১.১ জলবায়ু অঞ্চলের ধারণা ও সংজ্ঞা
ভৌগোলিক দিক থেকে জলবায়ু অঞ্চল (Climatic Region) হলো পৃথিবীর এমন একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক এলাকা যেখানে বায়ুমণ্ডলের সামগ্রিক উপাদান—যেমন উষ্ণতা, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও বণ্টন, বায়ুচাপ এবং বায়ুপ্রবাহের ধরন এক বিশেষ সমরূপতা বা সাদৃশ্য প্রদর্শন করে। এই জলবায়ুগত সাদৃশ্যের ফলে ওই বিস্তীর্ণ এলাকায় স্বাভাবিক উদ্ভিদ, জীবজন্তু ও মানুষের জীবনধারায় এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
জলবায়ু বোঝার ক্ষেত্রে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পার্থক্য জানা অপরিহার্য:
- আবহাওয়া (Weather): কোনো নির্দিষ্ট স্থানের নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুমণ্ডলের ক্ষণস্থায়ী অবস্থা (যেমন—উষ্ণতা, আর্দ্রতা, মেঘাচ্ছন্নতা, বৃষ্টিপাত ও বায়ুর গতি)। আবহাওয়া প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে পারে।
- জলবায়ু (Climate): কোনো বিস্তৃত অঞ্চলের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ বছরের আবহাওয়ার উপাদানগুলির সামগ্রিক গড় ও সাধারণ প্রবণতাকে ওই অঞ্চলের জলবায়ু বলা হয়।
১.২ অক্ষাংশ ও সূর্যরশ্মির পতনকোণ
পৃথিবী অভিগত গোলক হওয়ায় এবং এর অক্ষ কক্ষতলের সঙ্গে $৬৬.৫^\circ$ কোণে হেলে থাকার কারণে বিভিন্ন অক্ষাংশে সূর্যরশ্মি ভিন্ন ভিন্ন কোণে পতিত হয়। এটিই পৃথিবীর জলবায়ু বৈচিত্র্যের মূল কারণ:
- লম্ব সূর্যরশ্মি (নিরক্ষীয় অঞ্চল): নিরক্ষরেখা ($০^\circ$) ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে সূর্যরশ্মি সারা বছর প্রায় লম্বভাবে পড়ে। লম্ব রশ্মি অল্প স্থান জুড়ে বিস্তৃত হয় এবং বায়ুমণ্ডলের কম স্তর ভেদ করে আসায় তাপের অপচয় কম হয়। ফলে এখানে সারা বছর তীব্র উষ্ণতা বিরাজ করে।
- তির্যক সূর্যরশ্মি (মেরু অঞ্চল): মেরুর দিকে সূর্যরশ্মি অত্যন্ত তির্যকভাবে পড়ে। তির্যক রশ্মিকে অনেক বেশি ক্ষেত্রফল জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে হয় এবং বায়ুমণ্ডলের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে প্রচুর তাপ প্রতিফলিত ও শোষিত হয়। ফলে মেরু অঞ্চলে চরম শৈত্য দেখা যায়।
| তাপবলয় (Thermal Zone) | অক্ষাংশীয় বিস্তার | সূর্যরশ্মির পতনকোণ | জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| উষ্ণবলয় (Torrid Zone) | $২৩.৫^\circ$ উত্তর (কর্কটক্রান্তি) থেকে $২৩.৫^\circ$ দক্ষিণ (মকরক্রান্তি) | সারা বছর প্রায় লম্বভাবে পতিত হয় | সারা বছর উষ্ণ; কোনো প্রকৃত শীতকাল থাকে না। |
| নাতিশীতোষ্ণবলয় (Temperate Zone) | $২৩.৫^\circ$ থেকে $৬৬.৫^\circ$ উত্তর ও দক্ষিণ | মাঝারি তির্যক কোণে পতিত হয় | গ্রীষ্মকালে খুব বেশি গরম নয়, শীতে মাঝারি ঠাণ্ডা; মনোরম জলবায়ু। |
| হিমবলয় (Frigid Zone) | $৬৬.৫^\circ$ থেকে $৯০^\circ$ উত্তর ও দক্ষিণ (সুমেরু ও কুমেরু) | অত্যন্ত তির্যক বা কয়েক মাস সূর্য দিগন্তের নিচে থাকে | সারা বছর তীব্র বরফজমা শৈত্য; দীর্ঘ অন্ধকার মেরু রাত্রি। |
১.৩ ভূমির উচ্চতা ও স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের হার
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওপরের দিকে উঠলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা দ্রুত হ্রাস পায়। একে ভূগোলে স্বাভাবিক উষ্ণতা হ্রাসের হার (Normal Environmental Lapse Rate) বলা হয়:
কারণ বায়ুমণ্ডল সরাসরি সূর্যরশ্মি দ্বারা উত্তপ্ত হয় না; ভূপৃষ্ঠ প্রথমে সৌরশক্তি শোষণ করে এবং পরে দীর্ঘ তরঙ্গবিশিষ্ট পার্থিব বিকিরণ রূপে তাপ বিকিরণ করে বায়ুর নিচের স্তরকে গরম করে। অধিকন্তু, উপরের স্তরের বায়ু অত্যন্ত হালকা ও পাতলা হওয়ায় এতে ধূলিকণা ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে, যা তাপ ধরে রাখতে পারে না। এই কারণেই নিরক্ষরেখার ঠিক ওপরে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও তানজানিয়ার কিলিমঞ্জারো পর্বত (৫,৮৯৫ মি) চূড়ায় চিরস্থায়ী বরফ জমে থাকে।
১.৪ সমুদ্র থেকে দূরত্ব: সমভাবাপন্ন বনাম চরমভাবাপন্ন জলবায়ু
জলের আপেক্ষিক তাপ কঠিন স্থলের চেয়ে প্রায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি। ফলে জলভাগ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয় এবং ধীরে ধীরে শীতল হয়, অন্যদিকে স্থলভাগ দ্রুত গরম ও দ্রুত ঠান্ডা হয়। এর প্রভাবে দুই প্রকার জলবায়ু সৃষ্টি হয়:
- সমভাবাপন্ন জলবায়ু (Maritime Climate): সমুদ্রোপকূলবর্তী অঞ্চলে (যেমন—কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই) জলভাগ ও স্থলভাগের বায়ুপ্রবাহের প্রভাবে গ্রীষ্মকালে খুব বেশি গরম হয় না এবং শীতকালে খুব বেশি ঠাণ্ডা পড়ে না। বার্ষিক উষ্ণতার প্রসার অত্যন্ত কম থাকে।
- চরমভাবাপন্ন জলবায়ু বা মহাদেশীয়তা (Continental Climate): সমুদ্র থেকে বহুদূরে মহাদেশের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে (যেমন—দিল্লি, মধ্য এশিয়া, সাইবেরিয়া) গ্রীষ্মে চরম দাবদাহ ($৪০^\circ-৪৫^\circ\text{সে}$) এবং শীতে বরফজমা ঠাণ্ডা পড়ে। দিন ও রাতের এবং গ্রীষ্ম ও শীতের উষ্ণতার প্রসার অনেক বেশি হয়।
১.৫ বায়ুচাপ বলয়, সমুদ্রস্রোত ও পর্বতের ঢাল
- বায়ুচাপ বলয় ও নিয়ত বায়ুপ্রবাহ: সূর্যের উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়নের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর চাপবলয়গুলি ৫° থেকে ১০° উত্তরে ও দক্ষিণে সরে যায়, যা মৌসুমী ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে।
- সমুদ্রস্রোত: উষ্ণ সমুদ্রস্রোতের (যেমন—উপসাগরীয় স্রোত) ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ু উপকূলের উষ্ণতা বাড়ায় ও প্রচুর বৃষ্টি ঘটায়। অন্যদিকে শীতল স্রোতের (যেমন—ল্যাব্রাডর বা বেঙ্গুয়েলা স্রোত) প্রভাবে উপকূলে চরম শৈত্য, কুয়াশা এবং বৃষ্টিহীন মরুভূমির সৃষ্টি হয় (যেমন—আটাকামা মরুভূমি)।
- পর্বতের অবস্থান (প্রতিবাত ও অনুবাত ঢাল): জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু পর্বতের গায়ে বাধা পেয়ে ওপরে উঠে ঘনীভূত হয়ে পর্বতের সম্মুখভাগে বা প্রতিবাত ঢালে (Windward slope) প্রবল শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত ঘটায় (যেমন—মৌসিনরাম)। কিন্তু পর্বত অতিক্রম করে যখন বাতাস বিপরীত ঢালে বা অনুবাত ঢালে (Leeward slope) পৌঁছায়, তখন তা শুষ্ক ও উষ্ণ হয়ে যায়, ফলে সেখানে বৃষ্টি হয় না। এই এলাকাকে বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল (Rain Shadow Region) বলে (যেমন—শিলং এবং পশ্চিমঘাট পর্বতের পূর্ব ঢাল)।