা এই অনুকূল হাওয়ায় সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। উপসংহার: দিন ও রাতের এই চব্বিশ ঘণ্টার তাপীয় ভারসাম্যের আবর্তনই সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ুর মূল চালিকাশক্তি।
উদাহরণ 7
কোরিওলিস বলের গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে দেখাও কেন নিরক্ষরেখায় কোরিওলিস বল শূন্য হয় এবং কেন নিরক্ষরেখার ৫° উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে কোনো ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে না?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. কোরিওলিস বলের সূত্র:

$$F_c = ২ m v \Omega \sin \phi$$

যেখানে $\Omega$ পৃথিবীর আবর্তন বেগ এবং $\phi$ হলো অক্ষাংশ। ২. নিরক্ষরেখায় ($\phi = ০^\circ$):

  • $\sin ০^\circ = ০$।
  • সুতরাং কোরিওলিস বল $F_c = ২ m v \Omega \times ০ = \mathbf{০}$।
  • অর্থাৎ নিরক্ষরেখায় কোনো আবর্তনজনিত বিক্ষেপ বল থাকে না। ৩. ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি না হওয়ার কারণ:
  • একটি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোন সৃষ্টির জন্য বায়ুকে কেন্দ্রমুখী হয়ে তীব্র কুন্ডলী বা ঘূর্ণাবর্ত আকারে ঘুরতে হয়।
  • নিরক্ষরেখা থেকে ৫° উত্তর ও দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে কোরিওলিস বল প্রায় শূন্য থাকে ($\sin \phi \approx ০$), যার ফলে বাতাস বৃত্তাকারে ঘুরতে পারে না।
  • ঘূর্ণন সৃষ্টি না হয়ে চারপাশের বাতাস সরাসরি নিম্নচাপের কেন্দ্রে সোজা ঢুকে নিম্নচাপটি পূরণ করে বিলুপ্ত করে দেয়। উপসংহার: কোরিওলিস বলের অনুপস্থিতির কারণেই নিরক্ষীয় শান্তবলয় (০°-৫°) সম্পূর্ণ ঘূর্ণিঝড়মুক্ত থাকে।
উদাহরণ 8
একটি বায়ুকলের পাখার মোট ঘূর্ণন ক্ষেত্রফল ১,২০০ বর্গমিটার। বায়ুর ঘনত্ব ১.২ কেজি/ঘনমিটার। যদি বায়ুর গতিবেগ ৫ মি/সেকেন্ড থেকে বেড়ে ১০ মি/সেকেন্ড হয়, তবে উৎপন্ন শক্তির মান কত বৃদ্ধি পাবে এবং শক্তির সাথে গতিবেগের সম্পর্ক কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

১. সূত্র: বায়ুশক্তির সমীকরণ:

$$P = \frac{1}{2} \cdot \rho \cdot A \cdot v^3$$

২. ১ম ক্ষেত্রে (গতিবেগ $v_১ = ৫\text{ মি/সে}$):

$$v_১^৩ = ৫^৩ = ১২৫\text{ মি}^৩/\text{সে}^৩$$

$$P_১ = \frac{১}{২} \times ১.২ \times ১,২০০ \times ১২৫ = ০.৬ \times ১,২০০ \times ১২৫ = ৭২০ \times ১২৫ = ৯০,০০০\text{ ওয়াট} = \mathbf{৯০\text{ কিলোওয়াট}}$$

৩. ২য় ক্ষেত্রে (গতিবেগ দ্বিগুণ হয়ে $v_২ = ১০\text{ মি/সে}$):

$$v_২^৩ = ১০^৩ = ১,০০০\text{ মি}^৩/\text{সে}^৩$$

$$P_২ = \frac{১}{২} \times ১.২ \times ১,২০০ \times ১,০০০ = ৭২০ \times ১,০০০ = ৭২০,০০০\text{ ওয়াট} = \mathbf{৭২০\text{ কিলোওয়াট}}$$

৪. অনুপাত তুলনা:

$$\frac{P_২}{P_১} = \frac{৭২০\text{ kW}}{৯০\text{ kW}} = ৮ = ২^৩$$

উপসংহার: বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বায়ুর গতিবেগের ঘনফলের সমানুপাতিক ($P \propto v^৩$)। বাতাসের বেগ মাত্র দ্বিগুণ হলেই উৎপন্ন বিদ্যুৎশক্তি ৮ গুণ বৃদ্ধি পায়।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

বায়ুপ্রবাহের নামকরণের নিয়ম ভুল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

বায়ুর নাম সর্বদা বাতাস যেদিক থেকে আসছে সেই দিক অনুসারে হয়। পশ্চিমা বায়ু পশ্চিম দিক থেকে এসে পূর্ব দিকে যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

আর্দ্র বাতাস শুষ্ক বাতাসের চেয়ে ভারী বলে মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

জলীয় বাষ্পের আণবিক ভর (১৮) শুষ্ক বাতাসের উপাদানের (২৮-৩২) চেয়ে অনেক কম, তাই আর্দ্র বাতাস হালকা এবং নিম্নচাপ সৃষ্টি করে।

সাধারণ ভুল ধারণা

উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয়কে তাপজনিত মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উপক্রান্তীয় অঞ্চল (২৫°-৩৫°) প্রচণ্ড গরম এলাকা! এটি তৈরি হয়েছে বায়ুর গতিজনিত কারণে (ওপরের শীতল বায়ুর নিচে নেমে আসা বা অবতরণের ফলে)।

সাধারণ ভুল ধারণা

ডোলড্রাম্স বা শান্তবলয়কে ঝড়বৃষ্টির এলাকা মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ডোলড্রাম্সে কোনো অনুভূমিক পৃষ্ঠীয় বাতাসই থাকে না; বাতাস সোজা ওপরের দিকে ওঠে বলে ভূপৃষ্ঠে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ শান্ত অবস্থা থাকে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ফেরেলের সূত্রের গোলার্ধের দিক গুলিয়ে ফেলা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

ফেরেলের সূত্র অনুযায়ী: উত্তর গোলার্ধে বাতাস ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক বায়ুর সময় ভুল করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

অ্যানাবেটিক (উপত্যকা বায়ু) দিনের বেলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠে; ক্যাটাবেটিক (পার্বত্য বায়ু) রাতের বেলা ঠান্ডা হয়ে ঢাল বেয়ে নিচে নামে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ঘূর্ণবাতের আবর্তনের দিককে সাধারণ ঘড়ির মতো মনে করা।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

উত্তর গোলার্ধে ঘূর্ণিঝড় ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Counter-Clockwise) ঘোরে, আর প্রতিপ ঘূর্ণবাত ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরে।

পৃথিবীর স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় ও নিয়ত বায়ুপ্রবাহ — বায়ুমণ্ডলীয় ধারণাগত রূপরেখা

পৃথিবীর স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় ও নিয়ত বায়ুপ্রবাহ (অষ্টম শ্রেণি ভূগোল — অধ্যায় ৪) ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় ও নিয়ত বায়ুপ্রবাহ ৮০°উ – ৯০°উ সুমেরু উচ্চচাপ বলয় (তাপজনিত উচ্চচাপ) শীতল নিমজ্জন ↙ উত্তর-পূর্ব মেরু বায়ু (মেরু উচ্চচাপ থেকে সুমেরুবৃত্তে) ৬০°উ – ৭০°উ সুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (গতিজনিত) বায়ুর ঊর্ধ্বগমন ↗ দক্ষিণ-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ থেকে) ২৫°উ – ৩৫°উ কর্কটীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (অশ্ব অক্ষাংশ) বায়ুর অবতরণ ↙ উত্তর-পূর্ব আয়ন বায়ু (বাণিজ্য বায়ু / ডানে বাঁক) ৫°উ – ৫°দ নিরক্ষীয় নিম্নচাপ বলয় (শান্তবলয় / ডোলড্রাম্স / ITCZ) পরিচলন উত্থান ↖ দক্ষিণ-পূর্ব আয়ন বায়ু (দক্ষিণ গোলার্ধে বামে বাঁক) ২৫°দ – ৩৫°দ মকরীয় উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ বলয় (গতিজনিত উচ্চচাপ) মরুভূমি অঞ্চল ↘ উত্তর-পশ্চিম পশ্চিমা বায়ু (গর্জনশীল চল্লিশা / উন্মুক্ত সমুদ্র) ৬০°দ – ৭০°দ কুমেরুবৃত্ত প্রদেশীয় নিম্নচাপ বলয় (গতিজনিত) প্রবল ঘূর্ণিঝড় ৮০°দ – ৯০°দ কুমেরু উচ্চচাপ বলয় (তাপজনিত / অ্যান্টার্কটিকা) তুষার শীতলতা বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন কোশ ও গতিসূত্র ত্রিকোশীয় দ্রাঘিমাংশীয় সঞ্চালন মডেল হ্যাডলি কোশ ০° – ৩০° অক্ষাংশ আয়ন বায়ু চক্র ফেরেল কোশ ৩০° – ৬০° অক্ষাংশ পশ্চিমা বায়ু চক্র মেরু কোশ ৬০° – ৯০° অক্ষাংশ তাপীয় নিমজ্জন বায়ুপ্রবাহের মৌলিক সূত্র (কোরিওলিস প্রভাব) • ফেরেলের সূত্র (১৮৫৫): উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাঁদিকে বেঁকে যায়। • বায়স ব্যালটের সূত্র (১৮৫৭): উত্তর গোলার্ধে বাতাসের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে বাঁয়ে নিম্নচাপ, ডানে উচ্চচাপ। দক্ষিণ গোলার্ধের উত্তাল পশ্চিমা বায়ু ৪০°দ: গর্জনশীল চল্লিশা (Roaring Forties) — উন্মুক্ত সমুদ্র ঝড় ৫০°দ: ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ (Furious Fifties) — হিংস্র সামুদ্রিক ঝোড়ো হাওয়া ৬০°দ: চিৎকারকারী ষাট (Screaming Sixties) — মেরুমুখী তুষার ঝড় সাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় বায়ু সাময়িক: সমুদ্র ও স্থল বায়ু, অ্যানাবেটিক/ক্যাটাবেটিক, মৌসুমি বায়ু। উষ্ণ স্থানীয়: লু (ভারত), ফন (আল্পস), চিনুক (রকি/বরফখাদক)। শীতল স্থানীয়: মিস্ট্রাল (ফ্রান্স), বোরা (অ্যাড্রিয়াটিক), ব্লিজার্ড (মেরু)।

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ হলো ভূপৃষ্ঠের প্রতি একক ক্ষেত্রফলে বায়ুর ওজন, যার প্রমাণ মান সমুদ্রপৃষ্ঠে ১০১৩.২৫ মিলিবার বা ৭৬ সেমি পারদস্তম্ভ।
মূল বিষয় 2
বায়ুচাপের প্রধান নিয়ন্ত্রক চারটি: উষ্ণতা (ব্যস্তানুপাতিক), উচ্চতা (প্রতি ১১০ মিটারে ১ সেমি পারদ হ্রাস), জলীয় বাষ্প (আর্দ্র বায়ু হালকা) এবং পৃথিবীর আবর্তন গতি।
মূল বিষয় 3
পৃথিবীতে ৭টি স্থায়ী বায়ুচাপ বলয় রয়েছে: তাপজনিত নিরক্ষীয় নিম্নচাপ (ডোলড্রাম্স) ও দুই মেরু উচ্চচাপ; গতিজনিত দুটি উপক্রান্তীয় উচ্চচাপ (অশ্ব অক্ষাংশ) ও দুটি মেরুবৃত্ত নিম্নচাপ।
মূল বিষয় 4
সূর্যের উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়নের সাথে চাপবলয়গুলি ঋতুভেদে ৫°-১০° স্থান পরিবর্তন করে, যা ভূমধ্যসাগরীয় বৃষ্টিপাত ও ভারতীয় মৌসুমির নিয়ন্ত্রক।
মূল বিষয় 5
উচ্চচাপ থেকে নিম্নচাপে চাপ ঢাল বলের (PGF) কারণে বায়ু প্রবাহিত হয় এবং কোরিওলিস বলের প্রভাবে ফেরেলের সূত্র (উত্তরে ডানে, দক্ষিণে বাঁয়ে) ও বায়স ব্যালট সূত্র মেনে বেঁকে যায়।
মূল বিষয় 6
নিয়ত বায়ুর মধ্যে আয়ন বায়ু (বাণিজ্য বায়ু ও পশ্চিমের মরুভূমি), পশ্চিমা বায়ু (দক্ষিণ সমুদ্রে গর্জনশীল চল্লিশা, ক্রুদ্ধ পঞ্চাশ ও চিৎকারকারী ষাট) ও মেরু বায়ু প্রধান।
মূল বিষয় 7
সাময়িক বায়ুর মধ্যে সমুদ্র বায়ু ও স্থল বায়ু, অ্যানাবেটিক ও ক্যাটাবেটিক পার্বত্য বায়ু এবং মৌসুমি বায়ু প্রধান; স্থানীয় বায়ুর মধ্যে লু, চিনুক, ফন, হারমাটান ও মিস্ট্রাল উল্লেখযোগ্য।
মূল বিষয় 8
ঘূর্ণবাত হলো গভীর নিম্নচাপযুক্ত ঝড় (উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত ঘূর্ণন), যার কেন্দ্রে শান্ত চোখ থাকে; বাতাসের বেগ অ্যানিমোমিটার এবং দিক বাত-পতাকা দিয়ে মাপা হয়।
অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।