Follow Us
মাধ্যম নির্বাচন করুন / Select Medium:
Eng (English) Beng (বাংলা) Hindi (हिन्दी)
পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) • শ্রেণি 8 • Social Science • অধ্যায় 16
আনুমানিক সময়: ৫০ মিনিট
অগ্রগতি: অধ্যয়নে সক্রিয়

মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যবই "আমাদের পৃথিবী"-র অন্তর্ভুক্ত সপ্তম অধ্যায় "মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন" (Human Activities and Environmental Degradation)-এর প্রামাণ্য ও বিস্তারিত পাঠ্যবস্তু। আমাদের পৃথিবী চারটি প্রধান জড় ও সজীব পরিমণ্ডলের সমন্বয়ে গঠিত: অশ্মমণ্ডল (Lithosphere), বারিমণ্ডল (Hydrosphere), বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) এবং জীবমণ্ডল (Biosphere)। সুপ্রাচীনকালে আদিম মানবসমাজ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রেখে বসবাস করত। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি (জনবিস্ফোরণ), অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহারের ফলে প্রকৃতির এই চিরন্তন ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। পরিবেশের অবনমন (Environmental Degradation) হলো পরিবেশের উপাদানসমূহের গুণগত ও পরিমাণগত এমন এক সামগ্রিক অবনতি যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং জীবধারণ ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়। অম্লবৃষ্টি, মার্বেল ক্যানসার, জলাশয়ের ইউট্রোফিকেশন ও উচ্চ বিওডি (BOD), পশ্চিমবঙ্গের মারাত্মক ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক দূষণ ও ব্ল্যাকফুট রোগ, মৃত্তিকার মরুকরণ, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান, ওজোন স্তরের ক্ষয় এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সংকট—এই অধ্যায়ে গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। অধ্যায়টিতে ৫টি সুসংহত মডিউল, ২৫টি ক্লাসরুম অনুচ্ছেদ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর এসভিজি (SVG) ধারণচিত্র, ৮টি বৈজ্ঞানিক সূত্র/পরিবেশ সূচক, ৮টি সমাধানকৃত আদর্শ প্রশ্ন, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও ভ্রান্ত ধারণা সতর্কতা, ৮টি মূল সারসংক্ষেপ বিন্দু, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে।

🌍 যখন মানব সভ্যতা ও প্রকৃতির সংঘাত চরমে: আমাদের নীল গ্রহকে রক্ষার শপথ!

তুমি কি জানো ১৯৫০ সালের পর থেকে পৃথিবীতে যত প্লাস্টিক তৈরি হয়েছে, তার একটি টুকরোও আজ পর্যন্ত প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়নি—বরং তা কোটি কোটি ক্ষুদ্র কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) হয়ে সমুদ্রের জল ও আমাদের খাদ্য শৃঙ্খলে ঢুকে পড়েছে?

কিংবা পশ্চিমবঙ্গের বহু জেলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ হাত ও পায়ে কালো দাগ ও ক্ষত সৃষ্টিকারী এক ভয়াবহ "ব্ল্যাকফুট রোগে" আক্রান্ত হচ্ছেন শুধুমাত্র গ্রীষ্মকালীন বোরো ধানের চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলার কারণে?

কলকারখানার কালো ধোঁয়া ও অম্লবৃষ্টি থেকে শুরু করে মেরু বরফের দ্রুত গলন, সুন্দরবনের ভাঙন এবং চিপকো আন্দোলনের গাছ জড়িয়ে ধরার বীরত্বপূর্ণ লড়াই পেরিয়ে এসো পা রাখি এক জীবনমুখী ভৌগোলিক পাঠে—মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমনে!

অধ্যায়টির গুরুত্ব

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) অষ্টম শ্রেণির ভূগোল পাঠ্যবই "আমাদের পৃথিবী"-র অন্তর্ভুক্ত সপ্তম অধ্যায় "মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন" (Human Activities and Environmental Degradation)-এর প্রামাণ্য ও বিস্তারিত পাঠ্যবস্তু। আমাদের পৃথিবী চারটি প্রধান জড় ও সজীব পরিমণ্ডলের সমন্বয়ে গঠিত: অশ্মমণ্ডল (Lithosphere), বারিমণ্ডল (Hydrosphere), বায়ুমণ্ডল (Atmosphere) এবং জীবমণ্ডল (Biosphere)। সুপ্রাচীনকালে আদিম মানবসমাজ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ ভারসাম্য বজায় রেখে বসবাস করত। কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি (জনবিস্ফোরণ), অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহারের ফলে প্রকৃতির এই চিরন্তন ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। পরিবেশের অবনমন (Environmental Degradation) হলো পরিবেশের উপাদানসমূহের গুণগত ও পরিমাণগত এমন এক সামগ্রিক অবনতি যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা, স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এবং জীবধারণ ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পায়। অম্লবৃষ্টি, মার্বেল ক্যানসার, জলাশয়ের ইউট্রোফিকেশন ও উচ্চ বিওডি (BOD), পশ্চিমবঙ্গের মারাত্মক ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক দূষণ ও ব্ল্যাকফুট রোগ, মৃত্তিকার মরুকরণ, বিশ্ব উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান, ওজোন স্তরের ক্ষয় এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সংকট—এই অধ্যায়ে গভীরভাবে আলোচিত হয়েছে। অধ্যায়টিতে ৫টি সুসংহত মডিউল, ২৫টি ক্লাসরুম অনুচ্ছেদ, প্রতিক্রিয়াশীল ভেক্টর এসভিজি (SVG) ধারণচিত্র, ৮টি বৈজ্ঞানিক সূত্র/পরিবেশ সূচক, ৮টি সমাধানকৃত আদর্শ প্রশ্ন, ৭টি পরীক্ষকের ফাঁদ ও ভ্রান্ত ধারণা সতর্কতা, ৮টি মূল সারসংক্ষেপ বিন্দু, ৮টি টেক-অ্যাওয়ে, ৫টি স্ব-মূল্যায়ন প্রশ্ন ও ৫টি সিবিটি ডায়াগনস্টিক এমসিকিউ সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে।

পাঠের পূর্বে প্রয়োজনীয় ধারণা

  • পৃথিবীর চারটি প্রধান পরিমণ্ডল: অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও জীবমণ্ডলের সাধারণ ধারণা।
  • বাস্তুতন্ত্র, খাদ্যশৃঙ্খল এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের মৌলিক নিয়মাবলী।
  • সাধারণ পরিচিত দূষকসমূহ: ধোঁয়া, কার্বন ডাই অক্সাইড, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং রাসায়নিক কীটনাশক।
  • বিশ্ব উষ্ণায়ন ও বনভূমি ধ্বংসের সাধারণ প্রভাব সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা।

শিখন লক্ষ্যমাত্রা ও ফলাফল

  • পরিবেশ দূষণ (Pollution) এবং পরিবেশের অবনমন (Degradation)-এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • মানবসমাজ ও প্রকৃতির সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তন (শিকারী-সংগ্রাহক পর্যায় থেকে শিল্পবিপ্লব ও বর্তমান কাল) বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • বায়ু দূষণ, অম্লবৃষ্টি (মার্বেল ক্যানসার), জলাশয়ের ইউট্রোফিকেশন এবং বিওডি (BOD)-র কারণ ও প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে পারবে।
  • পশ্চিমবঙ্গের ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক সংকটের কারণ, ভূতাত্ত্বিক বিক্রিয়া এবং ব্ল্যাকফুট রোগের মতো স্বাস্থ্য ঝুঁকি পর্যালোচনা করতে পারবে।
  • গ্রিনহাউস প্রভাব, বিশ্ব উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থানের বৈজ্ঞানিক কারণ মূল্যায়ন করতে পারবে।
  • গঙ্গা ও দামোদর নদের দূষণ, সুন্দরবনের সংকট এবং কয়লা খনি অঞ্চলের ভূমিধসের স্থানীয় ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারবে।
  • ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন অনুসারে সুস্থায়ী উন্নয়নের (Sustainable Development) সংজ্ঞা ও রাষ্ট্রসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) ব্যাখ্যা করতে পারবে।
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৪R নীতি (Refuse, Reduce, Reuse, Recycle) এবং চিপকো, নর্মদা বাঁচাও ও সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারবে।

অধ্যায়ের বিষয়সূচি ও রূপরেখা

1 ১. পরিবেশের উপাদান, বাস্তুতন্ত্রের...
2 ২. প্রধান দূষণ ও বাস্তুতন্ত্রের সংক...
3 ৩. বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু...
4 ৪. ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশগত অবন...
5 ৫. পরিবেশ সংরক্ষণ, সুস্থায়ী উন্নয়...

সম্পূর্ণ তত্ত্ব ও ধারণাগত আলোচনা

১. পরিবেশের উপাদান, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য ও অবনমনের কারণসমূহ

১.১ পরিবেশের ধারণা ও প্রধান পরিমণ্ডলসমূহ

যে সকল বাহ্যিক ভৌত, রাসায়নিক, জৈব ও সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে জীব সম্প্রদায় জন্মগ্রহণ করে, বৃদ্ধি পায় এবং জীবনধারণ করে, তাকে সামগ্রিকভাবে পরিবেশ (Environment) বলা হয়। পৃথিবীর পরিবেশ মূলত চারটি আন্তঃসম্পর্কিত পরিমণ্ডলের সমন্বয়ে গঠিত:

  • অশ্মমণ্ডল (Lithosphere): পৃথিবীর কঠিন শিলাময় বহিরাবরণ ও মৃত্তিকা স্তর, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাসস্থান এবং কৃষিকাজ ও খনিজ সম্পদের আধার।
  • বারিমণ্ডল (Hydrosphere): মহাসাগর, সাগর, নদ-নদী, হ্রদ, হিমবাহ এবং ভূগর্ভস্থ জলরাশি সমন্বিত সমগ্র জলমণ্ডল (পৃথিবীর প্রায় ৭১% অংশ)।
  • বায়ুমণ্ডল (Atmosphere): পৃথিবীকে বেষ্টন করে থাকা অদৃশ্য গ্যাসীয় স্তর, যা ক্ষতিকর সৌর বিকিরণ প্রতিরোধ করে এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।
  • জীবমণ্ডল (Biosphere): অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডলের সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা জীবনধারণের উপযোগী সংকীর্ণ সজীব বলয়, যেখানে সমগ্র উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব সম্প্রদায় বসবাস করে।

১.২ পরিবেশ দূষণ বনাম পরিবেশের অবনমন

শিক্ষার্থীরা প্রায়শই "দূষণ" এবং "অবনমন" শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু এদের মধ্যে সুস্পষ্ট ভৌগোলিক পার্থক্য রয়েছে:

পার্থক্যসূচক বিষয় পরিবেশ দূষণ (Environmental Pollution) পরিবেশের অবনমন (Environmental Degradation)
সংজ্ঞা বহিরাগত কোনো ক্ষতিকর পদার্থ বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল বা মৃত্তিকায় যুক্ত হয়ে যখন পরিবেশের স্বাভাবিক বিশুদ্ধতা ও গুণমানকে বিঘ্নিত করে। পরিবেশের উপাদানসমূহের সামগ্রিক গুণগত ও পরিমাণগত অবক্ষয়, যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রতিরোধ ক্ষমতা ও জীবধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়।
ব্যাপ্তি ও সম্পর্ক একটি তুলনামূলক সংকীর্ণ প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট দূষক পদার্থের (যেমন ধোঁয়া, নিকাশি জল, প্লাস্টিক) নির্গমনের ফলে ঘটে। একটি ব্যাপক ও সামগ্রিক ধারণা। দূষণের পাশাপাশি অবৈজ্ঞানিক সম্পদ আহরণ, বৃক্ষচ্ছেদন, ভূমিক্ষয় প্রভৃতির ফলে ঘটে।
কারণগত ভিত্তি প্রত্যেক প্রকার দূষণই পরিবেশের অবনমন ঘটায়। কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ রাসায়নিক দূষণ ছাড়াও কেবল অতিরিক্ত বন নিধন বা অতি-চারণের মাধ্যমে অবনমন ঘটতে পারে।
পুনরুদ্ধার যোগ্যতা দূষণের উৎস বন্ধ করলে বা শোধন করলে দ্রুত পরিবেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। অবনমন দীর্ঘমেয়াদী এবং অনেক সময় অপূরণীয় (যেমন শীর্ষমৃত্তিকা ক্ষয়, প্রজাতির বিলুপ্তি বা হিমবাহের বিনাশ)।

১.৩ মানবসমাজ ও প্রকৃতির সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তন

সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের তিনটি ঐতিহাসিক পর্যায় লক্ষ্য করা যায়:

  1. শিকারী ও খাদ্য-সংগ্রাহক যুগ: আদিম মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি না করে তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মধ্যেই বাস করত।
  2. কৃষি বিপ্লব (~১০,০০০ বছর পূর্বে): মানুষ বুনো গাছপালা ও পশুকে পোষ মানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কৃষিজমি তৈরির জন্য বন উজাড় এবং সেচের জন্য নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রথম পরিবেশের ওপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ শুরু হয়।
  3. শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তি যুগ: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারের পর কয়লা ও খনিজ তেলের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। বৃহদায়তন কলকারখানা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, নগরায়ণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের ফলে মানুষ প্রকৃতিকে সীমাহীনভাবে শোষণ করতে শুরু করে, যা বর্তমান পরিবেশগত সংকটের মূল কারণ।

১.৪ পরিবেশ অবনমনের প্রধান চালিকাশক্তি ও IPAT সমীকরণ

পরিবেশের অবনমনের পেছনে প্রধানত পাঁচটি মানবীয় কারণ সক্রিয় রয়েছে:

  • জনবিস্ফোরণ (Population Explosion): ১৮০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০০ কোটি, যা ১৯৫০ সালে ২৫০ কোটি এবং ২০২২ সালে ৮০০ কোটি অতিক্রম করেছে। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য, বাসস্থান ও জীবিকার চাহিদা মেটাতে বন উজাড় ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল শোষণ করা হচ্ছে।
  • অপরিকল্পিত নগরায়ণ (Unplanned Urbanization): কৃষিজমি ও জলাভূমি বুজিয়ে কংক্রিটের শহর গড়ে ওঠার ফলে স্বাভাবিক জলনিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে এবং "আরবান হিট আইল্যান্ড" সৃষ্টি হচ্ছে।
  • শিল্পের বর্জ্য ও জীবাশ্ম জ্বালানি: কলকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপ এবং বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন।
  • কৃষিতে রাসায়নিক পদার্থের অতিব্যবহার: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
  • IPAT সমীকরণ: বিজ্ঞানী পল এহরলিচ পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাব পরিমাপের জন্য একটি সূত্র প্রকাশ করেন: $$\text{পরিবেশের প্রভাব } (I) = \text{জনসংখ্যা } (P) \times \text{মাথাপিছু ভোগক্ষমতা } (A) \times \text{প্রযুক্তির বিরূপতা } (T)$$

১.৫ প্রাকৃতিক বনাম মনুষ্যসৃষ্ট অবনমন

প্রাকৃতিক কারণ (Natural Causes)

ভূ-অভ্যন্তরীণ আলোড়ন বা প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট অবনমন:

  • আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (বিপুল পরিমাণ ছাই ও সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গমন)।
  • ভূমিকম্প ও পার্বত্য অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিধস।
  • সুনামি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দাবানল।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি সাময়িক এবং প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে পুনরায় ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে পারে।
মনুষ্যসৃষ্ট কারণ (Anthropogenic Causes)

মানুষের অপরিণামদর্শী কার্যাবলীর ফলে সৃষ্ট অবনমন:

  • উন্মুক্ত কয়লা ও খনিজ উত্তোলন (Open-cast mining) দ্বারা বনভূমি ধ্বংস।
  • কলকারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন।
  • আমাজন ও ইন্দোনেশিয়ার ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য পুড়িয়ে সাফ করা।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি অবিরাম, তীব্র এবং প্রকৃতির ধারণক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে।

২. প্রধান দূষণ ও বাস্তুতন্ত্রের সংকট (বায়ু, জল, মৃত্তিকা, শব্দ ও বর্জ্য দূষণ)

২.১ বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ ও অম্লবৃষ্টির (Acid Rain) প্রক্রিয়া

বায়ুতে ক্ষতিকর গ্যাসীয় ও কণিকাজাত পদার্থের উপস্থিতি জীবের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুললে তাকে বায়ু দূষণ বলে:

  • প্রাথমিক দূষক: যা সরাসরি উৎস থেকে বাতাসে মেশে—কার্বন মনোক্সাইড ($CO$), সালফার ডাই অক্সাইড ($SO_2$), নাইট্রোজেন অক্সাইডসমূহ ($NO_x$) এবং সূক্ষ্ম ধূলিকণা ($PM_{2.5}$ ও $PM_{10}$)।
  • গৌণ দূষক: প্রাথমিক দূষকগুলি বাতাসে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে তৈরি করে—যেমন আলোক-রাসায়নিক ধোঁয়াশা (Photochemical Smog) ও ট্রপোস্ফিয়ারিক ওজোন।
  • অম্লবৃষ্টি বা অ্যাসিড রেন (Acid Rain): তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কলকারখানা থেকে নির্গত $SO_2$ এবং যানবাহনের ধোঁয়ার $NO_2$ বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ও অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে সালফিউরিক অ্যাসিড ($H_2SO_4$) ও নাইট্রিক অ্যাসিড ($HNO_3$) তৈরি করে: $$2SO_2 + O_2 + 2H_2O \rightarrow 2H_2SO_4$$ $$4NO_2 + O_2 + 2H_2O \rightarrow 4HNO_3$$ যে বৃষ্টির জলের $pH < 5.6$, তাকে অম্লবৃষ্টি বলে। এর ফলে বনাঞ্চলের গাছপালা মারা যায়, জলাশয়ের মাছের ডিম নষ্ট হয় এবং মার্বেল পাথরের তৈরি প্রাচীন সৌধ ক্ষয়ে যায়, যাকে মার্বেল ক্যানসার বা স্টোন লেপ্রসি (Marble Cancer / Stone Leprosy) বলে: $$CaCO_3 \text{ (মার্বেল)} + H_2SO_4 \rightarrow CaSO_4 \text{ (জিপসাম)} + H_2O + CO_2$$ (যেমন আগ্রার তাজমহলের সাদা মার্বেল হলুদ ও ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাওয়া)।

২.২ জলদূষণ, ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) ও বিওডি (BOD)

কলকারখানার বর্জ্য, নর্দমার জল এবং চাষের জমি থেকে ধুয়ে আসা অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ও ফসফেট সার জলাশয়ে মিশে মারাত্মক জলদূষণ ঘটায়:

ইউট্রোফিকেশনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া:
  1. পুষ্টির আধিক্য: চাষের জমি থেকে সার ধুয়ে এসে পুকুর বা হ্রদে নাইট্রোজেন ও ফসফেটের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
  2. অ্যালগাল ব্লুম (Algal Bloom): পুষ্টি পেয়ে জলাশয়ের উপরিভাগে কচুরিপানা ও সবুজ-নীল শৈবালের দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ঘটে এবং জলের ওপর একটি ঘন সবুজ আস্তরণ তৈরি হয়।
  3. সূর্যালোক প্রবেশে বাধা: এই আস্তরণের কারণে জলের গভীরে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে না, ফলে নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ করতে না পেরে মারা যায়।
  4. ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও অক্সিজেনের ঘাটতি: মৃত শৈবাল ও উদ্ভিদ পচানোর জন্য বায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। এরা জল থেকে দ্রুত দ্রবীভূত অক্সিজেন (Dissolved Oxygen - DO) শোষণ করে নেয়।
  5. বিওডি বৃদ্ধি ও মাছের মৃত্যু: জলের বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) মারাত্মক বৃদ্ধি পায় এবং দ্রবীভূত অক্সিজেন শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় জলের সমস্ত মাছ ও জলজ প্রাণী দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। একে জলাশয়ের "অ্যানক্সিক ডেড জোন" বলা হয়।

২.৩ মৃত্তিকা অবক্ষয়, লবণাক্ততা ও মরুকরণ (Desertification)

মৃত্তিকার ১ সেন্টিমিটার উর্বর স্তর তৈরি হতে প্রকৃতির প্রায় ২০০ থেকে ৪০০ বছর সময় লাগে। কিন্তু মানুষের অপরিণামদর্শী কাজের ফলে মৃত্তিকা দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে:

  • মৃত্তিকা ক্ষয় (Soil Erosion): গাছপালা কাটার ফলে এবং অবৈজ্ঞানিক চাষের কারণে বৃষ্টির জল ও বায়ুর দ্বারা উপরের উর্বর পলি ও হিউমাস ধুয়ে উড়ে যায়।
  • মৃত্তিকার লবণাক্ততা (Salinization): শুষ্ক অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত খাল সেচ দেওয়ার ফলে কৈশিক প্রক্রিয়ায় ভূগর্ভস্থ লবণ মাটির ওপর উঠে আসে এবং মাটির ওপর একটি সাদা লবণের আস্তরণ পড়ে জমিকে সম্পূর্ণ অনুর্বর করে তোলে (যেমন পাঞ্জাব ও হরিয়ানার রেহ্ বা কাল্লার)।
  • মরুকরণ (Desertification): অতিরিক্ত গাছ কাটা, ভূমিক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিক উর্বর কৃষিজমি বা চারণভূমি ক্রমশ শুষ্ক অনুর্বর বালুকাময় মরুভূমিতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া।

২.৪ শব্দদূষণ ও তেজস্ক্রিয় দূষণ

  • শব্দদূষণ (Noise Pollution): শব্দের তীব্রতা মাপার একক হলো ডেসিবেল (dB)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে মানুষের কানে সহনশীল শব্দের মাত্রা দিনে ৫৫ dB এবং রাতে ৪৫ dB। কিন্তু কলকারখানা, হাইড্রলিক হর্ন ও মাইকের তীব্র শব্দ ৬৫ dB-এর বেশি হলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও তীব্র মানসিক অবসাদ সৃষ্টি হয়।
  • তেজস্ক্রিয় দূষণ (Radioactive Pollution): পারমাণবিক চুল্লি দুর্ঘটনা (১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দুর্ঘটনা এবং ২০১১ সালের জাপানের ফুকুশিমা বিপর্যয়) থেকে নির্গত আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি মানবদেহে প্রবেশ করে জিনগত বিকলাঙ্গতা, রক্তে ক্যানসার (লিউকেমিয়া) এবং বংশপরম্পরায় মারাত্মক জন্মগত ত্রুটি ঘটায়।

২.৫ প্লাস্টিক, মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ই-বর্জ্য (E-Waste) সংকট

প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ:

অপচনশীল পেট্রো-প্লাস্টিক প্রকৃতিতে নষ্ট হতে ৪০০ থেকে ১,০০০ বছর সময় নেয়। সাগরে ও মাটিতে পড়ে থাকা প্লাস্টিক সূর্যালোক ও ঘর্ষণে ভেঙে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। সামুদ্রিক মাছ ও প্লাঙ্কটন একে খাবার ভেবে গ্রহণ করে, ফলে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে বিষাক্ত রাসায়নিক ঢুকে পড়ছে।

ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য (E-Waste):

পরিত্যক্ত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন ও ব্যাটারির মধ্যে মারাত্মক বিষাক্ত সীসা (Lead), ক্যাডমিয়াম ও পারদ থাকে। অবৈজ্ঞানিক উপায়ে এই বর্জ্য পোড়ালে বা মাটির নিচে ফেললে তা বাতাস ও ভূগর্ভস্থ জলকে বিষাক্ত করে তোলে।

৩. বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন (বিশ্ব উষ্ণায়ন, ওজোন অবক্ষয় ও বিপর্যয়)

৩.১ অতিরিক্ত গ্রিনহাউস প্রভাব ও বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming)

স্বাভাবিক গ্রিনহাউস প্রভাব (Greenhouse Effect) পৃথিবীর জন্য একটি আশীর্বাদ। বায়ুমণ্ডলের কিছু গ্যাস পৃথিবীর প্রতিফলিত দীর্ঘ তরঙ্গবিশিষ্ট অবলোহিত বিকিরণকে (Infrared Radiation) ধরে রেখে ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা প্রায় +১৫°C বজায় রাখে (এটি না থাকলে পৃথিবী -১৮°C ঠান্ডায় জমে বরফ হয়ে যেত)।

কিন্তু মানুষের ক্রিয়াকলাপে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রা অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় শুরু হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming):

গ্রিনহাউস গ্যাস (GHG) বায়ুমণ্ডলে স্থায়িত্বকাল উষ্ণায়ন ক্ষমতা (GWP) প্রধান মানবীয় নির্গমন উৎস
কার্বন ডাই অক্সাইড ($CO_2$) ১০০–৩০০ বছর ১ (মানক সূচক) কয়লা, খনিজ তেল ও গ্যাসের দহন; তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র; অরণ্যচ্ছেদন। প্রাক-শিল্পযুগে ২৮০ ppm থেকে বর্তমানে বেড়ে হয়েছে ৪২০ ppm-এর বেশি।
মিথেন ($CH_4$) প্রায় ১২ বছর ২৮–৩৬ গুণ প্লাবিত ধানক্ষেতের পচন, গবাদি পশুর রোমন্থন, আবর্জনা স্তূপের পচন ও গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ।
নাইট্রাস অক্সাইড ($N_2O$) প্রায় ১১৪ বছর ২৬৫–২৯৮ গুণ অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার, নাইলন কারখানা ও জীবাশ্ম জ্বালানি।
ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFCs) ৫০–১০০ বছর ১,০০০–১২,০০০ গুণ রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার ও ফোম তৈরির স্প্রে।

৩.২ হিমবাহের দ্রুত গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি

বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর বরফাবৃত ক্রায়োস্ফিয়ার (Cryosphere) আশঙ্কাজনকভাবে গলে যাচ্ছে:

  • মেরু বরফের ক্ষয়: উত্তর মেরু (আর্কটিক) এবং গ্রিনল্যান্ড ও আন্টার্কটিকার বিশাল বরফের চাদর দ্রুত গলছে।
  • হিমালয়ীয় হিমবাহের পশ্চাদপসরণ: গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রী হিমবাহ প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ২৫ মিটার পিছিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভবিষ্যতে গঙ্গা ও সিন্ধু নদীর জলপ্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
  • সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান ও সুন্দরবনের সংকট: বিগত শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ২০ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের লোহাচড়া দ্বীপ সমুদ্রের জলে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে এবং ঘোড়ামারা দ্বীপ ও সাগর দ্বীপের অর্ধেকের বেশি অংশ প্রবল ভাঙনের কবলে পড়েছে। মালদ্বীপ ও তুভালুর মতো নিচু দ্বীপরাষ্ট্রগুলি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

৩.৩ ওজোন স্তর অবক্ষয় (Ozone Layer Depletion) ও মন্ট্রিল চুক্তি

স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ১৫ থেকে ৩৫ কিমি উচ্চতায় অবস্থিত ওজোন স্তর সূর্য থেকে আসা মারাত্মক অতিবেগুনি রশ্মি ($UV\text{-}B$) শোষণ করে পৃথিবীকে রক্ষা করে, তাই একে 'প্রাকৃতিক ওজোন ছাতা' বলা হয়।

ক্লোরিনের মাধ্যমে ওজোন ধ্বংসের রাসায়নিক বিক্রিয়া: মানুষের ব্যবহৃত রেফ্রিজারেটর ও এসি থেকে নির্গত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) উড়ে গিয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছায়। সেখানে তীব্র সৌর অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে CFC ভেঙে সক্রিয় মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ($Cl$) নির্গত হয়: $$CF_2Cl_2 + UV \rightarrow CF_2Cl + Cl$$ এই মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে ওজোন অণুকে ভেঙে দেয়: $$\text{ধাপ ১: } Cl + O_3 \rightarrow ClO + O_2$$ $$\text{ধাপ ২: } ClO + O \rightarrow Cl + O_2$$ $$\text{সামগ্রিক ফল: } O_3 + O \rightarrow 2O_2$$ একটি মাত্র মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ধ্বংস হওয়ার আগে ১ লক্ষেরও বেশি ওজোন অণুকে ধ্বংস করতে পারে! ১৯৮৫ সালে আন্টার্কটিকার ওপরে ভয়াবহ ওজোন গহ্বর (Ozone Hole) আবিষ্কৃত হয়। এই সংকট মোকাবিলায় ১৯৮৭ সালে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ কানাডার মন্ট্রিলে ঐতিহাসিক মন্ট্রিল চুক্তি (Montreal Protocol) স্বাক্ষর করে সিএফসি উৎপাদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।

৩.৪ চরম আবহাওয়া ও জীববৈচিত্র্যের ষষ্ঠ মহা-বিলুপ্তি

জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন সুপার সাইক্লোন (আম্ফান, ইয়াস, রেমাল) সৃষ্টি হচ্ছে। খরা, আকস্মিক মেঘভাঙা বৃষ্টি ও ভয়াবহ দাবানল বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের অরণ্য ধ্বংসের কারণে পৃথিবীর বন্যপ্রাণীরা দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে, যাকে ভূবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ইতিহাসের 'ষষ্ঠ মহা-বিলুপ্তি' (Sixth Mass Extinction) বলে চিহ্নিত করছেন। সমুদ্রের জল উষ্ণ হওয়ায় প্রবালের শরীর থেকে রঙিন শৈবাল বেরিয়ে গিয়ে সম্পূর্ণ প্রবাল কঙ্কাল সাদা হয়ে মারা যাচ্ছে, একে প্রবাল ব্লিচিং (Coral Bleaching) বলে।

৪. ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশগত অবনমনের বাস্তব কেস স্টাডি

৪.১ গঙ্গা ও দামোদর নদীর দূষণ সংকট

ভারতের প্রধান নদ-নদীগুলি মারাত্মক শিল্প ও নিকাশি দূষণের শিকার:

  • গঙ্গা নদীর সংকট: উত্তরপ্রদেশের কানপুরের চামড়া কারখানাগুলির বিষাক্ত ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য এবং বারাণসী, প্রয়াগরাজ ও কলকাতার অপরিশোধিত নর্দমার জল সরাসরি গঙ্গায় পড়ে। এর ফলে জলের অক্সিজেন কমে গিয়ে গঙ্গার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং বিপন্ন গাঙ্গেয় শুশুক (River Dolphin) বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। ভারত সরকার গঙ্গা পুনরুদ্ধারে নমামি গঙ্গে (Namami Gange) প্রকল্প রূপায়ণ করছে।
  • মৃতপ্রায় দামোদর নদী: রানিগঞ্জ-আসানসোল কয়লাখনি অঞ্চলের কয়লা ধোয়া জল, ডিভিসির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই (Fly Ash) এবং দুর্গাপুর ও বোকারোর লৌহ-ইস্পাত কারখানার রাসায়নিক বর্জ্যের কারণে দামোদর নদের জল কালো বিষাক্ত স্লাজে পরিণত হয়েছে।

৪.২ পশ্চিমবঙ্গের ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক বিপর্যয় ও ব্ল্যাকফুট রোগ

পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ গ্রামীণ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক বিষক্রিয়ার শিকার:

আর্সেনিক সংকটের কারণ ও মারাত্মক পরিণতি:
  • ভূতাত্ত্বিক কারণ: গঙ্গা বদ্বীপের মাটির নিচের পলিস্তরে আয়রন পাইরাইট ($FeS_2$) খনিজের সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক আবদ্ধ ছিল।
  • মানুষের অবিমৃশ্যকারিতা: সবুজ বিপ্লবের পর থেকে গ্রীষ্মকালীন উচ্চফলনশীল বোরো ধান (Boro Paddy) চাষের সেচের জন্য অগভীর নলকূপ দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোটি কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ জল তোলা হতে থাকে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর মারাত্মক নিচে নেমে যায় এবং মাটির গভীরে ফাঁকা স্থানে বাতাসের অক্সিজেন প্রবেশ করে। অক্সিজেনের সংস্পর্শে আয়রন পাইরাইট জারিত হয়ে বিষাক্ত আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ পানীয় জলে দ্রবীভূত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
  • নিরাপদ মাত্রা: WHO-এর মতে পানীয় জলে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ নিরাপদ মাত্রা হলো ০.০১ মিলিগ্রাম/লিটার (10 ppb); অথচ বাংলার নলকূপগুলিতে এর মাত্রা ০.০৫ থেকে ০.৫০ মিলিগ্রামেরও বেশি!
  • ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহ: মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বর্ধমান ও হাওড়া।
  • স্বাস্থ্য সংকট (আর্সেনিকোসিস): দীর্ঘদিন এই বিষাক্ত জল পানের ফলে চামড়ায় কালো ছোপ ছোপ দাগ (মেলানোসিস), হাতের তালু ও পায়ের তলায় শক্ত খসখসে ফুসকুড়ি (কেরাটোসিস), হাত ও পায়ের রক্তনালী নষ্ট হয়ে পচন ধরা ব্ল্যাকফুট রোগ (Blackfoot Disease) এবং অবশেষে ফুসফুস, ত্বক ও মূত্রাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

৪.৩ সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রের ভঙ্গুরতা

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন আজ বহুমুখী সংকটে জর্জরিত:

  • মিষ্টি জলের প্রবাহ হ্রাস: উজান থেকে গঙ্গার মিষ্টি জলের প্রবাহ কমে যাওয়ায় জোয়ারের সমুদ্রের নোনা জলের আধিক্য বাড়ছে। এর ফলে সুন্দরবনের প্রতীক সুন্দরী গাছ (Heritiera fomes) মারা যাচ্ছে এবং সেখানে কম মূল্যবান নোনা-সহনশীল গরান গাছ জন্মাচ্ছে।
  • উপকূলীয় ক্ষয় ও তীব্র জলোচ্ছ্বাস: ঘন ঘন ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নদীর পাড় ভেঙে নোনা জল ঢুকে চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। সুন্দরবনের লোহাচড়া ও বেডফোর্ড দ্বীপ তলিয়ে গেছে এবং ঘোড়ামারা দ্বীপের অস্তিত্ব সংকটে।
  • ম্যানগ্রোভ ধ্বংস ও রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার: নোনা চিংড়ির মীন ধরার জন্য সূক্ষ্ম জাল টেনে নদী ও খাড়ির হাজার হাজার অন্যান্য জলজ প্রাণীর চারা ধ্বংস করা হচ্ছে। মানুষ-বাঘের সংঘাতও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৪.৪ কলকাতা ও মেট্রো শহরের বায়ুর তাপমাত্রার বিপরীত অবস্থান (Smog)

শীতকালে (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) কলকাতা ও দিল্লির মতো মহানগরে বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রার বিপরীত অবস্থান (Temperature Inversion) ঘটে। স্বাভাবিক নিয়মে উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে উষ্ণতা কমার বদলে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ঠান্ডা ও ভারী বাতাসের ওপর উষ্ণ বাতাসের একটি ঢাকনা তৈরি হয়। এই আটকে থাকা বাতাসের মধ্যে গাড়ির ধোঁয়া, কারখানার ছাই ও ধূলিকণা মিশে বিষাক্ত ঘন ধোঁয়াশা (Smog) সৃষ্টি করে, যা শিশুদের হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ মারাত্মক বাড়িয়ে দেয়।

৪.৫ রানিগঞ্জ-আসানসোল কয়লাখনি অঞ্চলের অবনমন ও ভূমিধস

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জ-আসানসোল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভূগর্ভস্থ কয়লা উত্তোলনের পর ফাঁকা খনিগর্ভ বালুকা দ্বারা ভরাট না করায় ভয়াবহ ভূমিধস (Land Subsidence) ঘটছে। ভূগর্ভস্থ কয়লাস্তরে যুগের পর যুগ আগুন জ্বলছে এবং বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হচ্ছে। পাথর ও বালুকা উত্তোলনের ফলে বীরভূম ও পুরুলিয়ার প্রাচীন শাল ও পিয়াল অরণ্য ধ্বংস হয়ে গেছে।

৫. পরিবেশ সংরক্ষণ, সুস্থায়ী উন্নয়ন ও নাগরিক ভূমিকা

৫.১ সুস্থায়ী উন্নয়ন (Sustainable Development) ও রাষ্ট্রসংঘের লক্ষ্যমাত্রা

১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত বিশ্ব কমিশন (ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন)-এর "আমাদের সাধারণ ভবিষ্যৎ" (Our Common Future) শীর্ষক ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে সুস্থায়ী উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)-এর আধুনিক সংজ্ঞা প্রদান করা হয়:

"যে উন্নয়ন বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা মেটায় অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্যকে এতটুকু ক্ষুণ্ণ করে না, তাকেই সুস্থায়ী উন্নয়ন বলে।"

সুস্থায়ী উন্নয়নের তিনটি প্রধান স্তম্ভ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ন্যায় এবং পরিবেশগত সুরক্ষা। ২০১৫ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ২০৩০ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs 2015–2030) গৃহীত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: বিশুদ্ধ জল ও নিকাশি (SDG 6), সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত শক্তি (SDG 7), জলবায়ু পদক্ষেপ (SDG 13) এবং স্থলভাগের বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা (SDG 15)।

৫.২ অপ্রচলিত সবুজ শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি

দূষণকারী জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার করে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য সবুজ শক্তিতে রূপান্তর ঘটাতে হবে:

  • সৌরশক্তি (Solar Energy): সিলিকন ফটো-ভোল্টাইক প্যানেল দ্বারা সৌররশ্মিকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তর (যেমন জাতীয় সৌর মিশন ও বাড়ির ছাদে সোলার রুফটপ)।
  • বায়ুশক্তি (Wind Energy): বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন (যেমন তামিলনাড়ু ও গুজরাটের উইন্ড পার্ক)।
  • ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস: বড় বাঁধ না দিয়ে পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক স্রোত থেকে বিদ্যুৎ তৈরি এবং কৃষিজ বর্জ্য ও গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি।
  • বৈদ্যুতিক যানবাহন (EVs): পেট্রোল ও ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে ধোঁয়াহীন ইলেকট্রিক বাস ও ব্যাটারি চালিত যানের প্রসার।

৫.৩ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৪R (Four R's) নীতি

কঠিন বর্জ্য হ্রাস ও বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তুলতে ৪R নীতি প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক:

ক্রম ৪R নীতি অর্থ ও শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ
১ম (সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার) Refuse (প্রত্যাখ্যান) একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ, থার্মোকল ও অতিরিক্ত প্যাকেটজাত সামগ্রী কিনতে সরাসরি "না" বলা।
২য় Reduce (হ্রাস করা) সম্পদের অপচয় কমানো; অপ্রয়োজনে ফ্যান-লাইট বন্ধ রাখা; জল অপচয় রোধ করা; খাতার উভয় পৃষ্ঠা ব্যবহার করা।
৩য় Reuse (পুনর্ব্যবহার) একটি জিনিস ফেলে না দিয়ে বারবার ব্যবহার করা; কাঁচের শিশি ও কাপড়ের থলে পুনরায় কাজে লাগানো।
৪র্থ (শেষ স্তর) Recycle (পুনর্নবীকরণ) পুরনো খবরের কাগজ, লোহা-টিন ও প্লাস্টিক আলাদা করে কারখানায় পাঠিয়ে নতুন পণ্য তৈরি করা।

৫.৪ ভারতের ঐতিহাসিক পরিবেশ আন্দোলনসমূহ

ভারতবর্ষের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাছ ও প্রকৃতি বাঁচাতে যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে:

  • চিপকো আন্দোলন (Chipko Movement, ১৯৭৩): বর্তমান উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার মণ্ডল গ্রামে শুরু হয়। নেতৃত্ব দেন সুন্দরলাল বহুগুণা, চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট এবং গ্রামের সাহসী নেত্রী গৌরা দেবী। কাঠ ব্যবসায়ীরা হিমালয়ের মূল্যবান গাছ কাটতে এলে গ্রামের মহিলারা গাছগুলিকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন ("চিপকো" অর্থাৎ আলিঙ্গন করা বা আঁকড়ে ধরা)। তাঁদের অসীম সাহসের কাছে হার মেনে সরকার হিমালয়ের সংরক্ষিত বনে গাছ কাটা ১৫ বছরের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে।
  • নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (Narmada Bachao Andolan): নর্মদা নদীর ওপর সর্দার সরোবর মেগা বাঁধ নির্মাণের ফলে লাখ লাখ আদিবাসী মানুষের ভিটেমাটি উচ্ছেদ ও বনভূমি নিমজ্জনের প্রতিবাদে সমাজকর্মী মেধা পাটকর ও বাবা আমতের নেতৃত্বে এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আন্দোলন।
  • সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন (Silent Valley Movement, ১৯৭৮): কেরালার পালাক্কাদ জেলায় কুন্তিপূজা নদীর ওপর জলবিদ্যুৎ বাঁধ তৈরি করে একটি চিরহরিৎ ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য এবং বিপন্ন সিংহলেজী বানর (Lion-tailed Macaque)-কে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে কেরালা শাস্ত্র সাহিত্য পরিষদ (KSSP) এই সফল আন্দোলন গড়ে তোলে।
  • আপ্পিকো আন্দোলন (Appiko Movement, ১৯৮৩): কর্ণাটকের উত্তর কন্নড় জেলায় পশ্চিমঘাট পর্বতের অরণ্য রক্ষায় চিপকোর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে গাছ জড়িয়ে ধরে এই দক্ষিণ ভারতীয় আন্দোলন পরিচালিত হয়।

৫.৫ পরিবেশ সুরক্ষা আইন ও প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নাগরিক কর্তব্য

১৯৮৪ সালের ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনার পর ভারতীয় সংসদ পরিবেশ সুরক্ষা আইন, ১৯৮৬ (Environment Protection Act, 1986) পাস করে। তবে কেবল সরকারি আইনে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়; প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা:

  • স্কুল চত্বর ও বাড়ির আশেপাশে দেশীয় ফল ও ছায়াদানকারী গাছ লাগানো (সামাজিক বনসৃজন)।
  • বাড়িতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) এবং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাপড়ের থলে ব্যবহার করা।
  • মহাত্মা গান্ধীর সেই অমর বাণী সর্বদা স্মরণ রাখা: "পৃথিবী প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ দিয়েছে, কিন্তু কারও লোভ মেটানোর মতো যথেষ্ট নয়।"

গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিভাষা, সময়কাল ও প্রশাসনিক নীতি

পরিবেশ প্রভাব নির্ণায়ক সমীকরণ (IPAT Identity)
পরিবেশ প্রভাব (I) = জনসংখ্যা (P) × মাথাপিছু ভোগক্ষমতা (A) × প্রযুক্তির বিরূপ প্রভাব (T)
বিজ্ঞানী পল এহরলিচ ও জন হোলড্রেন উদ্ভাবন করেন; জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে বিলাসবহুল ভোগবৃদ্ধি পরিবেশের ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বায়ু গুণমান সূচক গণনা নীতি (Air Quality Index - AQI)
শ্রেণী: ০–৫০ (ভালো), ৫১–১০০ (সন্তোষজনক), ১০১–২০০ (মাঝারি), ২০১–৩০০ (খারাপ), ৩০১–৪০০ (খুব খারাপ), ৪০১–৫০০ (ভয়াবহ)
PM2.5, PM10, SO2, NO2 ও ওজোনের ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিক AQI নির্ধারিত হয়।
বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড সমীকরণ (BOD Equation)
বিশুদ্ধ নদীজল: BOD < ২ mg/L; দূষিত নর্দমার জল: BOD > ১০০–৩০০ mg/L
DO_0 = প্রাথমিক দ্রবীভূত অক্সিজেন; DO_5 = ২০°C উষ্ণতায় ৫ দিন অন্ধকারে রাখার পর অবশিষ্ট অক্সিজেন।
সার্বজনীন মৃত্তিকা ক্ষয় সমীকরণ (Universal Soil Loss Equation - USLE)
A = বার্ষিক মৃত্তিকা ক্ষয় (টন/হেক্টর); R = বৃষ্টির ক্ষয়কারিতা; K = মাটির ক্ষয়প্রবণতা; LS = ঢালের দৈর্ঘ্য ও খাড়া ভাব; C = উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদন; P = সংরক্ষণ কৌশল
বন উজাড় করলে উদ্ভিজ্জ আচ্ছাদন গুণক (C) বৃদ্ধি পেয়ে মৃত্তিকা ক্ষয় ৫০০ গুণেরও বেশি ত্বরান্বিত হয়।
গ্রিনহাউস গ্যাসের বিকিরণীয় বলপ্রয়োগ (Radiative Forcing of CO2)
C = বর্তমান বায়ুমণ্ডলীয় CO2 (~৪২০ ppm); C_0 = প্রাক-শিল্পযুগ (~২৮০ ppm); বর্তমান বিকিরণীয় চাপ > ২.২ W/m²
ধনাত্মক বিকিরণীয় চাপ নির্দেশ করে যে পৃথিবী মহাকাশে যে তাপ ছাড়ছে তার চেয়ে বেশি তাপ ধরে রাখছে।
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারিক ওজোন ধ্বংসের অনুঘটক বিক্রিয়া
সামগ্রিক ফল: O_3 + O → 2 O_2 (১টি মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু > ১ লক্ষ ওজোন অণু ধ্বংস করে)
সিএফসি থেকে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে মুক্ত হওয়া ক্লোরিন পরমাণু নিজে অক্ষত থেকে ধারাবাহিকভাবে ওজোন বিনষ্ট করে।
বাস্তুতন্ত্রের ধারণক্ষমতা নীতি (Carrying Capacity Principle)
N = জনসংখ্যা; r = প্রাকৃতিক বৃদ্ধির হার; K = বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা (Carrying Capacity)
যখন মানুষের সম্পদের চাহিদা K-এর সীমা অতিক্রম করে (Overshoot), তখনই বাস্তুতন্ত্রের অবনমন ও বিপর্যয় ঘটে।
বর্জ্য পুনর্নবীকরণ ও পৃথকীকরণ দক্ষতা অনুপাত
বর্তমান বৈশ্বিক গড় ~২০%; শূন্য-বর্জ্য টেকসই শহরের লক্ষ্যমাত্রা > ৭৫%
উৎস পৃথকীকরণ (ভেজা বর্জ্য ও শুকনো বর্জ্য) পুনর্নবীকরণের হার সর্বাধিক করতে সাহায্য করে।

সমাধানকৃত উদাহরণ ও প্রয়োগ (Solved Examples)

উদাহরণ 1
প্রশ্ন ১: পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশের অবনমনের মধ্যে পার্থক্য কী? উপযুক্ত ভৌগোলিক উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দাও।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: ১. পরিবেশ দূষণ (Environmental Pollution):

  • সংজ্ঞা: পরিবেশের কোনো অংশে (বায়ু, জল বা মাটি) বাহ্যিক কোনো অবাঞ্ছিত বা ক্ষতিকর পদার্থ যুক্ত হয়ে যখন পরিবেশের স্বাভাবিক বিশুদ্ধতা ও কার্যকারিতা নষ্ট করে, তাকে পরিবেশ দূষণ বলে।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি একটি বাহ্যিক উপাদানের সংযোজন প্রক্রিয়া।
  • উদাহরণ: কয়লা পোড়ানোর ফলে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস বা দামোদর নদে কলকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য নিক্ষেপ।

২. পরিবেশের অবনমন (Environmental Degradation):

  • সংজ্ঞা: পরিবেশের উপাদানসমূহের এমন এক সামগ্রিক অবক্ষয় বা গুণগত অবনতি, যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা ও জীবধারণ ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি একটি সার্বিক ফলাফল। দূষণের কারণে অবনমন ঘটে, কিন্তু প্রত্যক্ষ দূষণ ছাড়াও কেবল অতি-ব্যবহার বা বন ধ্বংসের মাধ্যমে অবনমন ঘটতে পারে।
  • উদাহরণ: গ্রীষ্মকালীন চাষের জন্য ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত তোলায় জলস্তরের অবনমন; নির্বিচার বৃক্ষচ্ছেদনের ফলে পাহাড়ের উপরিভাগের উর্বর মৃত্তিকা ধুয়ে যাওয়া; কিংবা কোনো প্রজাতির চিরতরে বিলুপ্তি।

সম্পর্ক: সমস্ত দূষণই পরিবেশের অবনমন ঘটায়, কিন্তু অবনমন কেবল দূষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাস্তুতন্ত্রের কাঠামোগত ক্ষতিকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

উদাহরণ 2
প্রশ্ন ২: অম্লবৃষ্টি বা অ্যাসিড রেন কী? এর রাসায়নিক উৎপত্তির সমীকরণ লেখো এবং "মার্বেল ক্যানসার" বলতে কী বোঝো তা ব্যাখ্যা করো।
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: ১. অম্লবৃষ্টির সংজ্ঞা ও রাসায়নিক উৎপত্তি: যে বৃষ্টির জলের অ্যাসিডের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অর্থাৎ pH-এর মান ৫.৬-এর কম হয়, তাকে অম্লবৃষ্টি (Acid Rain) বলে।

  • কলকারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার ডাই অক্সাইড ($SO_2$) এবং যানবাহনের ধোঁয়ার নাইট্রোজেন অক্সাইড ($NO_2$) বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প ও অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে যথাক্রমে সালফিউরিক অ্যাসিড ($H_2SO_4$) ও নাইট্রিক অ্যাসিড ($HNO_3$) তৈরি করে:

$$2SO_2 + O_2 + 2H_2O \rightarrow 2H_2SO_4$$

$$4NO_2 + O_2 + 2H_2O \rightarrow 4HNO_3$$

২. মার্বেল ক্যানসার বা স্টোন লেপ্রসি (Marble Cancer / Stone Leprosy):

  • মার্বেল পাথর নির্মিত ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সৌধের (ক্যালশিয়াম কার্বনেট, $CaCO_3$) ওপর যখন অ্যাসিড বৃষ্টি পড়ে, তখন অ্যাসিড মার্বেল পাথরের সঙ্গে তীব্র রাসায়নিক বিক্রিয়া করে:

$$CaCO_3 \text{ (মার্বেল)} + H_2SO_4 \rightarrow CaSO_4 \text{ (জিপসাম)} + H_2O + CO_2$$

  • বিক্রিয়ার ফলে উৎপন্ন জিপসাম অত্যন্ত নরম ও জলে দ্রবণীয়। এর ফলে মসৃণ মার্বেলের গা খসখসে হয়ে যায়, ক্ষতের মতো গর্ত তৈরি হয় এবং পাথরের উজ্জ্বল সাদা রঙ বিবর্ণ ও হলদেটে হয়ে ক্ষয়ে পড়ে। একে পাথরের কুষ্ঠরোগ বা "মার্বেল ক্যানসার" বলা হয়।
  • বিখ্যাত উদাহরণ: আগ্রার মথুরা তেল শোধনাগারের ধোঁয়ার কারণে বিশ্বখ্যাত তাজমহলের সাদা মার্বেল মারাত্মক মার্বেল ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিল।
উদাহরণ 3
প্রশ্ন ৩: জলাশয়ে ইউট্রোফিকেশন (Eutrophication) কীভাবে ঘটে? এর ফলে জলজ প্রাণীদের কী ক্ষতি হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: ১. ইউট্রোফিকেশন ঘটার প্রক্রিয়া: (ক) কৃষিজমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার (নাইট্রেট ও ফসফেট) এবং শহরের নিকাশি ড্রেনের বর্জ্য জল বৃষ্টির জলে ধুয়ে পুকুর, খাল বা হ্রদের জলে মেশে। (খ) এই পুষ্টি উপাদানের প্রাচুর্যের কারণে জলে শৈবাল ও কচুরিপানার মতো জলজ উদ্ভিদের অবিশ্বাস্য দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে, যাকে "অ্যালগাল ব্লুম" (Algal Bloom) বলে। (গ) শৈবালের ঘন সবুজ আস্তরণ জলের উপরিভাগ সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে, ফলে সূর্যালোক জলের গভীরে প্রবেশ করতে পারে না এবং তলদেশের নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষ করতে না পেরে মারা যায়। ২. জলজ প্রাণীদের ক্ষতি ও বিওডি (BOD) বৃদ্ধি: (ক) বিপুল পরিমাণ শৈবাল ও উদ্ভিদ যখন মারা যায়, তখন তাদের পচানোর জন্য জলে অবায়বীয় ও বায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা লক্ষ লক্ষ গুণ বৃদ্ধি পায়। (খ) এই ব্যাকটেরিয়া পচনের কাজের জন্য জলের দ্রবীভূত অক্সিজেন (Dissolved Oxygen) দ্রুত খরচ করে ফেলে। ফলে জলে বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (BOD) মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। (গ) জলে অক্সিজেনের ঘাটতি (Anoxia) দেখা দেওয়ায় মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মারা যায় এবং জলাশয়টি একটি দুর্গন্ধযুক্ত প্রাণহীন মৃত জলাশয়ে পরিণত হয়।
উদাহরণ 4
প্রশ্ন ৪: পশ্চিমবঙ্গে ভূগর্ভস্থ জলকূপে মারাত্মক আর্সেনিক দূষণের প্রধান কারণগুলি কী কী? এর ফলে মানবদেহে কী কী রোগ সৃষ্টি হয়?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: ১. আর্সেনিক দূষণের কারণসমূহ:

  • ভূতাত্ত্বিক কারণ: গঙ্গা বদ্বীপ অঞ্চলের মাটির গভীরের পলিস্তরে প্রাকৃতিকভাবেই আয়রন পাইরাইট ($FeS_2$) খনিজের সঙ্গে আর্সেনিক মিশে ছিল।
  • অতিরিক্ত জল উত্তোলন: গত কয়েক দশক ধরে গ্রীষ্মকালীন উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষের জন্য গভীর ও অগভীর নলকূপ দিয়ে অবিরাম বিপুল পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল তোলা হতে থাকে।
  • জারন প্রক্রিয়া: জলস্তর অস্বাভাবিক নিচে নেমে যাওয়ার ফলে মাটির নিচের ফাঁকা স্তরে বাতাসের অক্সিজেন প্রবেশ করে। অক্সিজেনের উপস্থিতিতে আয়রন পাইরাইট জারিত হয়ে বিষাক্ত অজৈব আর্সেনিক মুক্ত হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানীয় জলের সঙ্গে মিশে যায়।

২. ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহ: মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বর্ধমান ও হাওড়া।

৩. মানবদেহে সৃষ্ট রোগসমূহ (আর্সেনিকোসিস):

  • মেলানোসিস: চামড়ার ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো কালো কালো ছোপ ছোপ দাগ পড়ে।
  • কেরাটোসিস: হাতের তালু ও পায়ের তলায় চামড়া শক্ত, খসখসে ও ফেটে যায়।
  • ব্ল্যাকফুট রোগ (Blackfoot Disease): হাত ও পায়ের রক্ত সঞ্চালন নষ্ট হয়ে পচন (গ্যাংগ্রিন) ধরে এবং অঙ্গ পচে খসে পড়ে।
  • ক্যানসার: দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত জল পান করলে ফুসফুস, ত্বক, যকৃত ও মূত্রাশয়ে মারাত্মক ম্যালিগন্যান্ট ক্যানসার সৃষ্টি হয়।
উদাহরণ 5
প্রশ্ন ৫: ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) কীভাবে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তরকে ধ্বংস করে? ওজোন স্তর রক্ষায় কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: ১. ওজোন ধ্বংসের রাসায়নিক প্রক্রিয়া:

  • রেফ্রিজারেটর, এসি ও স্প্রে থেকে নির্গত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) গ্যাস হালকা হওয়ায় উড়ে গিয়ে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ওজোন স্তরে পৌঁছায়।
  • সেখানে তীব্র সৌর অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে CFC ভেঙে অত্যন্ত সক্রিয় মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ($Cl$) নির্গত হয়:

$$CF_2Cl_2 + UV \rightarrow CF_2Cl + Cl$$

  • এই মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ওজোন অণুকে ($O_3$) আক্রমণ করে ক্লোরিন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন তৈরি করে:

$$Cl + O_3 \rightarrow ClO + O_2$$

  • পরবর্তীতে $ClO$ বায়ুমণ্ডলের মুক্ত অক্সিজেন পরমাণুর সাথে বিক্রিয়া করে পুনরায় ক্লোরিন পরমাণু মুক্ত করে দেয়:

$$ClO + O \rightarrow Cl + O_2$$

  • যেহেতু ক্লোরিন পরমাণুটি বিক্রিয়ার শেষে নিজে অবিকৃত থাকে, তাই এটি একটি ধারাবাহিক ধ্বংসাত্মক শৃঙ্খল বিক্রিয়া চালায়। একটিমাত্র ক্লোরিন পরমাণু নিজে বিনষ্ট হওয়ার আগে প্রায় ১ লক্ষ ওজোন অণুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।

২. আন্তর্জাতিক চুক্তি:

  • ১৯৮৫ সালে আন্টার্কটিকার আকাশে বিশাল ওজোন গহ্বর আবিষ্কৃত হওয়ার পর ১৯৮৭ সালে বিশ্বের দেশগুলি কানাডার মন্ট্রিলে ঐতিহাসিক মন্ট্রিল চুক্তি (Montreal Protocol) স্বাক্ষর করে এবং বিশ্বজুড়ে সিএফসি ও ওজোন ক্ষয়কারী গ্যাসের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
উদাহরণ 6
প্রশ্ন ৬: সুস্থায়ী উন্নয়ন বা টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development) বলতে কী বোঝো? এর তিনটি মূল স্তম্ভ কী কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:
উত্তর: ১. সুস্থায়ী উন্নয়নের সংজ্ঞা: ১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রসংঘের ব্রুন্টল্যান্ড কমিশনের "আমাদের সাধারণ ভবিষ্যৎ" (Our Common Future) প্রতিবেদনে সুস্থায়ী উন্নয়নের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে: "যে উন্নয়ন বর্তমান প্রজন্মের মানুষের মৌলিক চাহিদা এমনভাবে পূরণ করে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য ও সুযোগকে বিন্দুমাত্র বিনষ্ট বা আপস করে না, তাকে সুস্থায়ী উন্নয়ন (Sustainable Development) বলে।" ২. সুস্থায়ী উন্নয়নের তিনটি অপরিহার্য স্তম্ভ: (ক) পরিবেশগত সুরক্ষা (Environmental Protection): প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে সৌর ও বায়ুর মতো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। (খ) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (Economic Growth): এমন অর্থনৈতিক অগ্রগতি যা দারিদ্র্য দূর করে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে কিন্তু প্রকৃতির মূলধন ধ্বংস করে না। (গ) সামাজিক সাম্য (Social Equity): সমাজের সকল স্তরের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও বাসস্থানের সমান অধিকার নিশ্চিত করা এবং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস করা। এই তিনটি স্তম্ভের মেলবন্ধনেই মানব সভ্যতার টেকসই ভবিষ্যৎ সম্ভব।
উদাহরণ 7
প্রশ্ন ৭: চিপকো আন্দোলন সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো। এই আন্দোলনের মূল নেতা কারা ছিলেন এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: ১. চিপকো আন্দোলনের সূচনা ও নেতৃত্ব: ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের (বর্তমান উত্তরাখণ্ড) চামোলি জেলার গোপেশ্বর ও মণ্ডল গ্রামে চিপকো আন্দোলন শুরু হয়।

  • মূল নেতৃবৃন্দ: প্রখ্যাত পরিবেশবিদ সুন্দরলাল বহুগুণা, সমাজকর্মী চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট এবং গ্রামের সাধারণ নারীদের পথপ্রদর্শক গৌরা দেবী।

২. আন্দোলনের অহিংস কৌশল: খেলাধুলার সরঞ্জাম তৈরির ঠিকাদাররা যখন বন দপ্তরের অনুমতি নিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন হিমালয়ীয় অ্যাশ ও ওক গাছ কাটতে আসে, তখন গৌরা দেবীর নেতৃত্বে গ্রামের মহিলারা দলবদ্ধ হয়ে গাছের গুঁড়ি দু-হাতে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়েন। গাড়োয়ালি ও হিন্দি ভাষায় "চিপকো" শব্দের অর্থ হলো "জড়িয়ে ধরা বা আঁকড়ে থাকা"। কুঠারধারীদের উদ্দেশ্যে তাঁরা ঘোষণা করেন: "গাছ কাটার আগে আমাদের শরীরে কুঠার মারতে হবে।"

৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

  • তৃণমূল পরিবেশ সচেতনতা: এই আন্দোলন দেখিয়ে দেয় যে সাধারণ গ্রামীণ মহিলারা অরণ্যের বাস্তুতান্ত্রিক মূল্য তথাকথিত বাণিজ্যিক বিশেষজ্ঞদের চেয়ে অনেক ভালো বোঝেন।
  • সরকারের পিছু হঠন: আন্দোলনের তীব্রতায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে ১,০০০ মিটার উচ্চতার ওপরে আগামী ১৫ বছরের জন্য সবুজ গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেন।
  • অনুপ্রেরণা: এটি পরবর্তীকালে কর্ণাটকের 'আপ্পিকো আন্দোলন' ও 'নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন'-এর পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
উদাহরণ 8
প্রশ্ন ৮: বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ৪R (Four R's) নীতি কী? দৈনন্দিন জীবনে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে এটি প্রয়োগ করতে পারে?
ধাপে ধাপে সমাধান / উত্তর:

উত্তর: বর্জ্য হ্রাস ও পরিবেশ রক্ষার আধুনিক বৈজ্ঞানিক কৌশলকে ৪R (Four R's) নীতি বলা হয়:

১. Refuse (প্রত্যাখ্যান করা - ১ম অগ্রাধিকার):

  • যে সমস্ত জিনিস পরিবেশের ক্ষতি করে, সেগুলিকে ব্যবহার করতে সরাসরি "না" বলা।
  • শিক্ষার্থীর করণীয়: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক স্ট্র, থার্মোকল কাপ ও প্লাস্টিক ক্যারি ব্যাগ নিতে দোকানদারকে বিনীতভাবে প্রত্যাখ্যান করা।

২. Reduce (হ্রাস করা):

  • অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার ও অপচয় কমিয়ে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে আনা।
  • শিক্ষার্থীর করণীয়: পড়ার ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় আলো ও ফ্যানের সুইচ বন্ধ করা; দাঁত মাজার সময় জলের নল বন্ধ রাখা; খাতার পাতা নষ্ট না করা।

৩. Reuse (পুনর্ব্যবহার করা):

  • কোনো জিনিস একবার ব্যবহার করে ফেলে না দিয়ে সেটিকে বারবার বিভিন্ন কাজে লাগানো।
  • শিক্ষার্থীর করণীয়: টেকসই স্টিলের টিফিন বক্স ও জলের বোতল ব্যবহার করা; পুরনো পাঠ্যবই ও গল্পের বই ছোটদের দান করা; খালি কাঁচের শিশিকে পেনদানি হিসেবে ব্যবহার করা।

৪. Recycle (পুনর্নবীকরণ করা - শেষ ধাপ):

  • বাতিল অপচনশীল বর্জ্যকে আলাদা করে কারখানায় পাঠিয়ে প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে নতুন জিনিসে রূপান্তরিত করা।
  • শিক্ষার্থীর করণীয়: বাড়িতে ও বিদ্যালয়ে ভেজা জৈব বর্জ্য (ফলের খোসা) এবং শুকনো অজৈব বর্জ্য (কাগজ, প্লাস্টিক, ধাতু) আলাদা বালতিতে রাখা এবং তা ফেলে না দিয়ে রিসাইকেলিং ব্যবসায়ীদের কাছে দেওয়া।

সাধারণ ভুলত্রুটি ও সতর্কতা (Common Traps)

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: "পরিবেশ দূষণ" এবং "পরিবেশের অবনমন" দুটি সম্পূর্ণ সমার্থক শব্দ।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: দূষণ হলো ক্ষতিকর উপাদানের মিশ্রণ; কিন্তু অবনমন হলো বাস্তুতন্ত্রের গুণগত ও উৎপাদনশীলতার সামগ্রিক অবক্ষয়। অতিরিক্ত বন নিধনে কোনো রাসায়নিক না মিশলেও সরাসরি অবনমন ঘটে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: গ্রিনহাউস প্রভাব পৃথিবীর জন্য শুধুমাত্র একটি ক্ষতিকর অভিশাপ।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: স্বাভাবিক গ্রিনহাউস প্রভাব পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অপরিহার্য (+১৫°C তাপমাত্রা বজায় রাখে)। মানুষের অতিরিক্ত নির্গমনের ফলে সৃষ্ট "অতিরিক্ত গ্রিনহাউস প্রভাব" বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: ওজোন গহ্বরই বিশ্ব উষ্ণায়ন ও বরফ গলনের প্রধান কারণ।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: ওজোন ক্ষয় ঘটে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে CFC-র কারণে এবং এর ফলে অতিবেগুনি রশ্মি আসে। আর বিশ্ব উষ্ণায়ন ঘটে ট্রপোস্ফিয়ারে CO2, মিথেন প্রভৃতি দ্বারা অবলোহিত তাপ আটকে পড়ার ফলে। দুটি সম্পূর্ণ পৃথক বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনা।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: পশ্চিমবঙ্গের ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক কলকারখানা থেকে পাইপ দিয়ে মাটির নিচে ফেলা হয়েছে।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: আর্সেনিক প্রাকৃতিকভাবেই মাটির নিচের আয়রন পাইরাইট শিলায় ছিল। বোরো ধান চাষে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল তোলায় জলস্তর নেমে বাতাস ঢুকলে জারণের মাধ্যমে আর্সেনিক জলে দ্রবীভূত হয়।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: ইউট্রোফিকেশন হলে জলে প্রচুর শৈবাল জন্মে বলে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে যায়।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: শৈবাল বেঁচে থাকার সময় অক্সিজেন দিলেও, ঘন শৈবাল মারা যাওয়ার পর কোটি কোটি পচনকারী ব্যাকটেরিয়া পচনের জন্য সমস্ত অক্সিজেন শুষে নেয়, ফলে জলে চরম অক্সিজেন ঘাটতি ঘটে মাছ মারা যায়।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: চিপকো আন্দোলন কেরালায় সাইলেন্ট ভ্যালির অরণ্য রক্ষায় হয়েছিল।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: চিপকো আন্দোলন (১৯৭৩, সুন্দরলাল বহুগুণা) হয়েছিল বর্তমান উত্তরাখণ্ডের হিমালয়ে গাছ কাটার বিরুদ্ধে। সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন (১৯৭৮) হয়েছিল কেরালার পালাক্কাদে জলবিদ্যুৎ বাঁধের বিরুদ্ধে।

সাধারণ ভুল ধারণা

ভ্রান্ত ধারণা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৪R নীতির মধ্যে রিসাইকেল (Recycle) সবচেয়ে সেরা ও প্রথম সমাধান।

সঠিক পদ্ধতি ও সমাধান

সঠিক তথ্য: "রিফিউজ" (প্রত্যাখ্যান) এবং "রিডিউস" (হ্রাস) হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর কারণ এটি বর্জ্য তৈরিই হতে দেয় না। রিসাইকেল করতেও প্রচুর বিদ্যুৎ, জল ও জ্বালানি লাগে, তাই এটি শেষ বিকল্প।

মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন — সামগ্রিক ভৌগোলিক রূপরেখা

মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন — সামগ্রিক ভৌগোলিক রূপরেখা ১. পরিবেশের উপাদান ও অবনমনের কারণসমূহ পরিবেশের পরিমণ্ডল: অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও জীবমণ্ডল দূষণ বনাম অবনমন: ক্ষতিকর উপাদানের সংযোজন বনাম গুণমান ও উৎপাদনশীলতা হ্রাস ঐতিহাসিক বিবর্তন: শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ → কৃষিকাজ → শিল্পবিপ্লব ও জীবাশ্ম জ্বালানি প্রধান চালিকাশক্তি: জনবিস্ফোরণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্বিচার বৃক্ষচ্ছেদন ও কীটনাশক IPAT সমীকরণ: পরিবেশ প্রভাব (I) = জনসংখ্যা (P) × ভোগক্ষমতা (A) × প্রযুক্তি (T) ২. প্রধান দূষণ ও বাস্তুতন্ত্রের সংকট বায়ু ও অম্লবৃষ্টি: SO2, NOx → H2SO4, HNO3 (মার্বেল ক্যানসার, ধোঁয়াশা, PM2.5) জল ও ইউট্রোফিকেশন: নাইট্রোজেন/ফসফেট, শৈবাল বৃদ্ধি ও অক্সিজেন হ্রাস (উচ্চ BOD) মৃত্তিকা ও মরুকরণ: উপরিভাগের পলি ক্ষয়, অতিরিক্ত সেচে লবণাক্ততা ও উর্বরতা বিনাশ বিষাক্ত উপাদান: বাংলার ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক (ব্ল্যাকফুট রোগ), ফ্লুরাইড ও ভারী ধাতু কঠিন ও ই-বর্জ্য: অপচনশীল প্লাস্টিক, মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ইলেকট্রনিক বিষাক্ত সীসা-পারদ ৩. বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন গ্রিনহাউস ও বিশ্ব উষ্ণায়ন: CO2, CH4, N2O ও CFCs দ্বারা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি হিমবাহ গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠ: মেরু বরফ হ্রাস, মালদ্বীপ ও সুন্দরবনের দ্বীপ নিমজ্জন ওজোন স্তর ক্ষয়: ক্লোরিন পরমাণু দ্বারা O3 ধ্বংস; ১৯৮৭ মন্ট্রিল চুক্তি চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ঘন ঘন সুপার সাইক্লোন (আম্ফান, রেমাল), অনাবৃষ্টি ও দাবানল জীববৈচিত্র্য বিলোপ: ষষ্ঠ মহা-বিলুপ্তি, ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য ধ্বংস ও প্রবাল ব্লিচিং ৪. পরিবেশ সংরক্ষণ, সুস্থায়ী উন্নয়ন ও নাগরিক ভূমিকা সুস্থায়ী উন্নয়ন: ব্রুন্টল্যান্ড রিপোর্ট (১৯৮৭), রিও সম্মেলন (১৯৯২) ও রাষ্ট্রসংঘের SDG বর্জ্যের ৪R নীতি: রিফিউজ, রিডিউস, রিইউজ ও রিসাইকেল (উৎস পৃথকীকরণ) সবুজ প্রযুক্তি: সৌর ও বায়ুশক্তি, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ এবং বৈদ্যুতিক যান (EV) ঐতিহাসিক আন্দোলন: চিপকো (১৯৭৩, সুন্দরলাল বহুগুণা), নর্মদা বাঁচাও ও সাইলেন্ট ভ্যালি নাগরিক দায়িত্ব: সামাজিক বনসৃজন, প্লাস্টিক বর্জন ও পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৮৬

অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মূল বিষয় 1
পৃথিবীর পরিবেশ অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও জীবমণ্ডলের সুষম ভারসাম্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, যা জীবের অস্তিত্বের প্রধান ভিত্তি।
মূল বিষয় 2
পরিবেশে অবাঞ্ছিত উপাদান যুক্ত হওয়া হলো দূষণ, আর বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক গুণমান, প্রতিরোধ ক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার সামগ্রিক হ্রাস হলো অবনমন।
মূল বিষয় 3
শিকারী যুগ ও কৃষি বিপ্লব পেরিয়ে অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লব ও জীবাশ্ম জ্বালানির অপরিমিত ব্যবহার মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির চিরন্তন ভারসাম্য চূর্ণ করেছে।
মূল বিষয় 4
বায়ু দূষণের ফলে অম্লবৃষ্টি ও মার্বেল ক্যানসার হয়; জলাশয়ে অতিরিক্ত সারে ইউট্রোফিকেশন ঘটে অক্সিজেন সংকট তৈরি হয় এবং বোরো ধানের অতিরিক্ত সেচে বাংলায় আর্সেনিক রোগ ছড়িয়েছে।
মূল বিষয় 5
কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও সিএফসির অতিরিক্ত নির্গমনে বিশ্ব উষ্ণায়ন হচ্ছে, যার ফলে মেরু ও হিমালয়ের বরফ গলছে এবং সুন্দরবনের লোহাচড়া দ্বীপ সাগরে তলিয়ে গেছে।
মূল বিষয় 6
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে সিএফসি থেকে মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু ওজোন স্তরকে বিনষ্ট করেছে, যা ১৯৮৫ সালের আন্টার্কটিক ওজোন গহ্বর এবং ১৯৮৭ সালের মন্ট্রিল প্রটোকলের জন্ম দিয়েছে।
মূল বিষয় 7
১৯৮৭ সালের ব্রুন্টল্যান্ড কমিশনের সুস্থায়ী উন্নয়ন নীতি বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেয় এবং রাষ্ট্রসংঘের ১৭টি SDG লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
মূল বিষয় 8
সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার, ৪R নীতি (রিফিউজ, রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল), চিপকো ও নর্মদা আন্দোলনের মতো পরিবেশ সচেতনতা এবং ১৯৮৬ সালের পরিবেশ আইনের যথাযথ প্রয়োগই ভবিষ্যৎ রক্ষার পথ।

স্ব-মূল্যায়ন অনুশীলন (Check Your Understanding)

মূল ধারণাগত স্পষ্টতা যাচাই করার জন্য অনুশীলন প্রশ্ন। উত্তর দেখার আগে নিজে সমাধান করার চেষ্টা করো।

1
১. পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশের অবনমনের মধ্যে মূল পার্থক্যটি কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
উত্তর দেখুন

পরিবেশ দূষণ হলো ক্ষতিকর পদার্থের প্রত্যক্ষ মিশ্রণের ফলে পরিবেশের বিশুদ্ধতা নষ্ট হওয়া। অন্যদিকে পরিবেশের অবনমন হলো পরিবেশের বাস্তুতান্ত্রিক গুণমান, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতার সামগ্রিক হ্রাস। দূষণ ছাড়াও কেবল মাত্রাতিরিক্ত গাছ কাটা বা ভূমিক্ষয়ের ফলেও অবনমন ঘটতে পারে।


2
২. অ্যাসিড বৃষ্টি কীভাবে আগ্রার তাজমহলের মতো প্রাচীন সৌধের মার্বেল ক্যানসার ঘটায়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
উত্তর দেখুন

অ্যাসিড বৃষ্টির সালফিউরিক অ্যাসিড ($H_2SO_4$) মার্বেল পাথরের ক্যালশিয়াম কার্বনেটের ($CaCO_3$) সাথে বিক্রিয়া করে নরম ও জলে দ্রবণীয় জিপসাম ($CaSO_4$) তৈরি করে। এর ফলে মার্বেলের মসৃণতা নষ্ট হয়ে খসখসে গর্ত তৈরি হয় এবং পাথরের রং হলুদ ও বিবর্ণ হয়ে ক্ষয়ে যায়, যাকে মার্বেল ক্যানসার (Marble Cancer) বলে।


3
৩. পশ্চিমবঙ্গে নলকূপের পানীয় জলে আর্সেনিক বিষাক্ততা ছড়িয়ে পড়ার পেছনের প্রধান মানবীয় কারণটি কী?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
উত্তর দেখুন

মাটির নিচের শিলায় আর্সেনিক প্রাকৃতিকভাবে ছিল। কিন্তু শুখা মরশুমে উচ্চফলনশীল বোরো ধান চাষের জন্য পাম্প দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোটি কোটি লিটার ভূগর্ভস্থ জল তোলায় জলস্তর নেমে যায়। ফাঁকা জায়গায় বাতাসের অক্সিজেন ঢুকে আয়রন পাইরাইট শিলাকে জারিত করে বিষাক্ত আর্সেনিক ভূগর্ভস্থ পানীয় জলে মিশিয়ে দেয়।


4
৪. আন্টার্কটিকার ওজোন গহ্বর সৃষ্টির প্রধান কারণ কী এবং কোন আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে এটি সমাধান করা হয়?
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
উত্তর দেখুন

রেফ্রিজারেটর ও এসি থেকে নির্গত ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFC) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ভেঙে মুক্ত ক্লোরিন পরমাণু তৈরি করে ওজোন স্তর বিনষ্ট করে। ১৯৮৫ সালে আবিষ্কৃত এই সংকট সমাধানের জন্য ১৯৮৭ সালে বিশ্বজুড়ে সিএফসি নিষিদ্ধ করে ঐতিহাসিক মন্ট্রিল চুক্তি (Montreal Protocol) স্বাক্ষরিত হয়।


5
৫. ১৯৮৭ সালের ব্রুন্টল্যান্ড কমিশন অনুসারে "সুস্থায়ী উন্নয়ন" (Sustainable Development)-এর সংজ্ঞা দাও।
উত্তর ও ব্যাখ্যা দেখুন
উত্তর:
উত্তর দেখুন

ব্রুন্টল্যান্ড কমিশনের (Our Common Future) মতে: "যে উন্নয়ন বর্তমান প্রজন্মের মানুষের চাহিদা এমনভাবে পূরণ করে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্যকে এতটুকু ক্ষুণ্ণ বা বিনষ্ট করে না, তাকেই সুস্থায়ী উন্নয়ন বলে।"


অধ্যায় পড়া শেষ হয়েছে?
অনুশীলন শুরু করো

অনলাইন মক টেস্ট দিয়ে প্রস্তুতি যাচাই করো

পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ (WBBSE) পাঠ্যক্রম অনুযায়ী বহু বিকল্পীয় প্রশ্ন (MCQ) সমাধান করো। তাৎক্ষণিক ফলাফল, সঠিক ব্যাখ্যা এবং নিজের স্কোর জেনে নাও।

শ্রেণি 8 Social Science — সকল অধ্যায়

অধ্যায় 1: Concept of History অধ্যায় 2: Rise of Regional Powers অধ্যায় 3: Establishment of Colonial Authority অধ্যায় 4: ঔপনিবেশিক অর্থনীতির চরিত্র অধ্যায় 5: ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিক্রিয়া: সহযোগিতা ও বিদ্রোহ অধ্যায় 6: জাতীয়তাবাদের প্রাথমিক বিকাশ অধ্যায় 7: ভারতের জাতীয় আন্দোলনের আদর্শ ও বিবর্তন অধ্যায় 8: সাম্প্রদায়িকতা থেকে দেশভাগ অধ্যায় 9: ভারতীয় সংবিধান: গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নাগরিকের অধিকার অধ্যায় 10: পৃথিবীর অন্দরমহল অধ্যায় 11: অস্থিত পৃথিবী অধ্যায় 12: শিলা অধ্যায় 13: বায়ুচাপ বলয় ও বায়ুপ্রবাহ অধ্যায় 14: মেঘ ও বৃষ্টি অধ্যায় 15: জলবায়ু অঞ্চল অধ্যায় 16: মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায় 17: ভারতের প্রতিবেশী দেশসমূহ ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক অধ্যায় 18: উত্তর আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 19: দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশ অধ্যায় 20: ওশিয়ানিয়া মহাদেশ

AI সহায়ক

তাত্ক্ষণিক সমাধান

মানুষের কার্যাবলী ও পরিবেশের অবনমন অধ্যায়ে কোনো প্রশ্ন বা সন্দেহ আছে? আমাদের AI শিক্ষক থেকে সহজ সমাধান ও ব্যাখ্যা নিন।