ইতিহাসে 'আধুনিক' (Modern) শব্দটি কেবলমাত্র সাম্প্রতিক কোনো সময়কাল বা ক্যালেন্ডারের সন-তারিখকে বোঝায় না; এটি মানবচিন্তা, উৎপাদন ব্যবস্থা, সমাজ কাঠামো ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের এক মৌলিক গুণগত রূপান্তরকে নির্দেশ করে। ইউরোপের ইতিহাসে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের রেনেসাঁস বা নবজাগরণ, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ, এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানদীপ্তি, গণতান্ত্রিক অধিকারবোধ এবং অষ্টাদশ শতকের শিল্পবিপ্লবের সমাহারে আধুনিক যুগের সূচনা ঘটেছিল।
কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে 'আধুনিকতা'-র রূপটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও জটিল। ভারতে আধুনিক যুগের সূচনা কোনো স্বাধীন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে ঘটেনি; বরং তা এসেছিল বিদেশি ব্রিটিশ বণিক শক্তির রাজনৈতিক আধিপত্য, ঔপনিবেশিক পরাধীনতা ও তীব্র অর্থনৈতিক শোষণের হাত ধরে। ফলে ভারতে আধুনিক যুগ মূলত একটি ঔপনিবেশিক রূপান্তরের ইতিহাস এবং একই সঙ্গে সেই ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর জাতীয়তাবাদী প্রতিরোধ ও সংগ্রামের ইতিহাস।
আধুনিক ঐতিহাসিকরা সাধারণভাবে অষ্টাদশ শতককে (Eighteenth Century) মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে পদার্পণের সন্ধিক্ষণ বা রূপান্তরের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই কালপর্বে ভারতীয় উপমহাদেশে দুটি সুদূরপ্রসারী ঘটনা ঘটেছিল:
- মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙন ও আঞ্চলিক শক্তির উত্থান: ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর কেন্দ্রীয় মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলা (মুর্শিদকুলি খান), অযোধ্যা, হায়দরাবাদ এবং পশ্চিম ভারতে মারাঠাদের মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটে, যা মধ্যযুগীয় এককেন্দ্রীক রাষ্ট্রকাঠামোকে ভেঙে দেয়।
- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা: এই আঞ্চলিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক শক্তি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামরিক শক্তিবৃদ্ধি করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর কোম্পানি বাংলা তথা সমগ্র ভারতে নিজেদের প্রভাব কায়েম করে। সবশেষে ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি লাভ করে কোম্পানি প্রত্যক্ষ রাজস্ব ও শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
কোনো ঐতিহাসিক যুগ কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে ম্যাজিকের মতো শুরু বা শেষ হয় না। মধ্যযুগীয় সমাজ রাতারাতি মুছে গিয়ে পরদিনই আধুনিক যুগ শুরু হয়ে যায়নি। অষ্টাদশ শতকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও মধ্যযুগীয় গ্রামীণ অর্থনীতি, সামাজিক আচার-আচরণ এবং মুঘল শাসনব্যবস্থার বহু নিয়মকানুন ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত চালু ছিল। ইতিহাসবিদরা তাই একে আকস্মিক ছেদ না বলে ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে রূপান্তর হিসেবে দেখেন।
ভারতের সামগ্রিক ঐতিহাসিক গতিধারাকে তিনটি প্রধান পর্বে ভাগ করে আলোচনা করা হয়:
| ঐতিহাসিক কালপর্ব | আনুমানিক সময়সীমা | প্রধান আর্থ-সামাজিক রূপরেখা | রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মাইলফলক |
|---|---|---|---|
| প্রাচীন যুগ (Ancient Period) | প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আনুমানিক অষ্টম শতক | হরপ্পার নগরকেন্দ্রিক ব্রোঞ্জ সংস্কৃতি; বৈদিক পশুপালন অর্থনীতি থেকে স্থায়ী কৃষিকাজে রূপান্তর; লৌহ প্রযুক্তির প্রসার এবং হস্তশিল্প ও গ্রামীণ সমাজের উন্মেষ। | মহাজনপদ, মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা; বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু ধর্মীয় ভাবধারা; ধ্রুপদী সংস্কৃত সাহিত্যের বিকাশ। |
| মধ্যযুগ (Medieval Period) | অষ্টম শতক থেকে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধ | সামন্ততান্ত্রিক কৃষি সম্পর্ক; স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজ; সমৃদ্ধ কারিগরী কারখানা (কারখানা ব্যবস্থা) এবং বিশ্ববাজারে ভারতীয় সুতিবস্ত্র ও মসলার বিপুল রফতানি। | দিল্লি সুলতানি, আঞ্চলিক স্বাধীন রাজ্যসমূহ (ইলিয়াস শাহী, হোসেন শাহী), বিজয়নগর ও মুঘল সাম্রাজ্য; সমন্বয়বাদী ইন্দো-ইসলামিক সংস্কৃতি, ভক্তি ও সুফি আন্দোলন। |
| আধুনিক যুগ (Modern Period) | অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৪৭ ও তার পরবর্তী সময় | ঔপনিবেশিক রাজস্ব বন্দোবস্ত (চিরস্থায়ী, রায়তওয়ারি); কৃষির জোরপূর্বক বাণিজ্যিকীকরণ; ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের ধ্বংস (অবশিল্পায়ন); রেলপথ ও আধুনিক কলকারখানার সূত্রপাত। | ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র; উনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণ ও সংস্কার আন্দোলন; আধুনিক জাতীয়তাবাদের জন্ম, গণসংগ্রাম ও ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। |