১.১ মহাদেশীয় পরিচিতি ও ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক
উত্তর আমেরিকা (North America) ক্ষেত্রফলের বিচারে এশিয়া ও আফ্রিকার পর পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মহাদেশ। এর মোট ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ২ কোটি ৪৭ লক্ষ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৬.৫ শতাংশ। মহাদেশটির প্রায় পুরোটাই মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত এবং সম্পূর্ণভাবে উত্তর ও পশ্চিম গোলার্ধে বিরাজমান:
- অক্ষাংশগত বিস্তার: দক্ষিণে পানামার প্রায় ৭°১২′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে উত্তরে গ্রিনল্যান্ডের ৮৩°৩৮′ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
- দ্রাঘিমাংশগত বিস্তার: পূর্বে নিউফাউন্ডল্যান্ডের ৫২°৩৭′ পশ্চিম দ্রাঘিমা থেকে পশ্চিমে আলাস্কার অ্যালুশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ১৬৮°০৫′ পশ্চিম দ্রাঘিমা পর্যন্ত প্রসারিত।
- প্রধান অক্ষরেখা: মহাদেশের দক্ষিণ অংশ (মেক্সিকোর ওপর দিয়ে) দিয়ে গেছে কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩½° উত্তর) এবং উত্তর অংশের কানাডা ও আলাস্কার ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে সুমেরুবৃত্ত (৬৬½° উত্তর)।
| প্রান্তবিন্দু | ভৌগোলিক স্থান | অক্ষাংশ / দ্রাঘিমা ও বিবরণ |
|---|---|---|
| উত্তরতম বিন্দু | কেপ মরিস জেসুপ (গ্রিনল্যান্ড) / মারচিসন অন্তরীপ (মূল ভূখণ্ড) | ৮৩°৩৯′ উত্তর (গ্রিনল্যান্ড) / ৭১°৫৮′ উত্তর (কানাডার বুথিয়া উপদ্বীপ), সুমেরু মহাসাগরের উপকূলে। |
| দক্ষিণতম বিন্দু | পুনটা মারিয়াতো (পানামা) | ৭°১২′ উত্তর অক্ষাংশ, প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে পানামা ও কলম্বিয়া সীমান্তের কাছে। |
| পূর্বতম বিন্দু | নর্ডোস্টরুন্ডিনজেন (গ্রিনল্যান্ড) / কেপ স্পিয়ার (মূল ভূখণ্ড) | ১১°১৯′ পশ্চিম (গ্রিনল্যান্ড) / ৫২°৩৭′ পশ্চিম (কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ড)। |
| পশ্চিমতম বিন্দু | আট্টু দ্বীপ (অ্যালুশিয়ান) / কেপ প্রিন্স অব ওয়েলস (মূল ভূখণ্ড) | ১৭২°২৭′ পূর্ব / ১৬৮°০৫′ পশ্চিম, বেরিং প্রণালীর মুখোমুখি আলাস্কার সিওয়ার্ড উপদ্বীপে। |
১.২ চতুঃসীমা ও ভূ-কৌশলগত অবস্থান
উত্তর আমেরিকা তিনটি সুবিশাল মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা এই মহাদেশকে অপার সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করেছে:
- উত্তরে: চিরতুষারাবৃত সুমেরু মহাসাগর (Arctic Ocean), বিউফোর্ট সাগর ও বাফিন উপসাগর।
- পূর্বে: ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ সমৃদ্ধ আটলান্টিক মহাসাগর (Atlantic Ocean)।
- পশ্চিমে: সুবিশাল প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean), যা এশিয়া ও ওশিয়ানিয়ার সাথে সংযোগ রক্ষা করে।
- দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বে: মেক্সিকো উপসাগর, ক্যারিবিয়ান সাগর এবং পানামা খাল।
- বেরিং প্রণালী (Bering Strait): উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মাত্র ৮৫ কিমি প্রশস্ত সংকীর্ণ বেরিং প্রণালী উত্তর আমেরিকার আলাস্কাকে রাশিয়ার (এশিয়া) চুকচি উপদ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে এবং সুমেরু মহাসাগরকে বেরিং সাগরের সাথে যুক্ত করেছে।
- পানামা যোজক (Isthmus of Panama): পূর্বে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে যুক্তকারী সংকীর্ণ ভূখণ্ড, যা ১৯১৪ সালে পানামা খাল খননের মাধ্যমে কেটে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করা হয়।
১.৩ ঐতিহাসিক আবিষ্কারের ইতিবৃত্ত
ইউরোপীয়দের আগমনের বহু সহস্রাব্দ পূর্বে প্রাচীন এশিয়া থেকে বেরিং ল্যান্ড ব্রিজ পার হয়ে আসা রেড ইন্ডিয়ান (আমেরিকান ইন্ডিয়ান বা আদিবাসী) এবং এস্কিমো (ইনুইট) মানুষেরা এই মহাদেশের মূল বাসিন্দা ছিলেন। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় অনুসন্ধান বিশ্ব মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আনে:
- ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৪৯২): স্পেনের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতের জলপথ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছান। তিনি ভেবেছিলেন তিনি ভারতে পৌঁছে গেছেন, তাই সেখানকার অধিবাসীদের "রেড ইন্ডিয়ান" এবং দ্বীপপুঞ্জটিকে "ওয়েস্ট ইন্ডিজ" (পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ) নামে অভিহিত করেন।
- আমেরিগো ভেসপুচি (১৪৯৭–১৫০২): ইতালীয় নাবিক আমেরিগো ভেসপুচি প্রথম ঘোষণা করেন যে কলম্বাসের আবিষ্কৃত ভূখণ্ডটি এশিয়ার অংশ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ অজানা "নতুন পৃথিবী" (Mundus Novus)। তাঁর নামানুসারে ১৫০৭ সালে জার্মান মানচিত্রকার মার্টিন ওয়াল্ডসিমুলার এই মহাদেশের নাম রাখেন "আমেরিকা"।
- জন ক্যাবট (১৪৯৭): ইংল্যান্ডের পক্ষে ইতালীয় নাবিক জন ক্যাবট (জিওভানি কাবোতো) নিউফাউন্ডল্যান্ড ও পূর্ব কানাডা আবিষ্কার করে উত্তর আমেরিকার প্রধান ভূখণ্ডে পদার্পণ করেন।
১.৪ ওয়েস্টার্ন কর্ডিলেরা (Western Cordillera)
উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকূল বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত সুবিশাল সমান্তরাল নবীন ভাঁজ পর্বতশ্রেণী, আগ্নেয়গিরি ও আন্তঃপর্বত মালভূমির সম্মিলিত বলয়কে ওয়েস্টার্ন কর্ডিলেরা (Western Cordillera) বলা হয়। স্পেনীয় ভাষায় \'কর্ডিলেরা\' শব্দের অর্থ \'দড়ি বা রজ্জু\'—যেমন একাধিক সুতো পাকিয়ে দড়ি তৈরি হয়, তেমনই বহু সমান্তরাল পর্বতশ্রেণী একত্রে জট পাকিয়ে এই অঞ্চল গড়ে তুলেছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৮০০ থেকে ১,৬০০ কিমি।
মেসোজোয়িক ও সেনোজোয়িক যুগে মহাদেশীয় উত্তর আমেরিকান পাতের নিচে মহাসাগরীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও জুয়ান দে ফুকা পাতের অধোগমন বা সাবডাকশনের (Subduction) ফলে এই প্রবল গিরিজনি আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
| পর্বতশ্রেণী | ভৌগোলিক অবস্থান | প্রধান শৃঙ্গ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| আলাস্কা শ্রেণি (Alaska Range) | দক্ষিণ আলাস্কা | উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট ডেনালি (মাউন্ট ম্যাককিনলে) অবস্থিত, উচ্চতা ৬,১৯০ মিটার। |
| রকি পর্বতমালা (Rocky Mountains) | কানাডা থেকে নিউ মেক্সিকো (যুক্তরাষ্ট্র) | কর্ডিলেরার প্রধান পূর্ব মেরুদণ্ড ও মহাদেশীয় জলবিভাজিকা (Continental Divide)। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: মাউন্ট এলবার্ট (৪,৪০১ মি)। |
| ক্যাসকেড ও কোস্ট রেঞ্জ | প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল (ওয়াশিংটন, ওরেগন) | প্রশান্ত মহাসাগরীয় \'অগ্নিবলয়\' (Ring of Fire)-এর অন্তর্গত। জীবন্ত আগ্নেয়গিরি: মাউন্ট সেন্ট হেলেন্স, মাউন্ট রেইনিয়ার (৪,৩৯২ মি)। |
| সিয়েরা নেভাদা (Sierra Nevada) | ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র | বিশাল স্তূপ পর্বতমালা। প্রধান ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: মাউন্ট হুইটনি (৪,৪২১ মি)। ইয়োসেমাইট উপত্যকা বিখ্যাত। |
| সিয়েরা মাদ্রে (Sierra Madre) | মেক্সিকো | সিয়েরা মাদ্রে অক্সিডেন্টাল (পশ্চিম) ও ওরিয়েন্টাল (পূর্ব), যা মধ্যবর্তী মেক্সিকো মালভূমিকে ঘিরে রেখেছে। |
১.৫ আন্তঃপর্বত মালভূমি, গ্রেট বেসিন ও গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন
পূর্বের রকি পর্বতমালা এবং পশ্চিমের উপকূলীয় পর্বতমালার মধ্যবর্তী স্থানে কয়েকটি সুউচ্চ শুষ্ক মালভূমি রয়েছে, যাদের আন্তঃপর্বত মালভূমি বলা হয়:
- কলাম্বিয়া-স্নেক মালভূমি: প্রাচীনকালে ভূ-গর্ভস্থ ফাটল দিয়ে ক্রমাগত নির্গত তরল ব্যাসাল্ট লাভা সঞ্চিত হয়ে এই সুবিশাল লাভা মালভূমিটি গড়ে তুলেছে, যা কলাম্বিয়া ও স্নেক নদী দ্বারা বিধৌত।
- গ্রেট বেসিন (Great Basin): কর্ডিলেরার মধ্যভাগে অবস্থিত একটি বিশাল লবণাক্ত ও শুষ্ক অন্তঃস্থ নদী অববাহিকা। এখানকার কোনো নদীর জল সমুদ্রে পৌঁছায় না; নদীগুলি মরুভূমির অভ্যন্তরে বাষ্পীভূত হয়ে বিভিন্ন লবণাক্ত হ্রদে পতিত হয়, যার মধ্যে গ্রেট সল্ট লেক (Great Salt Lake) বৃহত্তম। গ্রেট বেসিনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার কুখ্যাত ডেথ ভ্যালি বা মৃত্যু উপত্যকা (Death Valley)—যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮৬ মিটার নিচু এবং এটি উত্তর আমেরিকার সর্বনিম্ন বিন্দু। এখানকার তাপমাত্রা বিশ্বরেকর্ড ৫৬.৭° সেন্টিগ্রেডে পৌঁছেছিল।
- কলোরাডো মালভূমি ও গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (Grand Canyon): প্রায় ৩ লক্ষ ৩৭ হাজার বর্গকিমি বিস্তৃত বালিপাথর ও চুনাপাথরে গঠিত সুউচ্চ কলোরাডো মালভূমি। এর ওপর দিয়ে তীব্র বেগে প্রবাহিত কলোরাডো নদী লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কোমল পাললিক শিলার স্তরকে উলম্বভাবে কেটে এক বিস্ময়কর গভীর গিরিখাত বা ক্যানিয়ন সৃষ্টি করেছে, যার নাম গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। এটি প্রায় ৪৪৬ কিমি দীর্ঘ, প্রায় ২৯ কিমি পর্যন্ত চওড়া এবং স্থানে স্থানে ১.৬ কিলোমিটারেরও বেশি (১,৬০০ মিটার) গভীর! নদীর শুষ্ক মরুপথে এই গভীর খাত পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক বিস্ময়।
- মেক্সিকো মালভূমি: সিয়েরা মাদ্রে দ্বারা বেষ্টিত সুউচ্চ ও উর্বর সমতল মালভূমি, যা মেক্সিকোর প্রধান জনবসতিপূর্ণ কেন্দ্র।