১.১ ১৮৫৭-র পরবর্তী ব্রিটিশ নীতি ও 'বিভাজন ও শাসন'
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান সিপাহি এবং প্রজারা ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে মহারানী ভিক্টোরিয়া ও ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করলেও ব্রিটিশ প্রশাসন সতর্ক হয়ে ওঠে। ভারতীয়দের এই জাতীয় সংহতি ভবিষ্যতে যাতে পুনরায় ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যকে না কাঁপিয়ে দেয়, সেজন্য ব্রিটিশরা সক্রিয়ভাবে 'বিভাজন ও শাসন' (Divide and Rule) নীতি প্রয়োগ করতে শুরু করে।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ও প্রশাসকেরা ভারতীয় সমাজকে একটি একক জাতি হিসেবে না দেখে 'হিন্দু' এবং 'মুসলমান'—এই দুটি পরস্পরবিরোধী স্থায়ী জাতিসত্তা হিসেবে তুলে ধরতে থাকেন। ঔপনিবেশিক সরকার কখনো এক সম্প্রদায়কে আবার কখনো অন্য সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত সুযোগ দিয়ে নিজেদের শাসন দীর্ঘস্থায়ী করার ভারসাম্য নীতি গ্রহণ করে।
১.২ ১৮৩৭-এর ভাষা নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
সাম্প্রদায়িক পার্থক্যের অন্যতম সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ ছিল ব্রিটিশদের ১৮৩৭ সালের ভাষা আইন। ১৮৩৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আদালত ও সরকারি কাজকর্ম থেকে সরকারি ভাষা হিসেবে ফারসি (Persian) ভাষার ব্যবহার বাতিল করে এবং তার পরিবর্তে উচ্চস্তরে ইংরেজি ও নিম্নস্তরে আঞ্চলিক ভাষা (যেমন বাংলা) চালু করে।
ফারসি ভাষায় পারদর্শী ঐতিহ্যবাহী মুসলিম অভিজাত শ্রেণী (আশরাফ) এই পরিবর্তনের ফলে সরকারি চাকরি ও ওকালতি পেশায় হঠাৎ পিছিয়ে পড়ে। বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যেখানে ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারি প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও শিক্ষকতায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিল, সেখানে মুসলিমরা অনেক দিন পর্যন্ত পশ্চিমা ইংরেজি শিক্ষাকে গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিল।
- সরকারি চাকরির অসম বণ্টন: ১৮৭০-এর দশকে সরকারি উচ্চপদে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল হিন্দুদের তুলনায় নগণ্য।
- বাংলার কৃষি পরিকাঠামো: বাংলায় অধিকাংশ জমিদার, মহাজন ও মধ্যস্বত্বভোগী ছিলেন হিন্দু, আর পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ গরিব প্রজা ও কৃষক (রায়ত) ছিলেন মুসলমান।
- শ্রেণিদ্বন্দ্বের সাম্প্রদায়িক রূপ: ফলে কৃষক ও জমিদারের অর্থনৈতিক শোষণ সহজেই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার রূপ ধারণ করত।
১.৩ ১৮৭২-এর আদমসুমারি ও ডব্লু ডব্লু হান্টারের বই
১৮৭২ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রথমবার সর্বভারতীয় আদমসুমারি (Census) অনুষ্ঠিত হয়। এই আদমসুমারির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে গণনা করা। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারে যে পূর্ববঙ্গে এবং পশ্চিম পাঞ্জাবে মুসলিমরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এর ঠিক আগের বছর, ১৮৭১ সালে সিভিল সার্ভেন্ট স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টার (W.W. Hunter) তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেন—'দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমানস' (The Indian Musalmans)। হান্টার পরিসংখ্যানে দেখান যে আধুনিক শিক্ষা, চাকরি ও সম্পদে মুসলিমরা হিন্দুদের থেকে কতটা পিছিয়ে পড়েছে। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে সতর্ক করে বলেন যে মুসলিমদের এই ক্ষোভ দূর না করলে তারা যেকোনো সময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
হান্টার মুসলিমদের বিশেষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা, বৃত্তি ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এর মাধ্যমেই ব্রিটিশ শাসকের সাথে মুসলিম শিক্ষিত অভিজাতদের নতুন সমঝোতার সূচনা হয়।
১.৪ স্যার সৈয়দ আহমদ খান ও আলিগড় আন্দোলন
ঊনবিংশ শতকে ভারতীয় মুসলিম সমাজের আধুনিকায়নের প্রধান পথপ্রদর্শক ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭–১৮৯৮)। তিনি অনুধাবন করেন যে আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চা ছাড়া মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনরুত্থান সম্ভব নয়। এই উদ্দেশ্যে তিনি গড়ে তোলেন আলিগড় আন্দোলন (Aligarh Movement)।
- এম.এ.ও কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮৭৫): তিনি ১৮৭৫ সালে আলিগড়ে 'মহামেডান অ্যাংলো-ওরিয়েন্টাল (MAO) কলেজ' প্রতিষ্ঠা করেন (যা ১৯২০ সালে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়)।
- দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর: প্রথম জীবনে স্যার সৈয়দ হিন্দু ও মুসলমানকে 'ভারতের দুটি সুন্দর চোখ' বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় পরিবর্তন আসে।
- সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশঙ্কা: তিনি যুক্তি দেন যে ভারতে পাশ্চাত্য ধাঁচের গণতান্ত্রিক নির্বাচন হলে সংখ্যালঘু মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হিন্দুদের অধীনে চিরতরে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
- ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য: তাই তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে কংগ্রেসের রাজনৈতিক আন্দোলন বর্জন করে শুধুমাত্র আধুনিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে এবং ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থাকার পরামর্শ দেন।
১.৫ সিমলা ডেপুটেশন ও মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা (১৯০৬)
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অছিলায় বাংলাকে বিভক্ত করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে নতুন প্রদেশে তাদের উন্নতি হবে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বদেশী আন্দোলনের ফলে বঙ্গভঙ্গ রদের সম্ভাবনা দেখা দিলে মুসলিম নেতারা নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার তাগিদ অনুভব করেন।
১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর মহামান্য আগা খান (Aga Khan III)-এর নেতৃত্বে ৩৫ জন বিশিষ্ট মুসলিম অভিজাতদের একটি প্রতিনিধিদল সিমলায় বড়লাট লর্ড মিন্টোর সঙ্গে দেখা করে। ইতিহাসে এটি 'সিমলা ডেপুটেশন' (Simla Deputation) নামে খ্যাত। তাঁদের প্রধান দাবি ছিল:
- আইনসভায় মুসলিমদের জন্য তাদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুযায়ী আসন সংরক্ষণ।
- মুসলিম প্রতিনিধিদের শুধুমাত্র মুসলিম ভোটদাতারা নির্বাচন করবেন—অর্থাৎ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা (Separate Electorates)।
- একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সরকারি সাহায্য।
লর্ড মিন্টো এই দাবি সানন্দে মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এর ঠিক তিন মাস পর, ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লিগ (All India Muslim League)। লিগের প্রথম স্থায়ী সভাপতি হন আগা খান।