১.১ বায়ুচাপের ধারণা ও প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ
বায়ু বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদানের একটি মিশ্রণ যার নিজস্ব নির্দিষ্ট ভর ও ওজন রয়েছে। পৃথিবীর অভিকর্ষ বলের কারণে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসীয় অণুগুলি ভূপৃষ্ঠের দিকে আকৃষ্ট হয়। বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Atmospheric Pressure) হলো সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রতি একক ক্ষেত্রফলের ওপর উল্লম্বভাবে অবস্থিত সামগ্রিক বায়ুমণ্ডলীয় স্তম্ভের নিম্নমুখী ওজনের পরিমাপ।
সমুদ্রপৃষ্ঠে ৪৫° অক্ষাংশে এবং ০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বায়ুর চাপ ৭৬ সেমি (বা ৭৬০ মিলিমিটার) উঁচু পারদস্তম্ভকে ধরে রাখতে পারে। আবহাওয়া বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে প্রমাণ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ (Standard Atmospheric Pressure) বলে। এর মান:
- প্রমাণ বায়ুচাপ: ১০১৩.২৫ মিলিবার (mb) বা ১০১৩.২৫ হেক্টোপাস্কাল (hPa), যা প্রতি বর্গমিটারে প্রায় $১.০১৩ \times ১০^৫\text{ নিউটন}$ বলের সমান।
- উচ্চচাপ (High Pressure): কোনো স্থানের বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবারের বেশি হলে তাকে উচ্চচাপ বলে (সমচাপ রেখায় ১০২০ mb, ১০২৪ mb ইত্যাদি দ্বারা চিহ্নিত)।
- নিম্নচাপ (Low Pressure): কোনো স্থানের বায়ুচাপ ১০১৩.২৫ মিলিবারের কম হলে তাকে নিম্নচাপ বলে (সমচাপ রেখায় ১০০০ mb, ৯৯২ mb বা তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে ৯৬০ mb-এর নিচে নেমে যায়)।
১.২ ব্যারোমিটার: টরিচেলির পারদ ব্যারোমিটার, ফোরটিন ও অ্যানিরয়েড ব্যারোমিটার
বায়ুর চাপ পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রকে ব্যারোমিটার (Barometer) বলে:
| ব্যারোমিটারের প্রকার | কার্যপদ্ধতি | বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার |
|---|---|---|
| টরিচেলির সাধারণ পারদ ব্যারোমিটার (১৬৪৩) | পারদপূর্ণ একটি একমুখ বন্ধ কাঁচের নলকে উল্টে পারদপাত্রে স্থাপন করা হয়; নলের পারদস্তম্ভ বাইরের বাতাসের চাপ দ্বারা ভারসাম্যে থাকে। | নলের শীর্ষে পারদহীন ফাঁকা স্থানকে "টরিচেলির শূন্যস্থান" (Torricellian Vacuum) বলে; এটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। |
| ফোরটিন ব্যারোমিটার (Fortin's Barometer) | পারদস্তম্ভের নিখুঁত উচ্চতা পরিমাপের জন্য হাতির দাঁতের নির্দেশক ও ভার্নিয়ার স্কেলযুক্ত সমন্বিত পারদ ব্যারোমিটার। | আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের মানক যন্ত্র; অত্যন্ত নিখুঁত কিন্তু কাঁচ ও পারদ থাকায় সহজে স্থানান্তরযোগ্য নয়। |
| অ্যানিরয়েড ব্যারোমিটার (Aneroid Barometer) | তরলহীন (গ্রিক a-neros = তরল ছাড়া); বাতাসশূন্য একটি স্থিতিস্থাপক ধাতব বাক্সের সংকোচন-প্রসারণের দ্বারা কাঁটা ঘুরে পাঠ দেয়। | হালকা, টেকসই ও সহজে বহনযোগ্য; পর্বতারোহী, বিমানচালক (উচ্চতামাপক বা Altimeter হিসেবে) এবং জাহাজ পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। |
১.৩ বায়ুচাপের তারতম্যের কারণ: উষ্ণতা বনাম ঘনত্ব
ভূপৃষ্ঠের সব জায়গায় বায়ুচাপ সমান থাকে না। এর প্রধান নিয়ন্ত্রক হলো বায়ুর তাপমাত্রা:
- উষ্ণতার প্রভাব (ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক): বায়ু উত্তপ্ত হলে তার অণুগুলির গতিশক্তি বাড়ে এবং বাতাস প্রসারিত হয়। ফলে বায়ুর ঘনত্ব হ্রাস পায় এবং তা হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এই হালকা প্রসারিত বায়ু ভূপৃষ্ঠে কম চাপ দেয়, ফলে তাপজনিত নিম্নচাপ (Thermal Low) সৃষ্টি হয়।
- শীতলতার প্রভাব: বাতাস ঠান্ডা হলে সংকুচিত ও ভারী হয়। এই ঘন ভারী বাতাস নিচের দিকে নেমে আসে এবং ভূপৃষ্ঠে জমা হয়ে তাপজনিত উচ্চচাপ (Thermal High) তৈরি করে।
- মূল ভৌগোলিক নীতি: বায়ুর উষ্ণতা বাড়লে চাপ কমে, আর উষ্ণতা কমলে চাপ বাড়ে।
১.৪ উচ্চতার তারতম্য ও স্বাভাবিক পতন হার
বায়ু সংকোচনশীল হওয়ায় ওপরের সমস্ত বায়ুর চাপে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন নিচের স্তরের বায়ু সবচেয়ে বেশি ঘন ও ভারী হয়। যত ওপরে ওঠা যায়, বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব তত কমে যায়:
- চাপ হ্রাসের হার: ক্ষোভমণ্ডলের নিচের অংশে প্রতি ১১০ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিতে প্রায় ১ সেমি পারদস্তম্ভের চাপ হ্রাস পায়, যা প্রতি ৩০০ মিটারে প্রায় ৩৪ মিলিবার (বা প্রতি ৮.৫-৯ মিটারে প্রায় ১ মিলিবার) কমার সমান।
- উচ্চ পর্বতের অভিজ্ঞতা: মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় (৮,৮৪৮ মিটার) বায়ুর চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের চাপের এক-তৃতীয়াংশেরও কম (মাত্র ৩১৪ মিলিবার) হয়ে যায়। ফলে সেখানে বাতাসের ঘনত্ব এত কম থাকে যে পর্বতারোহীদের শ্বাসকষ্ট হয় ও অতিরিক্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার নিতে হয়।
১.৫ জলীয় বাষ্পের প্রভাব: শুষ্ক বায়ু বনাম আর্দ্র বায়ু
অনেকেই মনে করেন জলে বাষ্প যোগ হলে বাতাস ভারী হয়, কিন্তু বাস্তবে আর্দ্র বায়ু শুষ্ক বায়ুর চেয়ে হালকা:
১. শুষ্ক বায়ুর প্রধান উপাদান হলো নাইট্রোজেন ($\text{N}_২$, আণবিক ভর ২৮) এবং অক্সিজেন ($\text{O}_২$, আণবিক ভর ৩২)। ফলে শুষ্ক বায়ুর গড় আণবিক ভর প্রায় ২৮.৯৭ গ্রাম/মোল।
২. অন্যদিকে জলীয় বাষ্পের ($\text{H}_২\text{O}$) আণবিক ভর মাত্র $(২ \times ১) + ১৬ = \mathbf{১৮\text{ গ্রাম/মোল}}$।
৩. একই তাপমাত্রা ও চাপে সম-আয়তনের যেকোনো গ্যাসে সমান সংখ্যক অণু থাকে। তাই বাতাসে জলীয় বাষ্প বাড়লে হালকা জলের অণু ভারী নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণুকে প্রতিস্থাপিত করে।
৪. ফলে আর্দ্র বাতাস শুষ্ক বাতাসের চেয়ে হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায় এবং সেখানে তীব্র নিম্নচাপ সৃষ্টি করে (যেমন—বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ তৈরি হয়)।