১.১ পরিবেশের ধারণা ও প্রধান পরিমণ্ডলসমূহ
যে সকল বাহ্যিক ভৌত, রাসায়নিক, জৈব ও সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার মধ্যে জীব সম্প্রদায় জন্মগ্রহণ করে, বৃদ্ধি পায় এবং জীবনধারণ করে, তাকে সামগ্রিকভাবে পরিবেশ (Environment) বলা হয়। পৃথিবীর পরিবেশ মূলত চারটি আন্তঃসম্পর্কিত পরিমণ্ডলের সমন্বয়ে গঠিত:
- অশ্মমণ্ডল (Lithosphere): পৃথিবীর কঠিন শিলাময় বহিরাবরণ ও মৃত্তিকা স্তর, যা উদ্ভিদ ও প্রাণীর বাসস্থান এবং কৃষিকাজ ও খনিজ সম্পদের আধার।
- বারিমণ্ডল (Hydrosphere): মহাসাগর, সাগর, নদ-নদী, হ্রদ, হিমবাহ এবং ভূগর্ভস্থ জলরাশি সমন্বিত সমগ্র জলমণ্ডল (পৃথিবীর প্রায় ৭১% অংশ)।
- বায়ুমণ্ডল (Atmosphere): পৃথিবীকে বেষ্টন করে থাকা অদৃশ্য গ্যাসীয় স্তর, যা ক্ষতিকর সৌর বিকিরণ প্রতিরোধ করে এবং আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।
- জীবমণ্ডল (Biosphere): অশ্মমণ্ডল, বারিমণ্ডল ও বায়ুমণ্ডলের সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা জীবনধারণের উপযোগী সংকীর্ণ সজীব বলয়, যেখানে সমগ্র উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীব সম্প্রদায় বসবাস করে।
১.২ পরিবেশ দূষণ বনাম পরিবেশের অবনমন
শিক্ষার্থীরা প্রায়শই "দূষণ" এবং "অবনমন" শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু এদের মধ্যে সুস্পষ্ট ভৌগোলিক পার্থক্য রয়েছে:
| পার্থক্যসূচক বিষয় | পরিবেশ দূষণ (Environmental Pollution) | পরিবেশের অবনমন (Environmental Degradation) |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | বহিরাগত কোনো ক্ষতিকর পদার্থ বায়ুমণ্ডল, বারিমণ্ডল বা মৃত্তিকায় যুক্ত হয়ে যখন পরিবেশের স্বাভাবিক বিশুদ্ধতা ও গুণমানকে বিঘ্নিত করে। | পরিবেশের উপাদানসমূহের সামগ্রিক গুণগত ও পরিমাণগত অবক্ষয়, যার ফলে বাস্তুতন্ত্রের স্ব-নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, প্রতিরোধ ক্ষমতা ও জীবধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। |
| ব্যাপ্তি ও সম্পর্ক | একটি তুলনামূলক সংকীর্ণ প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট দূষক পদার্থের (যেমন ধোঁয়া, নিকাশি জল, প্লাস্টিক) নির্গমনের ফলে ঘটে। | একটি ব্যাপক ও সামগ্রিক ধারণা। দূষণের পাশাপাশি অবৈজ্ঞানিক সম্পদ আহরণ, বৃক্ষচ্ছেদন, ভূমিক্ষয় প্রভৃতির ফলে ঘটে। |
| কারণগত ভিত্তি | প্রত্যেক প্রকার দূষণই পরিবেশের অবনমন ঘটায়। | কোনো প্রকার প্রত্যক্ষ রাসায়নিক দূষণ ছাড়াও কেবল অতিরিক্ত বন নিধন বা অতি-চারণের মাধ্যমে অবনমন ঘটতে পারে। |
| পুনরুদ্ধার যোগ্যতা | দূষণের উৎস বন্ধ করলে বা শোধন করলে দ্রুত পরিবেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। | অবনমন দীর্ঘমেয়াদী এবং অনেক সময় অপূরণীয় (যেমন শীর্ষমৃত্তিকা ক্ষয়, প্রজাতির বিলুপ্তি বা হিমবাহের বিনাশ)। |
১.৩ মানবসমাজ ও প্রকৃতির সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তন
সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের তিনটি ঐতিহাসিক পর্যায় লক্ষ্য করা যায়:
- শিকারী ও খাদ্য-সংগ্রাহক যুগ: আদিম মানুষ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি না করে তারা প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মধ্যেই বাস করত।
- কৃষি বিপ্লব (~১০,০০০ বছর পূর্বে): মানুষ বুনো গাছপালা ও পশুকে পোষ মানিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কৃষিজমি তৈরির জন্য বন উজাড় এবং সেচের জন্য নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রথম পরিবেশের ওপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ শুরু হয়।
- শিল্পবিপ্লব ও আধুনিক প্রযুক্তি যুগ: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কারের পর কয়লা ও খনিজ তেলের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। বৃহদায়তন কলকারখানা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, নগরায়ণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির দহনের ফলে মানুষ প্রকৃতিকে সীমাহীনভাবে শোষণ করতে শুরু করে, যা বর্তমান পরিবেশগত সংকটের মূল কারণ।
১.৪ পরিবেশ অবনমনের প্রধান চালিকাশক্তি ও IPAT সমীকরণ
পরিবেশের অবনমনের পেছনে প্রধানত পাঁচটি মানবীয় কারণ সক্রিয় রয়েছে:
- জনবিস্ফোরণ (Population Explosion): ১৮০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০০ কোটি, যা ১৯৫০ সালে ২৫০ কোটি এবং ২০২২ সালে ৮০০ কোটি অতিক্রম করেছে। এই বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য, বাসস্থান ও জীবিকার চাহিদা মেটাতে বন উজাড় ও অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল শোষণ করা হচ্ছে।
- অপরিকল্পিত নগরায়ণ (Unplanned Urbanization): কৃষিজমি ও জলাভূমি বুজিয়ে কংক্রিটের শহর গড়ে ওঠার ফলে স্বাভাবিক জলনিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে এবং "আরবান হিট আইল্যান্ড" সৃষ্টি হচ্ছে।
- শিল্পের বর্জ্য ও জীবাশ্ম জ্বালানি: কলকারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে নিক্ষেপ এবং বাতাসে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমন।
- কৃষিতে রাসায়নিক পদার্থের অতিব্যবহার: অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
- IPAT সমীকরণ: বিজ্ঞানী পল এহরলিচ পরিবেশের ওপর মানুষের প্রভাব পরিমাপের জন্য একটি সূত্র প্রকাশ করেন: $$\text{পরিবেশের প্রভাব } (I) = \text{জনসংখ্যা } (P) \times \text{মাথাপিছু ভোগক্ষমতা } (A) \times \text{প্রযুক্তির বিরূপতা } (T)$$
১.৫ প্রাকৃতিক বনাম মনুষ্যসৃষ্ট অবনমন
প্রাকৃতিক কারণ (Natural Causes)
ভূ-অভ্যন্তরীণ আলোড়ন বা প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট অবনমন:
- আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত (বিপুল পরিমাণ ছাই ও সালফার ডাই অক্সাইড গ্যাস নির্গমন)।
- ভূমিকম্প ও পার্বত্য অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিধস।
- সুনামি, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দাবানল।
- বৈশিষ্ট্য: এটি সাময়িক এবং প্রকৃতি নিজস্ব নিয়মে পুনরায় ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে পারে।
মনুষ্যসৃষ্ট কারণ (Anthropogenic Causes)
মানুষের অপরিণামদর্শী কার্যাবলীর ফলে সৃষ্ট অবনমন:
- উন্মুক্ত কয়লা ও খনিজ উত্তোলন (Open-cast mining) দ্বারা বনভূমি ধ্বংস।
- কলকারখানা ও তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন।
- আমাজন ও ইন্দোনেশিয়ার ক্রান্তীয় বৃষ্টিঅরণ্য পুড়িয়ে সাফ করা।
- বৈশিষ্ট্য: এটি অবিরাম, তীব্র এবং প্রকৃতির ধারণক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে।