১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের নিরঙ্কুশ অধিকার লাভ করে। প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে ভূমি রাজস্ব ছিল মূলত উৎপন্ন ফসলের একটি অংশ, যা অনাবৃষ্টি বা বন্যার সময় হ্রাস বা মকুব করা হতো। কিন্তু ব্রিটিশ কোম্পানি রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহ, যুদ্ধের খরচ মেটানো এবং বিলেতে রফতানির জন্য ভারতীয় পণ্য কেনার উদ্দেশ্যে খাজনাকে এক নির্মম, অনমনীয় নগদ অর্থে রূপান্তরিত করে।
ওয়ারেন হেস্টিংস রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রথমে ১৭৭২ সালে পাঁচসালা বন্দোবস্ত (ইজারাদারি ব্যবস্থা) এবং পরবর্তীতে ১৭৭৭ সালে একসালা বন্দোবস্ত চালু করেন। নিলামে সর্বোচ্চ ডাককারীকে জমি ইজারা দেওয়ার এই নীতির ফলে বংশানুক্রমিক প্রাচীন জমিদাররা ধ্বংস হন এবং কৃষকদের ওপর অকথ্য নির্যাতন নেমে আসে।
কোম্পানির বার্ষিক আয়ের অনিশ্চয়তা দূর করতে এবং সাম্রাজ্যের প্রতি অনুগত একটি দেশীয় ভূস্বামী শ্রেণি তৈরি করার উদ্দেশ্যে গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯৩ সালের ২২ মার্চ বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় প্রবর্তন করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। রাজস্ব বোর্ডের জন শোর ও জেমস গ্রান্টের মধ্যকার দীর্ঘ বিতর্কের পর ১৭৯০ সালের 'দশসালা বন্দোবস্ত'-কেই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী রূপ দেওয়া হয়।
- জমিদারদের ভূমিস্বত্ব প্রদান: জমিদারদের জমির স্থায়ী ও বংশানুক্রমিক স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে আবহমানকাল ধরে জমিতে বংশানুক্রমিক স্বত্ব ভোগকারী কোটি কোটি রায়ত বা কৃষক তাদের নিজস্ব জমির ওপর অধিকার হারিয়ে জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায় (Tenant-at-will) পরিণত হয়।
- নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় রাজস্ব: জমিদার কোম্পানিকে যে পরিমাণ বার্ষিক রাজস্ব দেবেন, তা চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় (১৭৮৯–৯০ সালের হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা)। ভবিষ্যতে উৎপাদন বা জমির মূল্য যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, সরকারি রাজস্ব আর কখনো বাড়ানো হবে না।
- রাজস্বের বণ্টন অনুপাত: প্রজাদের কাছ থেকে আদায়কৃত মোট খাজনার ১০/১১ অংশ (প্রায় ৮৯%) কোম্পানিকে দিতে হতো এবং অবশিষ্ট ১/১১ অংশ (প্রায় ১১%) জমিদার তাঁর নিজস্ব মুনাফা ও আদায় খরচ হিসেবে রাখতেন।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে কর্নওয়ালিস প্রণয়ন করেন এক নির্মম আইন, যা ইতিহাসে সূর্যাস্ত আইন (Sunset Law) নামে কুখ্যাত। এই আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বাংলা সনের ধার্য কিস্তির শেষ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বে সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত রাজস্ব জমা দিতে হতো। সূর্যাস্তের আগে এক পাই পয়সাও কম থাকলে বা খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে সরকার কোনো অজুহাত না শুনে সংশ্লিষ্ট জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে প্রকাশ্যে নিলামে বিক্রি করে দিত।
প্রথমদিকে রাজস্বের হার মাত্রাতিরিক্ত চড়া থাকায় ১৭৯৪ থেকে ১৮০৭ সালের মধ্যে বাংলার প্রায় ৪০% থেকে ৫০% জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। রাজশাহীর রানি ভবানী, নদীয়া ও বিষ্ণুপুরের মতো প্রাচীন ঐতিহাসিক রাজপরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তাঁদের স্থান দখল করে কলকাতার নব্য ধনী বণিক, বানিয়া ও মহাজনরা। এরা গ্রামে না থেকে শহরে বসে নায়েব-গোমস্তাদের দিয়ে কৃষকদের ওপর শোষণ চালাত, যার ফলে জন্ম নেয় অনুপস্থিত জমিদার (Absentee Landlord) শ্রেণি।
নিলামের হাত থেকে বাঁচতে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্র ১৮১৯ সালের রেগুলেশন ৮ অনুযায়ী তাঁর জমিদারির অংশ স্থায়ীভাবে অন্যদের কাছে বিলি করতে শুরু করেন, যা পত্তনি প্রথা (Patni System) নামে পরিচিত। জমিদার পত্তনিদারকে জমি দিতেন; পত্তনিদার আবার তা দর-পত্তনিদার এবং সেহ-পত্তনিদারকে সাব-ইজারা দিত। এর ফলে জমি ও কৃষকের মাঝে বহুধাপ মধ্যস্বত্বভোগী পরজীবীর সৃষ্টি হয়, যারা প্রত্যেকে নিজেদের মুনাফা নিশ্চিত করতে নিরীহ প্রজাদের ওপর অন্তহীন বেআইনি কর বা আবওয়াব (Abwab) চাপিয়ে দিত।
দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে (মাদ্রাজ ও বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে) বাংলায় মতো কোনো বড় জমিদার শ্রেণি ছিল না। সেখানে ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার রিড এবং স্যার টমাস মনরো ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তন করেন রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত:
- সরাসরি কৃষকের সাথে চুক্তি: কোনো মধ্যবর্তী জমিদার বা দালাল না রেখে ঔপনিবেশিক সরকার সরাসরি জমির প্রকৃত কৃষক বা 'রায়ত' (Ryot)-এর সাথে রাজস্বের চুক্তি করে।
- জমির চূড়ান্ত মালিক রাষ্ট্র: কৃষক নিয়মিত খাজনা দিলে জমিতে তার স্বত্ব বজায় থাকত, কিন্তু কার্যত রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা প্রধান ভূস্বামী।
- অস্থায়ী ও চড়া করহার: এই ব্যবস্থা চিরস্থায়ী ছিল না; প্রতি ২০ বা ৩০ বছর অন্তর জমি জরিপ করে নতুন করে রাজস্ব ধার্য হতো। রাজস্বের হার ছিল অত্যন্ত চড়া—মোট সম্ভাব্য ফসলের ৫০% থেকে ৬০%।
- মহাজনের ঋণজাল: অজন্মা, খরা বা মহামারী হলেও সরকার এক কড়াও খাজনা মকুব করত না। ফলে নগদ টাকায় কর পরিশোধ করতে গিয়ে রায়তরা গ্রাম্য মহাজন ও সাহুকারদের কাছে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হতো এবং পরিশেষে জমি হারিয়ে ভূমিহীন শ্রমিকে পরিণত হতো।
উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ (বর্তমান উত্তর প্রদেশ), মধ্যভারত এবং পাঞ্জাবের কিছু অংশে গ্রাম পঞ্চায়েত ও যৌথ গ্রাম্য সমাজের ঐতিহ্য বজায় ছিল। এই অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো পর্যালোচনা করে হল্ট ম্যাকেনজি ১৮২২ সালের ৭ নম্বর রেগুলেশন দ্বারা এবং পরবর্তীতে ১৮৩৩ সালে রবার্ট মার্টিন্স বার্ড সংস্কার সাধন করে মহলওয়ারি বন্দোবস্ত চালু করেন:
- কর নির্ধারণের একক: এই ব্যবস্থায় রাজস্ব কোনো একক কৃষক বা জমিদারের ওপর নয়, বরং সম্পূর্ণ গ্রাম বা একগুচ্ছ গ্রাম নিয়ে গঠিত তালুক বা 'মহাল' (Mahal)-এর ওপর ধার্য করা হতো।
- যৌথ দায়িত্ব ও লম্বরদার: রাজস্ব পরিশোধের দায় ছিল গোটা গ্রাম সম্প্রদায়ের যৌথ। গ্রামের মোড়ল বা প্রধান (যাঁকে লম্বরদার / Lambardar বলা হতো) প্রতিটি রায়তের কাছ থেকে অংশ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতেন।
- শোষণের মাত্রা: প্রথমে মোট উৎপাদনের ৬৬% ধার্য করা হলেও ১৮৫৫ সালে তা কমিয়ে ৫০% করা হয়। তবুও অতিরিক্ত করের চাপে গ্রাম্য সমাজ ভেঙে পড়ে এবং বহু জমি বহিরাগত মহাজনদের হাতে চলে যায়।
| বন্দোবস্ত | প্রবর্তক ও সাল | প্রচলিত অঞ্চল | রাজস্বের মাধ্যম | হার ও প্রকৃতি | কৃষকের ওপর প্রভাব |
|---|---|---|---|---|---|
| চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত | লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৯৩) | বাংলা, বিহার, ওড়িশা (ব্রিটিশ ভারতের ১৯%) | জমিদার | চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট; ১০/১১ কোম্পানি, ১/১১ জমিদার | জমিস্বত্বহীন প্রজা, সূর্যাস্ত আইন ও পত্তনি শোষণে নিঃস্ব |
| রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত | টমাস মনরো, আলেকজান্ডার রিড (১৮২০) | মাদ্রাজ, বোম্বাই, আসাম (ব্রিটিশ ভারতের ৫১%) | প্রত্যক্ষ রায়ত (কৃষক) | ২০-৩০ বছর অন্তর পরিবর্তনশীল; উৎপাদনের ৫০-৬০% | সরকারি কর্মচারী ও মহাজনের দ্বিমুখী ফাঁদ, দাক্ষিণাত্য দাঙ্গা |
| মহলওয়ারি বন্দোবস্ত | হল্ট ম্যাকেনজি (১৮২২), মার্টিন্স বার্ড (১৮৩৩) | গাঙ্গেয় উপত্যকা, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ (৩০%) | গ্রামপ্রধান (লম্বরদার) | পরিবর্তনশীল; প্রথমে ৬৬%, পরে ৫০% | যৌথ বাধ্যবাধকতায় গ্রামীণ সংহতি বিনষ্ট ও ঋণগ্রস্ততা |