১.১ প্রতিবেশী দেশের ধারণা ও ভারতীয় উপমহাদেশ (Indian Subcontinent)
যে সকল দেশের সঙ্গে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক স্থলসীমানা বা নিকটবর্তী সামুদ্রিক জলসীমা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকে এবং যাদের পারস্পরিক জলবায়ু, নদীব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের নিবিড় আদান-প্রদান লক্ষ্য করা যায়, তাদের প্রতিবেশী দেশ (Neighbouring Country) বলা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ—এই দেশগুলিকে একত্রে ভারতীয় উপমহাদেশ (Indian Subcontinent) বলা হয়। ভূগোলবিদগণ একে একটি পৃথক "উপমহাদেশ" হিসেবে গণ্য করেন কারণ:
- প্রাকৃতিক প্রাচীর দ্বারা পৃথকীকরণ: উত্তরে সুবিশাল হিমালয় ও কারাকোরাম, উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ ও সুলেমান পর্বতমালা, পূর্বে আরাকান ইয়োমা পাহাড় এবং দক্ষিণে সুবিস্তৃত ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর সমগ্র অঞ্চলটিকে অবশিষ্ট এশিয়া মহাদেশ থেকে একটি স্বতন্ত্র ভৌগোলিক দুর্গের মতো বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
- বিশাল ক্ষেত্রফল ও বৈচিত্র্য: প্রায় ৪৪ লক্ষ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট এই অঞ্চলে মহাদেশের মতো ভূমিরূপ, জলবায়ু, বিভিন্ন জাতি ও ভাষার অনন্য সমাহার ঘটেছে।
- একক মৌসুমি জলবায়ু চক্র: সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশীয় অঞ্চলের কৃষি, নদীব্যবস্থা ও ঋতুচক্র যৌথভাবে ভারত মহাসাগরীয় মৌসুমি বায়ুর গতিপ্রকৃতির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।
১.২ ভারতের আন্তর্জাতিক স্থল ও সামুদ্রিক সীমানা
ভারতের মোট আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫,১০৬.৭ কিলোমিটার এবং মোট উপকূলরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭,৫১৬.৬ কিলোমিটার (আন্দামান-নিকোবর ও লাক্ষাদ্বীপ সহ)। ভারতের স্থলসীমান্ত ৭টি স্বাধীন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত:
| প্রতিবেশী দেশ | সীমান্তের দৈর্ঘ্য (কিমি) | সংলগ্ন ভারতীয় রাজ্যসমূহ | সীমান্তরেখার নাম / বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ৪,০৯৬.৭ কিমি | পশ্চিমবঙ্গ (২,২১৭ কিমি), অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরাম | রেডক্লিফ লাইন (ভারতের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক স্থলসীমানা)। |
| চীন | ৩,৪৮৮ কিমি | লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ | ম্যাকমোহন লাইন (McMahon Line - ১৯১৪ সালের চুক্তি)। |
| পাকিস্তান | ৩,৩২৩ কিমি | গুজরাট, রাজস্থান, পাঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ | রেডক্লিফ লাইন (Radcliffe Line - ১৯৪৭); নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC)। |
| নেপাল | ১,৭৫১ কিমি | উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম | উন্মুক্ত শান্তিময় হিমালয়ীয় সীমানা (১৯৫০ মৈত্রী চুক্তি)। |
| মায়ানমার | ১,৬৪৩ কিমি | অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম | অরণ্যাবৃত পাহাড়ি সীমানা (কালাদান অববাহিকা)। |
| ভুটান | ৬৯৯ কিমি | সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ, অসম, অরুণাচল প্রদেশ | শান্তিপূর্ণ ও সুরক্ষিত পাহাড়ি সীমানা। |
| আফগানিস্তান | ১০৬ কিমি (বাস্তবে ৮৬ কিমি) | লাদাখ (পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের ওয়াকান করিডোর) | ডুরান্ড লাইন (Durand Line - ১৮৯৩; ভারতের ক্ষুদ্রতম সীমান্ত)। |
১.৩ স্থলবেষ্টিত ও দ্বীপ প্রতিবেশী রাষ্ট্র
ভৌগোলিক সান্নিধ্য ও সমুদ্রোপকূলের উপস্থিতির ভিত্তিতে ভারতকে কেন্দ্র করে দুই ধরনের প্রতিবেশী দেশ দেখা যায়:
- ১. স্থলবেষ্টিত দেশ (Landlocked Countries): নেপাল ও ভুটান। এই দেশগুলির কোনো নিজস্ব উন্মুক্ত সমুদ্রোপকূল নেই; চারপাশ স্থলভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এরা ভারতের কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত ট্রানজিট সুবিধায় বহির্বাণিজ্য পরিচালনা করে।
- ২. দ্বীপ প্রতিবেশী দেশ (Island Neighbours): শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। শ্রীলঙ্কা ভারত থেকে পক প্রণালী ও মান্নার উপসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন একটি প্রধান দ্বীপরাষ্ট্র। মালদ্বীপ আরব সাগরে লাক্ষাদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত প্রায় ১,২০০টি প্রবাল দ্বীপ ও ২৬টি প্রাকৃতিক অ্যাটলের সমন্বয়ে গঠিত রাষ্ট্র।
১.৪ সার্ক (SAARC): প্রেক্ষাপট, গঠন ও নীতিসমূহ
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও জনগণের সার্বিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে সার্ক (SAARC - South Asian Association for Regional Cooperation) বা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা।
সার্ক সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী:
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রথম শীর্ষ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
- স্থায়ী সদর দপ্তর (Secretariat): নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু (Kathmandu)-তে অবস্থিত।
- সদস্য দেশ (৮টি): ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ২০০৭ সালে চতুর্দশ সম্মেলনে যুক্ত হওয়া আফগানিস্তান।
- সাফটা (SAFTA - South Asian Free Trade Area): সদস্য দেশগুলির মধ্যে আন্তঃবাণিজ্যিক শুল্ক হ্রাস করে মুক্ত বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা।
- মূল নীতি: সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো হস্তক্ষেপ না করা। কোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধ সার্কের আলোচনায় তোলা যায় না।
১.৫ সুপ্রতিবেশী সম্পর্কের তাৎপর্য ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব
ভারতের নিরাপত্তা, জলবায়ু সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তার প্রতিবেশী দেশগুলির শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির সংযোগ রক্ষা, আন্তর্জাতিক নদীজলের যৌথ ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস আদান-প্রদান এবং সীমান্ত সন্ত্রাস ও অনুপ্রবেশ রোধে ভারত তার পররাষ্ট্র নীতিতে "প্রতিবেশী প্রথম" (Neighbourhood First) নীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে।